সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ২৫)
ইচ্ছামণি
পর্ব ২৫
সেবার বেশ ঝামেলা বেধেছিল। অন্য অনেককে নগদে পারিশ্রমিক নিতে দেখে রুমা শুধু রাহা করচটা দাবি করে। তাতেই তাকে নিয়ে বালাজীর প্রোডাকশন ম্যানেজার আর কোঅর্ডিনেটর রাকেশ শার টিকটিকি বেশ খানিক লোফালুফি খেলে নিয়েছিল। বিমল মণ্ডল এই রাকেশেরই অধীনে কাজ করে, তার কাছ থেকেই নিজের অংশ পায়।
না। বিমল মণ্ডল এবার কথা রাখল। কারণ “বিমলদা ক্রাউডে দাঁড়ানোর দৃশ্য হলে আমায় বাদ দিন” বলেছিল গুবলুর শ্যুটিং-এর সময় একফাঁকে। সেজন্যই বোধহয় বাচ্চাদের শ্যুটিংএর ঠিক দুদিন পরে ফোন করে বলল, “কাল টালিগঞ্জ মেট্রোতে এসো। আমি তোমার টাকা দিয়ে দেব। তোমার ডেট পড়েছে শনিবার। বালিগঞ্জে পরিচালক শমীকদার বাড়িতে আটটায় কল টাইম।”
“আর কাল কখন যাব?” আগের দিন দিয়ে দিলেই তো ল্যাটা চুকে যেত। রুমাকে আবার দৌড়তে হোত না। গত পরশুই তো তো গুবলুর শ্যুটিং হল। কে জানে? হয়ত টাকার পরিমাণটা বেশি বলে সেদিন দিতে পারেনি, আলাদা করে ডাকছে।
“বারোটা নাগাদ।”
“কিন্তু বিমলদা, রাকা দুটো কুড়ি থেকে আড়াইটের মধ্যে স্কুল থেকে ফেরে। আমাকে অ্যাট এনি কস্ট দেড়টার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসতে হবে। বড় রাস্তা থেকে বাচ্চা কালেক্ট করতে হয়। আর একটু আগে হলে ভালো হয়।”
“আমার তো একটা কাজ নয়। কালও ঐ সময় আমার শ্যুটিং আছে। আমি সেখান থেকে ম্যানেজ করে বারোটা নাগাদই ওখানে যেতে পারব। তোমার অসুবিধা থাকলে বাদ দাও।”
সর্বনাশ! বলে কিনা ‘বাদ দাও’। “ঠিক আছে ঐ বারোটার সময়ই আমি পৌঁছব। কাজ করিয়ে পেমেন্ট ঝুলিয়ে রাখাই কি কোঅর্ডিনেটরদের স্বভাব? আপনি দেরি করবেন না যেন।” রাগের চোটে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল কথাগুলো। কী হবে?
পরের দিন বর বিদায় নিতে নিজেও ছুটল টালিগঞ্জের দিকে। বাসা থেকে সোদপুর স্টেশন যেতে পনেরো টাকা রিক্শা ভাড়া লাগে। ট্রেনে ভিড়ও অনেক বেশি। বারোটায় পৌঁছতে হবে মানে তাড়াহুড়ো না করলেও চলবে। ঠিক করল হেঁটে বিটি রোডে গিয়ে ট্রাফিক মোড় থেকে বাস ধরে যাবে শ্যামবাজার। সেখান থেকে মেট্রো করে টালিগঞ্জ। গড়িয়া পর্যন্ত মেট্রো সম্প্রসারণের কাজ চলছে পুরো দমে। চলাচল শুরু হল বলে।
টালিগঞ্জে স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে এসে ফোন করল, “রুমা বলছি। কোথায় আপনি?”
