সাপ্তাহিক T3 অরিজিনাল মিনি সিরিজে পিয়া সরকার (পর্ব – ১)

নৈর্ঋতা ও অন্যান্য ব্রাত্যজনেরা
নৈর্ঋতা দেবী অলক্ষ্মীর অপর নাম। নামের উৎস বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় যে ইনি এক প্রাচীনা দিগ্দেবী। নৈঋত কোণের অধিদেবতা দেবী নৈঋতি বা দেবী নৈর্ঋতা। বাস্তশাস্ত্রমতে তিনি গৃহস্থদের কর্তব্য-দায়িত্ব এবং প্রতিপালনীয় আচার বিধিকে প্রভাবিত করেন। আপাতদৃষ্টিতে দেখতে গেলে গার্হস্থ্যজীবনে তাঁর ভূমিকা সদর্থকই মনে হয়। তবে কী কারণে দেবী অলক্ষ্মী নামে তিনি পরবর্তীকালে অবহেলিত এবং লোকধর্ম থেকে পরিত্যক্ত হলেন তা আদতে এক গভীর সামাজিক বিবর্তনকে নির্দেশ করে। ধীরে ধীরে এই প্রবন্ধে দেবী অলক্ষ্মী ওরফে নৈঋতি ওরফে নৈর্ঋতার উৎপত্তি, ভারতের বিভিন্নস্থানে তাঁর নানাবিধ রূপ এবং পূজনীয়া দেবী থেকে ব্রাত্যজনে পরিবর্তন, এই বিষয়গুলি আলোচিত হবে। আলোচনা প্রসঙ্গে ভারতবর্ষ জুড়ে অনামী অখ্যাতা দৈবীশক্তির প্রসঙ্গ উঠবে। তাঁদের পারস্পরিক মিল (আইকোনোগ্রাফি এবং লোকাচারজনিত) নিয়ে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করার উদ্দেশ্যই কলম ধরা।
দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ অর্থাৎ নৈঋত কোণে দুর্যোগের আভাস পেলে তা অশুভ এবং সম্পত্তিহানি করবে এমন মনে করতেন আদিবৈদিকযুগের প্রকৃতি উপাসকরা। সম্পত্তিহানি অর্থে যে যুগে অবশ্যই শস্যহানির কথা বলা হত। আধুনিক বাস্তুশাস্ত্র অবশ্য বলে নৈঋত কোণের অধিদেবতা কুপিত হলে দুর্যোগ অবশ্যম্ভাবী। আর দুর্যোগ এবং দুর্ভাগ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন অলক্ষ্মী। কিন্তু শুধুমাত্র লোকবিশ্বাসে নয়, ভারতের বিভিন্ন দেবীমূর্তির বৈশিষ্ট্য পড়তে গিয়ে বারবার বিভিন্ন অলক্ষ্মীমূর্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রবাদপ্রতিম এলিমেন্টস অফ হিন্দু আইকোনোগ্রাফিতে ( টি. এ গোপীনাথ রাও রচিত) যেমন উল্লিখিত আছেন দেবী জ্যেষ্ঠা। পঞ্চম থেকে নবম শতাব্দী জুড়ে দেবী জ্যেষ্ঠা মূলতঃ পূজিত হতেন দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন মন্দিরে। কাঞ্চিপুরমের কৈলাস মন্দিরে দেবী জ্যেষ্ঠার যে মূর্তিটির কাঠামো এখনো দেখতে পাওয়া যায়, তাতে আসলে তিনটি আলাদা মূর্তি রয়েছে। মধ্যভাগে বৃহদাকার এক নারীমূর্তি, বাম দিকে বৃষানন এক পুরুষমূর্তি এবং ডানে সুন্দরী এক রমণীমূর্তি। গোপীনাথ তাঁর বইতে এই দুই মূর্তির তাৎপর্য বর্ণনা করলেও, বোধযান সূত্র মতে এরা দেবী জ্যেষ্ঠার পুত্র এবং কন্যাসন্তান। অবশ্য তামিলনাড়ুর অন্যন্য মন্দিরে দেবী জ্যেষ্ঠার যে মূর্তিগুলি পাওয়া যায়, তার কোনো কোনোটিতে তিনি একাই সিংহাসনে অধিস্থান করছেন। তাঁর হাতে ধরা রয়েছে সম্মার্জনী, কোনসময় তাঁর ডানদিকের রমণীমূর্তি ধরে রেখেছে সম্মার্জনী। কখনও কখনও তাঁর সঙ্গিণী উপদেবী সম্মার্জনীর সঙ্গে ধরে রেখেছেন এক বিশেষ পাখিকে, সাধারণভাবে যার সঙ্গে দেশীয় কাকের প্রচুর মিল পাওয়া যায়।
