|| মানচিত্র আর কাঁটাতার, হৃদয় মাঝে একাকার || বিশেষ সংখ্যায় ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত

স্বাধীনতার স্বাদ আর দেশভাগের বিষাদ

প্রতি বছর ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এবছর অর্থাৎ ২০২০ সালে (শনিবার) ৭৩ তম স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালিত হবে। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা লাভ করেছিল, সে দিনটাও ছিল শনিবার। তবে ভাবার বিষয় ১৫ আগস্টকে কেন ভারতের দেশের স্বাধীনতার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল? মাউন্টব্যাটেনের কাছে ১৫ আগস্ট দিনটি মঙ্গলজনক ছিল, কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জাপানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল এবং মাউন্টব্যাটেন সে সময় মিত্রবাহিনীর সেনাপতি ছিলেন। তবে ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্রবিদরা বলেছিলেন উনিশশো সাতচল্লিশ সালের পনেরোই আগস্ট দিনটা নাকি শুভ ছিল না। লর্ড মাউন্টব্যাটেন ছাড়া কাউকেই সে দিন ঠিক গরিমায় আপ্লুত দেখা যায় নি। তাই ক্ষমতা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা হল, গোটা শহরে প্রায় তিনশোটি পতাকা তোলা হল, কিন্তু নাচ-গান সমারোহ হল না। সরকারি আনন্দ একটু নিচু তারে বাঁধা রইল। আশঙ্কা সত্যি প্রমাণ করে দিল্লিতে পরের দিনই আবার শুরু হল হানাহানি।
এদিকে ভারতের ইতিহাসে এই প্রথমবার করোনার জেরে সংক্ষিপ্ততম স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান হতে চলেছে দিল্লির রাজপথে। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এবার অনুষ্ঠানে থাকবেন ১৫০০ জন করোনা যুদ্ধ জয়ীরা। এঁদের মধ্যে ৫০০ জন স্থানীয় পুলিশ কর্মী ও ১০০০ জন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ।
স্বাধীনতার স্বাদ
যাই হোক, অর্জিত স্বাধীনতার আনন্দ উপভোগের জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আমাদের যে দীর্ঘ লড়াই তা সংক্ষেপে একটু তুলে ধরি।
মুলতঃ ইংরেজরা ১৬০৮-এ মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনকালে সুরাটে প্রথম বাণিজ্য কুঠি স্থাপনের অনুমতি পায়। আস্তে আস্তে ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলে তাদের বিচরণ শুরু হয়। ১৬৫৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন প্রতিনিধি হিসেবে জেমস হার্ট ঢাকা প্রবেশ করার মধ্য দিয়ে বাংলায় ইংরেজ আগমন শুরু হয়। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধ হয় তাতে বাংলার নবাবের করুন মৃত্যু দিয়ে এই ভুখন্ডে অর্থাত্ ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সূচিত হয়।
ব্রিটিশ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ বাংলার প্রথম গভর্ণর নিযুক্ত হন। তারপর মীরকাসিম সিংহাসনে বসলে পুনরায় দ্বন্দ্ব বাধে। মীরকাসিম অযোধ্যার নবাব সূজাউদ্দৌলা ও দিল্লীর বাদশা দ্বিতীয় শাহ আলমের সাথে মিলিত হয়ে ১৭৬৪ খৃষ্টাব্দে ২২ অক্টোবর কোম্পানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই যুদ্ধে মীরকাসিম চুড়ান্তভাবে পরাজিত হলে বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের ভিত সুনিশ্চিত হয়। যা ইতিহাসে বক্সারের যুদ্ধ নামে খ্যাত।