“ট্রাম লাইনের দিকে একটু হেঁটে এসো। আমি আসছি।”
বেশ কিছুক্ষণ গেল খোঁজাখুঁজিতে, দুবার রাস্তা পার হওয়াতে। মক্কেলকে দেখতে পেয়ে দ্রুত এগিয়ে গেল রুমা।
বিমল মণ্ডল আবার তার লেকচার শুরু করল। কিশোরকণ্ঠী মনোজ চট্টোরাজকে সেই উঠিয়েছে। টাকা পয়সার ব্যাপারে তিনি কত পরিষ্কার ইত্যাদি। রুমা অস্থির হয়ে মোবাইলে সময় দেখে বলল, “বিমলদা, আমায় তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিন। রাকা এসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলে ব্যাপারটা বিপজ্জনক হতে পারে। ও তো কাঁদবে। নিজে নিজে ভারী ব্যাগ নিয়ে বাড়ি যেতেও পারবে না। অতটুকু বাচ্চাকে আনঅ্যাটেন্ডেড রাখাটাও রিস্কি –”
আবার খানিকক্ষণ পাঁয়তাড়া। তারপর একটা ডায়রি বার করে কিছু লিখে বলল “সই করো।”
রুমা দেখল লেখা আছে, তিনদিন – ৮০০টাকা। দিনপ্রতি আটশো, হাজারও নয়? সই করল।
বিমল মণ্ডল মানি ব্যাগ থেকে আটশো টাকা বের করে রুমাকে ধরাল। রুমা স্তম্ভিত। বলল, “আটশো?”
“হ্যাঁ, তিন দিনে নশো, মাইনাস একশো টাকা সার্ভিস চার্জ।”
ইচ্ছা করছিল টাকাগুলো বিমল মণ্ডলের মুখে ছুঁড়ে মারে। কিন্তু সই করেছে যে। প্রায় পুরো টাকাটা আত্মস্যাৎ করে আবার সর্ভিস চার্জের প্রশ্ন আসে কোথা থেকে? তর্ক বৃথা। ঐ বজ্জাতটার হাত থেকে কেড়ে তো নেওয়া যাবে না। টেনে থাপ্পড়ও কষানো যাবে না। ঐ টাকাই ব্যাগে ভরতে হল। জাতও গেল, পেটও ভরল না? পেট অবশ্য ভরে না। দু চোখ ভরে যায়। অপমানে, লজ্জায়, ঘৃণায়! নিজের প্রাপ্যের এক আনা ভিক্ষের মতো হাত পেতে নেওয়ার অপমান, বারবার পারিশ্রমিকের জন্য বলার লজ্জা, আবার এই লোকটা ডাকলেই হুট করে ফেকলুর মতো বেরিয়ে পড়ার আত্মগ্লানি, ঘৃণা।
কোনও ক্রমে বলল, “আ্যামাউন্টটা বলে দিলে, আজকে আবার উজিয়ে আসতাম না।”
বচসার সময় নেই। লাভও নেই। তাড়াতাড়ি বেরোতে পারলে বেঙ্গল ট্যালেন্টকে নতুন ট্যাবলয়েডের জন্য লেখা সম্পাদকীয়টা দিয়ে আসতে পারত। সমীরণ রোজই তাড়া লাগাচ্ছে। সঞ্জিত লাহাও এমন ভাব করছে যেন মহাবীরের প্রতিবেদনটা বিবিসি যাবে, আর ঐ লেখাটারটার ওপর রুমার লেখিকা-জীবন নির্ভর করছে। আর বুঝি লড়াই করতে হবে না। এখন সময়ও নেই, মানসিক অবস্থাও নেই। ঊর্ধ্বশ্বাসে ফিরতি পাতাল পথে ছুটতে হল।
[২০৬২ শব্দ]
১০
