ছোটগল্পে সুপ্রসা রায়

একজন সাহিত্যিক । বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় যেমন , আনন্দ বাজার রবিবাসরীয় , সানন্দা , সাপ্তাহিক বর্তমান , নব কল্লোল , উত্তর বঙ্গ সংবাদ নিয়মিত আমার লেখা গল্প প্রকাশিত হয় । ছোটদের জন্য আনন্দমেলা , শুকতারা , কিশোর ভারতী , সন্দেশ , চির সবুজ লেখা ইত্যাদিতেও আমার গল্প প্রকাশিত হয় । এ ছাড়াও আরও বিভিন্ন পত্রিকায় গল্প , কবিতা এবং নিবন্ধ প্রকাশিত হয় । শুকতারায় প্রকাশিত আমার বেশ কিছু গল্প দেব সাহিত্য কুটির থেকে পুরস্কৃত হয়েছে ।

জাগরী

স্টেশন থেকে বাড়ি ফেরার পথের আলোগুলো আজ যেন অন্যদিনের তুলনায় বেশি উজ্জ্বল লাগছে । সারাদিন এদিক সেদিক চড়ে বেড়াবার পর দিনের শেষে কুলায় ফিরতি পাখিদের কলকাকলি মন ভরিয়ে দিচ্ছে কতদিন পর। রাস্তার দুপাশের দোকান ঘরগুলোও যেন নতুন নতুন রঙ বেরঙের পসরায় সেজে উঠেছে । সব কিছুতেই আজ ভরপুর আনন্দ । ঠিক আগের মতো । বুকের ভিতরটাও খুশিয়াল হয়ে আছে । এইমাত্র খেয়াল হল, ভিড় ট্রেনের গাদাগাদিতে খানিক বেসামাল লাগলেও , ট্রেন থেকে নামার পর ফুরফুরে মনটা যেন ডানা মেলে উড়ে গিয়ে ওই আকাশের সাদা মেঘগুলোর পাশে পাশে ভেসে যেতে চাইছিল । তখনই প্ল্যাটফর্মে ইতি উতি ঘুরে বেড়ানো বাপ মা হারা এক রত্তি ছেলেটাকে না ফুরোনো ছোলাভাজার প্যাকেটটা দিয়ে দিল ব্যাগ থেকে বার করে । একদিন আগেও এমন বেহিসেবি কাজ করার কথা ভাবাই যেত না । ছেলেটার চোখ মুখের হাসির ঝিলিক বুকের ভিতরে ঝর্ণা বইয়ে দিয়েছিল । সেই খুশিই বহমান হয়ে সঙ্গ দিয়ে চলেছে এখনও । সবাইকে ডেকে ডেকে ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করছে সেই খুশির আবির । অনেকদিন খরা চলার পর আজ আবার কাজ পেয়েছে বাবলি । একটানা গুমোট আবহাওয়া চলার পর যেন রিমঝিম বৃষ্টির বয়ে আনা স্বস্তি ।
অনেকদিন মানে সত্যিই এতগুলো দিন , যে সেই হিসেব মাথায় আর ধরে রাখতে পারেনি ও । একদম প্রথম দিকে মনে আশাটা বহাল ছিল । ঠিক আবার কাজ জুটবে ওর । যাদের সঙ্গে এত বছরের সম্পর্ক , কথা নেই বার্তা নেই , নাহক তারা ওকে একেবারে বসিয়ে দেবে ! তারা সবাই জানে ঘরে ওর দুটো ছেলে মেয়ে আছে । তাদের ভরণ পোষণের জন্য বাবলির রোজগার করা টাকাগুলোই ভরসা । জেনে শুনে সেই ভরসাটুকু কেড়ে নেবে ওরা ? এত বছর ওদের সঙ্গে মেলামেশা করছে বাবলি । তেমন নিষ্ঠুর তো কাউকেই মনে হয় না ওর । বরং সকলের মনে দয়া মায়ার আঁচটা বেশ টের পেয়েছে বারবার । পাওনা টাকা ছাড়াও , ছেলে মেয়ের জন্য কত রকম উপহার যে বাবলি পেয়েছে , তার গোনা গাঁথা নেই । অন্য কিছু না হলেও চকোলেট বা বিস্কুট তো একেবারে বাঁধা থাকত । ওই ভালো মানুষগুলোর দয়াতেই তো বিন্তি আর টোটা কত্ত রকম খাবার দাবারের স্বাদ পেয়েছে। না হলে বাবলির সাধ্য কি অমন সুস্বাদু রকমারি দামি দামি খাদ্য ওদের মুখে তুলে দেয় ! এমন ধারা মানুষগুলো ওর উপার্জনের