সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ২৭)

ইচ্ছামণি

পর্ব ২৭

 মিটিং-এ কী স্থির হল পরিস্কার নয়। সঞ্জিত লাহার মেয়ে আর পরিচালক অনিমেষ গুহোর মেয়ের নৃত্যানুষ্ঠান থাকছেই। সঞ্চালনার জন্য মেয়ে ঠিক হয়েছে। রাকার জন্য একটা পাঁচ মিনিটের ধ্রূপদী নাচের স্লটও বরাদ্দ হল না। ইচ্ছাপ্রকাশ করা সত্ত্বেও রুমা সঞ্চালনার কাজ করতে পারবে না, যদিও তারই লেখা স্বাগতবার্তা ও অনুষ্ঠানসূচী থাকবে নির্দেশিকা হিসাবে! যদি নিজেদের মতো করেই ব্যাপারফটা করবে, তাহলে রুমার কাছে পরামর্শ ও পরিকল্পনা চাওয়ার কী ছিল? বেঙ্গল ট্যালেন্ট একটা কবিতা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল যাতে প্রথম তিনজনের মধ্যে না হলেও রুম দশজনের মধ্যে আছে। এতদিন পর্যন্ত এমনকি অফিস থেকে বেরোনোর সময়ও প্রথম কুড়িজন কবিকে সম্মান জানানোর কথা বলছিল সমীরণ, এখন সেই কথাটাও এড়িয়ে যাচ্ছে। কথার মাঝখানে তার গেছো দাদা সঞ্জিব লাহার ফোন আসার ফলেই বোধহয়। অনিমেষ গুহ কুড়িজনের বদলে প্রথম কুড়ির মধ্যে স্থান পাওয়া মহিলা কবিদের কজনকে সংবর্ধনা দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করল কয়েকবার। শেষে তাকেও  থেমে যেতে হল। প্রথম কুড়ির মধ্যে রুমাও আছে। তাহলে রুমাকে ডেকে এনে সময় নষ্ট করিয়ে ঘুরপাক খাওয়ানোর মানে কি? সমীরণটা মুখে কিছু পরিস্কার না করে চুপ করে থেকে বা আমতা আমতা করে “আসলে সঞ্জিতদা বলছিলেন” জাতীয় মারপ্যাঁচ খেলে গেল। সঞ্জিত লাহা রুমাকে সাফল্যের একটা সহজ পথের প্রস্তাব দিয়েছিল। রুমা সেই পথ মাড়ায়নি। সুতরাং পাতার পর পাতা লিখে যাক, আর অপেক্ষা করুক।
বেঙ্গল ট্যালেন্টের দপ্তর যাওয়ার পর থেকে মাথা গরম করা অপমানটা একটু ঝিমিয়ে ছিল। এবার আর পারছে না। চোখের জলও উত্তাপে বাষ্পীভূত। শুধু একটা ক্লান্তিবোধ তাকে বাড়ি ডাকছে। “বাড়ি”? হ্যাঁ, ঐ খিটখিট করা মালিকদের কাছে ভাড়া নেওয়া একতলার গোঁজামিল অংশটুকু। সেখানে ঢুকে বাথরুমে ভালো করে গা ধুয়ে আধভেজা গায়ে তোয়ালে জড়িয়ে  নিজের বিছানায় গিয়ে বনবন করে পাখা চালিয়ে গড়িয়ে পড়ে থাকবে কিছুক্ষণ। অতীনকে ভাগ্যিস আজ পাওয়া যাবে, যদি না অন্য কোথাও বেরোবার ফন্দি আঁটে। ঘটনাগুলো কি সত্যিই ঘটল? রুমার হয়ে কোনও ডামি যদি কেউ প্রক্সি দিত তাহলে নির্ঘাৎ এত গোলমাল হোত না। এত অপমান সহ্য করতে হোত না। সমীরণের মিচকেমিও আর বরদাস্ত করতে হোত না। যদি প্রদীপের দৈত্যের মতো কেউ রুমার হয়ে রাকেশ শা, বিমল মণ্ডলদের কাছ থেকে ন্যায্য পাওনাটা আদায় করে আনত। আরে সেরকম হলে তো রুমা বড় অভিনেত্রী হয়ে যেত। বড় লেখিকাও। কাউকে পরোয়া করতে হোত না, কাউকে পাত্তাই দিতে হোত না।
১১
বাড়িটা বাড়ির মতোই আছে। দুজনে খোশ মেজাজে। গুবলু টিভির রিমোট দখল করে নিয়ে রেখেছে। অতীন রান্নাঘরে কী সব করছে। বেরিয়ে এসে বলল, “ফ্রেশ হয়ে পাকুড়ি খাবে, না খেয়ে এক কাপ চা খেয়ে বাথরুমে যাবে? ক্যায়সা রহা দিন?”
