দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ১৮২)

পর্ব – ১৮২

অনসূয়া শ‍্যামলীর দিকে চেয়ে হেসে উঠে বললেন, লার্নেড কাউন্সেল, সেকুলারিজম নিয়ে আপনার আর্গুমেন্ট কোর্ট মন দিয়ে শুনলেন। এবার অন‍্য পয়েন্টটা ক্ল‍্যারিফাই করুন।
শ‍্যামলী বলল, কোন্ পয়েন্টটা মিলর্ড?
অনসূয়া বললেন, ওই যে লিগালাইজড প্রসটিটিউশন!
শ‍্যামলী বলল, মিলর্ড, এর প্রোলগ হিসেবে আমি মিল্টনের কথাটা আবার একটু মনে করাতে চাই।
অনসূয়া বললেন, লীভ গ্রান্টেড। প্রসীড।
শ‍্যামলী বলল, আমরা আগেই লক্ষ্য করেছি বড়মাপের একজন স্কলার জন মিল্টন প্রায় পঁয়ত্রিশ বৎসর বয়সে ১৬৪২ সালে ষোড়শী বালিকা মারি পাওয়েলকে বিবাহ করেন। বয়সের বিরাট পার্থক্য ছিল, তার চেয়েও দুস্তর পার্থক্য ছিল যে মিল্টন ছিলেন বহু ভাষাবিদ, ও প্রগাঢ় পাণ্ডিত্যের অধিকারী। আর মারি পাওয়েল নিতান্তই একটি বালিকা মাত্র। মিল্টনের সাথে বালিকা মারির চিন্তা চেতনার তফাতকে হিসেবে ধরলে বোঝা যায়, কেন বালিকার পক্ষে অমন গুরুগম্ভীর লোককে ভালবাসা প্রায় অসম্ভবের পর্যায়ে ছিল। বিয়ের মাসখানেকের মধ‍্যেই বাপের বাড়ি পালিয়েছিল মারি।
অথচ মিল্টনের চাহিদা মেটাতে একটি বৌয়ের দরকার ছিল। কথাটা বলেই শ‍্যামলী একটু হেসে ফেলল। অনসূয়া মুখটা গম্ভীর করে বললেন, লার্নেড কাউন্সেল আপনি হাসবেন না। কোর্টের অনেক কাজ আছে।
শ‍্যামলী বলল, মিল্টনের অভ‍্যাস ছিল যা মনে হত প‍্যামফ্লেট লিখে প্রচার করা। তিনি ১৬৪১ সালেই চার্চকে একহাত নিয়েছিলেন। ১৬৪২ এ মিল্টনের বৌ পালাবার পর, ১৬৪৩ সালে তিনি ডিভোর্স এর সপক্ষে আইন চালু করার দাবি তুললেন।
চার্চ মিল্টনের এই দাবিকে কোনো পাত্তাই না দিয়ে ওই ১৬৪৩ সালেই অর্ডিন্যান্স জারি করল যে লেখালেখি করতে গেলে, প্রকাশের আগেই রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে তা দেখিয়ে নিয়ে অনুমতি চেয়ে নিতে হবে।
 চার্চের এই আদেশের প্রতিক্রিয়ায় মিল্টনের কলমে জন্মাল অ্যারিওপ‍্যাগিটিকা। চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সপক্ষে অসামান্য গ্রন্থ।
 ক্রমে চার্চের কর্তারা একটু নরম হলেন। ওয়েস্ট মিনসটার কনফেশন অফ ফেথ ১৬৪৩ থেকে ১৬৫০ সালের মধ‍্যে দুটি কারণে ডিভোর্স করার সুযোগ মঞ্জুর করেন। এক হল ইনফাইডেলিটি বা অবিশ্বস্ততা, আর আরেকটি হল অ্যাবানডনমেন্ট বা ছেড়ে চলে যাওয়া।
 যে বিবাহ আগে স্বর্গলোকের অসামান্য পবিত্র বন্ধন ছিল, মিল্টনের কলমের জোরে তা মাটির কাছে নেমে এল। স্বর্গ হ‌ইতে বিদায়।
 ১৬৫২ সালে মারি পাওয়েল মৃত‍্যু মুখে পতিত হলে, কয়েকটি বৎসর অপেক্ষা করে আটচল্লিশ বছরের প্রৌঢ় মিল্টন পুনরায় দারপরিগ্রহ করলেন। এবার পাত্রী ক‍্যাথারিণ উডকক। সালটা ১৬৫৬। কিন্তু গভীর পরিতাপের বিষয় যে, বিবাহের তৃতীয় বর্ষেই ১৬৫৮ সালে ক‍্যাথারিণ ভবলীলা সংবরণ করলেন।
 পঞ্চান্ন বৎসরের বৃদ্ধ মিল্টনের বিবাহের আগ্রহে ভাঁটা পড়ল না। ১৬৬৩ সালে তিনি পুনরায় পাণিগ্রহণ করলেন। এবার পাত্রী এলিজাবেথ মিনশুল।