পথটা নিশ্চয়ই একেবারে বন্ধ করে দেবে না । এই ধারণা বুকে নিয়েই এক একটা দিনের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল বাবলি । রাত কাটলেই নতুন আর একটা দিন ধারালো দাঁত নখ মেলে আক্রমণ করত ওকে । ছেলেমেয়ের খিদেয় কাতর মুখ , মলিন জামা কাপড়, নতুন ক্লাসের বই খাতা, প্রাইভেট মাস্টারের মাইনে সব কিছু বাবলির চারপাশে লাল চোখ নিয়ে ঘুরে বেড়াতো । একটু অসাবধান হলেই ওরা যেন দল বেঁধে হামলে পড়বে বাবলির উপর । ওহ! কি করে যে ওদের ঠেকিয়ে রাখবে , সেই চিন্তাতেই দিশেহারা হয়ে পড়ছিল বাবলি । ধৈর্য্য , স্থৈর্য , আশা এই সব প্রবৃত্তিগুলো ক্রমশঃ ছেড়ে যাচ্ছিল ওকে । অথচ , সংসারের কথা যার ভাববার কথা , তার কোনো মাথা ব্যথাই নেই । উল্টে তার রসদের জোগান দিতেই বাবলি জেরবার । এছাড়া উপায়ও নেই । না হলেই সারা আকাশটা মাথার উপর ভেঙে পড়ে দুমড়ে মুচড়ে চুরমার করে দেবে বাবলি আর ওর ছেলে মেয়েকে ।
বছরখানেক আগেও বাবলির নিটোল শরীরের খুব কদর ছিল কাজের জায়গায় । সবাই ওকেই চাইত । কাজ জোটেনি , এমন একটা দিনও সেই সময় আসেনি ওর জীবনে । প্রথম দিন থেকে শুরু করে একটানা কাজ পেয়েছে । কাড়াকাড়ি পড়ে যেত ওকে নিয়ে । রেট তো বেড়ে গিয়েছিলই । অনেক সময় পরিস্থিতি বুঝে উপরিও কিছু চেয়ে নিত ওদের কাছ থেকে । ওরাও কার্পণ্য করত না । দরাজ মনেই বাবলির আবদার মেটাতো । অনুরোধ করত পরের দিন সময় মতো চলে আসতে । অনুরোধই করত । হুকুম নয় । ওর দুহাত ধরে নরম গলায় বায়না করত ওরা । বাবলির সঙ্গে এমনই সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল সবার ।
এখন দিন ঘুরে গিয়েছে । বাবলির বুকের গভীর থেকে লম্বা একটা শ্বাস বেরিয়ে এসে বাইরের নির্মল বাতাসটাকে ভারি করে তুলল । টাল খেয়ে গেল মনের খুশি খুশি ভাবটা । গুমড়ে ওঠা কান্না চাপতে গিয়ে বেঁকে গেল ওর ঠোঁট । অন্যকে দোষ দেবে কি ? আজকাল নিজেকে আয়নায় দেখলে নিজেরই বিতৃষ্ণা হয় । অকাল বার্ধক্যের থাবায় চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছে ওর সেই আকর্ষণীয় মুখশ্রী , চটকদার দেহ সৌষ্ঠব । শরীর সুন্দর রাখতে গেলে তাকে ভালো পুষ্টি দিতে হয় । যন্ত্রও সঠিক সময়ে পরিচর্যার দাবি করে । চায় যত্ন , বিশ্রাম । না হলেই বিগড়াবে । মানুষেরও পেট ভরা খাদ্য চাই । গায়ে মাখার ভালো সাবান , চুলে দেবার তেল । আর সবার উপরে মনের শান্তি । এর কোনোটাই কী জুটেছে বাবলির কপালে ? যা রোজগার করে ছেলেমেয়ের জন্যই খরচ হয়ে যায় । রতন একটা সেলুনে চাকরি করে । সেখান থেকে যা পায় , তাতে ঘর ভাড়া আর ওর প্রতিদিনের চুল্লু খাওয়ার খরচের পরে হাতে কিছুই থাকেনা । ঘর ভাড়াটাও কি দিত নাকি ? নেহাত বস্তির মালিক ওর পেয়ারের দোস্ত , এক গেলাসের স্যাঙাৎ । তাই বাবলির কিছু টাকা অন্ততঃ বেঁচে যায়।