তামিল বৈষ্ণব সন্ন্যাসী তোন্দর আদিপড্ডির রচিত
স্তোত্রে তিনি সাধারণ মানুষকে শ্রীবিষ্ণুর অবহেলা করে জ্যেষ্ঠা দেবীকে পূজার্চনার জন্য ভর্ৎসনা করেছেন। আশ্চর্যজনকভাবে দক্ষিণভারত জুড়ে বিষ্ণু-উপাসনা যত বেশি করে প্রচলিত হয়েছে, ততই দেবী জ্যেষ্ঠা এক কোণে সরে গিয়েছেন। লক্ষণীয় বিষয় হল, দেবী জ্যেষ্ঠা এবং দেবী অলক্ষ্মী দুজনেই গর্দভারূঢ়া। লেখক গোপীনাথ রাও যদিও দেবী জ্যেষ্ঠাকে বাংলাদেশে পূজিত মা শীতলার সঙ্গে তুলনা করেছেন, বর্তমান প্রবন্ধকারের মতে অলক্ষ্মীর সঙ্গেও তাঁর মিলের পরিমাণ কম নয়।
একে একে দেখা যাক মিলগুলি কী কী। আগমের বিভিন্ন সূত্র অনুসারে দেবী জ্যেষ্ঠা বৃহদনাসা, তাঁর অধরোষ্ঠ ঝুলন্ত, স্তনভার এতই প্রবল যে তা নাভি স্পর্শ করছে, স্ফীত উদর, অতিপ্রশস্ত জঙ্ঘা, এবং তিনি ঘন মসীবর্ণা। তিনি রক্তবর্ণ বা কালচে-নীল রঙের আভরণ পরেন। তাঁর হাতে তিনি নীল বর্ণের পদ্ম ধরে রেখেছেন এবং সাধারণতঃ এমন গৃহকোণে তিনি থাকতে পছন্দ করেন যেখানে নিত্যদিন কলহবিবাদ লেগে আছে। তিনি বিবাহিতা রমণীর চিহ্নসূচক তিলক কপালে ধারণ করে থাকেন। এই প্রসঙ্গে সমুদ্রমন্হন করে দেবী জ্যেষ্ঠার আবির্ভাবের গল্পটিও দেবী অলক্ষ্মীর উৎপত্তির কাহিনীর সঙ্গে মিলে গেছে। পদ্মপুরাণ অনুসারে শিব কণ্ঠে হলাহল ধারণের পরেই রক্তিম আভরণ পরে সমুদ্র থেকে উঠে আসেন দেবী জ্যেষ্ঠা, তার অব্যবহিত পরেই উথ্থিত হন দেবী লক্ষ্মী। তাই তিনি দেবী জ্যেষ্ঠা নামে পরিচিতা। আবার, তৈরিত্তীয় ব্রাহ্মণে প্রজাপতি ব্রহ্মার কপালের বন্ধ্যা অংশ থেকে জন্ম হয় দেবী অলক্ষ্মীর।
লিঙ্গপুরাণ অনুসারে সমুদ্রমন্হনের পর দেবী জ্যেষ্ঠার বিবাহ হয় দুঃসহ নামে এক মুনির সঙ্গে, এবং দেবী লক্ষ্মীকে বিবাহ করেন বিষ্ণু। আবার, রাজা রবি বর্মাকৃত এক তৈলচিত্রে শ্রাীবিষ্ণুর ডানদিকে দেবী লক্ষ্মী এবং বামদিকে দেবী জ্যেষ্ঠাকে আসনারুঢ় দেখা যায়। এ প্রসঙ্গে মানবশরীরের যা কিছু শুভ তাই ডান দিকে থাকে এবং যা কিছু অশুভ তা বাদিকে থাকে এমন ধারণার উল্লেখ করা যায়। পুরাণের বিবরণগুলি থেকে এই ধারণাও করা যেতে পারে, স্ত্রীর ভূমিকায় নারীর সদর্থক এবং নঞর্থক দুটি আলাদা রূপ কল্পনা করতে গিয়েই সম্ভবতঃ অলক্ষ্মী ওরফে জ্যেষ্ঠা এবং লক্ষ্মী দেবীর জন্ম।
পদ্মপুরাণের উত্তরখণ্ডে অবশ্য দুঃসহ নন, অলক্ষ্মী বা জ্যেষ্ঠাদেবীর স্বামীরূপে উদ্দালকমুনির নাম পাওয়া যায়।
