সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ৩)

গ্যাস চেম্বার

পর্ব – ৩

২৮শে ফেব্রুয়ারি
আজ আমার জন্মদিন । কাল রাত্রে বাবা আমাকে এই ডায়েরিটা দিয়ে বলল এখন থেকে নাকি আমার জীবনে এমন সব ঘটনা ঘটবে, যেগুলাে আমি ঝট করে বাবাকে বলতে পারব না, মাকেও নয় কিন্তু কথাগুলাে আমার ভিতরে থেকে যাবে। আর সেই কথাগুলাের বন্ধু হিসেবে এই ডায়েরিটার নাকি আমাকে দরকার । বাবার কথাটা হয়তাে ঠিকই, কিন্তু আমি ডায়েরি জিনিসটা অপছন্দ করি যার জন্য সেই মেযেটার নাম পর্ণা। পর্ণা আমার পাশেই বসত ক্লাসে । আর আগের বছর অ্যানুয়ালে ফেল করে ক্লাসে থেকে না গেলে এই বছরও আমার পাশেই বসত ও। তবে পাশে আর বসে না যে ও আমার কিছু কম বন্ধু। তা তাে নয়। ফেল করেছে জেনে যখন আমার কাছে এসে কাঁচুমাচু মুথে ও জানতে চেয়েছিল, ওর সঙ্গে আর আমি কথা বলব কি না, তখন কি আমি পর্ণাকে জড়িযে ধরিনি? তবে ওই যে অপছন্দের কথা বললাম তার কারণ হল, রােজ স্কুলে একটা ডায়েরি নিয়ে আসত পর্ণা আর আমাকে পড়ানাের সময় বলত যে ওটা ফুলকি বলে একটা মেয়ের লেখা।
আমি বহুদিন ওকে জিজ্ঞেস করেছি কিন্তু ফুলকি যে ঠিক কে, সেই উত্তর পর্ণা আমায় ঠিকঠাক দিতে পারত না। একবার বলত আত্মীয়; একবার, চেনা। উত্তর না দিয়ে বােঝাতে চাইত ফুলকি কত কষ্টে আছে। ফুলকিকে নাকি ফুলকির মা কিংবা বাবা কেউ ভালােবাসে না। ফুলকির আত্মীয়স্বজন অথবা চেনাশােনা কেউ ভালােবাসে না। শুনতে শুনতে এত কষ্ট হত আমার…
ডায়েরির লেখাগুলাে কীরকম যেন ছিল। সকাল থেকে রাত অবধি ফুলকি কী করেছে তার বর্ণনা নেই কোথাও খুব একটা। বরং পাতার পর পাতায় ফুলকি সম্বন্ধে অন্যদের বলা কথাগুলােই ফুলকি লিখে রেখেছে, নিজের ভাষায়। একটা জায়গায় যেমন লেখা, “এই বদ মেয়েকে পেটে ধরে আমি যে কী ভুল করেছি ভগবান । এরকম শয়তান মেয়ে পৃথিবীতে আর কারাে পেট থেকে যেন না জন্মায়। এরকম মেয়ে হওয়ার চাইতে না হওয়া ভালাে। আমি কিছু জানতে চাওয়ার আগেই পর্ণা বলেছিল যে ওই কথাগুলাে নাকি ফুলকির মা বলত ফুলকিকে শুনিযে। খুব অবাক হয়েছিলাম । আসলে আমি তাে ছােটবেলা থেকে আদর-যত্ন-ভালােবাসা পেয়ে বড় হয়েছি তাই আমার একটা অন্যরকম ধারণা ছিল সবকিছু নিয়ে । সেখানে ফুলকির মা এরকম ? আর একটা পাতায় লেখা, “এই তিনটে পচা ডিম সব কটাই ফুলকিকে খাওয়াতে হবে। সারাদিন যেমন খাই খাই বাতিক, তাতে হাতে বিষ তুলে দিলেও থেমে নেবে মেযেটা”।।
– এটাও কী ফুলকির মাযেরই বলা কথা? আমি জানতে চেযেছিলাম। – হ্যাঁ। পর্ণা জবাব দিয়েছিল।