বাবলি কাজটা না পেলে কবে সবাই না খেতে পেয়ে কিংবা বিনা চিকিৎসায় মরে যেত । সেই কাজের জায়গাতেই ইদানিং মন্দার হাওয়া । এখন এই লাইনে স্কুল কলেজে পড়া মেয়েরা আসছে । ভদ্রঘরের শিক্ষিত গৃহিনীরাও পিছিয়ে নেই । ওরা অনেক খোলা মেলা আর চৌখস । আগে থেকেই অনেক কিছু জেনে টেনে আসে । ফলে, কি করতে হবে না হবে , একবার শুনলেই বুঝতে পেরে যায় । স্বাভাবিকভাবেই এখন ওদেরই খাতির বেশি । তবুও বাবলি রোজ গিয়ে বসে থাকে । যদি কোনদিন ভাগ্যের শিকেটা ছেঁড়ে । যদি ওর ঢিলে হয়ে যাওয়া , পাতলা চুল আর বসে যাওয়া গালের শরীরটা কারও কাজে লাগে । তবে তার জন্যও খরচের ধাক্কা আছে । ট্রেনের মান্থলি করে নিয়েছে । যাওয়া আসা নিয়ে বাকি আরও বেশ খানিকটা পথ হেঁটেই পার করে । কষ্ট হয় । কিন্তু উপায় নেই । রিক্সায় চড়লেই এক একবারে দশ টাকা করে বেরিয়ে যাবে । হেঁটে সেই টাকাটা বাঁচালেও রাখতে পারেনা । টিফিন বাবদ খরচ হয়ে যায় । সব মিলিয়ে দিনের পর দিন স্বাস্থ্য হ্রাস ঘটছে লক্ষ্মীর ঝাঁপির ।
স্টেশন বাজার থেকে কিছু সব্জি কিনল বাবলি । বাজার যেন দাউদাউ আগুন । হাত ছোঁয়ালেই ফোস্কা পড়ে যায় । গাঠি কচু , কুমড়োর ফালি আর লাউয়ের ডগাতেই অনেকগুলো টাকা বেরিয়ে গেল । তবে , আজ ছেলে মেয়েদের একটু ভালো করে খাওয়াবার ইচ্ছে বাবলির । তাতে খরচ একটু বেশি হয় হোক । কাজটা তো একদিনেই শেষ হয়ে যায়নি । পুরনো অভিজ্ঞতার ফলে বাবলি জানে , অন্ততঃ দিন পনেরো টানা চলবে । রোজ কাজের শেষে হাতে হাতে মজুরি । অতএব একটা বেলা বেহিসেবি হওয়াই যায় । স্বাদের খাবার না খেয়ে না খেয়ে বেচারাদের জিভে স্যাঁতলা পড়ে গেছে । অল্প করে পাঁঠার মাংসের কিমা কিনে নিয়ে যাবে । তার সঙ্গে বেশি করে আলু দিয়ে দেবে , তাতেই বেড়ে যাবে পরিমাণটা । আদা , রসুন আর লঙ্কা নিয়ে নিল । বাড়িতে পেঁয়াজটা আছে । কদিন ধরে তো পেঁয়াজ আর ফ্যানা ভাতে এসে ঠেকেছিল দিন রাতের খাবার । সবাইকে আজ রাতে ফ্যান ফেলে দেওয়া ঝরঝরে ভাত খাওয়াবে বাবলি । চাল যতটা আছে তাতে হয়ে যাবে ।

(২)

সরষের তেল নিতে হবে নগেনের দোকান থেকে । অবশ্যই বাকিতে । নগেন খ্যাঁচ খ্যাঁচ করবে খুব । আগের ধারই শোধ হয়নি । মুখ বুঁজে থাকবে বাবলি । কারণ ও জানে শেষ পর্যন্ত নগেন তেলটা দিয়ে দেবে । সঙ্গে দুটো লজেন্স । বিনে পয়সায় । বিন্তি আর টোটাকে যে খুব ভালোবাসে নগেন । দুটো টোম্যাটো নিলে ভালো হত । ভাবনাটা মাথায় আসতেই সঙ্গে সঙ্গে ঝেড়ে ফেলে দিল বাবলি । একবারে সব হয় না । মশলা টশলা দিয়ে কিমাটা মেখে রেখে দেবে অনেকক্ষণ । তাতেই স্বাদ বাড়বে । বেশ কষা কষা করে রাঁধবে আজ । সঙ্গে গরম গরম ভাত । ছেলে মেয়েদের তৃপ্তি ভরা চোখ মুখ ভেসে উঠল বাবলির মনের পর্দায় । শুকনো ঠোঁটে খুশির পরশ লাগল আবার । যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অবসন্ন শরীরটাকে বাড়ির পথে টেনে নিয়ে চলল ও । সারা শরীর টাটাচ্ছে । এখন আর রোজকার অভ্যাসটা নেই তো ! অনেকদিন পরে কাজ করল , তাই এমন কাহিল অবস্থা । একদম শুরুর দিকের দিনগুলোতেও ঘাড় কোমর ব্যথা হয়ে যেত । আর্তনাদ করত শিরদাঁড়া । ছুটি পাবার জন্য ছটফট করত ক্লান্ত শরীর । কয়েক মাসের মধ্যেই অবশ্য সড়্গড় হয়ে গিয়েছিল । তারপর থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেলেও শরীর মন পুরোপুরি চনমনে থাকত । মিইয়ে যেত না মোটেই ।
