বিদ্যাসাগর ২০০: প্রবন্ধে ইন্দ্রাণী বিশ্বাস মণ্ডল
তেজস্বী পুরুষ বিদ্যাসাগর
আমাদের দেশের এক প্রবাদপ্রতিম পুরুষের নাম পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ধুতি – চাদর, চটি – জুতো পরিহিত ছোটখাটো সাধারন চেহারার এক অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী হলেন তিনি। অথচ বিদ্যাসাগর নামটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ফুটে ওঠে দৃঢ়চেতা এক করুণার সিন্ধু এবং পণ্ডিত মানুষের প্রতিচ্ছবি। এমন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সত্যিই বিরল।
বিদ্যাসাগর স্বভাবে যেমন কোমল, তেমন দৃঢ় বলা যায়- ব্জ্রাদপি কঠোরান মৃদুনী কুসুমদপি অর্থাৎ বজ্রের চেয়ে কঠোর এবং কুসুমের চেয়ে কোমল। সমাজ সংস্কার মূলক কাজে তিনি যেমন রক্ষনশীলদের প্রতি বিরুদ্ধাচারণ করেছেন ,তেমনি দীন দুঃখীর প্রতি অকাতরে দান করেছেন। এবং সমবেদনায় অশ্রু বিসর্জন করেছেন। রোগগ্রস্থ মানুষকে নিজের হাতে সেবাও করেছেন তিনি। তাঁকে দেওয়া ‘দয়ারসাগর’ অভিধাটি সার্থক।
তাঁর মধ্যে প্রগতিশীল মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। জড়তাগ্রস্থ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন এই সমাজে শিক্ষার প্রয়োজন যে সর্বাগ্রে একথা তিনিই প্রথম বুঝেছিলেন। তখন বাঙালি সমাজ কুসংস্কারের অচলায়তনে বদ্ধ। তথাকথিত সমাজপতিরা শাস্ত্রীয় নিয়মের দোহাই দিয়ে সমাজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে বসেছিলেন। বিদ্যাসাগর তাঁর একক প্রচেষ্টায় সেই অচলায়তনের প্রাচীরকে যুক্তি দিয়ে ভেঙ্গে মানবতাবাদের জয় ঘোষনা করেছিলেন। অশাস্ত্র, কুশিক্ষা, অশিক্ষার ঘেরাটোপে পড়ে মানুষ তার মনুষত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না।
একথা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। আর এই সমস্ত মানুষের প্রতি তিনি তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
বাঙালি জাতিকে ঈশ্বরচন্দ্র অশিক্ষার তমসা থেকে এক জ্যোতির্ময় আলোকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। যুগোপযোগী শিক্ষার বিস্তারের লক্ষ্যে তিনি প্রথম স্থাপন করলেন কলকাতার মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন, বর্তমানে যার নাম বিদ্যাসাগর কলেজ। তাছাড়া তিনি ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ ভারতে ইংরেজদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা কেন্দ্র ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অধ্যাপকের পদ অলংকৃত করেন। কলেজটি স্থাপন করেন,তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি। ইংরেজদের এদেশে শাসন ব্যবস্থার ভিত শক্ত করার জন্য বিদেশ থেকে আগত সিভিলিয়ানদের শিক্ষিত করে তোলার জন্য এই কলেজের প্রতিষ্ঠা হয়। তাছাড়া বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজে প্রথম সহকারি সম্পাদক হিসাবে এবং পড়ে অধ্যক্ষের পদলাভ করেন।
