রহস্য ক্রমশ জটিল হচ্ছে। কিন্তু একটা বিষয় বোঝা যাচ্ছে যে এই সমস্ত ঘটনাগুলো কোনো এক সুতোয় আটকে রয়েছে। আস্তে আস্তে সুত গোটানোর চেষ্টা করলেই যে জুতো রহস্যের উন্মোচন হবে সেকথা অনুমান করা যায়। রিয়া আর অনিন্দ গিটার নিয়ে গান করছিলো সমুদ্রের পাড়ে বসে, ঘিরে রয়েছে চারপাশে সবাই। তো অনিন্দ বলে উঠলো এই পুরো জুতোর ঘটনাটায় কেমন জানি আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পিন্ডিদার গল্পের আদল পাচ্ছি। যদিও বিষয় একেবারেই অন্য, সে ছিলো এক প্রচন্ড ভারী জুতো পায়ে দিয়ে ফুটবল ম্যাচ। তারপরে কত কান্ড। অবশেষে রহস্য উদ্ধার। এখানে সেসব নেই, এ রহস্যে খুন নেই, হিংস্রতা নেই, কিন্তু তবুও কিছু যেন একটা আছে। আর কি আছে, সেটা খোঁজার প্রাণপনে চেষ্টা করে যাচ্ছে বল্টুদার এই বেড়াতে যাওয়ার দল। বৌদি, নদী, রিয়া, অনিন্দ, গুহ দা, চক্রবর্তী দা এবং আরো সবাই, এমন কি বাস ড্রাইভার কানাইও। ও লুকিয়ে চুড়িয়ে নজর রাখছে সবার দিকে। আজ রাতেও যেমন, জুতোগুলো চুরি হওয়ার পর কিছুক্ষন কানাইকে দেখতে পাওয়া যায় নি। তারপর দেখে হাঁপাতে হাঁপাতে আসছে তাদের দিকেই,কাঁধে এক্টা বড় চটের ঝোলা। কিছুক্ষন চেয়ারে বসে দম নিয়ে কানাই বললে “জুতো চোরকে প্রায় ধরে ফেলেছিলাম। একটা বস্তায় জুতোগুলো নিয়ে যেই জুতো চোর দৌড় লাগিয়েছিলো, আমি তাড়া করেছিলাম ওর পিছনে। তারপর যা হয় আর কি, জুতো চোর দৌঁড়চ্ছে, আমি দৌঁড়চ্ছি পিছনে, কখনো সামনে চলে আসছে, আবার কখনো দূরে। প্রায় ধরে ফেলছি, প্রায়…হঠাৎ এক ঝালমুড়িয়ালা সামনে দাঁত বার করে বলছে, ‘বাবু, ঝালমুড়ি চাই?’ বোঝো,, প্রায় ধরে ফেলেছিলাম। তারপর সামনে তাকিয়ে দেখি ময়দান ফাঁকা, মানে বালিচড়ে কেউ নেই। হতাশায় কিছুটা হেঁটে গেলাম সামনের দিকে। সেই বস্তাটা পরে আছে ফাঁকা বালির মধ্যে। এদিকটায় খুব একটা লোক আসেনা। বস্তার সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকজোড়া জুতো। কৌতূহল হয়ে সামনে গেলাম। বস্তাটা খুলে দেখি, অনেকগুলো জুতো এবং সবগুলোই রীতিমতো ছুড়ি দিয়ে কাটা। অবাক হয়ে গেলাম, আবার রাগ ধরলো প্রচন্ড। তাই বস্তাটা কাঁধে নিয়ে চলে এলাম।”
এত প্রায় রৌমহর্ষক ব্যপারস্যাপার। সবাই কানাইকে বাহবা দিয়ে উঠলো। তারপর বস্তার মধ্যে জুতোগুলোকে ছিন্নভিন্ন দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেলো সকলের। যাই হোক আগেই বলেছি ওরা সবাই যে যার মত জুতো কিনতে দোকানে গেলো আর বাকীরা ফিরে গেলো গেস্ট হাউজে। রাত প্রায় নটা থেকে সাড়ে নটা বাজে। সবাই গিয়ে দেখে খাবার প্রস্তুত। মাঠের মধ্যে আলোর ব্যবস্থাও রয়েছে। টেবিলের মাথায় ছাতা, বাইরে হাওয়া, তাই ওদের খাবারদাবারের আয়োজন সব মাঠেই হচ্ছে। বল্টুদা হোস্ট। কিন্তু এ ট্রাভেল গ্রুপের মানুষেরা এতটাই মিশুকে যে সবাই নিজের মত করে নিয়েছে সবকিছু। রান্নার ঠাকুরের রান্নার স্বাদ অমৃতের মত। রাতের আয়োজনে প্রথমে লুচি, তারপর মিষ্টি ছোলার ডাল নারকেল দিয়ে, লম্বা করে বেগুন ভাজা, ধোকার ডালনা, ফিস ফ্রাই, চিকেন কষা, আমসত্বের চাটনি আর রসগোল্লা। রসগোল্লাগুলো এখান থেকেই কেনা, স্বাদও খারাপ নয়।
খাওয়াদাওয়া আর আড্ডায় জমাটি আসর। আজ বেশীক্ষন আর নয়। আগামীকাল সকালে কোনারক, নন্দনকানন এসব জায়গায় যাওয়া। জানি না আবার কি ঘটনা অপেক্ষা করে আছে আগামীকালের জন্য। তবে সকলের কেন জানি মনে হচ্ছে এবার এই জুতো রহস্যের শেষ কিছু একটা হবে। ওদিকে রাতের টিভিতে এখনো দেখিয়ে চলেছে কলকাতার বিখ্যাত গয়নার দোকানের দামী সমস্ত হীরে চুরির ঘটনাটাকে। কলকাতা পুলিশের একটি দল পুরী চলে এসেছে। তাদের কাছে খবর আছে কলকাতার একটি ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে পুরীতে এসেছেন সেই হীরে চোর। খবরটা শুনে থমকে গেলেন বৌদি। বল্টুদার দিকে তাকিয়ে রইলেন নির্বিক হয়ে।