সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ৬)

গ্যাস চেম্বার

পর্ব – ৬

৬ই মে
আমাদের মহল্লাটা যেখানে শেষ ঠিক তার আগেই একটা ধাঙর বস্তি ছিল। সেখানে রান্না হত কাঁচা কাঠে । সেই ধোঁয়ার দিকে তাকায় কার সাধ্যি! চোখ জ্বলে যেত । আমার জীবনের এক একটা জায়গা যেন কাঁচা কাঠের উনুনের ধোঁয়ার মতাে। তাকানাে যায় না। তাই ক্রমাগত এদিক-ওদিক দেখি । মা শিখিয়েছিল, মাটির ফুলদানিতে জল ভরে রেখে দিলে ঘর ঠান্ডা থাকে। সেই জলের ওপর তাজা ফুল রেখে দিত মা । মা চলে গেল। মাটির ফুলদানিতে জল থাকলেও ফুল আর রইল না । সেরকমই একটা ফুল ছাড়া ফুলদানির মতাে থমকে থাকতে থাকতে বয়সের কথা ভুলে গেলাম আমি। সমীরণকাকু আমাকে বলত, তাজমহল দেখতে গেলে কী দেখবি? কী মনে রাখবি? আমি একবার বলতাম, মার্বেল; একবার, জ্যোৎস্না; একবার, শিল্প । সমীরণকাকু হাসত, তাজমহল দেখলে এসবই শুধু মনে আসবে? মনে আসবে না, যে শ্রমিকগুলাে তাজমহল বানিয়েছিল আর তারপর যাদের আঙুলগুলাে কেটে নেওয়া হয়েছিল তাদের কথা?
ধাক্কা খেয়েছিলাম কথাটায় । ধাক্কা খেতাম যখন কেউ আমাকে বলত, ‘তাের মতাে সুন্দরী না এলে জমে না ঠিক’।সুন্দর বলেই আমার ডিমান্ড? বেগুনের ফালি তেলে পড়লে যেমন বেগুনির চেহারা নেয়, রূপের কারণে আমারও কি তেমন এনলার্জড অস্তিত্ব? ভাবতে ক্লান্ত লাগত বলে ভাবা বন্ধ করে দিলাম । যাওয়া শুরু করলাম যে যেখানে ডাকত। অনেক মানুষের মধ্যে একার ভয়টা মাথা চারা দিত না । স্বস্তি লাগত। আর স্বস্তি পেতে কার না ভালাে লাগে? সেই ভালাে লাগার খোঁজেই মালদায় এক্সকারশনে যাওয়া। আর সেখানেই ঘটল ঘটনাটা।
সকালে মালদায় পৌঁছে, স্টেশনের বাইরেই খাওয়াদাওয়া সেরে, মহানন্দা নদী পেরিয়ে যাচ্ছিলাম বহু পুরনাে একটা বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষ দেখতে । দু’পাশে বিস্তীর্ণ আমবাগান দেথে সবারই মনে দুপুরে নুন ছিটিয়ে কাঁচা আমে জিভ ছোঁয়ানাের স্মৃতি জেগে উঠল। আমাদের গ্রুপটায় মেয়ে ছিল পাঁচজন, ছেলে দু’জন | সাতজন মিলে ঢুকলাম জগজীবনপুরের কাছে একটা আমবাগানে । আমবাগানে ঢুকেই প্রতিষ্ঠার অদ্ভুত ইচ্ছে জাগল। ওর মনে হল লুকোচুরি খেলবে, একটু অন্যরকম লুকোচুরি। সবাই জানে প্রতিষ্ঠার সঙ্গে শৌনকের প্রেম আছে । কিন্তু সেটা যে কতখানি গভীর সেই আইডিয়া ছিল না। প্রতিষ্ঠা অফার দিল, শৌনকের চোখে শক্ত করে একটা রুমাল বেঁধে দেওয়া হবে । তারপর পুরুষ গান্ধারীর মতাে ওই আমবাগানের মধ্যে ঘুরে-ঘুরে শৌনক খুঁজে বের করবে ওকে । অন্য কারাে কাছে চলে গেলেও নাকি, তাকে ছুঁয়েই শৌনক বুঝতে পারবে, এ প্রতিষ্ঠা নয়, অন্য কেউ। প্রতিষ্ঠার এই বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার জন্যই