এইভাবে একটির পর একটি নারীকে বিবাহ করে মিল্টন যে নিদর্শন খাড়া করেছেন, পরবর্তীকালে গুণীজনদের আচরণ লক্ষ্য করলে, তার গ্রহণযোগ্যতা টের পাওয়া যায়। প্রথমেই আমি তুলছি বার্ট্রাণ্ড রাসেলকে। গণিতের ধুরন্ধর প্রতিভা, বিশ্বশান্তির চ‍্যাম্পিয়ন রাসেল জন্মেছিলেন ১৮৭২ সালে। ১৯৫০ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী। মাত্র চারটি বিয়ে করেছেন। অ্যালিস পিয়ারস‍্যাল, ডোরা ব্ল‍্যাক, প‍্যাট্রিসিয়া স্পেন্স, আর ১৯৫২তে সত্তর বৎসর বয়সে এডিথ ফিঞ্চকে অঙ্কশায়িনী করেন।
শতাব্দীর বিস্ময় অ্যালবার্ট আইনস্টাইন জন্মেছিলেন ১৮৭৯ সালে। ১৯২১ সালে পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী। বিয়ে করেছেন মাত্র দুটি। ১৯০৩ সালে মিলেভা মারিচ, আর ১৯১৯ সালে এলসা আইনস্টাইন।
আইনস্টাইনের থেকে চার্লি চ‍্যাপলিন দশ বছরের ছোট। জন্মেছিলেন ১৮৮৯ সালে। অসাধারণ ফিল্ম প্রতিভা। তিন তিনবার অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন, ১৯২৯, ১৯৭২ আর ১৯৭৩ সালে। চার্লি চ‍্যাপলিন সর্বমোট চারটি বিবাহ করেন।
 ১৯১৮ সালে ঊনত্রিশ বছরের চ‍্যাপলিন মাইল্ডরেড হ‍্যারিসকে। ১৯২০ অবধি বিয়ে টিঁকেছিল। ১৯২৪ সালে বিয়ে করলেন লিটা গ্রে কে। ১৯২৭ অবধি বিবাহ বন্ধন অক্ষুণ্ণ র‌ইল। ১৯৩৬ সালে আবার বিয়ে করলেন সাতচল্লিশ বছরের প্রৌঢ়। এবার পাত্রী পলেট গডার্ড। বিয়ে টিঁকেছিল ১৯৪২ অবধি। চুয়ান্ন বৎসরে চ‍্যাপলিন আবার ছাঁদনাতলায়। ১৯৪৩ সালে বিয়ে করলেন উনা ও’নীলকে।
চার্লি চ‍্যাপলিনের থেকে আবার দশ বছরের ছোট আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। জন্ম হয়েছে ১৮৯৯ সালে। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৫৪ সালে।
 তার আগের বছর পুলিৎজার পেয়েছেন। হেমিংওয়ে সাড়ে বাইশ বছর বয়সে বিয়ে করেন হ‍্যাডলি রিখার্ডসনকে। সালটা ১৯২১। ১৯২৭এ ডিভোর্স। ওই ১৯২৭এই দ্বিতীয় বিয়ে। এবার পাত্রী পলিন ফিফার। বিয়ে টিঁকল ১৯৪০ অবধি। ১৯৪০এই আবার বিয়ে। হেমিংওয়ের জীবনে এলেন মার্থা গেলহর্ণ। ১৯৪৫এ ডিভোর্স। ১৯৪৬ সালে সাড়ে সাতচল্লিশ বছর বয়সে তিনি আবার বিয়ে করলেন মারি ওয়েলশ হেমিংওয়েকে।
১৬৭৪ এর নভেম্বরে কবি জন মিল্টনের মৃত‍্যুর দুশো বছর পর জন্মে বার্ট্রাণ্ড রাসেল, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, চার্লি চ‍্যাপলিন আর আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মতো লোকেরা বিবাহ সম্পর্ক থেকে সমস্ত মেকি গরিমা ছাড়িয়ে নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে বার্তা দিলেন যে, বিবাহ আসলে একটা চুক্তি। পারস্পরিক বোঝাপড়ার সম্পর্ক। এর মধ‍্যে অতিলৌকিক কোনো কিছুই নেই।
অনসূয়া বললেন, কিন্তু শ‍্যামলী ওই যে বিয়েকে বলছিস লিগালাইজড প্রসটিটিউশন, ওইটা যেন গলা দিয়ে নামতে চাইছে না রে!
