কবি শম্ভু রক্ষিত চলে গিয়েছেন, তাঁর মহাপৃথিবী ছেড়ে। শম্ভু রক্ষিত মানে সেই শীর্ণকায় কোটরাগত চোখের একগাল দাড়ি মানুষটি, যাকে ট্রেনে বাসে যে কেউ আপামর খেটেখাওয়া মেহনতি জনের একজনই ভাবতেন। কবি বলে বিশ্বাস করতেই চাইতো না। নন্দীগ্রামের কাছে সুতাহাটার এক প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ, আদপে তিনি এই পৃথিবীর কেউ ছিলেন না বোধহয়, বোধহয় সত্যিই অন্য কোনও বিশ্বের থেকে আসা এক অতিথি, যেনে এসেছিলেন অন্য একটা পৃথিবী আছে, অন্য একটা বোধ আছে এটা বলার জন্য। তাঁর কবিতায় তাই এক অন্যতর স্বাদ, অন্যতর ভাষা, অন্যতর বোধ পাওয়া যায়। যায় বললাম এই জন্য যে, শম্ভু রক্ষিত নেই, তাঁর কবিতাগুলি রক্ষিত আছে। গচ্ছিত আছে এই পৃথিবীর পথে প্রান্তরে, খেজুর গাছের কাঁটায়, পুকুরের পানায়, মাঠের আলে বা এমন কোনও ‘স্বপ্নগর্ভনম্রতায়’। স্বপ্নগর্ভনম্রতা! বাংলা ভাষায় এই শব্দটির স্রষ্টা শম্ভু রক্ষিত।
কে বলেছে তিন থাকতেন সুতাহাটা বিরিঞ্চিবেরিয়ায়? তিনি থাকতেন অন্তঃসারশূন্য ঝুটো মুক্তোর ঝলকানি থেকে অনেক দূরে, অশ্লীল প্রচারসর্বস্ব যবনিকাসম কালো পর্দার থেকে কয়েক লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে। সেখান থেকে জীবনকে দেখতেন পরীক্ষার হলে বসা ছাত্রের মতো — “আমরা সকলেই পরীক্ষা দিতে বসেছি, খাতা জমা রেখে যেতে হবে, মহাকাল কাকে কত নম্বর দেবে তার ওপরেই নির্ভর করছে কবি ও কবিতার ভবিষ্যত, খাতা জমা দিয়ে চলে যাবো, চল্লিশ পঞ্চাশ বছর পর খাতাগুলো দেখা হবে, যদি কিছু সারবস্তু থাকে, পাশ করবেন, নাহলে গোল্লা!” এবার নিজেদের ঢক্কানিনাদিত, আকাদেমি-জীবনানন্দ-সদনের মঞ্চে বারংবার পঠিত ও হাততালি এবং বাহবা-অর্জিত কবিতাগুলির দিকে তাকাই। হায়, আজই তো তাঁর কোনও মূল্য নেই। শম্ভু রক্ষিত তো চল্লিশ পঞ্চাশ বছর পরের কথা বললেন। এখনকার কবিতা সম্পর্কে বলেছেন, “এখন কবিতা লেখা হয় ফুল ফুল, পাতা পাতা। আমি পাথরের সাধক। মাইকেলের কবিতা পাথরে খোদাই। পাথর দাঁড়িয়ে থাকে পাহাড় হয়ে।” তাই মাত্র ২৩ বছরে ক্ষুধার্ত কবি লিখেছেন, “তুমি কণিকা ও সূর্যের মধ্যে বিন্দু ও বিস্ফোরণজাত গোলাপ” -এর মতো পংক্তি। ভাবা যায়!
