সেই রাত। সেই একটি রাতের পর মেঘলার জীবনের পুরোটা জুড়েই বিরাজ করছে এক বিশাল অন্ধকার রাত। যে রাতের কখনো দিন হয়নি। কখনো সূর্যের আলো বিদূরিত করে অন্ধকার ঘুচে যায়নি মেঘলার জীবন থেকে। সাময়িক সময়ের জন্য অন্ধকার খানিকটা তরল হয়ে আসলেও দিনের স্বচ্ছ আলোর বিচ্ছুরণ তার জীবনাকাশে উদিত হয়নি।
এম উমর ফারুকের লেখা ‘যে রাতের দিন হয় না’ এমন একটি উপন্যাস, যেখানে এ সমাজের নারীদের সাথে ঘটে যাওয়া এমন কিছু বাস্তব এবং অনাকাক্সিক্ষতভাবে চলে আসা কিছু দুর্ঘটনার বর্ণনা আমরা দেখতে পাই। যে বর্ণনা আমাদের মনকে স্তব্ধ করে দেয়, জল ছলছল করা দুটি চোখ বইয়ের পাতা থেকে সরতে চায়না। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মেঘলা। যে কিনা ভালোবাসা আর বিশ্বাসের বলে আস্থা রেখেছিল তন্ময়ের উপর। তন্ময় তার সকল সুখের উৎস। তন্ময়ের অনুরোধ রক্ষার্তে নিজের বাবার সাথে দেখা করার দিনটি পিছিয়ে দিয়েছিল। আর সেই পিছিয়ে দেয়া একটি রাত, যে রাতে তন্ময়ের ডিপার্টমেন্টের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গিয়েছিল মেঘলা। নিজেকে সুন্দর করে পরিপাটি করে নিয়েছিল যাতে তন্ময়ের মান রক্ষা হয়। সেই রাতে মেঘলার জীবনে নেমে এসেছিল চিরজীবনের মতো একটি রাত। সরকারদলীয় এক নেতার হিংস্র থাবায় মেঘলা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নির্জন স্থানে তার সম্ভ্রম হারায়। তখন তন্ময় কিংবা অন্য কেউ তাকে বাঁচাতে আসেনি। মেঘলার আর্তনাদ কারো য়ে মমতার ছায়া ফেলেনি। বরং সকলেই মেঘলাকে দোষারোপ করেছে- কেন রাতের বেলা মেয়ে মানুষ ঘরের বাইরে পা রাখে? কেন সে অনুষ্ঠানে যায়? কেন সে সাজগোজ করে? এসবের জন্যই সে ধর্ষিত হয়েছে। এ তারই কর্মের ফল। হায় নিয়তি! মেঘলাকে তার পরিবারও আশ্রয় দেয়নি। এমন মেয়েকে ঘরে ঠাঁই দিলে সমাজে মান থাকে না, তাই বাবা ঘরে থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। সেই রাতে একাকী মেঘলা পথে নেমে আসে। ঠাঁই হয় তার যৌনপল্লীতে। সেখানে এক অভিশপ্ত জীবন তাকে কাটাতে হয়। এই যৌনপল্লীতে কেউ স্বেচ্ছায় আসে না, বাধ্য হয়ে সমাজের যে কোনো শ্রেণির মেয়েরাই এ জীবনের ফাঁদে পড়ে। এখানে একবার আসলে কেউ বের হতে পারে না।
লেখক এম উমর ফারুক তার বইটিতে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর কে নিদারুণ বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। সেখানে কেমন করে দালালের হাত ধরে এক একটি মেয়ে ধরা পড়ে। কেমন করে তারা পেশাদারা যৌনকর্মী হয়ে ওঠে। তাদের এক পরাধীন জীবনের এত বিস্তৃত ঘটনা হয়তো আমাদের অনেকেরই অজানা। তারা ‘মাসী’ নাম্নী আশ্রয়দাত্রীর কবলে পড়ে আর বের হতে পারে না। সেই মাসীও একদিন এভাবেই হয়তো পৌঁছেছিল ওই পল্লীতে। সেখানে মেঘলার সাথে পরিচয় হয় স্বপ্না, সালমা, সারিকাদের সাথে। যাদের প্রত্যেকেরই জীবনে রয়েছে কোনো না কোনো বিষাদের ঘটনা। তারা সমাজের পেতে রাখা ফাঁদে পা দিয়ে এই জীবনে এসে পড়েছে। যেখান থেকে কেউ কেউ অনেক চেষ্টায় একবার বের হতে পারলেও পরবর্তীতে তারা আবারো বাধ্য হয়েছে সেই পেশা গ্রহণ করে জীবিকা নির্বাহ করতে। শুধু দৌলতদিয়া নয়, ঢাকা শহরের অভিজাত এলাকাগুলোতেও কেমন করে রমরমা ব্যবসা চলছে তার বিস্তারিত বর্ণনা অতি নিখুঁতভাবে করেছেন লেখক এম. উমর ফারুক। তার লেখায় উঠে এসেছে এ সমাজের নারীদের করুণ চিত্র। নারী ধর্ষিত হয়, নারী বাধ্য হয়ে অন্ধকার জীবনে পতিত হয়, তবু সমাজের পদে পদে নারীকেই হেনস্থা হতে হয়। যে পুরুষ তাকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়, যে পুরুষ রোজ তাকে ব্যবহার করে, হাঁসের মতো গা ঝাড়া দিয়ে উঠে চলে যায়। তার গায়ে কোনো কলুষতা লেগে থাকে না। সমাজে তার মান ঠিকই থাকে। সে কখনো একা হয়ে যায় না। একা হয়ে যায় মেঘলা, স্বপ্না, সারিকারা। তাদের জীবনের অন্ধকার কখনো দূরীভূত হয় না। তারা অন্ধকার থেকে ক্রমে আরো গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। লেখক দেখিয়েছেন কিভাবে সমাজ একটি মেয়েকে মানুষ ভাবে না। ‘মেয়ে, তুমি কেন কথা বল? কেন প্রতিবাদ কর? কেন পুরুষের পাশাপাশি চলার স্বপ্ন দেখ? তুমি কি জান না তুমি মেয়ে? তুমি কি জান না এ সমাজ তোমাকে মানুষ ভাবার আগে মেয়ে মানুষ ভাবে?’ ধন্য লেখক এম উমর ফারুক। তার কলমের আঁচড়ে এ সমাজের নারীর কষ্টার্জিত এক জীবনালেখ্য’র নিখুঁত বর্ণনা হয়েছে। মেঘলার মত অনেক নারীর জীবনই এভাবে ‘রাতের’ অন্ধকারে আটকে গেছে। তাদের জীবনে কখনো আলো আসেনি, সারা জীবনের জন্য একটিবারও তারা হাসেনি। সার্থক তার উপন্যাস, যে রাতের দিন হয় না। বইটি প্রকাশ করেছে, প্রত্যাশা প্রকাশ, প্রচ্ছদ করেছেন আইযুব আল আমিন।