এটুকুর জন্যই যেন অপেক্ষা জমেছিল শরীরে মনে। ঝরজর করে বরের কাছে বাঁধ ভেঙে গেল।
অতীন বলল, “খেপি আবার একটা খেপামো করে এসেছে রে।”
“মা কী করেছে বাবা?” টিভির দিক থেকে মুখ না ঘুরিয়েই জিজ্ঞাসা করল গুবলু।
“তোর মা যা সব কাণ্ড মাণ্ড করে থাকে। তোমাকে সেদিনই বলেছিলাম না, কাজ করছ কর, কিন্তু ওভারস্মার্টনেস দেখানোটা কেউ পছন্দ করবে না। কী দরকার ছিল ভদ্রলোকের ফোন নম্বর নেওয়ার? সেদিন যে পছন্দ করেনি সেটা তোমার কথা থেকেই পরিষ্কার। তাও মেয়েকে দিয়ে ফোন নম্বর যোগাড় করলে। করলেই যদি, মিস্‌ড কল দেবার কী দরকার ছিল?” আশ্চর্য! অতীনকে কিছু না বলতেই আন্দাজে কী করে টের পেল, গোলমাল বেধেছে, আর সেটা ঐ নিয়ে?
“তাতে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে? সেটা ঐ বুলডগগুলোর সামনে বলে আমায় অপদস্থ করতে হবে? অ্যাসিটেন্ট ডিরেক্টরের নম্বর তো সবাই নিয়েছে।”
“ব্যাস্‌, তোমারও সেখানেই থেমে যাওয়া উচিৎ ছিল। তার পরেরটাই বেশি রকম স্মার্টনেস দেখানো।”
“আমি মেইল আইডিটা চাইতে গিয়েছিলাম, গুবলুর প্রোফাইল পাঠাব বলে।”
“পেলে? সেটা অ্যাসিসটেন্ট ডিরেক্টরের কাছে চাওয়া যেত না? সে তো নম্বরও দিয়েছে। এখন তুমি ঐ মেয়েটিকে ফোন করলেও পাত্তা পাবে না, দেখো।”
“মেয়েটাকে কাছাকাছি পেলে তো ঐ খ্যাঁচা মার্কা লোকটার কাছে যেতেই হোত না। আমি বেরোনোর আগে জাস্ট সৌজন্য দেখিয়ে বিদায় নিতে গেছি, আর লোকটা লিটারারি কুকুর লেলিয়ে দিল, রাকেশ শাহর কুত্তা। বুম্বা হয়তো শ্রুড, তুলনায় রাজুকে অনেক সরল মনে হোত। কিন্তু আজ যা রূপ দেখলাম! পা থেকে জুতো খুলে ওর গালে বসালেও জুতসই জবাব দেওয়া হয় না। জানো তো, আজ বেঙ্গল ট্যালেন্টেও গিয়েছিলাম। মহাবীর সেবা সদনের ওপর লেখাটার খোঁজ করলাম। ব্যাটা এখন অ্যাড, স্পনসরশিপ আর সঞ্জিত লাহা দেখাচ্ছে। অনর্থক দু’জায়গায় ঘুরিয়ে রোদে মাথা ব্যথা করে দিল। সঞ্জিত আর ঐ ফিল্মের পৃষ্ঠপোষক অনিমেষ কী যেন – ওদের দুজনের মেয়ে কলাভবনে অনুষ্ঠানের দিন নাচবে। কিন্তু বুব্‌লুর জন্য পাঁচটা মিনিট সময় বার করল না। কায়দা