এক ঢিলে দুই পাখি মারা যায়নি। এক ধকলে দুজনের কাজ সারা হয়নি। উপরন্তু রাকা মনে গুবলুর জামার মাপ দিতে মাঝে একদিন যেতে হয়েছিল। দেবে কত আর কদিন পরে তার ঠিক নেই, বারবার ধকল আর খরচ করানো। গুবলুর তারিখ পড়েছিল বুধবার সল্টলেকে অরোরা স্টুডিওতে। বাধ্য হয়ে আবার ট্রেন ধরতে হয়েছিল। সেখান থেকে একশো টাকা অটো ভাড়া দিয়ে অরোরা। দিব্যি নিকোপার্কগামী বাসে আসা যেত। ব্যাটা অটোওয়ালা এমন করে বুঝিয়েছিল। ওদিকে স্কুল কামাই হচ্ছে বলে অতীন যথেষ্ট বিরক্ত ছিল। যেতে যেতে মনে হচ্ছিল, না এলেও হোত। কিন্তু এই কাজটার প্রতিশ্রুতি না দিলে বালাজীর মেগাটার দরুণ টাকাটা আটকে যেত। ঐ তো ছিরির পারিশ্রমিক! বিমল মণ্ডলকে ডুবিয়ে খানিক গায়ের জ্বালা মেটালেই বেশ হোত? কিন্তু ডাক পেয়েছে জেনে গুবলু খুব উত্তেজিত। ও প্রায়ই বেঁকে বসে। এবারের উৎসাহ দেখে তার মনে কষ্ট দিতে আর তার সুযোগ নষ্ট করতে মন চাইছিল না। আর এই শ্যুটটায় হাজিরা দেওয়ার ফলে পূর্বতন কাজের টাকাটা যৎসামান্য হলেও পেয়েছে। কিন্তু ঐ টাকাটা পাওয়ার পর থেকেই মনটা যেন বেশি অপ্রসন্ন। কীসের যেন চিন্তা, খচ্খচানি!
সেদিন, অর্থাৎ বাচ্চাদের শ্যুটিং-এর দিন সারাদিন কাজের মধ্যে ছিল শটের জন্য অপেক্ষা করা। খান পঁচিশেক বাচ্চাকে আর টালিগঞ্জ কাঁপানো নায়িকা ঋতুপর্ণার শুটিং সেদিন। অডিশনের সময় যে সংলাপটা রুমাকে বলতে দিয়েছিল, দেখা যাচ্ছে সেটা আসলে ঋতুপর্ণার ডায়ালগ। বাচ্চাগুলোর হট্টগোল সামলানোর জন্য সহকারী পরিচালিকাসহ বেশ কয়েকজনকে নিযুক্ত থাকতে হয়েছিল। ঋতুর অটোগ্রাফ নিতে বাচ্চারা হৈহৈ করে ঘিরে ধরেছিল। রাকা ঋতুর কাছে ভিড় দেখে পাশে বসে থাকা পরিচালক সমীক দত্তর কাছে কাগজ মেলে কাগজ মেলে ধরেছিল। ভদ্রলোক নিষ্পৃ্ভাবে তাতে সই না করে নিজের ফোন নম্বর লিখে দিয়েছিল। এর আগে রুমা নম্বর পাওয়া যাবে কিনা জানতে চাওয়ায় বলেছিল, “পরে হবে। এখন কাজে ডিস্টার্ব হচ্ছে।”
ছোট্ট কাগজটা দেখে রুমার মনে হয়েছিল, এই তো দিগন্ত খুলে গেল। অ্যাসিটেন্ট পরিচালিকা মেয়েটির নাম নম্বর আগেই নেওয়া হয়ে গিয়েছিল। ভবিষ্যতের যোগাযোগের জন্য শুভ বার্তা ভেবে কাগজটা সযত্নে ব্যাগে রেখে দিয়েছিল। বিমলদা লোকটা শুটিং স্পটে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু পিছলে পিছলে যাচ্ছিল রুমাকে দেখে। মেয়ের কাজের দিন ঝামেলা হয়নি। শুধু একটু গাইতে পেরেছিল, রুমার আর কাজে আসার বিশেষ ইচ্ছা নেই ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ানোর জন্য। ফলশ্রুতি হিসাবে তার দুদিন পরে বকেয়া পারিশ্রমিক(?) পেয়েছে।
