প্রত্যেক বছর এই দিন’টা এলে আসমা’র অস্বচ্ছ চশমা’র কাঁচ, আরও ঝাপসা হয়ে আসে। দেওয়ালে টাঙানো ওনার ছবি’তে ফুলমালা পরে, ছেলেপুলেরা তো সব দূূরে দূরেই আজ কতবছর,ন’মাসে ছ’মাসে খোঁজ-খবর নেয়,তাও মন-মর্জি। সবকটা’কেই তো
পেটে ধরেছিল,এই রুখুশুকু বুকের ওমে মানুষ করেছিল আকালে’র দিনে। দীর্ঘশ্বাসে বেঁচে থাকা বছরগুলো তার দিকে অশালীন ঈঙ্গিত করে জানান দেয় ‘যার যার তার তার ‘, ওসব আদর্শ, দেশপ্রেমের পেছনে লাথ, গর্ভস্থ সন্তানের’ও দায় নেই অসুস্থ মা’র দায়িত্ব নেওয়ার। ওই কামাল যেটুকু রোজগার করে, মাষ্টারি’র মাইনেটুকু’ই এ সংসারে ভরসা। মা’র জন্য সারাজীবন ছেলে বিয়ে-শাদি করলো না, বউ এসে যদি না দ্যাখে! মা-অন্ত প্রাণ, এ পোলা ছিলো উল্টো বসা পেটের মধ্যে, ডাক্তার-কোবরেজ বিস্তর ফাড়াফাড়ি করে বের করেছে। বরকত আলি, এরে দু-চোখে দেখতে পেতেন না, অথচ শেষ বয়েসে এ ছেলেই তো সব করলে, বিছানায় পড়েছিলেন তিনি, হাগা-মোতা, সেবা-যত্ন, সব এই কামাল। অন্য ছেলে’রা ঘরে উঁকিও দেয়নি। মুখে কাপড় চেপে বউ’রা সরে গেছে।
—চিকিৎসা করান আম্মা, ডাক্তার দেখান। টাকা যা লাগে পাঠামু।
নোয়াখালি থেকে তিলজলা, উঠে এসে বসতি হলো, ঘর হলো না। গাছে’র শেকড় উপড়ে অন্য জায়গায় বসালে সে কী আর আগের মত বাঁচে!
নোয়াখালি’তে বাবা ছিলেন ইস্কুল-মাষ্টার, পড়াশোনায় আগ্রহ ছিলো আসমা’র, তখন ১৯৪৬ সাল, দাঙ্গা হচ্ছে হিন্দু-মুসলমানে, ঘরবাড়ি পোড়ানোর খবর আসছে রোজ, বাতাসে লাশে’র গন্ধ। স্বাধীনতার জন্য লড়ছে ছেলে’রা, বরকত আলি তার দলের’ই ছেলে। আসমা ভীষণভাবে জড়িয়ে পড়েছিলো সেসব অনুষঙ্গে, বাড়িতেই চলতো দলে’র কাজ। বাবা মা মুক্ত মনের মানুষ ছিলেন, বাধা দেননি। বাবা’র ছাত্রছাত্রী’রা দশহাতে আগলে রাখতো তাদের পুরো পরিবার’কে।
মাইক্রোফোনে গমগম আওয়াজে দেশপ্রেমে’র গান বাজছে, একদল ছেলে-পুলে, চেয়ার ধরে গোল করে ঘুরে, খেলা করছে, বিক্ষিপ্ত মানুষজন ঘুরে বেড়াচ্ছে। মঞ্চে’র ওপর চেয়ারে বসে আছে আসমা, কাউন্সিলর, পার্টি’র লোকজন, মহিলা কমিশনের নেত্রী সবাই আছেন।
এলাকা’র বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে মহাপুরুষদের ছবি’র ঠিক নিচে বরকত আলি’র ছবিতে টাটকা মালা দেওয়া। বরকত তাকে নিয়ে যে রাতে বাংলাদেশ ছাড়ে, সেদিন সন্ধেয় পুলিশের গুলিতে ঝাঁঝড়া হয়ে গেছে শাহিদ, আসমা’র বড়’দা। মা’র দুচোখ পাথর হয়ে গেছিল, বিড়বিড় করে বাবা কী সব বলছিলো। শেষবারের মত কাঠ-টগর গাছের নীচে ঝুঁঝকি অন্ধকারে তার সাথে দেখা করতে এসেছিলো বারিদ, বারিদবরণ রায়।
—হিন্দু’র পোলা তুমি বাপ, আমাগো ঘরে খাবা?
