ক্যাফে গল্পে সুজিত চট্টোপাধ্যায়

শোভনীয়

সুশোভন ব্যানার্জীর আজ স্মরণ সভা। গত হয়েছেন আজ দিন আটেক হলো।  যেহেতু উনি খুবই সাদামাটা মানুষ ছিলেন অর্থে ও প্রতিপত্তিতে, সেই কারণেই কিছু নির্দেশ উনি দিয়ে গেছিলেন ওঁর জীবদ্দশায়। মানুষটাকে সত্যিই কেউ এভাবে চেনেন নি তাঁর মৃত্যুর আগে। খুবই সাদামাটা কিন্তু ইস্ত্রি করা সাদা একশো ভাগ সুতির জামার মতোই উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত। চোখ আটকে যায় একলহমার জন্য। সাদামাটা মানুষ হবার কারণেই ওঁর কোনো উইল করা বা আইনী ব্যবস্থা নেবার কথা কখনোই মনে করেন নি। আরও একটা কারন বোধহয় ছিলো, সুশোভন কোনোদিনই বিষয়ী ছিলেন না। হয়তো বিষয় আশয় তাঁর থেকে শত যোজন দুরে থাকার কারণেই। সন্তানাদি নেই। তাই বোধহয় ভেবেছিলেন…”এহ্ বাহ্য “। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর বোঝা গ্যাছে কতোটা উদার ও উন্নত মানসিকতা পোষণ করতেন সুশোভন। মানুষটাকে ওপর থেকে যতোটা সাধারণ বুদ্ধির মনে হতো ওঁর মৃত্যুর আগে ওঁর নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ বুঝিয়ে দিচ্ছে যে প্রতিক্ষণে কতটা গভীরে তাঁর চিন্তা ভাবনা ছিলো তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্য সম্মন্ধে এবং মানুষের প্রতি কতোখানি সহানুভূতিশীল ছিলেন সুশোভন। সবকিছু মোটামুটি ওঁর ইচ্ছেতেই হচ্ছে। যেদিন গত হলেন, সেদিন তাঁরই এক ভাই হঠাৎই তাঁর মৃত্যু পরবর্তী ইচ্ছাগুলো সুশোভনের কাছের বন্ধু ও শুভানুধ্যা়য়ীদের মধ্যে প্রকাশ করেছিলেন। অনেক টানাপোড়েন এবং দোলাচলের মধ্যে দিয়ে তাঁর ইচ্ছেকে প্রাধান্য দেওয়াকেই সঠিক চিন্তা বলে বিবেচনা করা হয। তদনুসারে, প্রথম পদক্ষেপেই মৃত্যু পরবর্তী পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম বন্ধ করা হয়। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর প্রিয় পোশাক চুড়িদার পায়জামা এবং পাঞ্জাবীতে সজ্জিত করে যেন শ্মশান যাত্রা করানো হয় এবং চুল্লীতে প্রবেশ করানোর আগে পর্যন্ত যেন সেই পোশাক খোলানো না হয়। তারও একটা কারণ ছিলো। বাঙালী মৃত্যু নিয়ে রোমান্টিসিজম করতে ভালোবাসে। কোনো একদিন বাড়ীতে গামছা পরা অবস্থায় নিজের পা দুটোকে দেখে তাঁর মনে হয়েছিলো, এই পায়ে যখন কেউ ঘি মাখাবে, কি বিশ্রীই না লাগবে, কারণ, বিভিন্ন সময়ে একসিডেন্টে তাঁর পা দুটির এবং শরীরের বিভিন্ন অংশের চেহারা ছিলো সত্যিই ঘেন্না করার মতো এবং সেই পায়ে যে ঘী মাখাবে সে যে দীর্ঘদিন ঘী খেতে পারবে না এটা ভেবেই তাঁর খারাপ লাগতো। আরো খারাপ লাগতো ঐ বিশেষ কাজটা প্রচুর মানুষের সামনেই হবে বলে। তিনি জানতেন যেহেতু তাঁর কোনো সন্তানাদি নেই, তাই তাঁর স্ত্রী ভাস্বতীকেই মুখাগ্নি করতে হবে। ভাস্বতীকে যতোখানি চিনতেন, উনি জানতেন ভাস্বতী সেই চাপ নিতে পারবে না, অজ্ঞান হয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়। তাই আগেভাগেই সেসব সম্ভাবনাকে উনি বিচক্ষণতার সাথে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। অতএব, অন্তিম স্নান, পিণ্ড ভক্ষণ ও মুখাগ্নি থেকে বিরত থাকার অনুরোধ বা অন্য অর্থে