“এই শ্রাবণে আষাঢ়ে গপ্পো” বিশেষ সংখ্যায় পত্রালিকা

অদ্ভুতুড়ে

উল্টোডাঙা? দাদা উল্টোডাঙা..
মেধার কথাটা শেষ করতে না দিয়েই অটোওয়ালা উত্তর দেয়, না না এটা করুণাময়ী যাবে।
মেধা – আমাকে তাহলে করুণাময়ী নামিয়ে দেবেন দাদা। কথাটা বলতে বলতেই মেধা মনে মনে ভাবে প্রায় ঘণ্টাখানেক দাঁড়িয়ে আছি, একটাও অটো নেই,
এই বৃষ্টিতে চারদিকটা কেমন সুনসান হয়ে আছে, যদি একটু এগিয়ে যাওয়া যায়, করুণাময়ী থেকে আবার একটা অটো ধরে নাহয় চলে যাওয়া যাবে।
অটোওয়ালা – না দিদি, আমার ভাড়া হয়ে গেছে।
অটোওয়ালার উত্তরটা শুনে মেধা বেশ বিরক্ত হলো, যাও বা একটা অটো পাওয়া গেছিলো তাও যেতে চাইছেনা। মেধা মনে মনেই বলতে থাকে, রোজ এই এক জ্বালা হয়েছে, অফিসে দিনে আট ঘণ্টার বদলে দশ ঘণ্টা খাটছি, তাও বসের মন ভরেনা। আর এখন তো শুরু হয়েছে এই এক নতুন উপদ্রব, রোজ ঠিক বেরোনোর মিনিট পাঁচেক আগে উনি মিটিং এ ডেকে নিয়ে আবার কয়েকটা কাজ ধরিয়ে দেবেন। আজকাল রোজই এই কারনে দেরি হয়ে যায়। আবার বাড়ি যাওয়ার কথা বলতেই বলে, কি করবে বলতো বাড়ি গিয়ে? তোমরা ইয়াং জেনারেশন এখনই তো পরিশ্রম করবে, যত পারো কাজ করে নাও মেধা, এটাই তো সময়।
এসব কথাগুলো শুনলে আজকাল গা পিত্তি জ্বলে যায় মেধার, তবু অফিসের বস তাই চুপ থাকতে হয়।
এরা কি বোঝেনা নাকি কে জানে, সেক্টর ফাইভ থেকে রাতবিরাতে বাড়ি যাওয়ার জন্য কিছু পাওয়া যে মুশকিল, নাকি জেনেও না জানার ভান করে কে জানে। বাড়িতে বাবা অসুস্থ, মায়ের একার ওপর সংসারের চাপ, চাকরীতে সবে মেধার এই মাস তিনেক হলো, ওর মাইনেটা আসার পর থেকে সংসারের একটু সুরাহা হয়েছে। কয়েকদিন ওনার জ্বালায় লাঞ্চটাইমে রনিতকে একটা ফোন করার সময় হয়না, রনিতের সাথে সম্পর্কটাই না কেঁচে যায় এই লোকটার জন্য।
এসব ভাবতে ভাবতেই মেধা ঘড়ির দিকে তাকায়, দশটা বেজে গেছে, এবার বেশ ভয় করে মেধার, সেই নটা থেকে দাঁড়িয়ে, বুঝে উঠতে পারেনা কিভাবে বাড়ি ফিরবে। এদিকে বৃষ্টিও থামার কোন ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছেনা। আশপাশটা যেন কেমন চুপচাপ হয়ে আছে। এরমধ্যেই একটা গাড়ি একদম মেধার কাছে এসে দাঁড়ায়।
ড্রাইভার – ম্যাডাম, কোথায় যাবেন?
মেধা – না না আমার গাড়ি লাগবেনা। একটা অটো পেলেই..
ড্রাইভার – কোথায় যাবেন তো বলুন?