১৮৫৭ খৃষ্টাব্দে সিপাহি বিদ্রোহ ছিল প্রথম বৃহৎ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন। ব্রিটিশ সরকার ওই সময় এক ধরণের বন্দুক এনফিল্ড রাইফেল এর প্রচলন করে যার কার্তুজ এর খোলসটি গরু এবং শূকরের চামড়া দিয়ে নির্মিত ছিল এবং এটি দাঁত দিয়ে কেটে ভরতে হতো। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সৈনিকদের ধর্মকে আঘাত করা এবং তাদের খৃষ্টান ধর্মে দিক্ষিত করা। এই সময় সারা ভারতের সৈনিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই বিদ্রোহ সর্বপ্রথম ব্যারাকপুরের সেনানিবাসের একজন সৈনিক মঙ্গল পান্ডে সূচনা করেন। এই বিদ্রোহের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কেঁপে উঠলেও শেষ দিকে নেতৃত্বের অভাবে ও দেশবাসীর সহযোগীতার অভাবে এ বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়।
এরপর ১৮৫৮ সালে ভারতের শাসনভার ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ব্রিটিশ রাজশক্তির হাতে স্থানান্তরিত হন। রানি ভিক্টোরিয়া নিজ হাতে ভারতের শাসনভার তুলে নেন। এর সঙ্গে সঙ্গে ভারতে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ ভারতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
তারপর ১৮৮৫ খৃষ্টাব্দে জাতীয় কংগ্রেস তৈরি হওয়ার পর গান্ধীজী, নেহরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, মৌলানা আবুল কালাম কংগ্রসে যোগদান করলে স্বাধীনতা আন্দোলন আরও তীব্রতর হয়ে ওঠে। তাই ১৯০৫ সালে তৎকালীন ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন বাংলায় হিন্দু ও মুসলমান ঐক্যকে নষ্ট করার উদ্দেশে বাংলাকে দু-ভাগে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং Divide and Rule Policy গ্রহণ করে। তারপরই শিক্ষিত ব্যক্তিত্বগণ বন্দেমাতরম ধ্বনি দিয়ে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন শুরু করে। ব্রিটিশ সরকার মনে করে কলকাতা থেকেই সব আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে তাই ১৯১১ সালে ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে পরিবর্তন করে দিল্লীতে প্রতিষ্টা হয়।
১৯১৯ সালে রাওলাট পাশ করে ভারতীয়দের সব স্বাধীনতা খর্ব করে – যেমন পরোয়ানায় গ্রেফতার, প্রচারকার্যে বাধা, বিনা বিচারে শাস্তি প্রদান, আপিলে নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি। এই আইনের বিরুদ্ধে ১৯১৯ খৃষ্টাব্দের ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবাগে এক শান্তিপুর্ণ সমাবেশে প্রায় ১০ হাজার মানুষ যোগদান করে। এই মাঠ ছিল পাঁচিল দিয়ে ঘেরা এবং একটিমাত্র ঢোকা ও বের হবার রাস্তা ছিল।
এই সময়ে সামরিক শাসনকর্তা মাইকেল ডায়ার তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে সভাস্থলে উপস্থিত হন এবং নিরস্ত্র মানুষের উপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করতে থাকেন। এর ফলে ৩৭৯ জন মারা যায় এবং ১২০০ জন আহত হয়, এটি জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ড নামে পরিচিত।
জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের পর জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। তবে এই আন্দোলন পুরোপুরি ভাবে সফল হয়নি কারণ জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের পর ভারতীয় জনগণের মনে ব্রিটিশদের প্রতি হিংসা বেড়ে গিয়েছিল।
অসহযোগ আন্দোলনের পর গান্ধীজী ১৯৩০ খৃষ্টাব্দের ১২ই মার্চ ৭৮ জন অনুদানসহ সবরমতী আশ্রম থেকে গুজরাটের ডান্ডি অঞ্চলে ২০০ মাইল যাত্রা শুরু করে আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা করেন যা ইতিহাসে ডান্ডি অভিযান নাম পরিচিত।
এই ঘটনার পর ভারতীয় রাজনীতিতে সুভাষচন্দ্র বসুর আগমন হয়। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু মহাত্বা গান্ধীর এই অহিংসা মনোভাব পছন্দ করতেন না। নেতাজীর বক্তব্য ছিল, “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব”। উনি চাইতেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এবং সেটা হবে সমর যুদ্ধ। তাই তিনি খুঁজছিলেন ঠিক সেই মুহুর্তে ইংরেজদের বিরুদ্ধে কোন পরাশক্তি আছে। সেই হিসেবে সে খুঁজে পায় জামার্নীকে আর ইংল্যান্ড তো তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র বাহিনী। আর তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতবর্ষের অংশগ্রহনটা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু ভালো ভাবে নেননি। তিনি হিটলারের কাছে গেলেন।