করে এড়িয়ে গেল। আমাকে দিয়ে টাকা পয়সা যোগাড়ের আর বিনা নামে ব্রোশিওর তৈরির খাটনিটা করিয়ে নেবে, কিন্তু অ্যাঙ্কারিং করতে দেবে না যদিও সেসব বলেই আমাকে নিজেদের প্রোগ্রাম সঞ্চালনার একটা স্ক্রিপটও ড্রাফ্‌ট করাল। অনিমেষ মানে বিটির ঐ ফিল্ম ডায়রেক্টর না কে, সে কবিতা প্রতিযোগিতায় এক থেকে কুড়ির মধ্যে র‍্যাঙ্ক করা সবাইকে না হোক, মহিলা কবিদের সংবর্ধনা দেওয়ার পক্ষে ছিল ঐদিনই। কিন্তু সমীরণ ক্যাবলা ক্যাবলা মুখ করে সঞ্জিতদা সঞ্জিতদা করে গেল। মানে ওটাও গোল। যতই রুমাদি রুমাদি করুক, আমায় অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ফর্মালি না জানালে যাওয়াটাই উচিৎ হবে না। হতচ্ছাড়া আমার ছটা বড় লেখা তাগাদে মেরে কবে থেকে নিয়ে রেখেছে, তার একটাও এখনও প্রকাশ করেনি। আজ তো রিপোর্টটার ওপর রেজিস্ট্রী করানোর মতো করে খান দশেক সই করাল। কিন্তু ছাপবে কবে লাহা জানে। সবাই আমায় নিয়ে টাল্কিভাল্কি খেলছে।”
“দাঁড়াও, দাঁড়াও। আবার ওখানেও গিয়েছিলে। একসাথে অতগুলো কাজ নিয়ে যাও বলে কোনওটাতেই কনসেনট্রেট করতে পারো না। শ্যুটিং থেকে সোজা বাড়ি ফেরোনি কেন?”
“আজ তো তোমার ছুটি। আমার শ্যুট অত তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে ভাবিই নি। হাতে সময় আর লেখা দুটোই ছিল। এক জায়গায় বেইজ্জত হয়েছি। যেখানে মিথ্যে করে হলেও সম্মান দেখাচ্ছে সেখানে গিয়ে ভাবলাম মনটা ঠিক করব। সেখানেও নানা ক্রস-কারেন্ট, প্যাঁচপয়জার।”
“তাড়াতাড়ি কর। গা ধুয়ে আসতে আসতে কিন্তু পাকোড়ি ঠান্ডা হয়ে যাবে।”
“আমি ঝট্‌ করে আসছি। শরীর আর মনের ধকল কালি সব ধুয়ে রিল্যাক্স করে খাব। বাথরুম থেকে বেরিয়ে চা-ও করব। আমার প্রচণ্ড কান্না পাচ্ছে, কিন্তু হচ্ছে না। ধ্যুৎ!”
“ঘোন্তু গুবলুর মুখ দেখে কি কাঁদা যায়? এই দ্যাখ গুবলু মাকে হামি খাচ্ছি।”
“ইস্‌ ছাড়ো ছাড়ো! গা মুখ সব নোংরা। আগে ফ্রেশ হয়ে আসি”। গুবলু টিভিতে বুঁদ হয়ে ছিল, এদিকে দৃকপাত করেনি।
“পোকুড়িতে, মানে তুমি যাকে পাকোড়ি বল, তাতে পেঁয়াজ আছে তো?”