—কী যে ক’ন খালাম্মা, শাহিদ আমাগো বন্ধু, মনে নাই আপনের, কত্তদিন আমরা জড়ামড়ি করে ঘুমাইছি, একলগে ইস্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সব।
দ্যান দেহি আর দু-মুঠো ভাত, চাপা শুটকি’র ভর্তা দিয়া মাখি। একছুটে দৌড়ে গিয়ে লেবু চিপে ভর্তা নিয়ে আসতো আসমা। বারিদ আবডালে চেপে ধরতো তার হাত, নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাস মিশিয়ে বলতো, তুমি আমার আসমা,আসমানতারা। ওদের দোলে’র ঘুগনি, গজা, বিজয়া’র নাড়ু দিব্বি চলে আসতো এ বাড়িতে। বারিদ মাষ্টারমশাই’কে প্রণাম করে, আবীর লাগিয়ে দিতো আসমা’র গালে।
দেশভাগ আবার কী? উত্তেজিত শাহিদ, বারিদ, বরকত, জব্বার, বিজয়, সুবাস অস্থির পায়চারি করছে, সারারাত ঘুমায়নি ওরা, মানুষ মরছে পিঁপড়ের মতো, দলে দলে মানুষ বাক্স প্যাঁটরা নিয়ে চলে যাচ্ছে। বরকতে’র মামা-বাড়ি ইন্ডিয়া, কলকাতা তখন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। পরদিন সন্ধেয় বড়’দা খুন হইলো, বারিদ কুকুরের মতো হাঁফাচ্ছিলো, ঘামে চকচক করছিলো ওর মুখ,
—তিনদিন কিছু খাইতে পাইনি আসমা, দু-মুঠো মুড়ি,গুড়,দিবে কিছু?!
দুটো রুটি এনে দিয়েছিল রান্নাঘর থেকে আসমা, চলে যাবার সময় বারিদ কয়েছিলো,
—শাহিদের পরিবার মানে আমার পরিবার, আমি ঠিক ফিরে আসবো আসমা, আমার ওপর ভরসা রেখো। শাহিদের চলে যাওয়া এভাবে মেনে নিতে পারবো না।
হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, তার ওপর ব্রিটিশ অত্যাচার। জেরবার হয়ে যাচ্ছে দলে’র ছেলে’রা। তবু ওরা বারবার নিজেদের বুঝিয়েছে, আত্ম-সংহতি ভাঙা যাবে না। এ দাঙ্গা উস্কানীমূলক, তাদের কোনো ভেদ নেই, রাজনৈতিক স্বার্থে এসব হচ্ছে। একবছর যাবৎ চলছে এসব, তখন আসমা টুয়েলভ ক্লাসের ছাত্রী, বারিদ রোজ সন্ধ্যেবেলা আসে ইংরেজি পড়াতে, খুব বৃষ্টি সেদিন। ঝপ করে আলো নিভে গেছিলো হ্যারিকেনে’র, ভয়ে বারিদের বুকের ভেতর এতটুকু হয়ে সেঁধিয়ে গেছিলো আসমা।
সেদিন সন্ধ্যেটা কখনো ভুলতে পারেনি সে, ভেতরের ঘরে মা নিঃশব্দ, পাশের বাড়ি’র খালা’রা সুর করে কাঁদতেছিল দাদা’র জন্য, পুলিশের টর্চের আলোয় সারাবাড়ি ফালাফালা, বারিদে’র জামা চেপে ধরে আসমা শেষবারের মতো বলেছিল
—আমারে কই ফেলাইয়া যাও? দু’মাস আমার শরীরখারাপ হয়নি।
—আসমা, আমি কোথায় যাব তার কী ঠিক আছে! আমি ফিরা আসবো, মা’রে বলা আছে, তেমন বুঝলে তুমি আমার মা’র কাছে চলিয়া যেও। পেটে আলতো হাত বুলিয়ে বলেছিল,
—এরে তুমি দেখো,বাঁচিয়ে রেখো।
তখনও বড় রাস্তায় ওঠেনি, কাতর আর্তনাদ ঠিকই শুনেছিল আসমা, ছিটকে পড়েছিল দুখানা রুটি কোঁচড় থেকে, এবার আর পুলিশ নয়, দল পাকিয়ে বেপাড়া’র রফিক, সালাম, জুবায়েদ… আরও অনেকে, বারিদ হিন্দুর ছেলে!!