খেলাটা জরুরি। শৌনক ছাত্র না, ভালাে চাকরি করত কর্পোরেটে, প্রতিষ্ঠার প্রেমের ঠেলাতেই আমাদের সঙ্গে এসেছিল । অদ্ভুত যে ও নিজেও রাজি হয়ে গেল এই বােকা বােকা প্রস্তাবে । আমার হাসিই পাচ্ছিল, তবু এনজয়ও করছিলাম বােধহয়। মনে হচ্ছিল জীবনে এমন কিছু ঘটছে, যা তত ইনটেন্স ন্য, তত রক্তক্ষরণ হয় না যার ভেতর থেকে । একটু হালকা, একটু মজার একটা ঘটনা ।
কিন্তু ব্যাপারটা হালকা থাকল না। চোখে রুমাল বাঁধা শৌনক ঘুরতে ঘুরতে একবার কৃষ্ণকলিকে স্পর্শ করল, একবার শম্পাকে, তারপর সরে এল। আমি খেলাটা দেখছিলাম আর ভাবছিলাম প্রতিষ্ঠা কীভাবে এতটা নিশ্চিত হতে পারছে? ভাবনার ভিতরেই দেখলাম চোখ বাঁধা শৌনক এগিয়ে আসছে আমার দিকে । বুঝতে পারছিলাম এই এগিয়ে আসাটা কিছুই না । যদি আমায় ছুঁয়েও ফেলে তবু নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে, আমি প্রতিষ্ঠা নয়, অন্য কেউ । তাই দাঁড়িযে রইলাম আর শৌনক এগিয়ে এল আমার দিকে। হঠাৎ করে আমার পিঠে একটা হাত রাখল শৌনক কী ছিল সেই ছোঁয়ায় আমি জানি না কিন্তু শিহরণ থেলে গেল আমার ভেতরে। তখনই শৌনক ওর দুটো হাত দিয়ে আমার মুখটা তুলে ধরল। প্রচন্ড রােদে চোখ খুলে রাখতে পারছিলাম না বলে চোখ বন্ধ করে ফেললাম । কিন্তু মুখটা সরিয়ে নিতে পারলাম না । চোখে রুমাল বাঁধা শৌনক ঠোঁট দিয়ে আমার ঠোঁট গ্রাস করে নিল । মনে হল বহুদিন পর, যার ভেতর শুধু জলই থাকে সেই ফুলদানিটাতে কেউ একটা ফুল রেখে গেল। বাকিরা বােধহয় একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছিল । কিন্তু তার মধ্যেও শৌনককে নিশ্চয়ই ফলাে করছিল সবাই । আমি একটা চিৎকার শুনতে পেলাম প্রতিষ্ঠার । সেই চিৎকারে আরও দু-একজনের গলা মিলে গেল।
– তুমি কাকে আদর করছ? আমার কানেও প্রশ্নটা গেল কিন্তু কোনাে উত্তর পেলাম না। কাকে আদর করছে শৌনক, প্রতিষ্ঠাকে না? আমাকে? আমি কে আসলে?
দুঃখের কথা ভুলে যাও, মানুষ মানুষকে বলে। কিন্তু মানুষ অন্যের দুঃখের কথা যত সহজে ভুলে যেতে পারে, নিজের দুঃখের কথা তত সহজে ভােলে না।। যতক্ষণ না একটা কোনাে সুখ এসে সেই দুঃখকে রিপ্লেস করে । শৌনক যে ওভাবে সবার সামনে আমাকে চুমু খেল, সেটা যতই নাটকীয় হােক, আমার ভেতর কোথাও একটা সুখের জন্ম দিল । আমি আশা তাে দূর কল্পনাও করিনি ওটা। আর তাই হয়তাে একটা খুশি ছলকাচ্ছিল মনে ।। হােটেলে ফিরে আসার পরে দুপুরের দিকে প্রতিষ্ঠা আমার ঘরে এসে বলল, এই প্ল্যানটা কতদিন ধরে করেছিলি? আমি কোনাে কথা না বলে চুপ করে রইলাম । প্রতিষ্ঠা আমাকে অশ্রাব্য গালিগালাজ দিয়ে বলল, তুই ভাবছিস আমি কিছু বুঝতে পারছি না? তুই এখানে এসেছিস শৌনককে আমার থেকে হাতিয়ে নেওয়ার জন্য । রূপ আছে তাে, ল্যাম্পপােস্টে হেলান দিয়ে দাঁড়া না! অনেক খরিদ্দার পাবি অন্যের বয়ফ্রেন্ডের দিকে হাত বাড়াতে হবে না। অবাক হযে চেয়ে রইলাম প্রতিষ্ঠার দিকে। কোন নর্দমা ওর মুখ থেকে ছিটকে বেরােচ্ছে? এত রাগ ওর! এত ঘৃণা ।