কিন্তু সেই মুহুর্তে হিটলার প্রচন্ড ব্যাস্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে। তাই নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু অক্ষশক্তির আরেক শক্তিশালী রাষ্ট্র জাপানের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। এসময় জার্মান তাকে একটি সাবমেরিনে করে জাপানে পৌছে দেয়। জাপান নেতাজীর পরিকল্পনা শুনে, এতে মত দেয়। এবং প্রয়োজনীয় অর্থ ও সমরাস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে।
রাসবিহারী বসুর কাছ থেকে আজাদ হিন্দ ফৌজের দায়িত্ব নিয়ে ভারত আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেন। আজাদ হিন্দ ফৌজ মূলতঃ ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা গঠিত একটি সশস্ত্র সেনাবাহিনী। ১৯৪২ সালে এই বাহিনী গঠিত হয়। এর বাহিনী ভিতরে ভারতের স্বাধীনতাকামী মানুষ, ইংরেজ নির্যাতিত ভারতীয়, মুটে ও মজুর ছিল। আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অর্থের অভাব থাকলেও নেতাজী সুভাসের অসাধারণ নেতৃত্বের ফলে প্রায় ৬০ হাজার সৈন্যের একটি সুশৃঙ্খল দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী গড়ে ওঠে।
জাপানী সহায়তায় বলীয়ান হয়ে এই বাহিনী ভারতের উত্তর-পূর্ব দিক থেকে ভারতকে আক্রমন করে। [এখানে একটা বির্তক আছে যে কেন সে ভারতীয় হয়ে ভারতকে আক্রমন করলো? আসলে তার আক্রমন ছিল ইংরেজদের বিরুদ্ধে]
জাপানের সহায়তায় আজাদ হিন্দ ফৌজ অতর্কিত আক্রমনে ভারতে ইংরেজরা কিছুটা হলেও নড়বড়ে হয়ে যায়। এক যুদ্ধের ভিতরে আরেক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে ভারতের আরাকান, ইম্ফল, ময়রাং, বিষেণপুর প্রভৃতি স্থান সুভাষ চন্দ্র দখল করে নেন। এসব দখলকৃত জায়গা পুনরুদ্ধারের জন্য ব্রিটেনের নেতৃত্বে মিত্র বাহিনী মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা যুদ্ধবিমান ও কামান নিয়ে আক্রমণ শুরু করে। ঠিক এই মুহুর্তে নেতাজীর দল একটু পিছপা হয়ে পড়ে। তখন তারা রেঙ্গুনে গিয়ে আবারো পুর্নগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। কয়েক মাস ব্যাপী এ যুদ্ধে মারা যায় উভয় পক্ষের অনেক সৈন্য। কিন্তু ঠিক এই মূহুর্তে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয় পরাজিত হয় অক্ষ বাহিনী। তাই জাপানের আত্মসমাপর্নের ফলে বন্ধ হয়ে যায় আজাদ হিন্দ ফৌজের রসদ সরবরাহ। তারপর থেকে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু নিখোঁজ হন। কথিত আছে ১৯৪৫ সালের ১৮ অগস্ট তাইওয়ানে একটি বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। (তবে তাঁর এই দুর্ঘটনায় মৃত্যু নিয়ে বির্তক আছে)।
তারপর কিংস প্রস্তাব ব্যর্থ হলে ১৯৪২ সালের ৮ই আগষ্ট ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হয়। ভারত ছাড়ো আন্দোলনে কৃষক-শ্রমিক, নারী-পুরুষ, ছাত্র-ছাত্রী নির্বিশেষে ব্রিটিশ সরকারের বিরোধিতায় গণআন্দোলন শুরু করে।
বিভিন্ন গণআন্দোলনের পর ব্রিটিশ সরকারের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে ব্রিটেনের অর্থনৈতিক অবস্থা ধসে পড়ে যার কারণে ব্রিটিশ সরকার খুবই দুর্বল পড়ে অবশেষে ব্রিটিশদের হাত থেকে ১৯০ বছর পর ভারত স্বাধীনতা লাভ করে।
তবে ভাবার বিষয় ১৫ আগস্টকে কেন ভারতের দেশের স্বাধীনতার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল?