মায়াদি যখন এই কাজটার হদিশ দিয়েছিল , শুনে আঁতকে উঠেছিল বাবলি । সহজাত সংকোচে শাড়ির আঁচল দিয়ে সারা শরীরটা ভালো করে ঢেকে নিয়ে চোখ মুখ কুঁচকে বলে উঠেছিল ,”ছি ছি অমন কাজ করে ট্যাকা কামাবো !” মায়াদি ওর গায়ে হাত বুলিয়ে হেসে বলেছিল ,”আমিও যকন পেত্থম শুনিচিলাম , মোর দশাও তুর মতোই হইচিল । একন ভাবি , নিজির শরীল যেমন খুশি খাটাবো । তাতে কার কি এলো গেলো পুচি থোড়াই ।“ “কিন্তুক বাইরের নোকের কাচে ? ইস.আমি কিচুতেই পারবনি ।“ মায়ার অমন বুক বাজানো কথাতেও সংকোচ কাটেনি ওর । “ক্যানো কাজটা অল্যায্য কিসি ?” খেপে গিয়েছিল মায়া ,”বেশ্যাগিরি তো কচ্চি না । আর সিটাও বা খারাপ কিসি ? পেটের ছেল্যা মেয়াদের না খেইয়ে মেইরে ফেলার চে তো ভালো ।“ কথাগুলো শুনে শিউরে উঠে দুহাত দিয়ে কান চেপে ধরেছিল বাবলি । ও তো মায়াদির মতো করে ভাবতে পারে না । ও মনে করে , বেশ্যা বৃত্তি করার চেয়ে ছেলে মেয়ে নিয়ে বিষ খেয়ে মরা ভালো । ওর প্রতিক্রিয়া দেখে দুলে দুলে হেসেছিল মায়া । তারপর ওর হাতদুটো কান থেকে ছাড়িয়ে নিজের হাতে ধরে বলেছিল ,”জানিস তো আট কলেজের দিদিমনিরা বলিচে , বেশ্যাগিরিও একন নাকি আর বেনিয়মি কাজ লয় । আর পাঁচটা কাজের মতো উও এট্টা কাজ । তা যাগগা যাক , আমরা তো আর উসব কচ্চিনা , কি বল ?” বাবলির দ্বিধা তখনও কাটেনি ,”কিন্তুক উরা শুদু মুদু আমার খুলা শরীলটা দেকে কি কইরবে গো ?” “ফটোক এঁকবে । তুর শরীলটার ঘুইরে ফিইরে কত্ত রকম ফটোক এঁকবে ।“ “ফটোক !” বিস্ময়ে চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গিয়েছিল বাবলির ,”আমার শরীলের ফটোক এঁকে কী কইরবে উরা !” বিন্তি আর টোটাকে নানান রঙের পেন্সিল দিয়ে খাতায় ছবি আঁকতে দেখেছে ও । কিন্তু সেগুলো গাছ পাখি আকাশের ছবি । স্কুলের শিক্ষকদের দেখানোর জন্য । তাতে নম্বর পায় ওরা । কিন্তু এমন বেহায়া রকমের ছবি কার কোন কাজে লাগে ! এমন আজব কথা ও শোনেনি কখনও । ওকে বোঝানোর মতো করে মায়া বলেছিল ,”ফটোক আঁকা শিককে করবে । তাপরে , যি ফটোকগুলান সোন্দর হবে , সিগুলান বড়লোক বাবুরা কিনে নে গ্যে ঘর সাজাবে ।“ অবাক হয়ে ও শুনছিল মায়ার কথাগুলো । বড়োলোক বাবুদের সাজানো ঘর কোনোদিন দেখেনি ও । সত্যিই ওর মতো গরীব খেতে না পাওয়া মানুষের ছবি দিয়ে ঘর সাজায় বাবুরা ! কেন ? কি সুখ পায় এতে ? বাবলির দুচোখে স্বপ্ন ঘনাতে দেখে মায়ার উৎসাহ উজিয়ে উঠেছিল , “কালই চ মোর সাতে ।