গ এ গদ্যে বিতান দে

“দেউটি তব হেথায় রাখো বালা”

কোনো এক অপরিচিতার পথপানে একাকী চেয়ে থাকে জনৈক পুরুষ। ব্যক্তিটি পুরুষ কিনা আমরা নিশ্চিত বলতে পারি না, অন্তত লেখায় তার স্পষ্ট প্রমাণ দেন না রবীন্দ্রনাথ। আঁচলে প্রদীপ ঢাকা সেই মেয়েটিকে পথিক আহ্বান জানান, বলেন–”…আমার ঘরে হয়নি আলো জ্বালা, দেউটি তব হেথায় রাখো বালা।” ব্যক্তির আহ্বান ভঙ্গি বদলে যাবে। শব্দের অবস্থানগত হেরফেরে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারব তার অনুভূতির স্তরবদল। কাশের বনে, শূন্য নদীর তীরে প্রথম মুলাকাতে কথক বলবেন, “আমি তারে জিজ্ঞাসিলাম‌ ডেকে”। কলকাতার চলমানতায় কতকাল গোধূলি দেখি না। সেই গোধূলিতেই অপরিচিতার চোখ দুটি কালো!‌ অপরিচিতা কি অভিমানী? গোধূলির ধূলোয় কালো চোখে লেগে থাকা জল যে তবে দেখতে পাওয়া যাবে না। অপরিচিতা যেন খানিক সংকোচহীনও। অভিমান বা বেদনা বুকে নিয়েও তিনি স্পষ্ট দীপ্তিতে বলতে পারেন, আলো ভাসিয়ে দেওয়ার জন্যই তাঁর কূলে আসা। ভেসে যায় আলো, কথকের সামনে দিয়ে, প্রথমবারের জন্য, কোনো কারণ ছাড়াই!
সন্ধ্যা আসে, নামে অন্ধকার। অচানক আবারও দেখা হয় দুজনের! অনুভূতির প্রথম স্তর অতিক্রম করে কথক তখন পা দিয়েছেন দ্বিতীয় স্তরে। দূরত্ব যেন একটু কমেছে, “আমি ডেকে জিজ্ঞাসিলাম তারে”। আপনারা বুঝতে পারবেন কি চমৎকার ভঙ্গিতে শব্দগুলোর স্থান পরিবর্তন ঘটিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ! মেয়েটি যেন নিজের ঘরের সমস্ত আলো জ্বেলে অন্য কোথাও চলেছে প্রদীপটিকে সমর্পণ করতে! আবারও প্রার্থনা জানান সেই ব্যক্তি–”…আমার ঘরে হয়নি আলো জ্বালা, দেউটি তব হেথায় রাখো বালা।” লক্ষ্যণীয়, দ্বিতীয়বারের ভঙ্গির বদল কিন্তু ঘটে গেছে আগেই। তাই প্রত্যাশিত বাক্যালাপ এক থাকলেও তাতে নিশ্চয়ই ধ্বনিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটবে! এবারেও মেয়েটি কালো চোখেই উত্তর দেয়। সে জানায় তার আলো আকাশ-প্রদীপ শূন্যে তুলে দেওয়ার জন্য। খুব স্বাভাবিকভাবেই মেয়েটির বাচনভঙ্গিও বদলে যাওয়ার কথা, “আমার মুখে দুটি নয়ন কালো, ক্ষণেক-তরে রইল চেয়ে ভুলে।” প্রদীপ এবারেও জ্বলে আকাশকোণে, তবে কারণটা অকারণই থেকে যায়।
আলাপ পর্ব ক্রমশ গভীর হয়। অনুভূতির মাত্রা আরো আরো ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে যেন! দূরত্ব কমে কি? দেখা যাক, এইক্ষেত্রে কতটা বদল ঘটে কথকের বক্তব্যে, “…জিজ্ঞাসিলাম তাহার কাছে গিয়ে,‌ ওগো, তুমি চলেছ কার তরে/ প্রদীপখানি বুকের কাছে নিয়ে।” ‘ওগো’! না, তবে তো মেয়েটি কথকের কাছে নিছক অপরিচিতা নন! বরং কোথাও এক নিবিড়তা আছে, ঘনিষ্ঠ মানুষ ছাড়া আমরা এমন সম্বোধন কি করতে পারি! সাক্ষাতের সময়টি রাত দুই প্রহর এবং অমাবস্যা। এত রাতে এক অপরিচিতার কাছে যাওয়া, কিছুটা হলেও অপ্রত্যাশিত নয় কি? এবারেও কথক সেই দেউটি রাখারই প্রত্যাশা করবেন স্বাভাবিকভাবেই কিন্তু এইবার যেন সেই আহ্বানে কিছুটা আকুতি যুক্ত হবে, এমনটা আমরা ধরে নিতে পারি। অন্ধকার ফিকে হয়ে না। কালো চোখে মেয়েটি তাকিয়ে থাকেন কথকের দিকে, তারপর স্পষ্ট ভাষণে জানান–”…এনেছি এই আলো, দীপালিতে সাজিয়ে দিতে হবে।” লক্ষ্য দীপের মাঝে তার সেই দীপ কি তবে অকারণেই জ্বলে যায়?