মাউন্টব্যাটেনের কাছে ১৫ আগস্ট দিনটি মঙ্গলজনক ছিল, কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জাপানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল এবং মাউন্টব্যাটেন সে সময় মিত্রবাহিনীর সেনাপতি ছিলেন। উনিশশো সাতচল্লিশ সালের পনেরোই আগস্ট দিনটা নাকি শুভ ছিল না, জ্যোতিষশাস্ত্রবিদরা বলেছিলেন।
সেদিন জওহরলাল নেহরু ভারতের স্বাধীনতা দিবসে (Independence Day) একটি ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। যাকে আমরা ‘ট্রিস্ট উইথ ডেসটিনি’ বলেই জানি। এটি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর (Jawaharlal Nehru) সংসদে দেওয়া প্রথম ভাষণ। প্রতি স্বাধীনতা দিবসে (Independence Day) ভারতের যিনি প্রধানমন্ত্রী থাকেন, তিনি লাল কেল্লা থেকে পতাকা (Flag of India) উত্তোলন করেন।
কিন্তু ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট কিন্তু এই পতাকা তোলা হয়নি। লোকসভা সচিবালয়ের একটি গবেষণা পত্র অনুসারে, নেহেরু ১৯৪৭ সালের ১৬ অগাস্ট লাল কেল্লা থেকে পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। ভারত-পাকিস্তানের সীমানাও ওই সালের ১৫ অগাস্ট স্থির হয়নি। ১৭ আগস্ট র্যা ডক্লিফ লাইনের ঘোষণার সঙ্গে এটির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
১৯৪৭ সালের ৪ জুলাই ব্রিটিশ হাউস অফ কমন্সে ভারতীয় স্বাধীনতা বিল পেশ করা হয়। এই বিলে ভারত ভাগ ও পাকিস্তান গঠনের প্রস্তাব ছিল। বিলটি ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই গৃহীত হয় এবং ১৪ অগাস্ট দেশ ভাগের পর ১৪-১৫ অগাস্ট মধ্যরাতে ভারতের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছিল। মহাত্মা গান্ধি ভারতের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে (Happy Independence Day) অংশ নেননি। কেননা ভারত যখন স্বাধীনতা (Independence Day)পায়, তখন মহাত্মা গান্ধি বাংলার নোয়াখালিতে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা রোধে উপবাস করছিলেন।
দেশভাগের বিষাদ
স্বাধীনতার স্বাদের আনন্দের মধ্যেই বিষাদের ছায়া নেমে আসে। ভাবলে আশ্চর্য লাগে যে, পৃথিবীর কোনও অভিধানেই ‘স্বাধীনতা’ ও ‘দেশভাগ’ সমার্থক শব্দ হতে পারে না, বরং এদের পরস্পরবিরোধী হওয়ারই কথা। এ দিকে আমাদের দেশে ১৯৪৭ সালের ঘটনাপর্যায় দুটি শব্দকে প্রায় প্রতিশব্দ করে দিয়েছে! পেন্সিলের খসখস শব্দে বহু বছরের পুরনো মানচিত্রটা ধর্মের ভিত্তিতে কেটে ভাগ করে দিলেন সিরিল র্যা ডক্লিফ। পেশায় তিনি ছিলেন দক্ষ ব্রিটিশ আইনজীবী, কিন্তু মানচিত্র নিয়ে সামান্যতম জ্ঞান ছিল না তার। মাত্র পাঁচ সপ্তাহ সময় নিয়ে হিন্দু- মুসলমানের ভিত্তিতে মানচিত্রজুড়ে র্যা ডক্লিফ এঁকে দিলেন ‘সীমান্তরেখা’। এরপর নিজের সব নোট পুড়িয়ে তিনি ফিরে গেলেন ব্রিটেনে, পুরস্কার হিসেবে পেলেন ‘নাইট’ উপাধি। অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ ভারত ভেঙে পাকিস্তান অধিরাজ্য ও ভারত অধিরাজ্য নামে দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন হল। পাকিস্তান পরবর্তীকালে আবার দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ নামে দুটি রাষ্ট্রে পরিণত হল। ভারত অধিরাজ্য পরবর্তীকালে ভারতীয় প্রজাতন্ত্র বা ভারত গণরাজ্য নামে পরিচিত হল।