—স্বাধীনতা বিষয়ে আপনি যদি কিছু বলেন আজ এই অনুষ্ঠানে!
মাইক্রোফোন এগিয়ে দিয়েছে একটি হাসিখুশী মেয়ে, সেদিনের আসমা’র মতো।
ছুটে বারিদের কাছে যেতে চেয়েছিল আসমা, লাফ দিয়ে পথ আটকায় বরকত, তার খালাতো ভাই। নিজের খালা নয়, মা’র কেমন জানি বোনের ছেলে, হাতের মুঠি চেপে হিসহিস করে শাসিয়েছিলো তাকে,
—চোপ! তোর জন্য সবার খতড়া। কথা কইবি না। আশনাই? বারিদের সাথে পীরিত হচ্ছে? যা বলবো শুনবি, হিন্দুদের সাথে কোন আঁতাত না। চল…
টানতে টানতে ঘরে নিয়ে গেছিল তাকে, মা’র ততক্ষণে সেরিব্র্যাল এ্যাটাক হয়ে গেছে, বাবা উন্মাদের মত করছে, বারিদ’দের পাড়ার হিন্দু’রা দল পাকাচ্ছে বদলা’র জন্য। দলে’র মিলন, সমীর ছুটে এসে বাবা’কে বলেছিলো,
—বারিদে’র পিছনে বর্শা ঢুকিয়ে মুখ দিয়ে বার করে দিয়েছে ওরা, নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে এসেছে মুখের বাইরে,নড়াচড়া করেছিল কিছুক্ষণ, উপুড় হয়ে পড়েই আছে সে। শুনে পাঁঠাকাটা’র মতো ছটফটিয়ে উঠেছিল আসমা, আর সে রাতেই কাঁটাতার ডিঙিয়ে আসমা’কে নিয়ে ইন্ডিয়া’য় চলে এসেছিলো বরকত। বাবা’র তখন আটকানো’র অবস্থা নেই। সীমান্তে চাপা ফিসফিসিয়ে বলেছিল বরকত আলি,
—আমি বারিদ, বারিদবরণ রায়।
সেই বরকত হলো স্বাধীনতা সংগ্রামী। ব্যবসা-পাতি করে এতগুলো বছর কাটলো,ছেলে-পুলে। জোর করে বিয়া করতে মত দিছিলো আসমা, কে দেখবে তারে! সে শেকড়ছেঁড়া, শ্যাওলার মত ভেসে যাচ্ছে তখন।
চাপা হিসহিসিয়ে কইলেও, পেটের’টাকে নষ্ট করতে দেয়নি, আসমা। জেলা হাসপাতালে ওর মুখ দেখে কয়েছিল বরকত,
—এক্কেরে বারিদের মুখ বসানো। সারাজীবন অন্যের পাপ টানো অহন!
