সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ১৪)

ইচ্ছামণি

পর্ব ১৪

বছর কুড়ি পর্যন্ত রুমার ছেলে সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা ছিল ইভটিজিং জাতীয়। শুকনো শরীর আর ফুটফুটে মুখ নিয়ে নিজেকে সুন্দর বলা যায় কিনা ধন্দে থাকত। তাই নিয়ে ছেলেদের মনোযোগ বা নজর কাড়তে পারলে ভালোই লাগত, তবে অভব্য মন্তব্য বা ইঙ্গিতগুলো কখনই নয়। কারও সাথে হৃদয় বিনিময়ের বদলে কিছু পাড়া বেপাড়ার ছেলের কাছে যা মন্তব্য বা আচরণ পেয়েছে, তা শুধু বিরক্তিকর নয়, পীড়াদায়ক। লজ্জায় বাড়িতেও বলতে পারত না। বাবা মন্তব্য করতেন, “রুমুর তো ছেলে দেখলেই হয়ে গেল”। অর্থাৎ সে যেচে ওসব আমন্ত্রণ করছে। মুখে খারাপ লাগার কথা বললেও এক হাতে তালি বাজেনি। মাও মনের কথা বুঝত না। বাসে যাওয়া আসার সময় কেউ এখানে সেখানে হাত দিলে বাড়ি ফিরে ঘষে ঘষে স্নান করেও রাগ কমত না। বাথরুমে পুরো কান্নাটা সেরে চোখ ধুয়ে আসতে হোত। মা বলত, “জল ঘেঁটে চোখ লাল করে ফেলেছিস। সর্দিকাশি হয়ে টাকরা জ্বালা করলে?”
লিখতে বসে হাঁচিটা একটু দমলেও টাকরা ও নাকের জ্বালাটা রয়ে গেছে। ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে। একবার বাবার অফিসের এক ড্রাইভারের ছেলে ভালো মানুষের মতো তার সামনে দাঁড়াবার জায়গা করে দেবার ছলে সারাক্ষণ নিজের প্রত্যঙ্গ রুমার পেছনে চেপে রাখার চেষ্টা করছিল। রুমা যতই সরে যাওয়ার চেষ্টা করুক, ছেলেটা দারুণ সুবিধাজনক জায়গা পেয়ে গিয়েছিল। বাবার অফিসের ম্যানুয়াল স্টাফের ছেলের এত দুঃসাহস! কিন্তু সেটা আবিষ্কার করে ফেলা যেন অফিসারের মেয়ের পক্ষেই লজ্জার। সব টের পেয়েও সরাসরি ছেলেটাকে আক্রমণ করে এই নিয়ে কচাকচি করতেও মানে লাগছিল। ঘেন্না অপমানে গা ঘিনঘিন আর ব্রহ্মতালু আগুন করা রাগ নিয়ে বাড়ি ফিরে হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে মাকে কোনওক্রমে বলেছিল ঘটনাটা। “এত সাহস? ড্রাইভারের ছেলে হয়ে আমার সঙ্গে নোংরামি করার হিম্মত হয় কী করে? বাবাকে বোলো বদ্রুচাচাকে ছেলের কীর্তি জানাতে। জানোয়ার কোথাকার?”
বাবা বলেছিল। শাসনও করেছিল। বদ্রু বা তার বখাটে পুত্রকে নয়। নিজের কন্যাকে। অত্যন্ত অশালীন ভাষায়।
মাত্র ছবছর বয়সে গৃহ শিক্ষকের সৌজন্যে রুমা জেনেছিল শরীরের স্থানবিশেষে বেশ সুখানুভূতি হয়। বড় বিপদ হয়নি। কিন্তু কচি শিশু মাস্টারমশাইয়ের হস্ত সঞ্চালনকে বাধাও দেয়নি। মাস্টারমশাই তার আরও ছাত্রীদের শরীরের বর্ণনা দিত, পত্রিকা থেকে মেয়েদের অন্তর্বাসের বিজ্ঞাপণ দেখিয়ে কেমন কেমন মুখ করে যেন হাসত। ছোট্ট রুমা ওসবের তাৎপর্য বুঝত না। কেবল তার নিজের লজ্জাস্থানে আঙুলের ছোঁয়ায় ‘ঠিক নয়’ জাতীয় অস্বস্তি হলেও যেন অপেক্ষাই করে থাকত। রুমার শরীরে হাত দেওয়ার