টাকাটা হাতে পেয়ে যদিও মনে হয়েছিল, দুচ্ছাই! নিজে আর যাবে না। কিন্তু না গেলে নির্ঘাৎ গুবলুর খাটনি তথা গুবলুকে নিয়ে খাটনিটা বৃথা যাবে। ওর টাকাটাও মেরে দেবে। কিন্তু যেভাবে দুজন পরিচালকের সংযোগ সংখ্যা হাতে এল তাতে মনটা আবার আশায় দুলছে। হয়ত মেয়ের জন্য ব্যাপারটা শুভ হবে। তবু কে জানে কেন মনে সায় নেই। দু’ জনের ছশো যদি এক সাথে পায়, তাহলে ভবিষ্যতে বিমল মণ্ডলকে এড়িয়ে যাবে।
গুবলুর শ্যুটিংএর পর বাড়িতে ফিরে সন্ধ্যেবেলায় বাড়ি ফিরে নম্বরটা মোবাইলে সেভ করতে গিয়ে একটা কল হয়ে গিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে ফিরতি কল করে কড়া গলায় প্রশ্ন, “কে? এভাবে ফোন করলে ডিস্টার্ব হয়।” আমতা আমতা করে নিজের পরিচয় দিয়ে এবং মিস্ড কলটা যে অনিচ্ছাকৃত তার সাফাই দিয়ে ফোন রেখেছিল রুমা। যার ফোনে এমন ব্যবহার তার সাথে কাজ করাটা কি খুব আনন্দের হবে? তাও গিয়েই দেখা যাক। নিজের মনে বসে থাকবে। ক্যামেরায় এক্সপোজার পাওয়ার জন্য ব্যকুলতা দেখাবে না। ইমেইল আইডি যোগাড় করতে পারলে গুবলুর ছবি পাঠাবে কোনও সাইবার কাফেতে গিয়ে অতীনের মেইল আইডি থেকে।
আজ শনিবার। কোনও স্টুডিও নয়, বালিগঞ্জে পরিচালক সমীক দত্তের বাড়িতে হাজিরা দিতে হল। ওখানেই একটা দোকানে স্পট ঠিক হয়েছে। পাশে ভজহরি মান্না রেস্তোঁরা। বালাজীর জন্য ঐ ছাতার পেমেন্টের নামে হতফেল্লা পেয়েও কেন যে আবার এসেছে? এই কাজটা না করলে হয়ত গুবলুর পেমেন্ট নিয়ে ঝামেলা করবে? করুক! কত টাকা? তিনশো, কি রুমারটা ধরলে ছশোর বেশি তো নয়। মনটা ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে ওর বদলে ওর ড্যামিকে বসিয়ে যদি নিজে বাড়ি ফেরা যেত।
পরিচালকের বিশাল বৈঠকখানায় বসে থাকতে হল অন্যান্যদের সাথে অনেকক্ষণ। এক কালো মুটকির প্রবেশ। রুমার চেয়ে বয়সে ছোট হলেও রগে, কপালে পাকা চুল। তাকে নিয়ে সহকারী পরিচালিকা ব্যস্ত হয়ে উঠল। রুমারা এতক্ষণ বসে আছে, তাদের মুখে কেউ পাউডারও বোলায়নি। এই চেড়িকে নিয়ে সোজা মেক আপ করাতে ভেতরে নিয়ে গেল। সে একটি বাচ্চার মায়ের ভূমিকায় মূল চরিত্রটা করবে। ব্যাপারটা কী? রুমাদের ক্রাউডে দাঁড় করাবে নাকি। একজন পুরোনো শিল্পী আশা করেছিল, সংলাপ বলা মায়ের চরিত্রটা পাবে; রুমা যেমন ভেবেছিল, “বাচ্চারা, বল তো শ্বেতা ডিটারজেন্ট আমাদের কী কী দেয়?” বলতে হবে। তার জন্য যে ঋতুপর্ণাকে ভাবা আছে গুবলুকে নিয়ে সেদিন শুটিং ফ্লোরে পৌঁছনোর আগে টের পায়নি।