প্রায় আদেশ করে গিয়েছিলেন সুশোভন ব্যানার্জী । সেইসঙ্গে এটাও বলে গেছিলেন শ্মশান পুরোহিতের প্রাপ্য পাওনা থেকে যেন কোনোভাবেই তাঁকে বঞ্চিত না করা হয়। সেইমতোই পুরোহিতের প্রাপ্য তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছে তাঁর শ্মশানবন্ধুরা। এসবই যে খুব স্বাভাবিকভাবেই হয়েছে তাঁর কারণ, স্বভাব রসিক সুশোভন যাঁদের কাছে তাঁর মৃত্যু পরবর্তী ইচ্ছের কথা লিখে গিয়েছিলেন, তাঁদের এটাও বলেছিলেন…তাঁর এই শেষ ইচ্ছাকে যদি বাস্তবায়িত করা না হয়, তাহলে মৃত্যু পরবর্তী তাঁর আত্মার শক্তির পরিচয়ও তাঁরা বিলক্ষণ পাবে। অতএব, সেই শক্তি দর্শনের ইচ্ছা না থাকায় হয়তো সবকিছুই খুব স্বাভাবিক গতি পেয়েছে। সুশোভন ব্যানার্জী জীবিতাবস্থায় কিছু সাহিত্যচর্চা করতেন। যদিও সে তেমন কিছু নয়, কিন্তু সেটা ছিলো তাঁর প্যাশন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর কিছু পাঠক ছিলো এবং সেই পাঠককুল সবসময়ই তাঁকে উত্যক্ত করতেন তাঁর লেখা পুস্তকাকারে প্রকাশের জন্য। সুশোভন আমল দেন নি বন্ধুদের। কারণ, তিনি জানতেন পয়সা নষ্ট করার মতো পয়সা তাঁর ছিলো না। কিন্তু ইচ্ছে ছিলো না এমনটাও নয়। বন্ধুবান্ধবের কাছে কখনও কোনসময় হয়তো বলেও ছিলেন…”পয়সা থাকলে তিনি তাঁর ছবিসহ জীবনপঞ্জী দিয়ে একটা গল্পের সংকলন, কয়েকটা কাব্যগ্রন্থ বের করতেন । আর সেখানে তাঁর স্বাক্ষরও তিনি করে দেবেন। কমপ্লিমেন্টারি কপিগুলোতে কোনো একটা শুভকামনাসহ স্বাক্ষর করবেন তাঁর পাঠকদের সামনেই “।  বেশ একটা স্বপ্নের আবেশে কথাগুলো বলে যেতেন সুশোভন। তা সেসবই ছিলো সব কথার কথা। সেসব নিয়ে তাঁর কোনো দুঃখ বোধ ছিলো, এমনটাও কখনো বোঝা যায় নি।
কোনো বাহ্যাড়ম্বর নেই।  কোনোদিনই আত্মশ্লাঘাবোধে ভোগেন নি সুশোভন। যেমনটা বলে গেছিলেন, ঠিক তেমনভাবেই আজ দুপুরে হরিণঘাটার কাছে একটি অনাথ আশ্রমে এবং বৃদ্ধাবাসে সেখানের আবাসিকদের মধ্যাহ্নভোজে তৃপ্ত করা হয়েছে। না, পাবদা ইলিশ নয়, কিন্তু সুক্তো , মাছ তরিতরকারি, দই মিষ্টি দিয়ে খাইয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন বাকী শুধু শেষ পর্যায়ের অনুষ্ঠান। তাঁর ইচ্ছেমতো, তাঁর বাড়ীর নীচের তলার ঘরে বারান্দায় এবং বাড়ীর সামনের খোলা জায়গাটায় প্রচুর মানুষের সমাগম। অনেককেই অনেকে চেনেন না। জানেন না। কিন্তু সবাইই খুব ঘনিষ্ঠ আত্মীয় পরিজনের মতো একে অন্যের সাথে পরিচয় করে নিচ্ছে। কারুর সাথে কারুর সোশ্যাল মিডিয়ার মিউচুয়াল ফ্রেন্ডশিপ বেরিয়ে আসছে। কোথাও একটা ছোটখাটো মিলনমেলার রূপ নিয়েছে সুশোভনের বাড়ীর চত্বর। তাঁর কাছের বন্ধুরা ও তাঁর আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে , এমনকি ভাস্বতীও বেশ কিছুটা আশ্চর্য হয়েছেন।  একসময় উনিও সুশোভনকে মজা করে বলতেন…”এতোই যদি তোমার পরিচিতি, তাহলে ইলেকশানে দাঁড়াও না কেন “? সুশোভন হাসতেন। শুধুই হাসতেন, উত্তর দিতেন না কিছুই। আজ বোধহয় ভাস্বতী তাঁর কথার উত্তর পেয়ে গেছেন। আত্মীয় পরিজন ও বন্ধুদের মধ্যে কি কেউ কেউ এই জনসমাগমে কিছুটা ঈর্ষান্বিত? না, আজ আর কোনো খারাপ ভাবনা নয়।