ও যদি আমার কাছে এসে কাঁদতে শুরু করত তাহলে নিশ্চিতভাবে আমার তিরতিরে খুশি ছাপিয়ে একটা অপরাধবােধ মাথা তুলে দাঁড়াত। আমি হয়তাে বা, ‘শৌনকের সামনেই যাব না আর, এমন কোনাে প্রতিজ্ঞা করে বসতাম। কিন্তু ও যত আমাকে ‘বাজারের বেশ্যা’ বলে খিস্তি করতে লাগল তত আমার মনে হতে লাগল, মেয়েরা যদি বাজারের সামগ্রী আর ছেলেরা যদি ক্রেতা তাহলে পছন্দের জিনিস বেছে নেওয়ার অধিকার সব ছেলেরই আছে। সেই অধিকার থেকে তবে শৌনকই বা বঞ্চিত হবে কোন দোষে? আমি চুপ করে আছি, ওর কথায় কোনােভাবে রিয়্যাক্ট করছি না দেখে প্রতিষ্ঠা ধৈর্য হারিয়ে ফেলল। হঠাৎ করে ওর সেই নেলকাটারটা বার করল, যেটা আমি আগেও দেখেছি। জাপান থেকে কে যেন ওটা ওকে এনে দিযেছিল, ভেতরে দশরকম জিনিস একসঙ্গে। নেলকাটারটা ঘুরিযে প্রতিষ্ঠা একটা ছুরি বের করল। তারপর সেটা উঁচিযে আমার দিকে এগােতে থাকল। আমি বিহ্বল হযে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আর যে মুহুর্তে প্রতিষ্ঠা আমার কাছে এগিয়ে এসেছে একদম একেবারে মসালা ফিল্মের মতাে ঘটনা ঘটল ।শৌনক ঘরে ঢুকে পিছন থেকে জাপটে ধরে ওর হাতটা মুচড়ে ধরল । প্রতিষ্ঠা অদ্ভুত কায়দায় ঘাড় ঘুরিযে কামড়ে দিতে চেষ্টা করল শৌনককে । দিলও একবার । কিন্তু শৌনক কিছুতেই ওর হাতটা ছাড়ল না। ধরে থাকল যতক্ষণ না ওই নেলকাটার কাম ছুরিটা পড়ে যাচ্ছে ওর হাত থেকে । প্রতিষ্ঠা চিৎকার করে উঠল, গালাগালি দিতে থাকল, শেষমেষ শৌনকের মুখে থক করে অনেকখানি থুতু ছিটিযে অভিশাপ দিতে দিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। শৌনক ওর মুখে লেগে থাকা থুতু নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমি চুপ করে থাকলাম ।
শৌনক বলে যেতে থাকল অনেক কিছু, আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম না । শৌনক হ্যত বা আমার রূপের টানেই আমার কাছে এসেছে। কিন্তু একটা কিছুর টানেই তাে মানুষ আসবে। রূপ যেন সেই ভূমিকম্পে ধ্বসে যাওয়া বাড়িটার ভেতর একটা প্রাণ যার আওয়াজ শােনা যাচ্ছে, কিন্তু যাকে স্পর্শ করা যাচ্ছে না | শৌনক তাকে স্পর্শ করবে বলে সামনে এসেছে। কিন্তু সেই রূপ তাে আমার নয় । উত্তরাধিকার বা প্রকৃতির সুত্রে তাকে পেয়েছি । আমি শৌনকের এত আকর্ষণ, এত ভালবাসা নেব কীভাবে! শৌনক বলল, আমি বাথরুম থেকে আসছি । আমি টেনে ধরলাম শৌনককে । আমাকে ওর ভালবাসাটা অর্জন করতে হবে কোথাও । আমি আমার জিভটা এগিয়ে দিলাম ওর মুখের দিকে । শৌনক অবাক হয়ে