“ সঙ্গে সঙ্গে যেন হুঁশ ফিরেছিল বাবলির ,”ইস , না গো আমি পারব নি । অত্তগুলোন মানুষের সামনে গা খুলে – মা গো !” ওর অবুঝপনা দেখেও রাগ করেনি মায়া । মিষ্টি হেসে ওর কাঁধে হাত রেখে বলেছিল ,”পেত্থম পেত্থম মোরও লাজ লাগত জানিস । আট কলেজের দাদা দিদিরাই বুজোয়েছেলো , কুন পাপ কাজ কচ্চি না আমি । বরঞ্চ এনেক বড়ো কাজ কচ্চি , আটের কাজ । মুরা যদি উদেরকে মোদের শরীলের ফটোক এঁকতে না দিই , তো উদের শিক্কেটা ঠিকঠাক হয় না ।“ “ফটোক আঁকা শিক্কে করে কি করে গো উরা ?’ “পারি না বাবা তুর এত কতার জবাব দিতি । উরা কি কলল তাতে মুদের কী এল গেল ? মুরা কাজ কইরব আর ট্যাকা পাব বাস ।“ “কাজ !” দ্বিধা কিছুতেই কাটাতে পারছিল না বাবলি । “ইটাকে কাজ মনে কললে দেকবি মনে আর কুনো আনচান নাই । তাপরে দেকবি , ভদ্দরনোকেদের নেকা পড়া জানা ছেল্যা মেয়ারা কত্ত মান দিবে তুকে । তুর ভাতারও অমন মান দেয় না ।“ কথাটা সত্যি । সেই সময় , বস্তির বৌ ঝিরা সর্বদা বলত , বাবলির চেহারাটা নাকি সিনেমার হিরোয়িনদের মতো সুন্দর । উনিশ বছর বয়স হতে নাহতেই দুটো সন্তান হওয়া ওর শরীরকে টসকাতে পারেনি এতটুকুও । শুনে পুলকিত হত বাবলি । রতন কিন্তু কোনোদিনও মুখ ফুটে বলেনি এমন কথা । আচরণেও বোঝায়নি । সুযোগ পেলেই ওর শরীরটাকে বিকৃত মনা জন্তুর মতো ধামসায় কেবল । বাবলির শরীরের গুরুত্ব রতনের কাছে ওইটুকুই । নিজের মনেই হাসে বাবলি । বসে থাকাও যে কাজ হতে পারে আর তাই করে টাকাও রোজগার করা যেতে পারে , সেটা আগে কখনও শোনে নি । তবে এটাও ঠিক , ঘন্টার পর ঘন্টা একভাবে ঠায় বসে থাকাও যে এত কঠিন পরিশ্রমের , এত ভয়ানক ক্লান্তির তাই কি আগে বুঝেছিল !
উঠোন পেরিয়ে বারান্দায় পা রাখতেই ঘরের কন্দর থেকে ভেসে এল রতনের জড়ানো গলা ,”ওই এলেন গতর দেখিয়ে । না ফিরলিই বা কে কার কতা শুনচে ? বাকি রাতটুকুনও বাবুদের সঙ্গে খিল্লি করি কাটিয়ে দিলিই বা কার কি এল গেল ? শুওরের বাচ্চাদের দেখভাল করতে বুরবক বাপটা তো আচেই । তার তো কুনো কাজও নাই , বিস্‌রামেরও পেয়োজন নাই ।“ আগে আগে রতনের ওই ট্যারা ব্যাঁকা কথাগুলো শুনলে দাবানল জ্বলে উঠত বাবলির মাথার ভিতরে । আজকাল আর গায়ে মাখে না । ভালো কিছু তো আশাও করে না রতনের থেকে । অথচ ওকে বলেই এই কাজে গিয়েছিল বাবলি । শুনে অবশ্য হ্যাঁ না কিছুই বলেনি রতন । হয় তো পরে কথায় কথায় বাবলিকে বিঁধবে বলেই তখন চুপ করে ছিল । এখন বাবলি ভাবে , রতনকে খোলাখুলি সব কথা না বললেই ভালো হত । মিথ্যে করে অন্য কিছু বললে , অন্ততঃ নোংরা ইংগিতগুলো করতে পারত না । কিন্তু আজ আবার রতন এত তাড়াতাড়ি কাজ থেকে ফিরে এসেছে ! এই দিনগুলোকে বড়ো ভয় পায় বাবলি । সন্ধ্যেটা বিন্তি টোটার পড়ার সময় । তেরো বছরের বিন্তি কর্পোরেশনের স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ে । বছর বছর প্রথম হয় । স্কুলের দিদিমণি মাস্টার মশাইরা বলেন ,ওর ভবিষ্যত খুব ভালো । মেয়েরও ইচ্ছে বড়ো হয়ে স্কুলে পড়াবে । মেয়ের মনে স্বপ্নটাকে জিইয়ে রাখতে যথাসাধ্য ইন্ধন জুগিয়ে চলে বাবলি । টোটা পড়ে ক্লাস ফোরে । বিন্তি ওর পড়া টড়া ভালোই দেখিয়ে দিতে পারে । দুজনের জন্য প্রাইভেট মাস্টার রাখা বাবলির পক্ষে সম্ভব হয় না । স্কুল ছুটির পরে প্রাইভেট পড়ে এসে , সন্ধ্যেবেলায় ভাইকে।

