এই সময়ের লেখায় ভজন দত্ত – প্রথম পর্ব

করোনা – এক পাতি পাব্লিকের ডায়েরি
প্রথম পর্ব
সংবাদপত্রে সেই ডিসেম্বর২০১৯ থেকেই পড়ছি করোনা ভাইরাসের কথা, চীনের কথা। লকডাউন,কোয়ারান্টাইন,আইসোলেশনের কথা। ফেসবুকে পড়ছি,দেখছি,চরম চরম সব খিল্লি। কতকথা বাতাসে উড়ছে সেই কবে থেকেই। বঙালিদের করোনা নাকি কিছু করতে পারবে না।ছোট থেকেই তো শুনছে এটা করোনা সেটা করোনা, বড় হয়েও শুনছে….
এখানের গরমে করোনা নাকি কিছু করতে পারবে না। জাস্ট তাপেই ভ্যানিস হয়ে যাবে! হু সেই ভাবনায় জল ঢেলে দিয়েছে। এই ভাইরাস এত দ্রুত তার চরিত্র বদল করতে পারে যে বিজ্ঞানীদের ভাবনাকেও হার মানিয়ে দিয়েছে।উন্নত দেশ ইতালি,যেখানে উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা, সেখানের অবস্থা সাংঘাতিক। মানুষের অন্তিম সৎকারে যাওয়ার মানুষ নেই।
এদিকে কীকরে এলো এই ভাইরাস, তা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কত কত বিতর্ক! আমেরিকা বলছে করোনা ভাইরাস চিন ছেড়েছে, চিন বলছে আমেরিকা ছেড়েছে। এমনই সময়ে ইতিহাস থেকে উঠে এলেন ডিন কুনৎজ। তাঁর লেখা রহস্য উপন্যাস ‘দি আইজ অফ ডার্কনেস’ আলোচিত হলো।১৯৮১তে প্রকাশিত সেই বইয়ের ৩৯ পর্বের কয়েকটি পৃষ্ঠা উল্লেখ করা বলা হলো এতেই প্রথম করোনা ভাইরাসের উল্লেখ করা হয়েছে। ড্যারেন প্লাইমাউথ-এর একটি টুইট এই আলোচনার সূত্রপাত করে। আলোচনায় উঠে আসে বিশ্বত্রাস জৈব-অস্ত্রের কথা। এ শুধু বয়স্কদের মারে। চীনের জনসংখ্যার বেশির ভাগ বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের মেরে ফেলার জন্য এই অস্ত্র প্রয়োগ! না,কোনো প্রমাণ নেই । হোয়াটসঅ্যাপে উড়ে আসা এক ভয়েস ম্যাসেজ যাচাইয়ের কোনো কষ্টি পাথর নেই। কিন্তু চিন, সে প্রথম থেকে বললো এটা মানব বাহিত ভাইরাস নয়। তারপর সারা পৃথিবীর কত কত মানুষ চিন এলেন গেলেন। তারপর তাদের নববর্ষের অনুষ্ঠানের(২৫জানুয়ারি২০২০) পর জানা গেল এটা মানব বাহিত! ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। যে উহানের মাছের বাজারে এই ভাইরাস প্রথম পাওয়া যায় সেই উহান শহরকে পুরো লকডাউন করা হলো। রোগ ছড়ালো উন্নত দেশগুলিতেও। চীন বললো,এতে মারণ অনুপাত তিনের কম। অসমর্থিত সংবাদ, সেখানে নাকি দেড় কোটি মানুষের মোবাইল কাজ করছে না! আমরা শালা পাতি পাব্লিক, আমরা কি আর অত প্যাঁচপয়জার জানি?
