“এই শ্রাবণে আষাঢ়ে গপ্পো” বিশেষ সংখ্যায় অর্ণব কর্মকার

জোড়া তালতলা

গত রবিবার আমাদের বাড়িতে আমার বন্ধু সৌমিত্র এসেছিল। দুপুর বেলা। রান্নাবান্না সেরে আমি, আমার বাহান্ন বছর বয়সী বাবা আর সৌমিত্র তিনজনে একসাথে খেতে বসলাম। খেতে খেতে সৌমিত্র বাবাকে জানলো যে সে একটা নতুন বাড়ি তৈরি চায়, তাই একটা ভালো এবং পবিত্র জায়গা দরকার । আমি বললাম “পবিত্র জায়গা মানে?”। সৌমিত্র বললো ” আরে, জায়গাটাতে যেন ভূত-প্রেত কিছু না থাকে…মানে, হাওয়া-বাতাস…”। আমি চিরকালই অযৌক্তিক কিছু সহজে মেনে নিতে পারিনা, তাই সেই স্বভাবতই ওকে থামিয়েই বললাম- ” হাওয়া বাতাস!… বাজে বকিসনা তো! এখন শ্মশান থেকে কবর সবজায়গায় মানুষ বাড়ি বানিয়ে নিচ্ছে,আর তুই বলিস কিনা ভূত-প্রেত!” সৌমিত্র বললো- ” এই তো! তুই কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাসনা।” এই কথা বলে ও ভাতের উপর থেকে হাত না সরিয়ে বাবার দিকে ঘাড়টা ঘুরিয়ে বললো- “আচ্ছা কাকু, তুমি ভূতে বিশ্বাস করো?”। বাবা এতক্ষণ খুব বেশি কথা বলছিল না। সৌমিত্রের এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে কিছুটা সম্মতি আর কিছুটা অসম্মতির ভাব নিয়ে যা বললো তা আমাকে আজও খুব ভাবিয়ে তোলে।
বাবার বয়স তখন বোধ করি আঠারো অথবা ঊনিশ। শ্রাবণের শেষ দিক অথবা ভাদ্রের প্রথম। বাবা ছোটোবেলা থেকেই খুবই দুরন্ত আর দুঃসাহসি। তার দুঃসাহসিকতার কথা গ্রামের কমবেশি সকলেরই জানা। যাইহোক এই দুঃসাহসিকতার ভাবনা নিয়ে বাবা আর তার এক বন্ধু কাজল ঠিক করলো তারা তাল কুড়োতে যাবে। সেদিন সারাদিন খুব বৃষ্টি পড়ছে। তাই তালতলাতে তেমন কেউ লোক যে সেদিন যাবেনা তা তাদের জানা ছিলো। ভাবনা যতক্ষণ আসতে সময় লাগে তার থেকেও কম সময় লাগে তাদের কাজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে। সন্ধে হয়ে আসছে। বাড়ি থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে একটা পুকুর পাড়ে আছে একটি জোড়া তালগাছ সহ প্রায় পঁয়ত্রিশটি তালগাছ। দেখলে মনে হয়, একমাথা চুল নিয়ে কতকগুলো লম্বা কালো মানুষ পুকুরটাকা ঘিরে রয়েছে। ওই জোড়া তালগাছদুটো এমনভাবে জুড়ে থাকে যে তাকে দেখে মনে হয় তারা পুকুর পাড়ের উপরের পথে দুজনে দুটো বল্লামের গুণিত চিহ্ন হয়ে পাহারা দিচ্ছে। জায়গাটা সবাই জোড়া তালতলা নামেই জানে।
বাড়ি থেকে হাঁটা পথ ধরে বাবা আর কাজল কাকু যখন পুকুরপাড়ে উপস্থিত হলো, তখন সবেমাত্র বৃষ্টিটা থেমেছে। চারিদিকে বাদুড়ের ডানার মতো নেমে এসেছে অন্ধকার। হাতেনতুন সেলভরা টর্চটা জ্বালিয়ে বাবা কাজল কাকুর উদ্দেশ্যে বললো ” দ্যাখ ভাই, এখুনি রাত হয়ে আসবে, যাই হয়ে যাকনা কেন, তাল কিন্তু কুড়োবোই আমরা…”। এই কথায় কাকু সম্মতি দিয়ে দুজনে উপস্থিত হলো ঠিক জোড়া তালগাছটারতলায়।