কবি সুকান্তের জন্মদিন ১৬ আগস্ট, শম্ভুদারও। সুকান্তের ২২ বছর পর, ১৯৪৮-এ, হাওড়ার মামাবাড়িতে। লোহার সিন্দুকের কারখানার মালিক বাবা নন্দলাল রক্ষিত আর গৃহবধূ মা রাধারানী দেবীর সন্তান শম্ভুদারও আর পাঁচটা বাচ্চার মতো প্রাথমিক শিক্ষা সুতাহাটার পূর্ব শ্রীকৃষ্ণপুর প্রাইমারি স্কুলে, বৃত্তি পাস করে হাওড়ার ব্যাঁটরা মধুসূদন পালচৌধুরী স্কুলে মাধ্যমিক পাস, তারপর নরসিংহ দত্ত কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি। ধুর, এইসব শেখার জন্য তিনি কি এই বিশ্বে জন্মেছিলেন! অতএব…।
লেখাপড়ায় ইতি টেনে কবিতায় ভরা হৃদয়ে টের পেলেন কবিতার ক্ষিদে। অন্য ক্ষিদে, যা তখপ্ন বাংলা ভাষায় কেউ লিখছেন না, বলছেন না। হয়তো অনেকেই চাইছেন, ছুরির ফলাকে ফলাই বলি, বলছেন না। যা চাইছেন, তা লিখছেন না। এই ক্ষিদেটাই শম্ভুদাকে টেনে নিয়ে গেল হাংরি আন্দোলনে। শুরু করেছেন ১৯৬৪ থেকে ‘ব্লুজ’ পত্রিকা। নিজের সম্পাদনায় হাওড়া থেকে প্রকাশ করতেন। তাতে আগুন থাকতো, বারুদ থাকতো, বিস্ফোরণের উপাদান থাকতো মগজের ক্ষিদে মেটাতে। সইবে কেন? ব্লুজ তাঁকে টেনে নিয়ে গেল কারাগারে, জরুরি অবস্থার আমলে। শম্ভু রক্ষিতের অস্ত্র কলম। তাঁর ওপর চলল ডান্ডা, বেরি। অকথ্য সে অত্যাচারের কথা রয়েছে এ কে রমণলাল সম্পাদিত ‘ভায়োলেশন অফ ডেমোক্রেটিক রাইটস’ নথিগ্রন্থাবলির তৃতীয় খণ্ডে। আট মাস পর ছাড়া পেলেন, ভগ্নস্বাস্থ্য, কিন্তু অন্তরে আগুনের চাষ করা কবি।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন “সত্তরের আধুনিক কবিদের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিমান ও সম্ভাবনাময় কবি শম্ভু রক্ষিত”। কবি শম্ভু রক্ষিত সম্পর্কে শঙ্খ ঘোষ বলেছিলেন “তার কবিতা সমকালের পাঠকরা সেভাবে অনুধাবন করতে না পারলেও আগামী দিনের পাঠকরা সঠিক মূল্যায়ন করবে।” ‘সর্বশ্রেষ্ঠ জীবিত কবি’ আখ্যা দিয়েছিলেন হাংরি আন্দোলনের মলয় রায়চৌধুরী, যিনি বলেছেন, “কবিতা বিশেষটি আরম্ভ করে শম্ভু ক্রমশঃ ভঙ্গুর ডিকশানের মাধ্যমে তার গঠনবিন্যাসের ল্যাবিরিন্থে নিয়ে যান, ছবি পুরো গড়ে ওঠার আগেই অন্য ছবিতে চলে যান,ষাট,সত্তর,আশি,নব্বই দশকের কবিতার যে ধারা তার সঙ্গে শম্ভুর কবিতার মিল নেই, তিনি নিজের বাক্য সাজানোর কৌশল গড়ে ফেলেছেন এবং তা থেকে কখনও সরে যাননি,আশে পাশে নানারকম আন্দোলন ও শৈলী নিরীক্ষা সত্বেও…”। কোনও একটি রেখায়, একটি স্তরে তাঁর কবিতাকে বাঁধতে পারেননি মলয় রায়চৌধুরী। শম্ভু রক্ষিতের কবিতা, তাঁর মতে, ‘রাইজ্যোম্যাটিক, বহুরৈখিক, ম্যাক্সিমেলিস্ট, ফ্র্যাগমেন্টারি, নন-টাইটেল হোল্ডিং, আয়রনিকাল এবং অবশ্যই টেকনিক্যালি আঁভা গার্দ।’
বলাগড় কলেজের সাহিত্যের অধ্যাপক পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, বাংলা কবিতায় ষাটের দশকের নতুন নতুন পরীক্ষার উজ্জ্বল শম্ভু রক্কিতের আস্বাদ পূর্ণত ভিন্ন। তিনি দার্শনিকতার গাইডলাইনে আশ্রয় নেননি, প্রতীকে নির্ভর করেননি। তাঁর কৌশলও ভিন্ন। তিনি লেখেন “পীচের পথের দু পাশে প্রাচীন পুরুষের মতো লম্বা উঁচু গাছের সারি,” লেখেন, “মানুষ ছোটো ছোটো সবুজ শিখার মতো,” লেখেন “অনেক দূর দেশ ঘুরে আমার সোনার দাসী আসে… … বায়ুমন্ডলের মতো তাকে মনে হয়,” লেখেন “শঙ্কুর মতো ধূসর ছাইরঙের কিছু গ্রাম, কিছু শহর দেখা যাচ্ছে/ গড়িয়ে পড়ছে রঙিন ঘাসের ঘোড়া।” এমনটাই ছিলেন ‘প্রিয় ধ্বনীর জন্য কান্না’ কাব্যগ্রন্থের রূপকার।