বারবার রবীন্দ্রনাথ বলছেন ‘দেউটি তব হেথায় রাখো বালা’, আমি আমার ব্যক্তিগত এক অনুমানের কথা বলছি মাত্র। ‘দেউটি’ শব্দটির মাঝের ‘উ’-টিকে যদি ‘হ’ ধ্বনি দিয়ে পরিবর্তন করি তাহলে এরকম দাঁড়াবে–’দেহটি তব হেথায় রাখো বালা’! ‘অনাবশ্যক’,‌ রবীন্দ্রনাথের এক অদ্ভুত কবিতা। কোনো এক ক্লাসে কাফি স্যার তাঁর জাদুময় ভঙ্গিতে আমাদের মুগ্ধ করেছিলেন কবিতাটি পড়ানোর সময়। তারপর কতবার পড়েছি এই কবিতা। ‘অনাবশ্যক’ অর্থাৎ যা আবশ্যক নয়। সেই অকারণের মধ্যে বারবার খুঁজতে চেয়েছি কারণ। আজ রবি বর্মার কিছু ছবি দেখছিলাম। উনিশ শতকের বিখ্যাত এক ভারতীয় চিত্রকর রবি বর্মা। তাঁর বিভিন্ন ছবি দেখতে দেখতে একটি ছবির উপরে চোখ পড়ল। পরে নীলাঞ্জন স্যার জানালেন ছবিটি রবি বর্মার নয়! অথচ রবি বর্মার নামে ছবিটি গুগলে ঘুরছে এমনকি অ্যামাজনেও বিক্রি হচ্ছে! কেন জানি না রবীন্দ্রনাথের এই কবিতাটিকে ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে ইচ্ছে হল। ছবিটি সম্পর্কে জানতে গিয়ে দেখলাম এটির নাম ‘দ্য গ্লো অফ হোপ’। ছবিটি এস. এন. হালদনকরের আঁকা। তিনিও উনিশ-বিশ শতকের এক বিখ্যাত ভারতীয় চিত্রকর। ছবিটি আঁকা হয় ১৯৪৫-৪৬-এ, নিজের মেয়েকে নিয়ে এঁকেছিলেন ছবিটি, চিত্রকর। ‘মাইসোর আর্ট গ্যালারি’-তে ছবিটি প্রদর্শিত হয়। রবীন্দ্রনাথের পক্ষে এই ছবি সাল-তারিখের হিসেবে দেখা সম্ভব নয়, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আরেক চিত্রকর! লেখাটা লেখার আগে পর্যন্ত আমি ছবিটার নাম জানতাম না। কি সুন্দর একটা নাম! ‘দ্য গ্লো অফ হোপ’–আশার ঝিলিক। কবিতাটির মধ্যেও তো কথক বারবারই এক আশার প্রত্যাশা করেছেন! অথচ অপরিচিতা হেলায় ভাসিয়ে দিয়েছেন তাঁর প্রদীপ। প্রত্যাশা কি প্রদীপের নাকি খোদ অপরিচিতার? লেখায় ‘দেউটি’-কে ‘দেহটি’ করার কোনো আবশ্যকতা আসে না হয়তো, এমনকী কোনো কারণও খুঁজে পাওয়া যায় না কিন্তু ভালোবাসার কবিতা হিসেবে পড়তে গিয়ে আমি যেন শব্দপরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে কবিতাটিতে নতুন এক মাত্রা খুঁজে পাই, খুঁজে পাই অদ্ভুত এক স্পর্শের প্রত্যাশা। এই পরিবর্তনটিও হয়তো অনাবশ্যক-ই।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।