স্থানীয় একটা দোকানকে ‘শ্বেতা’ ডিটারজেন্টের প্যাকেট আর পাউচ দিয়ে সাজানো হয়েছে। রুমারা সকলে ক্রেতার ভঙ্গীতে দোকানের সামনে লম্বা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওপাশে ঐ মুটকি একটি গুবলুর বয়সী বাচ্চার মা সেজে কী সব সংলাপ অভ্যাস করছে। ঐ মুটকির চেয়ে রুমাকে দেখতে অনেক ভালো। ছয়-সাত বছরের বাচ্চার মা হিসাবে মানাতও ভালো। রাকা এতটা ফর্সা না হলেও ঐ বাচ্চাটির চেয়ে অনেক সুন্দর। কিন্তু পরিচালকের সাথে বা কাস্টিং ডিরেক্টরের সাথে যার যেমন ঘণিষ্ঠতা।
নীল সূতীর সালোয়ার কামিজে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে এক প্যাকেট গোটা গোল মরিচ আর একগোছা চীজ স্লাইস কিনে ফেরল রুমা। তার দেখাদেখি অন্য কয়েকজন মহিলাও কেনাকাটা শুরু করলেন। ভিড়ের মধ্যে এক ভাগ্যবতী ক্যামেরার সামনে বাড়তি চলা ফেরার সুযোগ পেয়ে বেশ খুশি। রুমার ছবি আদৌ উঠল কিনা সে ব্যাপারে তার মাথা ব্যাথা নেই। সে চায় গুবলুর জন্য ভবিষ্যৎ তৈরি হোক। এবং তার জন্য ঐ ডায়রেক্টরের ই-মেইল আইডিখানা জানতে পারলে সুবিধা।
শ্যুটিং-এর মাঝে এক কাপ চাও দেওয়া হয়নি। শেষে প্যাকআপ বলার সময়ও কোনও জলখাবারের আয়োজন নেই। ঐ কেলে পাশ-বালিস আর ঐ বাচ্চাটার জন্য বোঝা গেল দ্বিপ্রাহরিক খাতিরের আয়োজন চলছে। চলে যাওয়ার আগে রুমা ভদ্রতা করে পরিচালকের অনুমতি এবং ইমেইল অ্যাড্রেস নেওয়ার জন্য মুখোমুখি হল।
রাকেশের টিকটিকি রাজু সেখানে ছিল। পরিচালকটি রুমাকে কাছে এগিয়ে আসতে দেখেই বিরক্ত মুখে প্রশ্ন করল, “আপনি সেদিন ফোন করেছিলেন না? এভাবে কল করবেন না। আমার কাজে ডিস্টার্ব হয়।”
রুমা ধাক্কা খেয়ে ফিরেই আসছিল। রাজু নামক রাকেশের কুকুরটা হঠাৎ ঘেউ ঘেউ শুরু করল, “কী ব্যাপার কী? কী দরকার আমাদের না বলে ডাইরেক্ট ডাইরেক্টরের সঙ্গে কী কথা হচ্ছে? আমরা আছি তো – ”
রুমাকে জবাব দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই রাজু চ্যাঁচাতে লাগল, “কাজ হয়ে গেছে, আর এক মোমেন্টও এখানে নয়। কী সব শুনছি ফোন নম্বর টম্বর চাইছিলে? নিজেকে খুব চালাক ভাবো, আর আমরা ঘাসে মুখ দিয়ে চরি?”
“ভদ্রভাবে কথা বল। আমি ওনার নাম্বার সেভ করতে গিয়ে একটা কল হয়ে গিয়েছিল। তাতে কী এমন ক্ষতি হয়েছে?”