আর আসমা দেখেছিল, তলপেটে লাল জন্মদাগ, বারিদে’র ছিল যে! ছেলের নাম রাখা হলো কামাল।
বলা হয়নি তেমন কিছুই, নিয়মমাফিক, ওই সামান্য কথা, একটু-আধটু যা বলা হয়, আর কী! কিই’বা বলার আছে!
অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে মাথা’টা কেমন পাক দিয়ে দিলো একচক্কর। কামাল ধরেছিল ঠিকই, না হলে পড়ে গিয়ে চোট লাগতো জোর। ঘরে ঢোকার মুখে দেখলো বরকত আলি’র ছবিতে সালাম করছে কামাল।
ফজরের নামাজের সময় হয়ে এলো, কামাল জায়নামাজে বসে, দোয়া চাইছে দুহাত তুলে।
বারিদে’র শেষ চিহ্ন টুকু শরীরে ছাড়াও একটা জিনিষ লুকাইয়া সঙ্গে করে এনেছিলো আসমা, বারিদ তারে দিছিলো এক শুনশান দুপুরে। তার মায়ে’র, লক্ষী’র ছোট একখান ঘট, পেতলের, চকচকে, তাতে সিঁদূর লাগানো। ওদের রায়-বাড়ী’র লক্ষীপুজা’র নাম ছিল দ্যাশ-গাঁয়ে।
—এ ঘট তোমারে দিলাম আসমা, তুমি আমার লক্ষী। বাপ-জেঠা যদি নাও মানাইয়ে নেয়, মা তুমারে ফেলবে না, এ আমাগো বংশের ঐতিহ্য, আমার মা’র জিনিষ। তুমি ইয়ার অমর্যাদা কখনো করিও না!
এতগুলো বছর বুকে আগলাইয়া রাখছে আসমা, কতবার ভেবেছে তোরঙ্গ খুলে বাইর করবো, পারেনি। ছেলে -বউ’রা হাসাহাসি করেছে,
—ওতে আম্মু’র হিরের নেকলেস আছে, বাপের ঘর থিক্যা নিয়ে আসছে।
হা হা হা করে অশ্লীল হেসেছে বরকত আলি, তবু প্রাণ থাকতে এরে কারোর হাতে পড়তে দেয়নি আসমা।
আজ ১৫ ই অগাষ্ট, শরীর এবার যাইযাই করতেছে, অনেকদিন তো বাঁচা হলো, সেই ১৯৪৭ সালে দ্যাশ স্বাধীন হলো, তখন বিয়া হয়ে গেছে। আব্বু -আম্মা’র গোরে মাটি দেবার লগে ছোড়’দা বারবার কয়েছিল নোয়াখালি যেতে, মিঞা যাইতে দেয়নি। সে আসমা, আসমা বেগম, স্বাধীনতা সংগ্রামী। তখন সন্ধে হয়ে আসছে, কামাল অযু করে এসে বসেছে মা’র পাশটিতে,লক্ষী’র ঘটখানা বের ক’রে তার হাতে দিয়ে আসমা বলে,
—রাখো বাপজান, তোমার কোরান শরীফে’র পাশে যত্ন করিয়া রাখো, আমি আজ আছি, কাল নেই, তোমার বাপে’র, তোমার বংশের স্মৃতি,অমর্যাদা কোরো না। তুমি আমার কলিজা’র টুকরা, আমি জানি তুমি ঠিকই বুঝবে। আমি আজ স্বাধীন হলাম, এই আসমা বেগম মুক্তি পাইলো।
বাইরে তখন পাড়া’র ক্লাবে বাজছে
—মাগো, ভাবনা কেন? আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে, তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে লড়তে জানি, তোমার ভয় নেই মা, আমরা প্রতিবাদ করতে জানি।
বারিদবরণ’রা চিরদিন আড়ালে থাকে, থেকে যায়, আসমা’রা মুক্তি পাবে বলে!