কিন্তু পেরুর নোবেলজয়ী লেখক ৮৩ বছর যার বয়স, সেই ভার্গাস ইয়োসা যখন লেখেন, চিন থেকে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে!তখন, ভাবতে বসে অনেকেই। তিনি বলেন,এর পিছনে চিনের ‘গণতন্ত্রহীন রাজনৈতিক ব্যবস্থা’ দায়ী।তার প্রতিবাদ করে চিনের এক বিদেশ দপ্তরের কর্তা যার নাম ঝাও লিজান বলেন, আমেরিকাই এই ভাইরাসের স্রষ্টা এবং তারাই গোপনে চিনে এটি ছড়িয়েছে। বুঝুন ঠ্যালা। আমরা পাতি পাব্লিক, আমরা কী আর অত জানি!কিন্তু প্রশ্ন তো রয়েই যায়, রোগটি যে মানব বাহিত তা জানতে ও জানাতে এত দেরি তারা কেন করলো?সমূহ বিপদ তো সেখান থেকেই। পৃথিবীব্যাপী এই মহামারীর পরিস্থিতি কারা সৃষ্টি করলো এবং সেটা যদি মনুষ্যসৃষ্ট হয় তবে বিশ্বের ইতিহাসে এটা হবে সবথেকে জঘন্য ঘটনা।
কোলকাতায় প্রথম যার প্রাণ নিল করোনা ভাইরাস, দমদমের বাসিন্দা ওই ব্যক্তির বিদেশযাত্রার কোনও রেকর্ড নেই।১৬ মার্চ জ্বর-সর্দি-কাশি নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।২৩তারিখ দুপুর ৩টে ৩৫ মিনিট নাগাদ সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়।পরে জানা গেল তার ছেলে ইতালির বউ নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলো।
এরাজ্যে ১৪ মার্চ রাজ্য মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সভাপতি বিজ্ঞপ্তি জারি করেন (55/Press/2020 dated 14/03/2020) ১৬-৩১ মার্চ,২০২০ বিদ্যালয়গুলিতে ক্লাস সাসপেন্ডের।অথচ দ্বাদশ ও একাদশ শ্রেণির পরীক্ষা চলছে।শিক্ষক শিক্ষিকারা পরীক্ষার ডিউটি করছেন, আবার প্রচুর খিল্লিও উড়ছে হোয়াটসঅ্যাপ-ফেসবুকে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উদ্দেশ্য করে।
খবর আসছে সারাদেশ থেকেই সংক্রমণের খবর আসছে। আর শুধু ভয় আসছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
১৯ মার্চ, আমাদের প্রধানমন্ত্রী এলেন টিভিতে দেশবাসী এক আতঙ্কের মধ্যে প্রথম শুনলেন ‘জনতা কার্ফ’-র কথা। ২২ মার্চ বিকেল পাঁচটার সময় পাঁচ মিনিট চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত সকলকে সম্মান ও অভিনন্দন জানানোর জন্য শঙ্খ, ঘণ্টা, কাঁসর,যার যা আছে তাই নিয়ে বাজনোর নির্দেশ এলো।সকাল সাতটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত সকলকে ঘরে থাকার নির্দেশ পালনের অনুরোধ এলো।
এর পরপরই এই রাজ্যের স্কুলশিক্ষা দপ্তরের এক আদেশ এলো শনিবারে, মানে ২১ থেকে ২৪ মার্চ স্কুলে স্কুলে মিডডে মিল বন্ধ থাকার জন্য শনিবার বাজার থেকে আলু কিনে নিতে হবে, রবিবার সেগুলি দেওয়ার জন্য প্যাকেট করে রাখতে হবে আর সোম-মঙ্গলবার মানে ২৩-২৪ মার্চ সেগুলি অভিভাবকদের হাতে তুলে দিতে হবে।করোনা ভাইরাসে সংক্রমণের ঘটনা বাড়ছে এদিকে। মহারাষ্ট্র মৃত্যু তালিকার শীর্ষে।
এদিকে কাঁসর-ঝাঁঝ-ঘণ্টা-ব্যান্ডপার্টির মিছিলে হঠাৎই এলো এক সার্কুলার আগামী ২৪মার্চ থেকে লকডাউন, (No.H&FW/120/20 dated 22/03/2920) একাদশ -দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা স্থগিত। তার আগে সিবিএসই বোর্ড পরীক্ষা স্থগিত করেছে।লকডাউন। হ্যাঁ,সবাই তাই চাইছিলেন।
২৩/০৩ পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষক -শিক্ষিকা সকল শিক্ষাকর্মী ছাত্র -ছাত্রী-অভিভাবকদের দুকেজি করে চাল আর আলু দিয়ে এলো। যারা কোনোদিন মিডডে মিল খায়নি তারাও নাকি সামিল ছিলো। জানিনা, জানিনা কটা স্কুল ভীড়,ঠেলাঠেলি এড়াতে পেরেছে! তারমধ্যে আবার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে না পারার জন্য নাকি দুজন প্রধান শিক্ষককে বদলির আদেশও দেওয়া হয়েছে। ২৪মার্চ থেকে লকডাউন পশ্চিমবঙ্গের পৌরসভা, নির্বাচিত শহর ও কোলকাতায়।২৩/০৩ চৈত্র মাসের সেলের বাজারে একদিনেই বাজার উপছে পড়ছে মানুষে।তেল ডাল চাল মশলার দোকানে দোকানে পাগলের মত সব মানুষ জিনিসপত্র কেনাকাটা করছেন। ১৪-১৫টাকার আলুর দামই সেদিন তিরিশ টাকার ওপরে, তাও পাওয়া যাচ্ছে না।
২৪ মার্চ, রাত আটটায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী আবার এলেন টিভির পর্দায়। এদিন রাত বারোটা থেকেই আগামী ১৪এপ্রিল অব্দি সারাদেশ লকডাউনের ঘোষণা করলেন। একুশদিন, আগামী একুশদিন। আমরা কি পারবো!
(চলবে)
(তাং ২৪/০৩/২০২০, সময় রাত ১১-৫৪ মিনিট)