“জী হুজুর। তুমি চট্‌পট কর। আমিও গা ধোব।”
“একটু বেশি করে পেঁয়াজ দিলে পেঁয়াজি হয়ে যায়। ঐটাই বেশি ভালো লাগে। ধ্যাৎ, আমি কথা বলছি কোন মুখে?  সারা দিন জুতো হজম করে আছি। এখন যা পাব তাই অমৃত। কোল্‌ড ড্রিংক খেয়ে গলা জ্বালাটা বেড়ে গেল।”
রুমা সময় নিয়ে স্নান সেরে এসে তোয়ালে গায়ে খানিকক্ষণ বিছানায় শুয়ে গায়ের জল শুকিয়ে নিল। অতীনও বাথরুমে ঢুকেছে। আলসেমি কাটিয়ে রুমা রান্নাঘরে গিয়ে চা বসাল গ্যাসে। পেছন থেকে দুটো শীতল বাহু দুপাশ থেকে বেড় দিয়ে ধরল। একটা ভেজা দাড়ি-গোঁফ শুদ্ধ মুখ চেপে বসল ডান কাঁধ আর ঘাড়ের মধ্যে। রুমা ঝট করে আঁচ কমিয়ে পেছন ফিরে জড়িয়ে ধরল বরকে। মুখ ডোবাল ঢেউ খেলানো বুকে। অতীনের বুকে লোম কম। আঃ! কী স্নিগ্ধ! গা ধোয়ায় সাবান মাখানো একটা সৌরভ ভেসে আসছে। কোনও ব্যাটাছেলের গা থেকে এমন সুগন্ধ বেরোতে পারে? বিয়ের আগে রুমা সব ছেলেদেরই অল্পবিস্তর ঘেন্না পেত তাদের মনোযোগটা উপভোগ করলেও। “ফোঁস ফোঁস” করে শুকনো নদীতে বান ডাকল।
অতীন ফিস ফিস করল, “আজ আবার করে দেব। তোমার বার বার আসবে..। বাধা দেবে না!”
“না, আমার মন একদম ভালো নেই। আজ আমার ভদ্রসভ্য আদর চাই।”
গুবলু কখন রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে ছোট্টো ছোট্টো হাতে বাবাকে পিটিয়ে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে মায়ের গা থেকে খেয়াল করেনি ওরা। অতীন “হিংসুটি” বলে মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ঝগড়াটা লাগল পেন খুঁজে না পাওয়া নিয়ে। বাড়িতে হাজারখানেক কলম। অথচ দরকারের সময় অতীন একটাও খুঁজে পায় না। কলমদানিগুলোয় লেখনীর মৃতদেহ দাঁড় করানো, একটাতেও লেখা পড়ে না।
“সারাটা দিন কর কী? সুডোকু আর শব্দছক করতে কটা পেন লাগে?”
“আমার ডায়রির মধ্যে একটা আছে, দিচ্ছি ।”
“ঐ এক হয়েছে ঢংয়ের ডায়রি লেখা। আমার গুষ্টি উদ্ধার ছাড়া ক্রিয়াটিভ কিছু তো মাথায় আসে না। তার জন্যও চারটে পেন হাওয়া ।”
“একখানা দিয়েই লিখি। আর একটা আছে আমার শেয়ারের ডায়রিতে গোঁজা।“
“লাখের ওপর টাকা গুঁজে বসে আছ। রিটার্ন নেগেটিভ। তার জন্যও হাফ ডজন কলম গোঁজা। ফ্ল্যাট-ফ্ল্যাট কর, এদিকে টাকা শেয়ারে ব্লক করে রেখেছ। আমার কি ব্ল্যাকমানি আছে?”
“ফ্ল্যাট কেনার কথা গত পাঁচ বছর ধরে বলছি, কান দিয়েছ ? উল্টে টাকা জমানোর বদলে এলোমেলো ভাবে খরচ করেছ। সঞ্চয়ের তাগিদে যেমন ব্যাঙ্কে জোর করে রেখেছি, তেমনি শেয়ারেও ইনভেস্ট করেছি। রিটার্ন ঠিকই আসবে।” বলল বটে, তবে টাকাগুলো আশু উদ্ধারের সম্ভাবনা যে নেই বাজার সে কথাই বলছে, রুমা ভালো করেই জানে। শেয়ারে লাভ করতে হলে দরকারে সাময়িক লোকসান মেনে নিয়ে লস বুক করেও বেরিয়ে আসতে হয়। সেটা অনেক পরে বুঝেছে রুমা। এখন তলানিতে আসা শেয়ার বিক্রি করা মানে বিরাট লোকসান, আবার ধরে রাখলেও ক্ষতি। সামান্য পুঁজি নিয়ে ক্যাশ মার্কেটেই খেলেছে। ফিউচারে মোটা বিনিয়গের ঝুঁকি নেয়নি। কিন্তু খেপে খেপে অল্প অল্প করে বিরাট টাকা কৃষ্ণগহ্বরে হারিয়ে গেছে। তর্কের খাতিরে লড়ে গেলেও রুমা জানে অতীনের চেয়ে ওর নিজেই ধৈর্যচ্যূতি ঘটবে আগে।

ক্রমশ….

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।