শ‍্যামলী বলল, দিদি, কোভারচার তত্ত্বটা মনে করে দেখুন। আমাদের দেশেতেও মেয়েরা বিয়ের আগে পিতার আধীন। বিয়ের পর পতির অধীন। পরে পুত্রের অধীন। অধীনতা যেন মেয়েদের কাটে না। মেয়েদের পাত্রস্থ করা হয়। ছেলেদের কিন্তু পাত্রীস্থ হতে হয় না। মেয়েদের গোত্রান্তর হয়। ছেলেদের কিন্তু হয় না। বিয়ের পর পদবি পাল্টাতে বাধ‍্য হয় মেয়েরা। ছেলেদের কিন্তু হয় না। পৈতৃক নাম যদি হয় ভবতারিণী, বিয়ের পর তা মৃণালিনী করে দিলে মেয়েরা কিছু বলতে পারে না।
 কোভারচার তত্ত্ব অনুযায়ী মেয়েরা তার স্বামীর সাথে পুরোপুরি লীন। দুয়ে মিলে এক অভিন্ন সত্ত্বা। এইরকম একটা কথা বলে, মেয়েদের আইনি অস্তিত্বটাকেই মুছে দেওয়া হয়। একটা বিবাহিত মেয়ে নিজের নামে সম্পত্তির মালিক হতে পারেন না, বিবাহিত মহিলা কোনো দলিল সম্পাদন করতে পারেন না, তিনি কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারেন না, কোনো বেতন অর্জন করতে পারেন না, স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে পড়াশুনা পর্যন্ত করতে পারেন না। উইলিয়াম ব্ল‍্যাকস্টোনের মতে বিবাহ জারি থাকাকালীন একটি মহিলার ব‍্যক্তি অস্তিত্ব ও আইনি সত্ত্বা নিষ্ক্রিয় থাকে। একজন বিবাহিতা মহিলা স্বামীকে পরমগুরু, নাথ ও প্রভু বলে চেনেন। এই যে একজন পত্নীর বিবাহিত জীবনের অবস্থা, একেই কোভারচার বলা হয়।
আবার ভারতীয় ব্রাহ্মণ‍্য ঐতিহ্যের দিকে তাকিয়ে দেখুন, তাদের মতে মহিলার সতীত্বই হল তার প্রথম ও প্রধান পুণ‍্য ও গুণ। এবং মহিলার এই সতীত্বকে ভারতীয় ব্রাহ্মণ‍্য ঐতিহ্য সর্বদা সুরক্ষিত রাখতে চেয়েছে। এই সতীত্বকে সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্য হল পুং রক্তধারার বিশুদ্ধতা বজায় রাখা। এই সতীত্ব ধারণার লক্ষ্য শুধু পত্নীর শারীরিক বিশুদ্ধতা রক্ষা নয়, এই সতীত্ব রক্ষার মাধ্যমে স্বামী তার স্ত্রীর যৌনচেতনার উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব ও দখলদারি বজায় রাখে।
আপনি ইণ্ডিয়ান পেনাল কোডের ৪৯৭ ধারাটার দিকেও তাকিয়ে দেখতে পারেন। ওখানে দেখুন, স্বামীর  সুযোগ রয়েছে অন‍্য কোনো পুরুষকে তার স্ত্রীর শরীরকে ব‍্যবহার করতে দেবার। বাইরের লোক স্বামী লোকটার অনুমতি নিয়ে তার বধূর স্ত্রী অঙ্গ ব‍্যবহার করলে সেটি নাকি দূষণীয় নয়। ভাবলে অবাক হতে হয়, এমন একটা আইন কি করে টিঁকে থাকতে পারে!