সময় অর্জুন স্যর ঘরের ভেতরের ও বাইরের দরজার দিকে নজর রাখত। একদিন মা চা জলখাবার দিতে বসার ঘরে ঢোকা মাত্র  মাস্টারমশাই ঝট্ করে ছাত্রীকে ঘাঁটা বন্ধ করে জামার তলা থেকে হাত সরিয়ে নিয়েছিল। সাত বছরের শিশু মুহুর্তে উপলব্ধি করেছিল, যা হচ্ছিল সত্যিই ভালো হচ্ছিল না। মাকে সব বলে দেয়। তারপর থেকে অর্জুন সেনের নাগালের মধ্যে বসত না। শিশুর সারল্যে স্যরকে বলেও দেয়, “মা বলেছে নিকুচির মাস্টার। অমন নোংরা লোককে পরীক্ষার পর রাখবও না”। কথাটা নিশ্চই বাবার কানেও গিয়েছিল। সেজন্যই কি বাবার ধারণা ছিল তাঁর বড় কন্যা পুরুষ ক্যাংলা? রাস্তা ঘাটের পীড়াদায়ক ঘটনা আসলে তার খারাপ লাগার মতো নয়?
অথচ মনের সুকুমারবৃত্তি সুন্দর অনুভূতিতে সুন্দরভাবেই আবিষ্ট হতে পারে। সেই অনুভূতি অনভিপ্রেত অভিজ্ঞতা ছাড়া এলে কত ভালো হোত। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় বাবার কাছে পড়তে আসা ক্লাস সেভেনের একটি ছেলেকে খুব ভালো লাগত, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতে ইচ্ছে করত। অনেকদিন পর দেখলে বুক ঢিপ্‌ঢপ্‌ করত। সেটা যে পুরোদস্তুর প্রেম না হলেও রোমান্স জাতীয় কিছু, সেটা ভাবলে এখন হাসি পায়। বাড়িতে কেউ টেরই পায়নি। ঐ ছেলেটাকে অনেকদিন থেকে দেখতে না পাওয়ার বেশ পরে জেনেছিল, তার বাবার বদলি হয়ে গেছে। আর দেখা হবে না।
আজকালকার এঁচোড়ে পাকা মেয়ে নয়। ঐ ভালোলাগা থেকেই ছেলেদের সম্পর্কে আলাদা সচেতনতার সূত্রপাত। দশ বছরের অপরিণত মস্তিষ্ক জেনেছিল প্রেমটাও লজ্জালজ্জা ব্যাপার, তবে নোংরামো নয় যা অর্জুনস্যর করত। কিন্তু প্রেমিকের বদলে দলবব্ধ বখাটেদের টিটকিরি কু-মন্তব্যই তার কৈশোর তারুণ্যের মধুরতম দিনগুলোকে বিরক্তিকর করে রেখেছিল। কদাচিৎ কারও ভালো ব্যবহার, বা অন্যের মারফৎ কানে আসা রূপের প্রশংসা মনে সামান্য ঢিপঢিপ করা আনন্দের সঞ্চার ঘটালেও ওখানেই ইতি ঘটত। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃন্দাবনেও রুমার জীবনটা প্রথম দিকে ছিল চাতক পাখির মতো। বাড়িতে বাবার রুদ্রমূর্তি অশান্তি, গালি গালাজ; মায়ের অসহায়তা; বছরের পর বছর পদোন্নতির অভাবে বাবার পালা করে বিষন্নতা আর উগ্রচণ্ডা রূপ; কাকাদের প্যারাসাইট বৃত্তি, নিষ্ঠুরতা ও চরম বিপর্জয়ের মধ্যে মাকে কটুকাটব্য করে দায় এড়িয়ে যাওয়া; বোনের কুঁড়েমি আর হিংস্র ঈর্ষাপরায়ণ হাবভাব….সব মিলিয়ে রুমা এত বিধ্বস্ত ছিল, যে একটা স্নিগ্ধ প্রেম বড় আশ্রয় হতে পারত। তিন মাসে বৃন্দাবনের কয়েকজন কৃষ্ণ কি গোপবালক একটু আধটু নাম ধাম ডিপার্টমেন্ট জানতে চাইলেও তাদের দেখে রুমার মনে কোনও তরঙ্গ ওঠেনি, বা অর্কপ্রভর মত অতটা এগিয়েও আসেনি মাদকতায় আচ্ছন্ন করে।

ক্রমশ….

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।