এর ফলে যে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে তা তিনি নিজে হয়তো কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলেন, কিন্তু ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষ তখনও স্বাধীনতা অর্জনের আনন্দ উদযাপনে গভীরভাবে মত্ত। হবেও না বা কেন! এ যে প্রায় দু’শো বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে মুক্তি। কিন্তু স্বাধীনতা কি সবার জন্য স্বস্তি হয়ে এল? অনেক মানুষ ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করল, যে দেশে তার জন্ম, বেড়ে ওঠা, যেখানের মাটি ও বাতাসে তার পরিপুষ্টি, সে দেশ আর তার নিজের নেই। তাকে যেতে হবে অন্য কোন দেশে। ক’দিনের মাঝেই মানবধর্মের ঊর্ধ্বে জয়লাভ করল সাম্প্রদায়িক ধর্ম। ‘মানুষ’ পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠল ধর্মের পরিচয়- হিন্দু, না কি মুসলমান? একজনের রক্তে রঙিন হলো আরেকজনের হাত। ভিটেমাটি সব ছেড়ে একদেশের মানুষ অন্য দেশে গিয়ে হলো ‘উদ্বাস্তু’, ‘বাস্তুহারা’। পরবর্তীতে ভয়াবহ রকমের মানবেতর জীবনের মধ্য দিয়ে যাওয়া সে সব মানুষের কাছে ‘দেশভাগ’ একটি দুঃস্বপ্নের নাম।
সে ছিল সহিংস এক দেশভাগ৷ ১০ লাখের মতো মানুষ মারা গিয়েছিল তাতে, আরো কয়েক লাখ মানুষ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল নিজের জন্মস্থান৷ নানা মত ও সংস্কৃতির ভারত উপমহাদেশকে ভাগ করে পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে৷ ধর্মের ভিত্তিতে, অবিশ্বাস ও অনৈক্যের যুক্তি দিয়ে জোর করে সৃষ্টি করা হয়েছিল একটি দেশ – পাকিস্তান৷
এই জন্ম যন্ত্রণা, দাঙ্গা এবং শারীরিক ও মানসিক কষ্ট কখনও লাঘব হয়নি৷ ৭৩ তম স্বাধীনতাদিবস উদযাপন করছে ভারত ও পাকিস্তান, কিন্তু ঘা রয়ে গেছে ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্টের মধ্যরাতের মতোই দগদগে৷
৭৩ বছর পেরিয়ে গেলেও সেসব উদ্বাস্তু শিবিরে রয়ে গেছে অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, যারা বাংলাভাগের বেদনাকে এখনও বহন করে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের সেইসব উদ্বাস্তু শিবিরে, যেখানে বাঙালির আত্মপরিচয় সন্ধানের হাহাকার এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
কিন্তু প্রথম প্রজন্মের উদ্বাস্তুদের অনেকেরই এখনও ছবির মতো মনে রয়ে গেছে ছেড়ে আসা দেশের কথা, ভিটের কথা।
“অহনও রাত্রে স্বপ্ন দ্যাহি দ্যাশের বাড়ির। নদীরে তো দ্যাশে গাঙ কইত। আমরা গাঙ্গে স্নান করতে যাইতাম। কত্ত কিসু মনে পড়ে, হায় কপাল,” বলছিলেন এক বৃদ্ধা।
দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা, ফরিদপুর থেকে চলে আসা উদ্বাস্তু শান্তিরঞ্জন গুহর কথায়,
“দেশের চার বিঘা জমিতে চারটা ঘর, দুইটা পুকুর ছিল। একটা চাইর পাড় বান্ধানো। গ্রামে কারও বিয়া-শাদি হইলে ওই পুকুর থিক্যা মাছ নিয়া যাইত। আর অন্য পুকুরটা নদীর সঙ্গে জোড়া ছিল – কত্ত রকমের যে মাছ সেখানে!”
