কাটোয়াতে লোকেশদার চায়ের দোকানের পাশের যে গলিটা ওখানেই ছিল আমার প্রথম বাড়িটা – জেঠুদের বাড়িটা।তিনতলা বাড়িটার ঢোকার দরজাতে একটা নেমপ্লেট ছিল।জেঠু যখন অফিস থেকে ফিরতো নেমপ্লেটে নামের পাশে ইন করে দিত আর দোতলায় ওঠার মুখে বাবলি বলে একটা হাঁক দিত।আমি অপেক্ষায় থাকতাম।জেঠুর থেকেও বেশি মনোযোগ ছিল জেঠুর ব্রিফকেস টা তে।ঠাকুমার ঝুলি,মিল্ক চকলেট,বারবি ডল,ডান্সিং ফ্রকগুলো তো ওখান থেকেই বেরোত।
একতলার সিঁড়ির মুখে একটা জোকারের ছবি ছিল।দাদা এঁকেছিল।আর ওই জোকারটা আমার বন্ধু ছিল।যখন কাটোয়া ছেড়ে চলে এসেছিলাম জোকারটার সামনে দাঁড়িয়ে অনেক্ষণ কেঁদেছিলাম।
সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই ছিল দোতলায় যাওয়ার সিঁড়ি।সিঁড়িতে ধাপে ধাপে জুতো রাখা থাকত।নিউকাটটা দিদির, ওই বাঘমুখো জুতোটা জেঠুর।মায়ের ওপর রাগ হলেই সিঁড়িতে বসে জোরে জোরে কাঁদতাম যাতে কান্নার শব্দটা ওপর অবধি পৌঁছয়।কেউ না কেউ এসে ঠিক ওপরে নিয়ে যেত।জেঠু যদি নেমে আসত তাহলে তো আরো মজা – মা বকুনি খেত চুপটি করে।
দোতলার শোয়ার ঘরে একটা বড় আল্পনা ছিল।লাল মেঝের ওপর কালো রঙ দিয়ে।ওর ওপর আসনপিঁড়ি হয়ে খেতে বসতাম আমি।কলায়ের ডাল,হাঁসের ডিমের পোচ আর পোস্তর বড়া দিয়ে ভাত মেখে খাইয়ে দিত জেঠিমা।
সেসব অনেক কথা।এখন থাক।তিনতলা বাড়িটার সবচেয়ে মজার বিষয় ছিল তিনতলার ছাদের ঘর।ওটা আসলে দাদার ঘর ছিল।দাদা পড়াশোনা করত।আর আমি গিয়ে হানা দিতাম আমার আজেবাজে প্রশ্নর ঝুলি নিয়ে।দাদা কখন বিরক্ত হত না।কত গল্প করতাম আমি আর দিদি ওই ঘরে বসে।স্কুল থেকে শুনে আসা যত আজগুবি গল্প দিদি আমাকে চুপিচুপি বলত ওই ঘরে বসে।
সেই বাড়িটা এখনো আছে।শুধু দোতলার ঘরে আর আল্পনাটা নেই।জেঠু জেঠিমার সাথে কতদিন দেখা হয় না। শুধু গলাটা শুনি ফোনে।কিন্তু বিশ্বাস কর জেঠিমা তুমি এখনো বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কলায়ের ডাল আর পোস্তর বড়া বানাও।আর জেঠু তোমার দেওয়া ঠাকুমার ঝুলিটা আমি এখনো পড়ি।দিদির সাথে গল্প হয়।ফোনে ফেসবুকে – সে নিজেই এখন ভীষণ ব্যস্ত একজন মা।দাদাও এখন বেশ রাগী একজন টিচার কিন্তু আমি ঠিক জানি স্কুলের বাচ্ছা বাচ্ছা ছাত্রদের সব প্রশ্নের উত্তর ও খুব ঠান্ডা মাথায় দেয় যেমন করে আমাকে সামলাত।
আমার ছোটবেলাটা আটকে আছে ওই বাড়িটাতেই।ওই ছাদটাতে,আল্পনাটাতে,দাদা দিদির সাথে,ছোটবেলাটা কেন যে পেরিস্কোপ দিয়ে দেখা যায় না।।