প্রদীপের শিখা যেভাবে ধীরে ধীরে নিভে গ্যালে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে সেভাবে রাত নেমে এলো। চারিদিকে একদমই কিছু দ্যাখা যায়না। শুধু ব্যাঙের ডাক আর পচা মাটির গন্ধে এক অদ্ভুত বিচ্ছিরিরকম পরিবেশ হয়ে আছে। মাঝেমাঝে শুধু মনে হয় কালো মতো কেউ বুঝি উপর থেকে জলে ঝাঁপ দিয়ে হারিয়ে গ্যালো। এসব দেখে কাকু একটু থমকে যাওয়ায়, বাবা তার কাঁধে হাত রেখে বললো, ” ভয় পাসনা, ওগুলো তাল পড়ছে জলে। কিন্তু সাবধান! ভুলেও জলে নামবিনা…”। যাইহোক কাকু একটু বুকে সাহস নিয়ে গাছটা টপকে পাড়ের ওপারে গিয়ে তাল কুড়োতে থাকে, বাবা এপারে। মাঝেমধ্যে ওরা নিজেদের স্থান পরিবর্তন করে সারারাত জুড়ে তাল কুড়োতে থাকে। হঠাৎ, বাবা একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে লক্ষ্য করে। জলের মধ্যে প্রচুর তাল পড়ছে ঠিকই কিন্তু টর্চের আলোতে তাদের একটিকেও দ্যাখা যাচ্ছেনা। বাবা জানতো, জলে তাল পড়লে সাধারণত নাকি ভাসে। এই কাণ্ড দেখে বাবা বুঝতে পারে যে কিছু একটা অদ্ভুত জিনিস ঘটছে। তাই বাবা কাজলকাকুকে আবার সচেতন করে দ্যায় যে যেন জলের দিকে একদম না যায়। আর তাই বাবা আর কাকু দুজনেই জলের দিকে নজর না দিয়ে পুকুর পাড়ের ওপরই তাল কুড়োতে থাকে। খানিকক্ষণ পর আবার শোনা জলে তাল পড়ার শব্দ। এবার সেদিকে বাবা টর্চের আলোটা ঘুরিয়ে দেখতে গিয়ে দ্যাখে যে কয়েকটা তাল জলের উপর ভাসছে। এটা দেখে বাবা ভাবে যে সে অহেতুক ভাবছিলো, সব ঠিকই আছে। তাই মন থেকে ভয় সরিয়ে আবার দুজনেই তাল কুড়োনোয় মন দ্যায়। যেহেতু তারা মনস্থির করেছে জলে না নামার তাই সারা পাড় ঘুরে ঘুরে তাল কুড়োতে থাকে। কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর বাবা কৌতুহল বশত যেইনা সেই ভেসে থাকা তালটির দিকে আলো ফেলতে যাবে, অমনি জলের মধ্যে দ্যাখে যে একটি তালও আর ভেসে নেই। এবার বাবা নিশ্চিত হয় যে নিশ্চয় কোনো অদ্ভুতুড়ে কাণ্ডই ঘটছে।
এইরকম নানারকম কাণ্ড সারারাত চলতে থাকে । আগেই বলেছি বাবা খুব দুঃসাহসি, তাই ওসব কিছুকে পরোয়া না করে সারারাত ধরে বাবা আর কাজলকাকু মিলে প্রায় দুশোখানা তাল কুড়িয়ে আনে। একটা ফাঁকা ঘরে গাদা করে রেখে, ব্যাগে মাত্র কয়েকটা নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দ্যায় প্রায় ভোরের দিকে।
এদিকে বাড়িতে তো হুলুস্থুল কাণ্ড। সারারাত গ্রামের দুটো ছেলে কোথায় গ্যাছে, কোনো খোঁজ নেই। তাই, সকালে ফিরে আসতেই তাদের উপর শুরু হয় একের পর এক জেরা। জেরা করে যা জানা গ্যালো তাতে তো প্রত্যেকেরই আকাশ থেকে পড়ে যাওয়ার অবস্থা। সবাই আতঙ্কিত হয়ে যে তথ্য দিলো তার এককথায় মর্মার্থ এই যে জোড়া তালতলা থেকে বাবা আর কাজল কাকুর ফিরে আসা মানে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা ; ওখানে নাকি চিরকলাই ভূতের বাস।
সৌমিত্র অনেকক্ষণ ধরে বাবার এই কথাগুলি মন দিয়ে গিলে গিলে খাচ্ছিলো। বাবার কথা শেষ হতে না হতেই ভূত দেখে ফেলেছে এমন ভাব নিয়ে আমাকে বললো, ” দেখলি তো, ভূত আছে। নাহলে এসব কাণ্ড কে ঘটালো বল?”
একটা অস্বস্তির ভাব নিয়ে বললাম,” জানিনা! আমি কোনোদিন তো দেখিনি এসব। হয়তো হতেও পারে…।”
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।