বাড়ীর সামনের গেটে তিনটে করে সাদা ফুলের ” রীদ ” দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে এটা একটা স্মরণসভার অনুষ্ঠান। একটা সাউন্ডবক্সে বাইরে থেকেও শোনা যাচ্ছে সুশোভন সম্মন্ধে  অনেক ভালো ভালো কথা। মানুষ যে মৃত্যুর পর ভালো হয়ে যায়… সেটা আরো একবার বোধহয় প্রমাণ হতে চলেছে। সুশোভন কি অন্তরীক্ষে বসে দেখছেন বা শুনছেন? পরলোকতত্ত্বে জানা যায়, আত্মার বিনাশ নেই। তাহলে হয়তো শুনছেন বা আশেপাশেই ঘুরে দেখছেন। এতো তাড়াতাড়ি কি আর সবকিছুর মায়া কাটিয়ে চলে যাওয়া যায়? পরিচিত পরিজন বা বাইরে থেকে আসা অপরিচিত কেউ কেউ এসে সংগঠকদের কাছে এসে কিছু বলার অনুরোধ রাখছেন। সবাইকেই সম্মান জানিয়ে তাঁকে লাউডস্পিকার এগিয়ে দেওয়া হচ্ছে স্বল্প সময়ের কথা মনে করিয়ে দিয়ে।
অনুষ্ঠান প্রায় শেষের মুখে। সংগঠকদের মধ্যে থেকে একজন ঘোষণা করলেন…” একটি ঘোষণা… আমাদের সবার প্রিয় স্বর্গীয় সুশোভন ব্যানার্জীর জীবিতাবস্থায় তাঁর একটি ইচ্ছেকে আমরা আজ বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করতে পেরেছি। যদিও তিনি যেভাবে চেয়েছিলেন আমরা তার সম্পূর্ণটাই করতে পেরেছি, এমন দাবী করবো না। কিন্তু তার কিছুটা আমরা আজ এই স্বল্প সময়ের মধ্যে বাস্তবায়িত করতে সক্ষম হয়েছি। (জনসমাগমের মধ্যে একটা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে)।
আমরা আপনাদের প্রিয় মানুষের প্রিয় ইচ্ছা ‘ একটি ছোটগল্পের সংকলন ‘ পুস্তাকাকারে ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছি। তাঁর ইচ্ছা ছিলো, তিনি নিজে হাতে স্বাক্ষর করে পাঠকের কাছে তুলে দেন, যা তাঁর জীবিতাবস্থায় সফল করা যায় নি। তার জন্য আমরা দুঃখিত ও লজ্জিত। হয়তো মানুষটাকেই আমাদের চেনা বা জানা কিছু বাকী ছিলো।
আমরা ওঁর লেখা গল্পগুলির মধ্যে বাছাই করা কিছু গল্প, যা অনেক সমালোচক ও পাঠকের ভালোবাসা জয় করেছে, এমনই কিছু গল্প নিয়ে একটি গল্প সংকলন এই মুহূর্তে আমাদের সঙ্গে রয়েছে। খুব সামান্য সম্মান মূল্যের বিনিময়ে আপনারা এটা গ্রহন করতে পারেন। আমরা দুঃখিত, আজকের স্মরণসভায় এই জনসমাগম আমাদের ধারণার বাইরে। মাত্রই দুশো কপি আমরা প্রথম সংস্করণ হিসেবে করিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের সব ধ্যান ধারণাকে মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়ে আপনারা বুঝিয়ে দিয়েছেন একজন আপাত সাধারণ মানুষ, যিনি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নয়, যিনি অভিনয় জগতের কোনো সেলিব্রিটি নয়, যিনি খেলাধুলার জগতের মানুষ নয়, তবুও সেই মানুষটি কতো মানুষের কাছে প্রিয় ছিলেন, ভাবতেই আমরা শিহরিত হচ্ছি। আপনাদের কাছে কোনরকম বাধ্যতামূলক জায়গা নেই যে বইটি সংগ্রহ করতেই হবে। যদি কেউ সংগ্রহ করতে চান, পাশেই আমাদের একটি ছোট্ট কাউন্টার করা হয়েছে, আপনারা সঠিক মূল্যে বইটি সংগ্রহ করতে পারেন। আমরা এই বইয়ের কাটতির ওপর বিবেচনা করবো দ্বিতীয় বা তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করবো কিনা! আমার বক্তব্য শেষ করছি এবং মাননীয় সভাপতিকে অনুরোধ করবো সভাটির সমাপ্তি ঘোষণা করার জন্য “!