কবিতায় তিনি বার্তালাপের নির্দিষ্ট ছক মানেননি। এমন সব শব্দ ব্যবহার করেছেন, সত্যিই তাঁর কোনও অর্থ হয় কি না, জানা নেই। যেমন —
“মোক্কিকো এসেছে মণ্ডি ও মহাসূতে
আমাকে নিয়ে আরেক লোক পালার সূচনা করবে।
সংসারচাঁদ দস্তা রূপো পাথর ও পুঁতির মালা পরে উষ্ণ অভিবাদন জানাচ্ছে
মোক্কিকো সুসজ্জিতা, একটু হেসে জমলু প্রধানের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে জোংগায়:”
মোক্কিকো, মণ্ডি, জমলু, জোংগা — শব্দগুলির আক্ষরিক অর্থ হয় কি না, কে জানে।
অথবা,
“হালকা অবিক্লিব স্বর্ণবর্ণ ঘোড়ায় চড়ে সূর্যকে দক্ষিণ দিকে
দেখতে দেখতে তাই আমি এই সোনার ঢালুস্থানে হাত মেলেছিলাম।“ (সাসানিয়া)
‘অবিক্লিব’ শব্দটি কেউ আগে পেয়েছেন? কিংবা ‘সোনার ঢালুস্থান’? কবিতায় তাঁর ব্যবহারে কিছু একটা অর্থ হয়তো হয়। পাঠক সেই অর্থ করেন নিজের মতো। পাঠককে কবিতা নিয়ে ভাবতে হয়, ভাবতে বাধ্য করেন শম্ভু রক্ষিত। লক্ষণীয়, তাঁর কবিতায় এমন অনেক প্রাচীন বা গূঢ় ভাষা, প্রায় অপ্রচলিত শব্দ তিনি ব্যবহার করছেন লক্ষ্যভেদী বাণের মতো। ছুঁড়ে ছুঁড়ে পাঠকের মনের দেওয়ালে আঘাতে আঘাতে শিল্প গড়ছেন।
তাঁর কাঁধে ঝোলানো হাপড়ের ঝোলাটি যেন সেই তুনীর, যেন এক অফুরন্ত প্রত্নভান্ডার, যেখানে আছে গ্রহান্তরের দুর্মূল্য রত্ন। কবিতায় আছে বিচিত্র প্রাণী, ফসিল, লুপ্ত সামুদ্রিক বেলাভূমি। ব্লুজের পরে মহাপৃথিবীর প্রতিটি সংখ্যায় শেষ পাতায় থাকতো শম্ভু রক্ষিতের কবিতা। ঠিক এক পৃষ্ঠা জোড়া — কমও না, বেশিও না। সেই কবিতার কোথাও নেই পৌনঃপুনিকতার ছাপ। । যেন শব্দ তন্দ্রায় আচ্ছন্ন প্রত্নসম্ভার। নিজেই বলেছেন, কবিতাটিতো অনেক বড়। যতটুকু আঁটে, ততটুকু দিই। বেশি হলে কেটে দিই, কম হলে আরও দু লাইন জুড়ে দিই। মানে? চমকে এ প্রশ্ন করলে বুঝিয়ে দিয়েছেন, কবি সারা জীবনে একটি কবিতা লেখে। তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা। তারই কিছুটা তো।
কি অসামান্য কলমে তিনি লেখেন, “মানুষের সব রকম মূর্ছনা আমি ধরে ফেলেছি। আমি বের করেছি মুখের ভেতর থেকে এক সমুদ্র।… নিরিখ করেছি অর্ধপ্রোথিত দ্রষ্টার মুখের, কৃপাজীবী ক্লীবের, উড়ুক্কু সরীসৃপের ও প্রোষিতভর্তৃকার গর্ভের ক্রূর বধিরতা… একটা তীব্র উন্নাসিকতা আমার মধ্যে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। বাগানে এসেছে উদ্ভিদ আর প্রাণীদের রাজত্বকাল। এই স্বপ্নগর্ভনম্রতা, এই মুণ্ডহীন তমস্বিনীকে পেয়ে দিন কেটে যায়।” তাঁর এমন কবিতাগুলি সংকলিত হয়েছে ‘সময়ের কাছে কেন আমি বা কেন মানুষ’, ‘প্রিয় ধ্বনির জন্য কান্না’, ‘রাজনীতি’, ‘পাঠক, অক্ষরগুলি’, ‘সঙ্গহীন যাত্রা’, ‘আমার বংশধররা’, ‘আমি কেরর না অসুর’, ‘ঝাড় বেলুনের জোট’ কাব্য সংকলন। লিখেছিলেন কিছু গল্পও, সংকলিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৪ সালে, ‘শুকনো রোদ কিংবা তপ্তদিন অথবা নীরস আকাশ প্রভৃতি’ নামে। লিখেছেন ‘অস্ত্র নিরস্ত্র’ (১৯৮০) একটি উপন্যাসও। চল্লিশ বছর ধরে মহাপৃথিবীর প্রতিটি অক্ষরকে ভালবেসে, হাতে ধরে সাজিয়েছেন। প্রতিটি শব্দের প্রুফ দেখেছেন।
তাঁর প্রয়াণে এক মহাপৃথিবী শূণ্যতা প্রিয় ধ্বনীর কান্নায় ফেটে পড়ে প্রশ্ন করছে, আমরা কি আজও গুণীর সম্মান করতে শিখেছি?