অনসূয়া বললেন, তোর কোভারচার এর কথায় মনে পড়ে গেল, আমাদের বন্ধু সুনন্দা তার বাবা মায়ের ওপর রাগ করে হঠাৎ কালিপদ নামে একটা অতি অশিক্ষিত ছেলেকে শুধুমাত্র রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করে ফেলে। তারপর নিজের ভুল বুঝতে পেরে সরে এসে নার্সিং পড়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবে ভেবেছিল। তখন নার্সিং পড়তে গেলে ছাত্রীদের লিখে দিতে হত যে সে অবিবাহিতা বা ডিভোর্সি অর্থাৎ সিঙ্গল। মেয়েটা পড়ায় চান্স পেয়েও গেছল। হোস্টেলে থেকে পড়ছিল।  কিন্তু বিধি বাম। কালিপদ অশিক্ষিত হলে কি হবে, কোভারচার কথাটা না শুনেও ভিতরকথাটা জানত। সে বুক চিতিয়ে কলেজে গিয়ে প্রিন্সিপাল ম‍্যাডামের কাছে ম‍্যারেজ রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট দেখিয়ে সুনন্দাকে মিথ‍্যাবাদিনী প্রতিপন্ন করে দিল। সবার সামনে সুনন্দার চুল ধরে টানতে টানতে নিয়ে গিয়েছিল সে। পরে অবশ‍্য ডিভোর্সের মামলা লড়ে সুনন্দা তার কবল থেকে রেহাই পায়। ততদিনে সে কালিপদর ঔরসে দুটি সন্তানের জননী।
 শ‍্যামলী বলল, কোভারচার তত্ত্ব জানে বলেই রিক্সাচালক তার বৌয়ের গায়ে হাত তুলে তার ঝি গিরি করে রোজগার করা টাকা কেড়ে নিতে পারে।
তো বার্ট্রাণ্ড রাসেল সাহেব ১৯২৯ সালে একটা ব‌ই লিখেছিলেন। তার নাম ম‍্যারেজ অ্যাণ্ড মরালস। ওই ব‌ইটা ওঁর এত প্রিয় ছিল যে, ১৯৫০ সালে নোবেল ফাউন্ডেশন যখন ওঁকে সারা জীবনের সাহিত্যকৃতির জন‍্য নোবেল পুরস্কার দেয়, উনি বলেছিলেন এই ম‍্যারেজ অ্যাণ্ড মরালস ব‌ইটার জন্য আমি নোবেল পুরস্কার পাচ্ছি।
এই ব‌ইটায় বার্ট্রাণ্ড রাসেল যৌনতা ও বিবাহ নিয়ে ভিক্টোরিয়ান মূল‍্যবোধকে কঠোর আঘাত করেন। রাসেল বলেছিলেন, শুধুমাত্র দুটি খেতে পরতে দেয় বলে বিস্তর মেয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বামীকে দেহ দিতে বাধ‍্য হয়।  বড়োটি হলে বাপ মা মেয়ের বিয়ে দিতে উদব‍্যস্ত হয়ে পড়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেয়েদের বিয়ে দেবার সময় বাপ মা দ‍্যাখে, ছেলেটা বৌকে খেতে দিতে পারবে কি না। একটা উপযুক্ত বয়সের ছেলের যেমন চাকরি, ন‌ইলে দোকান করা, একটা মেয়ের তেমনি বিয়ে। রাসেলের মতে এটা মেয়েদের ক্ষেত্রে জীবিকা অর্জনের একটা উপায়। রাসেল বলছেন স্বামী খেতে পরতে দেয় বলে  মেয়েরা অপছন্দ হলেও স্বামীর হাতে নিজের শরীর ছেড়ে দিতে বাধ‍্য হয়। যত মেয়ে এভাবে অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বামীর হাতে নিজের দেহ তুলে দেয় তার সংখ‍্যাটা যৌনকর্মীদের সংখ‍্যার চাইতে বেশি। রাসেল বলেছেন, বিবাহিত জীবনের আড়ালে আসলে রেপ চলছে। ম‍্যারিটাল রেপ।
 রাসেলকে সহজে ছাড়ে নি সভ‍্যতা। ১৯২৯এ ব‌ই বেরোনোর পর বিস্তর গালিগালাজ শুনতে হয়েছিল তাঁকে। তখন আইনস্টাইন রাসেলের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, যথার্থ বড়মনের মানুষেরা প্রায়শই মোটা মাথার লোকজনের থেকে ভয়াবহ ভাবে আক্রান্ত হয়ে থাকে।
অনসূয়া অবাক হয়ে শ‍্যামলীর দিকে তাকিয়ে থাকেন।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।