স্ত্রী শিক্ষা প্রসারেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। নারী শিক্ষাকেন্দ্র ও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি নারী মুক্তি চেয়েছিলেন। এর জন্য বহু বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয় তাকে। ব্যক্তিত্বের পৌরুষ ও দৃঢ়তা দিয়ে সমস্ত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সক্ষম হন তিনি। স্ত্রীলোকের আদর্শ বোধে তিনি লিখলেন সীতার বনবাস, শকুন্তলা প্রভৃতি। শিশুশিক্ষার জন্য তাদের আধুনিক জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে লিখলেন বর্ণপরিচয়, কথামালা, আখ্যানমঞ্জুরী, চরিতাবলী, বোধদয় প্রভৃতি। এছাড়া বিদ্যাসাগর সংস্কৃত শিক্ষার্থীদের সংস্কৃত পণ্ডিতদের রক্ষনশীল দুর্বোধ্যভাষা থেকে মুক্ত করার জন্য সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা ও ব্যাকরণ কৌমুদী লিখলেন। দেশ-সমাজ-জাতিকে সংস্কৃত ও উন্নত করার কাজে তিনি আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ছিলেন বাংলা গদ্যের জনক। বিদ্যাসাগরের হাত ধরেই প্রথম বাংলা গদ্যের আড়ষ্ট, নীরস দুর্বল গঠনকে প্রাঞ্জল সুষমামণ্ডিত করে তৈরি হয়।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অনেক সংস্কারমূলক কাজের মধ্যে সমজকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল ‘বিধবা বিবাহ’ আইন। এই জন্য তাকে অনেক বিতর্ক, বিদ্রুপ সহ্য করতে হয়েছিল। হিন্দু ধর্ম রসাতলে গেল, উচ্ছন্ন গেল ইত্যাদি কথাও তাঁকে শুনতে হয়েছিল। তখনকার সমাজে বিধবা হওয়া মাত্র জীবনে অভিশাপ নেমে আসতো। সমাজে অনেক বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও তাঁর পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতা ভগবতী দেবী দুজনেই সহায়ক ছিলেন। তাছাড়া পরাশর সংহিতার দু’লাইনের একটি শ্লোক তাঁকে বিধবা বিবাহ প্রচলন করতে আরও উদ্বুদ্ধ ও এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। স্বামী নিখোঁজ হলে বা তাঁর মৃত্যু হলে, নপুংসক আর পতিত হলে তাঁর স্ত্রী পুনরায় বিবাহ করতে পারেন,বলে দেখিয়ে দেন। ১৮৫৬ সালে ২৬ জুলাই বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয়। এই আইন পাশ হবার পিছনে গ্রান্ড সাহেবের অবদান অনস্বীকার্য। বঙ্গদেশে এক নতুন যুগের সৃষ্টি করলেন বিদ্যাসাগর। যদিও ধর্মান্ধরা আইনের বিচারে হেরে গিয়ে বিদ্যাসাগরকে রাতের অন্ধকারে গুণ্ডা দিয়ে তাঁকে মারার চেষ্টা করা হয় ঠনঠনিয়ার কাছে। বীরসিংহের লাঠিয়াল শ্রীমন্ত বিদ্যাসাগরকে রক্ষা করেন। তিনি তার পুত্র নারায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এক বিধবার বিবাহ দেন।
সারাজীবন কোন কিছুতে আপোস না করা, সংগ্রামী স্বজাত্যভিমানী ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন বিদ্যাসাগর। এক অনমনীয় মনোভাব ছিল তার। যার জন্য অনেক সময় ঘরে বাইরে সর্বত্র তাকে একা হয়ে যেতে হয়। তার কঠোর সিদ্ধান্ত ও মনোভাব অনেক সময়েই তার পরিবার মেনে নিতে পারেননি। যে বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ প্রচলনে উদ্দোগী ছিলেন তিনি যে কেন ১৮৬৯ সালে মুচিরাম ও বিধবা মনমোহিনীর বিবাহ মেনে নিতে পারেননি তা স্পষ্টভাবে জানা যায় না। যদিও এই বিবাহে তাঁর ভাইয়েরা, পুত্র নারায়ন, জননী ভগবতীদেবী ও স্ত্রী দিনময়ীর সমর্থন ছিল।