খুব রাগ হয়েছিল সেদিন ফুলকির মাযের ওপর । হােক না সেই মেযেটাকে আমি চিনি না, কোনােদিন দেখিনি চোখে । তাই বলে একজন মা নিজের মেযেকে এরকম বলবে! আমি পর্ণাকে বলেছিলাম যে ফুলকির সঙ্গে কথনাে দেখা হলে জানাতে, আমি ওকে খুব ভালােবাসি ।তাই ও যেন কথনাে না ভাবে যে কেউ ওকে ভালােবাসে না।
একসঙ্গে সাইকেল চালানাে শেখার পর সাইকেলে চড়ে মাঝেমধ্যে এদিক ওদিক চলে যাওয়ার একটা নেশা হয়েছিল আমাদের। একবার পর্ণার কথাতেই কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা না করে আমরা ঝিল পেরিয়ে চলে গিয়েছিলাম। তখন সন্ধে হ্য হয়। একটা বাড়ির সামনে এসে পর্ণা সাইকেলটা ঘ্যাঁচ করে থামিয়ে দিল । আমিও থামালাম দেখাদেথি । দরজার পাশ দিয়ে একটা ধুমসাে মতাে বেড়াল হেঁটে যাচ্ছে। সামনে একটা পচা ডােবা ।আকাশটা কীরকম লাল আর কালাে দুটো রঙে ভাগ হয়ে গিয়ে মাথার ওপর শুয়ে আছে। পুরাে পরিবেশটাই এমন যে আমার কেমন গা ছমছম করছিল । পর্ণাকে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে নিয়ে এলি কেন ?
পর্ণা আমার দিকে তাকিয়ে কেমন একটা ভয় পাওয়া গলায় বলল, আমার মা থাকে এখানে। – তাের মা? তােদের থেকে আলাদা থাকে কেন?
– কী করবে, মা তাে এখন অন্য একটা লােককে বিয়ে করেছে। আমার বাবার সঙ্গে তাে ডিভাের্স হয়ে গেছে। আমার একটা ভাই হয়েছে জানিস । কিন্তু ওকে কী আমার ভাই বলা যায় রে? ওর বাবা তাে আলাদা।
আমি অবাক হয়ে তাকিযেছিলাম পর্ণার দিকে । বাবা আলাদা । মা অন্য কাউকে বিয়ে করে চলে গেছে। এই পৃথিবীটার সঙ্গে আমি একদমই পরিচিত ছিলাম
। মনে হচ্ছিল যেন একটা অন্য গ্রহে এসে দাঁডিযেছি যেখানে রীতিনীতি, চালচলন, সবকিছু অন্যরকম। হঠাৎ কার যেন একটা গলার আওয়াজ পাওয়া গেল | পর্ণা সঙ্গে সঙ্গে সাইকেলে উঠে আমার দিকে না তাকিযেই প্যাডেল করা শুরু করল । আমি কোনােমতে ওকে ফলাে করে পিঠটান দিলাম। খুব অভিমান হযেছিল সেদিন বাড়িতে ফিরে । পরদিন স্কুলে গিয়ে দেখা হলেও কথা বলিনি পর্ণার সঙ্গে। কেন ও ওভাবে আমাকে ছেড়ে পালিযে এল! পর্ণা অদ্ভুত জবাব দিয়েছিল আমাকে বলেছিল যে, ও ওখানে গেছে জানলে ওই বাড়ির লােকেরা ওর মাকে কথা শােনাত। আমি ঠিক বুঝতে পারিনি কথাটা
পর্ণাই যে আসলে ফুলকি সেটা জানতে পারি আচমকা। তিনদিন পর্ণা স্কুলে আসছে না। খোঁজ নিতে ওদের বাড়িতে গিয়ে দেখি পর্ণার ধুম জ্বর । পর্ণার বিছানার পাশে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। পর্ণা এপাশ-ওপাশ করছে, কষ্ট পাচ্ছে দেখে একটা সময় রুমালটাই জলে ভিজিয়ে ওর কপালে দিলাম । ঠিক সেই সময় একজন মােটা মতাে মহিলা ঘরে ঢুকে চিৎকার করে উঠলেন, ফুলকি