(৩)

নিয়ে পড়তে বসে যায় বিন্তি । রতন বাড়িতে থাকলে ওদের পড়াশুনোর পরিবেশটা নষ্ট হয়ে যায় । একটাই মাত্র ঘর । সেটাও রতন ছিনিয়ে নেয় ওদের কাছ থেকে । কুকুর তাড়ানোর মত দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয় ঘরের বাইরে । বই পত্র আর মাদুর নিয়ে রান্না ঘরে এসে আশ্রয় নেয় বেচারিরা । শুধু সেটুকু হলেও মেনে নেওয়া যেত । ঘরে বসে সমানে চুল্লু খায় আর অকথ্য ভাষায় গালি গালাজ করতে থাকে অনুপস্থিত বাবলিকে উদ্দেশ্য করে । বাবলি ফিরলে তো আর কথাই নেই । তখন আক্রমণটা আর বাক্য বাণে থেমে থাকে না । বাবলির গায়ে হাতও চলতে থাকে বেধড়ক । ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে বাচ্চাদুটো । জলাঞ্জলি যায় সান্ধ্য পাঠের আবহাওয়া ।
শেষ পর্যন্ত মায়ার উৎসাহ আর সন্তানদের শুকনো মুখ কাটিয়ে দিয়েছিল বাবলির সব দ্বিধা সংকোচ । প্রথম যেদিন মায়ার সঙ্গে আর্ট কলেজে গিয়েছিল , ওকে দেখে উল্লাসে মেতে উঠেছিল ছাত্র ছাত্রী শিক্ষক সবাই । বাবলির দৃষ্টি ছিল মাটির দিকে । তাই কারও মুখ ও দেখতে পায় নি । উল্লাসটা বুঝেছিল সমবেত কন্ঠ ধ্বনি শুনে । ইংরাজি কথাগুলোর মানে না বুঝলেও সবাই যে ওকে পেয়ে খুব আপ্লুত , সেটা বুঝতে অসুবিধে হয়নি । দিদিরা কাছে এসে ওর গালে পিঠে হাত বুলিয়ে কতো আদর করল । ওকে নিয়ে আসার জন্য বারবার বাহবা দিল মায়াকেও। ওই দিদিরাই বাবলিকে ধরে নিয়ে গিয়ে বসালো কাজের জায়গায় । প্রায় ছয় বছর ওদের কাছে কাজ করছে বাবলি । আজ পর্যন্ত কোনো পুরুষ মানুষ ওর গায়ে হাত দেয়নি । বোন বা দিদি ছাড়া সম্বোধন করেনি কেউ । কিন্তু রতন কথাগুলো বিশ্বাসই করতে চায় না ।
জিনিস প্ত্রগুলো রান্নাঘরের এক কোণে রেখে ছেলে মেয়ের দিকে আশ্বাসের হাসি ছুঁড়ে দিল বাবলি । গা ঘিনঘিন করলেও রতনের সামনে যেতেই হল ওকে । ব্যাগটা রেখে দড়ি থেকে ঘরে পরবার ম্যাক্সি আর গামছাটা টেনে নিয়ে চলে এল । তার মধ্যেই হুল ফোটাতে ছাড়ল না রতন, ”উঁ মহারানি দপদপিয়ে ঘরে ঢুকচে দ্যাকো । কারুক্কে কুনো কেয়ারই নাই । ঘরে যে এট্টা মানুষ বসে আচে , সেই হুঁশটা আছে মোটে ?“ ওর কথা শেষ হবার আগেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে বাবলি । কলঘর থেকেও কানে আসছে রতনের গলা । তখনও জড়ানো গলায় বিষোদ্গার করেই চলেছে । ওই বিষ অবশ্য আজকাল আর বাবলিকে স্পর্শই করে না । মগে করে বালতি থেকে জল তুলে গায়ে ঢালে ও । আহ্‌ , ঠান্ডা জল গা থেকে ধূলো ময়লার সঙ্গে সারাদিনের ক্লান্তিও ধুয়ে সাফ করে দিচ্ছে । স্নান সেরে আবার ঘরে ঢুকতেই হল সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালাতে । ও ধরেই নিয়েছিল কাজটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে হবে না । কিন্তু অবাক কান্ড ! রতন চুপচাপ গেলাসে চুমুক দিতে দিতে ওকে জরিপ করতে লাগল কেবল ।