বলল, কী করছ? আমি বললাম, আমায় করতে দাও । এই প্রথম ‘তুমি’ বললাম শৌনককে । আর বলার পর আস্তে আস্তে আমার জিভ দিয়ে, আমার ঠোঁট দিয়ে শৌনকের মুখের ওপর লেগে থাকা থুতু নিজের জিভে, নিজের ঠোঁটে, তুলে নিতে থাকলাম। এই ঘৃণাটা তাে আমারই প্রাপ্য। এটা তাে শৌনকের প্রাপ্য নয় । আমার জন্যই শৌনকের মুখে ওটা ছিটেছে । সমস্ত থুতুটা নিজের মুখে নিতে নিতে টের পেলাম আমি শৌনকের ভালবাসার, শৌনকের আকর্ষণের যােগ্য হয়ে উঠছি ।
কলকাতায় ফেরার পর বন্ধুদের মধ্যে রটে গেল আমি নাকি প্রতিষ্ঠার বয়ফ্রেন্ডকে ভাগিয়ে নিয়েছি । রটল তাে রটল । বাড়ি থেকে ইউনিভার্সিটি যেতে থাকলাম, ইউনিভার্সিটি থেকে বাড়ি ফিরতে থাকলাম, আর তার মধ্যে আমাদের এম এ পরীক্ষাও এসে গেল । পরীক্ষার পরপরই একটা এনজিও’তে চাকরি পেলাম । ইতিমধ্যে শৌনকের সঙ্গে আমার সম্পর্কটায় ইটের মাঝখানে সিমেন্ট পড়া শুরু হয়েছে । একদিন আমায় ওর গাড়ি করে শৌনক নিয়ে গেল গাদ্যিারাতে । সেখানে গিয়ে নদীর ভেতর সূর্য ডুবছে দেখতে পেলাম। শৌনক আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে শুরু করল । সে কি তুমুল আদর, সেই আদরে পৃথিবী গলে যায় । আমার মনের মস্ত গহ্বর যাতে শুধু ওষুধ ঢুকতে পারে, সেই গহ্বরের মধ্যে শৌনকের আদর বােল্ডারের মতাে নেমে আসছিল । আমি সেই আদরে আমার সমস্ত শরীর ভরিয়ে ফেলছিলাম। মনে হচ্ছিল ইতিহাস বলে কিছু হয় না যা আছে তা শুধুই মুহুর্ত। আর সে মুহুর্ত একমাত্র সৌন্দর্য দিয়ে ভরিয়ে তােলা যায় । শৌনক আদরে আদরে আমাকে মহাশূন্যে পাঠিয়ে দিচ্ছিল প্রায় । আমি এক লহমার জন্য ওকে থামিয়ে বললাম, আমি কিন্তু রােজ দুটো ওষুধ খাই। আমার কঠিন একটা অসুখ আছে । শৌনকের হাত শিথিল হয়ে গেল, থমকে গেল ও । ফেরার পথে গাড়িতে একটু আদর করল আবার কিন্তু বােঝাই যাচ্ছিল, তাল কেটে গেছে । কী অসুখ জিজ্ঞেস করেনি শৌনক৷ সেদিন রাতের পর চব্বিশ ঘণ্টা আমায় ফোন করেনি, মেসেজও না।
তারপরই আমার কাছে এসে বলেছিল, জানি না তােমার কী অসুখ, কী ওষুধ, আমি শুধু জানি আমার একটা অসুখ আছে, আমি তােমাকে ছাড়া থাকতে পারব না। হাজার ওষুধ আমিও খেয়েছি, থাই, কিচ্ছু এসে যাবে না তাতে। শৌনক এমন ভাবে কথাগুলাে বলছিল যেন পরীক্ষার ওরাল দেবে বলে মুখস্থ করে এসেছে । আমি ওর দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললাম, তােমার কিছু আসছে, যাচ্ছে বলেই এভাবে বলছ । শৌনক বারবার বলল, না আমার কিছুতেই কিছু এসে যায় না। আমি শুধু জানি আমি তােমাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না । শৌনক সেদিন চলে গেলে ভাবছিলাম, আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না শৌনক? নাকি আমার রূপ ছাড়া?