এই ঘটনার পর বিদ্যাসাগর তাঁর গ্রাম ত্যাগ করেন। ১৮৭০ সালে ১১ আগস্ট কলকাতায় পুত্র নারায়নের সঙ্গে ষোল বছরের বিধবা কন্যা ভবসুন্দরীর বিবাহ দিয়েছিলেন পুরো পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে। অথচ এই পুত্রকেই বিদ্যাসাগর ত্যাজ্য করেছিলেন। সেই সঙ্গে তাঁর পত্নী বিচ্ছেদ ঘটে। পুত্রের প্রতি এমন অনমনীয় মনোভাব বিদ্যাসাগরের স্ত্রী দীনময়ী দেবী মানতে পারেননি। তিনি বিদ্যাসাগরের আগে মারা গেলে বিদ্যাসাগর শ্রাদ্ধের সমস্ত ব্যবস্থা করে দিলেও তিনি বীরসিংহে ফেরত যাননি তাঁর পিতা মাতা কাশীবাসী হন।
বিধবা বিবাহ নিয়ে বিদ্যাসাগরকে অনেক লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়, প্রতারিত হতে হয়। তিনি তাঁর সুহৃদ দুর্গাচরন বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘আমাদের দেশের লোক এত অসার ও অপদার্থ বলিয়া পূর্বে জানিলে আমি কখনই বিধবাবিবাহ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতাম না’। ১৮৭০ সালে দুর্গাচরনের মৃত্যু হয়।
বিদ্যাসাগর শেষ জীবনে কারমাটার চলে যান বাঙ্গালিদের কুৎসায় ও কলহপ্রিয়তায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে একটু শান্তির জন্য তিনি জামাতারা ও মধুপুরের মাঝে ছোট্ট স্টেশন কারমাটার বা কর্মাটাঁড়। সেখানে তিনি একটি বাড়ি করেছিলেন। যার বর্তমান নাম বিদ্যাসাগর। সেখানে মূলত সাঁওতালদের বাস। সরল প্রানবন্ত মানুষের মাঝে তিনি কিছুটা শান্তি পেয়েছিলেন। বিদেশ থেকে হোমিওপ্যাথের বই আনিয়ে পড়ে তাদের চিকিৎসা করতেন। এখানেই তিনি শেষ জীবন অতিবাহিত করেন। স্টেশনের খুব কাছে ১৪ বিঘা জমি কিনে বাড়ি করেছিলেন। সীতার বনবাস, বর্ণপরিচয়ের তৃতীয় সংস্করণের প্রুফ তিনি এখানে বসেই দেখেন। তিনি সেখানে আদিবাসীদের বন্ধু হয়ে ওঠেন। তারা তার কাছে ভুট্টা বিক্রি করতে আসতো। সেই ভুট্টাই আবার বিদ্যাসাগর বিকেলে সাঁওতালদের কাজ করে দেবার পথে খিদে পেলে খেতে দিতেন।
শেষ পর্যন্ত মানুষটিকে কলকাতায় ফিরে আসতে হয়। তিনি বাদুড়বাগানে থাকতে শুরু করেন, সেখানেই ১৮৯১-এ ২৯ জুলাই এই মহান ব্যক্তির জীবনাবসান হয়।
পরিশেষে রামকৃষ্ণ দেবের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের সাক্ষাৎ হওয়া নিয়ে বলে প্রসঙ্গের ইতি টানবো। ১৮৮২ সালে ৫ আগস্ট কলকাতার বাদুড়বাগানে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে রামকৃষ্ণ দেবের সাক্ষাত হয়। তার রামকৃষ্ণদেবের ধর্মতত্ত্ব শোনার প্রতি বিশেষ আকর্ষন ছিল না। কিন্তু রামকৃষ্ণদেবের ঈশ্বরচন্দ্র সম্পর্কে আগ্রহ ছিল। বিদ্যাসাগর রামকৃষ্ণ সম্পর্কে কোনো খোঁজ রাখতেন না। রামকৃষ্ণদেবের কথাতেও তিনি বশীভূত হননি। শশধর তর্কচূড়ামণির সঙ্গে সাক্ষাতের সময়।রামকৃষ্ণদেব বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বলেন, যে পণ্ডিতের বিবেক নাই,সে পণ্ডিতই নয়।