নামেই রান্নাঘর । আসলে বারান্দার একটা টুকরো বেড়া দিয়ে ঘেরা । তার এক দিকে লম্ফর আলোয় পড়তে বসেছে বিন্তি আর টোটা । রাস্তার তার থেকে টেনে আনা একমাত্র বিদ্যুতের আলোটা ঘরে জ্বলে । এই মূহুর্তে রতন সেটা অধিকার করে রেখেছে । বাবলি ঝুঁকে পড়ে ছেলে মেয়েদের দুগালে গাঢ়ভাবে চুমো খেল । সারাদিন বাদে মায়ের এই চুম্বনটার জন্য মুখিয়ে থাকে ভাই বোনে । স্টোভ জ্বেলে প্রথমেই চা করে ওদের দিয়ে নিজেও নিল বাবলি। সঙ্গে মুড়ি খেতে খেতে বাচ্চাদের সঙ্গে খুনসুটি করল খানিক । সেই ফাঁকে সারাদিনের খবরাখবরও নেওয়া হল । স্কুলে কি ঘটল জানা হল সেসবও । মেয়ে শান্ত হলেও ছেলেটা দামাল বিচ্ছু একটা । প্রায় রোজই বন্ধুদের সঙ্গে মারপিট করে আসে । আজও তাই । অতএব তাকে মৃদু ধমক ধামক দেওয়া হল । সব মিলিয়ে বড় জোর মিনিট পনেরো । ব্যাস , এরপরেই বিন্তি আর টোটা আবার পড়ায় মন দিল আর বাবলি কাজে । ভাত চড়িয়ে দিয়ে মাংস রান্নার জোগার করতে লাগল । মন পড়ে আছে ঘরের ভিতরে । চেতনা টানটান । যে কোনো সময় ওদিক থেকে আক্রমণ ধেয়ে আসতে পারে । থেকে থেকে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছে ও । সময় বয়ে চলে । অন্দর নির্বাক । কেবল গেলাস আর বোতলের আলিঙ্গনের ঠুং ঠাং । ভ্রূ কোঁচকায় বাবলি । রতনের হলটা কী ! এতটা সময় বাড়ির লোককে গালাগালি না করে থাকা তো ওর স্বভাবে নেই । কোনো কুমতলব ভাঁজছে নির্ঘাত ।
পেঁয়াজের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে বাবলি বাচ্চাদের দিকে তাকালো । ছেলেকে ঢুলতে দেখে প্রশ্রয়ের সুরে ধ্মকালো ,”ইস্কুল থেকে ফিরে হুটোপাটি করবি আর পড়বার বেলায় ঢুলঢুল ? মাংস রাঁদতেচি । ঘুমোয়ে পড়লে ডেকে খাওয়াবো নি বলি দিলাম ।“ আচমকা দরজায় শমন । পূর্বাভাস ছিলই । ঝড়ের মোকাবিলা করবার জন্য প্রস্তুত হয়েই আছে বাবলি । নিঃশব্দে হাত চলছে । অবাঞ্ছিত মানুষটার উপস্থিতিকে নস্যাৎ করবার ভঙ্গীতে টগবগিয়ে ফুটতে থাকা ভাতে ঠাণ্ডা জল ঢালল ধীরে সুস্থে । মন সজাগ । কালের নিয়মে কেটে গেল বেশ কিছুটা সময় । কিন্তু রতনের দিক থেকে কোনো আক্রমণ ধেয়ে এল না । বাবলির ভিতরে অস্বস্তির কালো মেঘ । ধৈর্য্য হারাচ্ছে ও । যা হবার হয়ে যাক । এমন গুমোট ভাব সহ্য করা যাচ্ছেনা । এর চেয়ে তুমুল কালবৈশাখি ভালো । এক সময় থেমে গেলে শীতল হবে পরিবেশটা । চকিতে মুখ তুলে রতনের চোখে চোখ রাখতে গিয়েই থমকে গেল । নিঃশব্দে হাসছে শয়তানটা । বাবলির ভ্রূ কুঁচকে গেল । কি ব্যাপার ! এমনটা তো হয়না কোনোদিন ! মতলব কি ওর ? মনের মধ্যে কী আরও গভীর কোনো প্যাঁচ কষে নিয়ে ওগরাতে এসেছে এঘরে ? নাকি মাংসের কথা কানে যেতে উঠে এসেছে ? দাঁতে দাঁত চাপল বাবলি । ইচ্ছে না হলেও , খাবারের বেশির ভাগটাই রতনকে দিতে হয় । আজকেও হবে । কদিন খেতে বসে খুব খোঁচা মেরেছে বাবলি ক্ষতে ,”ইঃ দিন দিন ফ্যানা ভাত আর পেঁয়াজ নংকা । ক্যানো , ছেনালিপনা জমছে না , নাকি ভালো ভালো খাবার লুকোয়ে রেকিচিস ওই হারামি দুটো আর তুই সাঁটাবি বলে ?” আজ মাংস পেয়েও কুৎসিত মন্তব্য করা থেকে বিরত হবে না , সেটা ভালই জানে বাবলি । বয়ানটাও ওর মুখস্থ ,”ওহ্‌ , আজ ঢ্যামনাদের সামনে ভ্যালা গতর নাচিয়েছিস না রে ? তাই নাগররা খুশি হয়ে মাংস খাওয়াচ্চে । ইসব করে আমাকে ভুলাতে পারবি না ।“ কথাগুলো বলবেও আবার জিভ টাগড়ায় বিশ্রি আওয়াজ তুলে তারিয়ে তারিয়ে খাবেও । কিন্তু এখনও কিছু বলছে না কেন ! রাত থমথম করছে । ছেলে মেয়েদুটোও পড়া থামিয়ে ভয়ার্ত চোখে দেখছে বাবাকে । বাবলির কপালে ঘাম জমছে । বুকের ভিতর উথাল পাথাল ।
অবশেষে ঝড় উঠল । প্রলয়ঙ্কর ঘূর্ণি ঝড় । এমন কালান্তক ঝড়ের জন্য প্রস্তুত ছিল না বাবলি । টাল খেয়ে গেল ওর মনের জোর । নেশা করে ফুলে ওঠা বীভৎস মুখটায় কুটিল হাসি ঝুলিয়ে রেখে বিকৃত গলায় রতন বলছে ,”মেয়ে তো তোয়ের হয়ে গেচে । খেয়ে দেয়ে গতরখানা যেন চিকনি লাউডগাটি । ইস্কুলে গে খামাখা ম্যাস্টরদের নে লটর পটর না করি , কাল থে তোর সাথে যাক । টেনিং ফেনিং দে ভাল করি । নাগরদের কাচে বডি দেকায়ে মালকড়ি নে আসুক । কচি শরীল । দেকলে নাগরদের মুক দে নাল গড়াবে । আম্মো এট্টু ভালো মন্দ খাই । বাংলায় আর নেসা ধচ্চে না । ভাবচি ইবার বিলাতি ধরব ।“ বলেই বিশ্রী ভঙ্গীতে শরীর দুলিয়ে খ্যা খ্যা করে অট্টহাস্য করে উঠল ।
দমকা ঝড়ে যেন মাথার উপর থেকে পলকা ছাদটা উড়ে নাগালের অনেক দূরে গিয়ে পড়ল । খোলা আকাশের নিচে তাণ্ডবের ধ্বংস লীলা থেকে বাঁচাতে , মেয়ের স্বপ্নটাকে বুকে আগলে প্রাণপণে যুঝে চলেছে অসহায় মা । আচমকা ঝটকায় নুয়ে পড়েছে ওর মনের জোর । রতনের গা ঘিনঘিন করা হাসি বেয়ে আসা অজস্র আবর্জনার ঝাপটায় অসাড় হয়ে পড়ছে ওর চেতনা । অন্ধকার ভবিষ্যতে এলোমেলো হাতড়ে অবলম্বন খোঁজার চেষ্টায় ব্যর্থ আস্ফালন করে চলেছে অন্তর ।

(৪)

বুকের অতলে যেন শিকারির জালে আটকে পড়া একটা পাখি মুক্তির চেষ্টায় ডানা ঝাপটাচ্ছে অনবরত । পাঁকে ডুবে যেতে যেতে সন্তানদের নিয়ে বাঁচবার তীব্র বাসনায় নিজেকে জাগিয়ে তুলবার আপ্রাণ চেষ্টা করছে বাবলি । প্রতিপক্ষ বড়ো কঠিন । ডুবতে ডুবতে অতলে পা ঠেকতেই যেন ফিরল চেতনা । মনের জোর ফিরল একটু একটু করে । ঝুঁকে পড়া মেরুদন্ড সোজা হচ্ছে ক্রমশঃ । বঁটির পাটা দুহাতে আঁকড়ে ধরতেই , চোয়াল শক্ত করা একটা সিদ্ধান্ত ঋজু হতে লাগল ওর মনের গহনে । জমাট অন্ধকারের বুক চিরে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে একটা আলোর পথ ।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।