“এই শ্রাবণে আষাঢ়ে গপ্পো” বিশেষ সংখ্যায় তনিমা হাজরা

মেনীরগালেটোল

আমার ঠিক ওপরের ফ্ল্যাটেই থাকেন কুহেলি বৌদি আর পিণাকদা। আমি এই হাউসিংটায় এসেছি আজ আটবছর হলো।
আসার পর থেকে একদিনও রাতে কুহেলি বৌদি আর পিণাকদার ঝগড়া আর বাসন কোসন ছোড়াছুড়ি বাদ যায়নি।
আবার দিনের বেলায় দেখেছি দিব্যি ভাব। দুজনের মোটর সাইকেলে চড়ে সেজেগুজে কোথাও চলেছে।
কুহেলি বৌদি কালো গোলগাল রসটুসটুসে পান্তুয়ার মতো, মাথায় বেশ ঘন চুলের লম্বা বেণী আর চোখদুটি টানা টানা আর হাসলে পরে দুইগালে টোল। পিনাকদা খ্যাসখ্যাসে ফর্সা, বাটার বারোনম্বর জুতোর মতো লম্বা মুখ, গালের হনু বেরোনো ঢ্যাঙ্গাটে গড়ন।
মাঝে দুবছর আমার আসামে বদলী হয়ে গেল। আমি ফ্ল্যাটে তালা দিয়ে বঙাইগাঁও চলে গেলাম।
ফিরে এসে শুনি একদিন রাতে প্রচন্ড মারপিটের জেরে খুনোখুনি হয়ে গেছে। কুহেলি বৌদি আর পিণাকদা দুজনেই মারা গেছে।
মনটা ভারি খারাপ হয়ে গেল। কুহেলি বৌদির গালে টোল পড়া হাসিটা মনে পড়ে গেল।
সকালের ফ্লাইটে এসেছি। সারাদিন ঘর সেট করে পরিস্কার করতেই গেছে। ঘুমিয়ে পড়েছি ভারি ক্লান্ত হয়ে। মাঝরাত্তিরে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল বাসন কোসন ছোড়াছুড়ির শব্দে। আর একটা অদ্ভুত গোঙানির আওয়াজে।
সকালে পাশের বাড়ির ভদ্রলোকের কাছে তো শুনেছিলাম কুহেলি বৌদি আর পিণাকদা মারা যাবার পরের থেকে ওপরের ফ্ল্যাটটা আজ দুবছর তালাবন্ধই পড়ে আছে। কেজানে উল্টো পালটা লোকজন জবরদখল করে আবার কিছু অনৈতিক কাজের আখড়া বানিয়ে ফেললো না তো ফ্ল্যাটটাকে।
একটু রিস্কই নেওয়া হয়ে যাচ্ছে হয়ত তবুও টর্চটা হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলাম। ফ্ল্যাটের দরজায় দুম দুম করে ধাক্কা মেরে, চেঁচিয়ে উঠলাম, কে ভাই ঘরের ভেতরে? কি হচ্ছে টা কি? উত্তেজনার বশে খেয়াল ই করিনি যে ফ্ল্যাটের দরজার কোলাপ্সেবেল গেটে তালা ঝুলছে বাইরে থেকে।
দরজায় ধাক্কাধাক্কি শুনে ব্যালকনি থেকে ঝাঁপ দিয়ে ওপাশের বাউন্ডারি ওয়ালের ওপর নামলো দুটো বেড়াল – একটা সাদা আর শীর্ণ এবং আরেকটা কালো আর গোলগাল।
চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পেলাম কালো বেড়ালটা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে আর ওর গালে টোল।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।