কোথায় রে ফুলকি? কথাটা শুনেই পর্ণা শিউরে উঠল। আমি অবাক হয়ে একবার পর্ণার দিকে তাকালাম, একবার সেই মহিলার দিকে । সেই মহিলা আমার উপস্থিতির তােয়াক্কা না করে কাছে এসে পর্ণার কপালে হাত দিয়ে বললেন, জ্বর কি করে বাঁধালি? তারপর আরাে পাঁচ দশটা কথা বলে একটা বিস্কুটের প্যাকেট পর্ণার বালিশের পাশে রেখে দিযে যেরকম এসেছিলেন সেরকমই হুড়মুড়িযে বেরিয়ে গেলেন । আর উনি চলে যাওয়ার পরই পর্ণা বালিশে মুখ গুঁজে ফুপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল ।
– কী হয়েছে, তুই কাঁদছিস কেন? আমি বারবার জিজ্ঞেস করলাম । – তুই জেনে গেলি সব! এখন থেকে তুইও ফুলকিকে ঘেন্না করবি আর সবার মতাে। বিশ্বাস কর ফুলকিকে কেউ ভালােবাসে না পৃথিবীতে। ওই যে দেখতে এসেছিল, ওই কাকিমাও না । আমিও না । তাই ওই ডায়েরিটা আমি তােকে দেখতাম। তাের মনে তাে মায়া আছে, আমি জানি। কিন্তু এখন আর…
পর্ণাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ফুলকিকে তাে আমি পছন্দ করি । তুই এটা নিয়ে এত ভাবছিস কেন? -আমি তাের কাছে মিথ্যে বলেছিলাম । পর্ণা করমচা রঙা দুটো চোখ নিয়ে তাকাল আমার দিকে । -তাতে কিছু হয়নি পর্ণা । বলে আমি চলে এসেছিলাম বাড়িতে, কিন্তু তারপর অনেকদিন পর্যন্ত ভাবতাম কেন পর্ণা নিজেকে নিজে অপছন্দ করত। সেকি শুধু ওর ভাগ্যের জন্য নাকি ও নিজেকে একটু অন্যভাবে দেখতে চেয়েছিল ক্লাসে? আমাদের স্কুলের সবচেয়ে পুরনাে টিচার স্বর্ণপ্রভা আন্টি রােজ কিছু না কিছুর জন্য ওকে শাস্তি দিতেন। কোনােদিন ওর চুলে উকুন হয়েছে তার জন্য, কোনদিন ওর স্কার্ট ময়লা তার জন্য । পর্ণা কি নিজের ভিতর ওই বকাগুলাে নিতে পারত না বলে সেগুলাে ট্রান্সফার করে দিত ফুলকিকে? তাই ফুলকির অস্তিত্বটাই অসহনীয় হয়ে উঠেছিল ওর কাছে?
ওই জ্বর এমনি জ্বর ছিল না, দু’দিন পরেই খবর পেলাম যে পর্ণার পক্স হয়েছে। আর সেই পক্স অচিরেই আমার শরীরেও দেখা দেয়। দেবে না কেন, পক্স যখন এসে গেছে তথনই তাে আমি পর্ণার ঘরে গিয়েছিলাম, ওর পাশে বসেছিলাম, চলে আসার আগে ওকে জড়িযেও ধরেছিলাম । সেই অসহ্য যন্ত্রণা, সারা গাযে গুটি ওঠার ব্যাথার ভিতরে অনুভব করেছিলাম প্রথমবার, পৃথিবীতে একদম নিজের বলে কিছু হয় না। যা অন্যের তাই নিজের। যে ফুলকি সেই পর্ণা। আমার ভিতরে অন্যেরা আছে। অন্যদের অসুখ, অন্যদের সুখ আছে। পক্স থেকে সেরে উঠে আবার সাইকেল চালিযে পর্ণার সঙ্গে এপাড়া ওপাড়া গেছি । আবার একসঙ্গে আমাদের দুজনের মাথাতেই কৃষ্ণচূড়া ফুল ঝরে পড়েছে ।….

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।