মেধা – আমি যাবো শোভাবাজার। আপাতত একটা উল্টোডাঙার অটো পেলে ওখান থেকে আবার পেয়ে যেতাম কিছু।
ড্রাইভার – আমিও ওই দিকেই যাচ্ছি। আসুন না ছেড়ে দেবো আপনাকে। এত রাতে আর কিছু পাবেন না।
চলে আসুন।
মেধা – না না আমার অভ্যাস আছে। আমি চলে যেতে পারবো। আর তারপর মনে মনে বলে, লোকটা তো আচ্ছা নাছোড়বান্দা দেখছি, বলছি যাবনা, অদ্ভুত তো। কিন্তু আজকে একটু বেশিই দেরি হয়ে গেল, কিজানি সত্যিই যদি কিছু না পাওয়া যায়, কিন্তু অচেনা একটা লোকের সাথে গাড়িতে ওঠা কি ঠিক হবে, ইদানিং যা হচ্ছে চারদিকে, ভাবলেই তো ভয় লাগে।
ড্রাইভার – কি এত সাতপাঁচ ভাবছেন ম্যাডাম। এত রাতে আর ভেবে সময় নষ্ট করবেন না। ভাবছেন তো আমি যদি কিছু করি আপনাকে। ভাববেন না, আপনি নিরাপদেই থাকবেন।আসুন।
আর বেশি না ভেবে এবার গাড়িতে উঠে বসে মেধা। গাড়িতে একটা হালকা মিউজিক চলছে, আর বেশ ঠান্ডা আমেজ, আসলে বাইরে বৃষ্টি আর এসিটাও চলছে ফুলদমে। বেশ খানিকক্ষণ দুজনেই চুপ থাকে, তারপর পি.এন.বি মোড় টা পেরোতেই মেধা নিজেই বলে, আপনিও কি এদিকে কাজেই?
ড্রাইভার – হ্যাঁ আসলে আমার উড বির অফিস ওই সেক্টর ফাইভেই, ওকে মাঝেমাঝে ছেড়ে দিতে আসি। আমার একটা পারিবারিক ব্যবসা আছে, ওটাই দেখাশোনা করি। আর আপনি?
মেধা – আমার এই একটা আইটি কোম্পানিতে সফটওয়্যার ডেভেলপার এর কাজ, এই তিনমাস হলো জয়েন করেছি।
ড্রাইভার – রোজই এমন দেরি হয় নাকি?
মেধা – সে এক গল্প। রোজই ছুটির আগেই বস মিটিংএ ডেকে নেন, ওই এম্প্লয়ীদের মাইনে দিচ্ছি যখন, যতক্ষণ আটকে রাখা যায় আর কি। কাজ হয়ে যায় অনেকক্ষণই।
ড্রাইভার – কলকাতায় এই এক সমস্যা। কোনো ম্যানেজমেন্ট নেই ঠিকমত, মানুষকে যদি আট ঘণ্টা খাটিয়ে আউটপুট যথেষ্ট না পাওয়া যায়, তাহলে কি আর চব্বিশ ঘন্টা খাটিয়েও লাভ হবে কোনো। একটা সময়ের পর মানুষ ক্লান্ত হবে, এমনিই কাজের মান কমবে।
মেধা – আচ্ছা আপনি কোথায় থাকেন?
ড্রাইভার – গিরিশ পার্ক মেট্রো থেকে আর একটু। আপনাকে কোথায় ছাড়বো?
মেধা – আমার বাড়ি শোভাবাজার মেট্রো থেকে পায়ে হেঁটে মিনিট পাঁচেক, আপনি মেট্রোর সামনে ছাড়লেই হবে।
ড্রাইভার – তা ম্যাডাম এখন ভয়টা কমেছে তো?
মেধা বেশ একটু লজ্জা পেয়েই মাথাটা ঘুরিয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে দেখে ভাবে, সত্যিইতো কথায় কথায় কখন ভয়টা উবে গেছে বুঝতেই পারেনি মেধা।দেখতে দেখতে শোভাবাজার মেট্রো এসে যায়। মেধা নামতে নামতেই মনে পড়ে ইসস নামটাই জানা হলনা,
মেধা – আপনার নামটা?