সুবিমলমামা মাযের খুড়তুতাে ভাই, মাঝেমধ্যে আমাদের বাড়ি এসে থাকত। বিয়ে করবে বলে মেয়ে দেখতে যাবে, আমার বায়নায় আমাকেও সঙ্গে নিয়েছিল। যাকে দেখতে গেল সেই সীমামামির রং কালাে, চেহারা রােগা, নাকটা অতিরিক্ত লম্বা, চোখটা বসা। মানে যাকে দেখলে এক কথায় খারাপ লাগে সেরকম একজন । সুবিমলমামা একটা দুটো কথা বলে উঠে আসবে তাল করছিল, তথনই সীমামামি কার একটা কথায় গান ধরল । ‘কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া’ গানটার পরে ‘আমি রূপে তােমায় ভােলাব না । আর সে কী গান । যেন বাতাসের ওপর কেউ ছুরি চালিয়ে দিচ্ছিল, এক একটা শব্দ কেটে বসে যাচ্ছিল, কানে-বুকে-মাথায় । গান শােনার পর সুবিমলমামা দুম করে বলে বসল, আমি এখানেই বিয়ে করব । পরে তাই নিয়ে কত কথা শুনতে হয়েছে মামাকে, আত্মীয়স্বজন মহলে। সুবিমলমামার মতাে একজন সুপুরুষের ওরকম বউ হবে মেনে নিতে পারেনি অনেকেই। আমরা তাে চেহারা দিযেই মানুষকে বিচার করি । শুধু আমিই হয়তাে বুঝতে পেরেছিলাম আসলে কী হয়েছে। ওই যে শব্দ আর সুর চোখ বাদ দিয়ে অন্য ইন্দ্রিয়গুলােয় সেঁটে বসেছিল সেই শব্দগুলাের কাছে, সেই সুরের কাছে সুবিমলমামা আত্মসমর্পণ করেছিল। কিন্তু আমি তাে কোনােদিন ‘আমি রূপে তােমায় ভােলাব না’ গানটাও গাইতে পারব না। আমার রূপই এমন একটা বিস্ফোরণ হয়ে উঠবে, যার সামনে আর কিচ্ছু দেখা যাবে না ।
শৌনক বাড়ি এসে বাবার সঙ্গে কথা বলল । বাবা একটা ছবি আঁকছিল তখন। শৌনকের কথা শুনে বলল, তােমরা যদি সুখী হও আমার কোনাে আপত্তি নেই |
আমাদের বিয়ের কথা এভাবেই পাকা হয়ে গেল। বিয়ের ব্যবস্থাও শুরু হয়ে গেল যথারীতি । শৌনক হােস্টেলে গিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করল । শৌনককে মাঝখানে রেখে ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা এতদিন পর নর্মালাইজড হল । কিন্তু আমায় বিয়ের আগে-পরে ওর কথায় মনে হচ্ছিল সত্যিই হল নাকি ভাই একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলল যে বাড়িতে এসে আর আমার মুখটা দেখতে হবে না?
সে যাই হােক, আমি চাইছিলাম বিয়ের পরই রূপান্তরিত হয়ে যাব, যেভাবে পাহাড় উপত্যকায় রূপান্তরিত হয়ে যায়, ঝর্ণা নদীতে । শৌনক সর্বস্ব নিয়ে আমার কাছে এলে আমার সমস্ত ওষুধ বমি হয়ে বেরিয়ে যাবে বাইরে । আমার ভেতর শুধু শৌনক থাকবে, শৌনকের প্রেম থাকবে । আমি সেই প্রেমের দিকে তাকিয়ে আমাদের ফুলশয্যার রাতে চোখ বন্ধ করে শুয়েছিলাম অনেকক্ষণ। শৌনক আমার পাশে এসে বসল, আমার খােপার থেকে ফুল খুলল, আমার বুকের ওপর মাথা রেখে শুল তারপর আমাকে অনেকক্ষণ ধরে দমবন্ধ করা চুমু খেল । সেই চুমুর ভেতর দিয়ে, আদরের মধ্য দিয়ে, শৌনকের সঙ্গে এক হয়ে যাওয়ার দরজা খুলে ফেলতে চাইছিলাম । ঠিক সেই সময় শৌনক থেমে গেল । বলল এখানে নয়, এখন নয়, আমি প্রথম যেভাবে পেয়েছিলাম সেই প্রকৃতির মধ্যে তােমাকে পেতে চাই । আমি সেই রাতে শৌনককে আমার ভেতরে চাইছিলাম, যেভাবে বারুদের স্তূপ নিজের ভেতরে একটা দেশলাইকে চায় ফেটে পড়ার জন্য । পেলাম না ।