সকাল থেকেই কখন ঝিরঝির কখন ঝমঝম বৃষ্টির ধারা বয়ে চলেছে । তিস্তা অনেকবার কিন্তু কিন্তু করেও একরকম বিরক্তির ঘ্যান ঘ্যনানি নিয়েই বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে । রাস্তার কাদা জলের সাথে একরকম কুমির ডাঙা খেলতে খেলতে সে এগোতে লাগল । শাড়ির কুচি সামলে তার ভ্রূ কুঞ্চিত চাহনি নিয়ে এগিয়ে চলা বেশ উপভোগ করছিল এক জোড়া মুগ্ধ চোখ । কিন্তু অবহেলায় ভরা তিস্তার নজর তাকে এড়ায় নি । সময়টা আজ যদিও দৈবাৎ, কিন্তু শনিবারের বিকেলে গান শিখে ফেরার পথে তার ছায়া সঙ্গী ঐ মুগ্ধ চোখ জোড়া নিজ অলিখিত কর্তব্য থেকে কোনদিন পিছু পা হয় না । জরুরী কাজ সেরে ফেরার পথে একেবারে জোরকদম বৃষ্টি নামলো । তার দাপটের সাথে পাল্লা দিতে অপারগ ছাতা ডাণ্ডি ভেঙে সেটি ঊল্টো হয়ে মুখ ভেংচাল তিস্তা কে । বাধ্য হয়ে তিস্তা একটা মুদি খানার আচ্ছাদনে আশ্রয় নিলো । মনে মনে দাঁত কিড়মিড় করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই ।মুদি খানার দাদু বললেন–‘কোন পরিচিত কে ছাতা সমেত দেখলে জুড়ে যাও নইলে এ বৃষ্টি থামবার নয়’, শুনে মুখে বিরক্তির ভাব থাকলেও তিস্তার চোখ পরিচিত মুখ খুঁজতে লাগল । আধ ঘণ্টায় একজনের টিকি ও দেখা গেলনা।
হঠাৎ কালো ছাতা হাতে অস্থির পায়ে এগিয়ে এলো সেই অপরিচয়ের পরিচিত মুখ । বেশ সাবলীল ভঙ্গিতেই বলল ‘ আপনি এখানে ! আর আমি রাস্তার উল্টো পথে অপেক্ষা করছিলাম, যাওয়ার সময় দেখেছি ছাতার হাল বেহাল । তাই জানতাম এই বৃষ্টি তে মুশকিলে পড়বেন। তাই কতক্ষণ অপেক্ষা করে ভাবলাম , যাই এগিয়ে দেখি ‘। তিস্তার মুখটা যে একটু হাঁ হয়ে গেছিল , সেটা সে নিজে একটু পরে বুঝল । দাদু আবার হেঁ হেঁ করে বলল’ নাও মা জুড়ে যাও, এ বৃষ্টি থামার নয় ‘ তিস্তা কখন যেন কালো ছাতার সাথে সত্যি জুড়ে গেল । রোজ অবহেলায় যাকে তিস্তা দেখে সে মানুষটার কাঁধের ছোঁয়া এক মিষ্টি আবেশ ভরিয়ে দিতে লাগলো । দু জোড়া চোখ তখন আলাপ চারিতার পর্বে ব্যস্ত ।
দশ মিনিটের রাস্তা পেরোতে সেদিন অনেকটা সময় লেগেছিল ।সেই রাস্তা তারপর দশটা শ্রাবণ মাস কাটিয়ে দিলো । জানালার বাইরে হাত ভিজিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তিস্তা অনেক্ষন। আবার সেই চেনা কাঁধের ছোঁয়া তে সে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল,’ নাহ ! রুপোলী চুলের উঁকিঝুঁকি তে সেই জোড়া চোখের চাহনি একই আছে’ , শ্রাবণ মাসের এই রিমঝিম ধারা তে এমন অনেক মুস্কিল আসান এসে সবুজ মনে ভালবাসার আচ্ছাদন হয়ত আজও দিয়ে যায় ।