বলা হয়, অবিবাহিতা জ্যেষ্ঠাকে একা রেখে দেবী লক্ষ্মী বিষ্ণুকে বিবাহ করতে রাজি না হওয়ায়, শ্রীবিষ্ণু উদ্দালক মুনির সঙ্গে তাঁর বিবাহ দেন। দেবী জ্যেষ্ঠা কলহপ্রিয়া হওয়ায় উদ্দালক মুনি তাঁকে পরিত্যাগ করেন। অলক্ষ্মী ওরফে জ্যেষ্ঠা তখন বিচলিত হওয়ায় দেবী লক্ষ্মীও বিচলিত হন। বিষ্ণু তখন স্ত্রীকে স্বান্তনা দিতে ঘোষণা করেন যে অশ্বত্থ গাছে দেবী জ্যেষ্ঠার স্থায়ী আবাস নির্ধারিত হবে। আবার ব্রহ্মপুরাণে বর্ণিত রয়েছে, স্বয়ং বিষ্ণু এই অশ্বথ গাছের তলায় জন্মগ্রহণ করেন এবং অশ্বথ্থ গাছকে তাই বিষ্ণুর অংশবিশেষ ভাবা হয়।
বিভিন্ন পুরাণগুলিতে বদলে যাওয়া অলক্ষ্মী বা জ্যেষ্ঠা দেবীর গল্পগুলি যাই থাকুক না কেন, শোধগঙ্গার রিসার্চ পেপারে প্রকাশিত অধ্যাপিকা জুলিয়া লেসলির বক্তব্য অপরিসীম গুরুত্বের দাবি রাখে। লেসলি লিখেছেন, জ্যেষ্ঠা অথবা অলক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সামাজিক আচার সম্ভবতঃ অতীতের বহুগামী সমাজব্যবস্থাকে নির্দেশ করে। জ্যেষ্ঠার কলহপ্রিয় চরিত্রের কারণে পতির বিরাগ এবং শান্তশিষ্ট স্নেহময়ী দ্বিতীয়া দারপরিগ্রহ করার জন্য যথেষ্ট উপযুক্ত কারণ প্রতিপাদিত করতে চেয়েছে।
অলক্ষ্মী পূজার বর্তমান যা বিবরণ পাওয়া যায়, তার সঙ্গে অবশ্য জ্যেষ্ঠাদেবীর আইকোনোগ্রাফিক মিল না খুঁজতে যাওয়াই ভালো। হিন্দুবাড়িতে দীপাবলির সন্ধ্যায় ঘর থেকে অলক্ষ্মী বিদায় করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের আদি বাসিন্দা এবং যশোর-খুলনার কিছু আদি নিবাসীদের বাড়িতে লক্ষ্মীপূজায় এই দেবীবিদায়ের প্রচলন আছে। দীপাবলিতে বাড়ির সদস্যরা অলক্ষ্মীর মূর্তিকে রাস্তায় পাটকাঠি জ্বালিয়ে “অলক্ষ্মী বিদায় হ, ঘরের লক্ষ্মী ঘরে আয়” ছড়া গাইতে গাইতে ঘরে ফেরে। এই অলক্ষ্মী বা পাপীলক্ষ্মীর মূর্তিটি পুরাণ বর্ণিত জ্যেষ্ঠাদেবীর মূর্তির থেকে আলাদা। মূর্তিটি গোবরের, মেয়েরা তৈরি করেন বাঁহাত দিয়ে। চোখের জায়গায় দু’টি কড়ি থাকে, সর্বাঙ্গে ছেঁড়া চুল গেঁথে দেওয়া হয়। বলা হয়, অলক্ষ্মী অমঙ্গল ও অশুভের প্রতীক, তাই গোবরমূর্তিটিকে দরজার এক কোণে রাখা হয়। পুরোহিত বাঁ হাত দিয়ে কিছু ফুল মূর্তির উপর ফেলে দেন।
পুরাণ বর্ণিত দেবী জ্যেষ্ঠার সঙ্গে দেবী শীতলার যে মিলের কথা লিখে গেছেন টি. গোপীনাথ রাও, তার গভীরে বিশ্লেষণ করলে বেশ চমকপ্রদ তথ্য উঠে আসে। দেবী শীতলাও গর্দভারুঢ়া, তাঁরও হাতে রয়েছে ঝাঁড়ু বা ঝাঁটা। বাহন হিসাবে গর্দভ বা গাধার মধ্যে ঘোড়ার আভিজাত্য নেই, ব্রাত্য এবং মূর্খ এই বাহনকে আসলে ধ্বংস, ক্ষতি এবং সম্পূর্ণ বন্ধ্যাবস্থার সঙ্গে তুলনা করা হয়।