ড্রাইভার – আকাশনীল মুখার্জি। আর আপনি তো মেধা?
মেধা – হম।বলেই গাড়ির দরজাটা বন্ধ করে সামনের দিকে তাকিয়েই মেধার খেয়াল হয়,আমার নামটা কি করে জানলো লোকটা। পেছনে ঘুরে জিজ্ঞেস করতে যাবে, আর গাড়িটাকে দেখা যায়না। এত তাড়াতাড়ি গাড়িটা বেরিয়ে গেলো, কোনদিক দিয়ে,কখন গেলো কিছুই তো টের পাওয়া গেলোনা। যাক এবার বাড়ির দিকে যাওয়া যাক, ভেবেই একটু জোরেই পা চালায় মেধা। বাড়ির কাছে আসতেই দেখে রমলা মানে মেধার মা দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়। মেধাকে দেখতেই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে,
রমলা – কিরে আজকেই এত দেরি হলো তোর?
মেধা – রোজই তো দেরি হচ্ছে মা, কাজ থাকলে কি করবো বলো। তোমায় কতবার বলি খেয়ে নাও।
রমলা – সেই। বললেই কি খেয়ে নেওয়া যায়, তোকে কখন থেকে ফোন করছি নট রিচেবল বলে যাচ্ছে।
মেধা – বৃষ্টিতে নেটওয়ার্ক এর সমস্যা হয়েছে কিছু। এত ভেবোনা তো তুমি।
রমলা – ভেবোনা বললেই না ভেবে থাকা যায়। তুই জানিস আজকে কি হয়েছে তোদের অফিসের দিকে, ওই সেক্টর ফাইভে? দেখ খবরে কি দেখাচ্ছে। মেয়েটাকে বাঁচাতে গিয়ে কিভাবে ছেলেটাকে মরতে হলো।
মেধা – কোন ছেলে মা কই দেখি কি হয়েছে?
বলেই মেধা রিমোটটা নিয়ে টিভিটা অন করে, খবরে তখন দেখাচ্ছে, সেক্টর ফাইভে আজ ঠিক রাত আটটা ত্রিশ মিনিট, তখন প্রেমিকাকে অফিসে পৌঁছে দিতে গেছিলেন এক যুবক। অফিসের গেটের কাছে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়ার পর তিনি গাড়ি নিয়ে দাড়িয়ে ছিলেন উল্টোদিকের ফুটে। তিনি দেখতে পান তার প্রেমিকাকে তিনজন দুষ্কৃতী জোর করে তুলে নিয়ে একটা অ্যাম্বাসেডরে তোলার চেষ্টা করছে। তিনি তৎক্ষণাৎ সেখানে পৌঁছে তাদের আটকানোর চেষ্টা করলে ওই দুষ্কৃতীদের একজনের ধারালো ছুরির বারংবার আঘাতে মৃত্যু হয় ওই যুবকের।পুলিশ ঘটনার তদন্তে নেমেছে, এখনও জানা যায়নি কেন এই খুন? পকেটে পড়ে থাকা পরিচয়পত্র থেকে জানতে পারা গেছে মৃত যুবকের নাম আকাশনীল মুখার্জি।বাড়ি গিরিশ পার্ক।
নামটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই মেধার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। কেমন যেন হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায়, একি করে সম্ভব। টিভিতে আকাশনীলের যে ছবিটা দেখাচ্ছে, তাতে হুবহু জামার রংটা মিলে যাচ্ছে গাড়ির ছেলেটার সাথে, শুধু মুখটায় আলো কম পড়ছিল বলে ঠিক ভালো বোঝা যায়নি, কিন্তু এরকমই মনে হচ্ছে দেখতে। মেধার মা কি যেন বলে যাচ্ছে আর কিচ্ছু কানে যাচ্ছেনা মেধার, টিভির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বসে আছে মেধা।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।