সেই সময়ের কথা বলছিলেন ময়মনসিংহের কিশোর ছাত্র – এখন কলকাতার প্রবীণ বাসিন্দা পবিত্র চক্রবর্তী।
“তখন সবে পূর্ব পাকিস্তান হয়েছে। কথাবার্তা শুনতাম নতুন দেশে বাইরে থেকে লোকজন আসবে, থাকবে। কী হবে না হবে, পড়াশোনা ঠিকমতো করা যাবে কী না, কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। তখনই বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন যে মামাদের সঙ্গে আমাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেবেন। পরীক্ষা দিতেই এসেছিলাম প্রথমে। কিছুদিনের জন্য দেশে ফিরে গিয়েছিলাম। তারপরেই দেশ থেকে চলে আসি কলকাতায়,” বলছিলেন মি. চক্রবর্তী। অশান্তির আগুন যখন ছড়িয়ে পড়ছে পূর্ববঙ্গের নানা জায়গায়, তখন চরভৈরবী বন্দরে পারিবারিক ব্যবসা ছিল নিত্যনন্দ পালের বাবা-দাদাদের। একদিন রাতে হঠাৎই তাঁদের ভিটে ছাড়তে হয়।
“দাদারা ঘাসিনৌকা করে মরিচ বিক্রী করতে গিয়েছিল নোয়াখালির দিকে রামপুরে। সেখানেই তারা শুনতে পায় যে বাইরে থেকে আসা মুসলমানরা একজন স্থানীয় জমিদারের ভিটে আক্রমণ করেছে। পালিয়ে চলে এসে বাবাকে ঘটনাটা জানায়”-বলেন নিত্যনন্দ পাল।
“রাতারাতি নৌকা ঠিক করে বন্দর ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম বাজাপ্তিতে এক আত্মীয়র বাড়িতে। সেখান থেকে নিজেদের গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে যখন যাচ্ছিলাম নৌকায়। গ্রামে ঢোকার মুখে দেখি কুমোরপাড়ার লোকেরা গরম জল, মরিচ নিয়ে পাহারা দিচ্ছে, যাতে আক্রমণ করলে বাধা দেওয়া যায়।”
“সেটা ছিল দূর্গাপূজোর ঠিক আগে। তবে আক্রমণটা হল লক্ষ্মীপূজোর দিন। বাইরে থেকে আসা কিছু মুসলমান গ্রামের সব কলাগাছ কেটে দিয়েছিল যাতে আমরা পূজো না করতে পারি। বেতবনে সবাই লুকিয়ে পড়েছিলাম আমরা। দাদারা রামদাও হাতে পাহারা দিচ্ছিল,” বলছিলেন নিত্যানন্দ পাল।
নতুন গড়ে ওঠা সীমান্ত পেরিয়ে সদ্য স্বাধীন হওয়া ভারতে আসার পরে বেশিরভাগেরই ঠাঁই হয়েছিল কলকাতার শিয়ালদা স্টেশনে।
বাংলাভাগের ফলে সবচেয়ে করুণ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে অভিভাবকহীন নারীরা। বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে এসে বৃদ্ধ বয়সে তাদের জায়গা হয়েছে পিএল ক্যাম্প বা Permanent Liability ক্যাম্পে। পরিবার পরিজন সবাইকে হারানোর বেদনা বুকে পাথর হয়ে এখনও চেপে বসে আছে তাদের অনেকের। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়বহতা স্মরণ করে কেউ বলেন, “দাঙ্গার সময় আমার পরিবারের ৩৬ জনকে মেরে ফেলেছে।” আবার কেউ বলেন, “চোখের সামনে ছোটভাইটারে কোল থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিল”; “বাবার কাটা দেহ এসে পড়ল মায়ের পাশে”। দশ বছর বয়সে বিয়ের পর তেরো বছর বয়সে দাঙ্গার কারণে বিধবা হয়েছেন কেউ।
হিন্দু-মুসলমান তিক্ত সম্পর্কের শুরুটা ঠিক যেখান থেকে হয়েছে, সেই পুরনো সময়ের আঁচ তাদের কথা থেকে যেন কিছুটা অনুভব হয়। দেশভাগ নিয়ে তাদের কেউ বা নিঃস্পৃহ, আবার কারো কারো মধ্যে এখন ক্ষোভের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। বরিশালের মুলাদি, পাবনা অথবা নড়াইলের মধুমতী নদীর পারের সে সব ছিন্নমূল মানুষেরা কেউ বা সবকিছু মেনে নিয়ে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, আবার কেউ বা ঐ সময়টার ভার বহন করে চলেছেন অদ্যাবধি।
“কি এই সীমান্তরেখা? এ কি ভারত ও বাংলাদেশ- দু’দেশের মাঝে বিভাজন না কি, হিন্দু মুসলমান- দু’ সম্প্রদায়ের মাঝে বিভাজন? কি সেই পার্থক্য যার জন্য মিলতে পারে না দু’বাংলার মানুষ?”
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।