গল্পের বোধহয় কিছু চমক বাকী ছিলো।
বইটি সংগ্রহ শুরু হয়ে গেছে। সারিবদ্ধভাবে না হলেও সুশৃঙ্খলভাবে প্রত্যেকে আসছেন এবং গ্রহন করছেন সঠিক মূল্যে, কেউ মোবাইল ব্যাংকিংয়ে, কেউ বা নগদ মূল্যে।
বইটি সংগ্রহ করার পরই অত্যুৎসাহী পাঠকেরা বইটি খুলছেন এবং সেখানে প্রচ্ছদের পরের সাদা পাতায়
ঠিক মধ্যিখানে সুশোভনের সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা…
” আমি আর কতোটুকু লিখতে পেরেছি। তাই রবিঠাকুরের লেখা থেকেই ঋণগ্রস্থ হলাম ….
 মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক,
আমি তোমাদেরই লোক,
          আর কিছু নয় —-
এই হোক শেষ পরিচয় “।
 নীচে সুন্দর হস্তাক্ষরে তাঁর স্বাক্ষর…
          সুশোভন ব্যানার্জী ।
সভামধ্যে গুঞ্জন। একি কর্তৃপক্ষ যে বললো ওঁর হস্তাক্ষর রাখা সম্ভব হয় নি! কিন্তু এ যে এই মাত্র লেখা। যেন এখনো কালির দাগ শুকোয় নি।
সংগঠকদের কাছে গিয়ে কিছু অত্যুৎসাহী পাঠক সেই লেখার অংশটিতে দৃকপাত করাতেই সংগঠকরাও হতবাক।
টেবিলের ওপর গুটিকয় বই এখনো পড়ে আছে। এখনো কিছু মানুষ বই সংগ্রহের জন্য উন্মুখ।
সংগঠকদের একজন টেবিলের ওপর থেকে একটি বই তুলে নিয়ে দেখলেন… মাঝের সাদা পাতা। সেখানে লেখা বা স্বাক্ষরের কোনো চিহ্নমাত্র নেই। কৌতূহলবশে মধ্যে থেকে কয়েকটি বই তুলে দেখতে থাকলেন। সব কটি বইয়ের মধ্যেই কোনো লেখা বা স্বাক্ষর দেখতে পেলেন না।
কিন্তু বইটি হস্তান্তরিত হবার পরই দেখা যাচ্ছে, সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্ধৃতিসহ হস্তাক্ষর।
শেষ কপিটি সুশোভনের বিশেষ বন্ধু বিক্রি করেন নি। নিজের কাছে রেখেছেন। বাড়ী গিয়ে দেখবেন। বইটির দ্বিতীয় বা তৃতীয় সংকলন হয়তো প্রকাশ করতে হবে। অনেকেই তার ফোন নম্বর এবং ই মেল আই ডি নিয়ে গিয়েছেন।
সারাদিনের ক্লান্তি শেষে সুশোভনের বিশেষ বন্ধু স্নান সেরে এককাপ চা নিয়ে বসে বইটি খুলতেই নতুন চমক…
” তুমি খুশী থাকো,
আমার পানে চেয়ে চেয়ে খুশী থাকো “।
নীচের স্বাক্ষরটি একেবারেই তাঁর ডাকনামে… তোদের ” সুশু”।
বিশেষ সংযোজন:(অবাক লাগছে? গল্পের গরু গাছে উঠেছে মনে হচ্ছে?
সব ভুতের গল্পই কি ” গা ছমছমে ” হতেই হবে?
সুশোভন তাঁর নামের সঙ্গে সাযুজ্য বজায় রেখে যা কিছু শোভন তাই তো করেছেন। তাহলে মেনে নিতে আপত্তি কোথায়)?
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।