“চুপ। নম্বর সেভই বা করার কী দরকার? আমাদের নম্বর, বিমলদার নম্বর তো আছে! যান এখন। কাজ হয়ে গেছে, এখন ফুটুন। আপনাদের মতন মালকে কীভাবে হ্যান্ডেল করতে হয়, আমরা জানি। বেরোন বলছি।”
অপমানে সারা গা ঝাঁঝাঁ করছিল। রাজুকে যতটা সম্ভব তীব্র গলায় রুমা বলল, “অসভ্যের মতো চেঁচিও না। এখানে বসে থাকতে আসিনি। আর বাড়িটাও তোমার নয়। কাজ গুছিয়ে নিয়ে এখন পেমেন্ট করার আগে ‘যান যান’ করছ? আমার ব্যাগ সমীক দত্তর ফ্ল্যাটে। সেটাও কি নিতে দেবে না?”
“ব্যাগ নিয়ে ফুটুন। একেবারে বাড়ি যান।”
যদি কাজে লাগে ভেবে বিমলদার পরামর্শ মতো দুটো শাড়ি আর একটা সালোয়ার-কামিজ একটা ব্যাগে করে নিয়ে এসেছিল। সেগুলো সমীক দত্তের বসার ঘরে রাখা আছে। চলে যান শুনেই পথ দেখা সম্ভব নয়। ব্যাগটা আনতে সিঁড়ি দিয়ে ঐ হামদা হামবড়াটার ফ্ল্যাটের দিকে চড়তে হচ্ছিল। রাজু এক নাগাড়ে “যান, চলে যান। যাও এক্ষুনি” করতে করতে সঙ্গ নিল।
“দাঁড়ান, বিমলদার সঙ্গে কথা বলাচ্ছি।…. এই বিমলদা, ফোন ধরুন, আপনার ক্যান্ডিডেট ডাইরেক্ট কথা বলছে সমীকদার সাথে। আপনি কথা বলুন।”
বিমল মণ্ডল রুমার কান্না চাপা গলায় সব শুনে নরম করেই বলল, “রাজুদের এইটাই তো কাজ। আমরা কষ্ট করে কন্টাক্ট তৈরি করব, আর তোমারা যদি ডাইরেক্ট ডিল করতে থাকো, তাহলে কোম্পানি চলবে?”
“তাই বলে কুকুর বেড়ালের মতো ব্যবহার করবে? আমি যাবার জন্য ব্যাগ গোছাচ্ছি দেখেও চলে যান চলে যান করে তাড়াবে? মিনিমাম ভদ্রতা সভ্যতাটুকুর ধার ধারবে না? আর আমি কারও ফোন নম্বর চাইতেই পারি। ইনফ্যাক্ট আগের দিন শ্যুটিং-এ উনি নিজেই নম্বরটা লিখে দিয়েছিলেন। সেটা সেভ করতে গিয়েই কল হয়ে যায়। তার জন্য কার কী ক্ষতি হয়েছে, যে আমার সাথে এমন ব্যবহার করবে?”
বিমল ছ্যাঁচড় হতে পারে, কিন্তু দুর্মুখ নয়। রাজু নামের কুত্তাটার কিন্তু গর্গরানি থামছিলই না। “কল দেওয়া বন্ধ করব, তখন বুঝবেন।”
“কী বুঝব? ভারি তো পেমেন্ট! আর ডাকলেও আসব না।” চেঁচিয়ে কথা বলে গলায় কষ্ট হচ্ছে।
রাকেশ, রাজু, বিমল এরা না হয় দালাল পদবাচ্য। কিন্তু অত বড় একজন পরিচালকেরও কি নিজের মেজাজ ও সততা জাহির করতে গিয়ে রুমার একবার ফোন, ফোনও না মিস্ড কল করে ফেলার মতো তুচ্ছ খবর ওদের না দিলে চলছিল না? খুব জরুরি ছিল রুমাকে সবার সামনে এভাবে অপদস্থ করার?
রাজু কুত্তাটার রুমাকে আঁচড়ে, কামড়েও ওর যেন শান্তি হচ্ছিল না। ক্রমাগত, “বেরিয়ে যান, চলে যান” করে যাচ্ছিল।