শৌনক বলল,এখানে না।আমরা যেখানে যাব,সেখানে । ও এক আশ্চর্য সংযমে, আমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইল, শুয়েই রইল । আমাকে নিজের করে। নিল না । ভালবাসার বদলে সান্ত্বনা দিয়ে, আদরের বদলে ঘুম দিয়ে, রাত্রির বদলে অন্ধকার দিয়ে চুপ করিয়ে রাখল, প্রত্যাশায় রাখল । অনেকদিন আগে সিনেমায় দেখেছিলাম একটা লােক ব্রিজ ভেঙে পড়ার মুহুর্তে লােহার রড ধরে ঝুলে আছে । নীচে অতল সমুদ্র। ওই লােহার রডটা যেন পৃথিবীর সঙ্গে সেই লােকটার শেষ সংযােগ। আমি সেভাবে শৌনককে আঁকড়ে ধরে থাকলাম । নীচের পাতাল ডাকতে লাগল । আমি তলিয়ে গেলাম না । ওপরের একটা বিশ্বাসযােগ্য ভূখণ্ডে শৌনক আমাকে তুলে নিতে পারত। কিন্তু ও তা করল না । আমি মাঝামাঝি ঝুলে রইলাম । ভেসে রইলাম । অপেক্ষায় থাকলাম ।

৯ই জুন
হানিমুনে আমাকে কেরালায় নিয়ে এল শৌনক । দমদম থেকে হায়দ্রাবাদে নেমে প্লেন চেঞ্জ করার সমযও জানি না কেরালায় গিয়ে কী দেখব, কোথায় থাকব | শৌনককে জিজ্ঞেস করলেই ও খালি বলছিল, সেটাই তাে সারপ্রাইজ ।
চমক তাে আমার জীবনে প্রতি পদে। শৌনকের সঙ্গে আলাপ হওয়া থেকে বিযে, পুরােটাই চমক । আমি কোথাও একটা নিশ্চয়ই ইনােসেন্ট থেকে গেছি তাই এই চমকগুলাে নাড়িয়ে দেয় আমাকে | কোচিনে নেমে আমরা যেখানে গিয়ে পৌছলাম সেই জায়গাটার নাম কুমারাকোম । কেরালার সেই বিখ্যাত ব্যাক ওয়াটার আর ঘন নারকেলের জঙ্গলের ভেতর ছােট্ট ছােট্ট কাঠের তৈরি ভিলা সেখানে। থাকতে থাকতে বুঝতে পারতাম কাঠগুলাে দিনের বেলায় রােদে বাড়ে,আবার রাত্রিবেলা গুটিয়ে আসে। সেই ভিলার বাথরুমের মাথার ওপর কোনাে ছাদ ছিল না। আমি স্নান করার সময় দেখতাম অজস্র পাখি আকাশে উড়তে উড়তে নেমে আসছে, আবার উড়ে যাচ্ছে। যেন আমার স্নান করা দেখে যাচ্ছে। সৌন্দর্যবােধ কি মানুষের একার ? সৌন্দর্যবােধ পাখির নেই?
সমুদ্র থেকে ভিতরে ঢুকে আসা খাদের জল, ঘন অরণ্য, অজস্র পাখির কিচিরমিচির, সব কিছুর মধ্যে ডুবে যেতে চাইছিলাম । নিশ্বাসে অনুভব করতে চাইছিলাম । কিন্তু শৌনক তাে ওখানে এসেছিল প্রকৃতির মধ্যে আমাকে পেতে । একদম শরীরে শরীর, হাতে হাত, পায়ে পা, মুখে মুখ, নারীকে পুরুষ যেভাবে পেতে চায়। আর আমি কিছুতেই সাড়া দিতে পারছিলাম না। কলকাতায় বড় হলে, আমি যেরকম দেখতে তাতে, আমার জীবন এতটা ঘটনাহীন থাকত না
কিন্তু কলকাতা থেকে খানিকটা দূরে একটা নিস্তরঙ্গ পরিবেশের মধ্যে বড় হয়েছি বলেই আমার পুরুষের সাথে মােলাকাত ওপর ওপর। অনেকটা আনাড়ি বলেই হয়তাে শৌনকের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিলাম না। আমার অসহ্য ইচ্ছে করছিল, চাইছিলাম আমাদের দুটো শরীর এক হযে যাক, পরস্পরের ভেতর দিয়ে একটা রাস্তা করুক, সেই টানেল দিয়ে অনেকক্ষণ যেতে যেতে আবার আলাের মুখে উঠে আসুক। কিন্তু শৌনক যে মুহূর্তে নগ্ন হয়ে আমার কাছে। আসছিল আমি স্টিফ হয়ে যাচ্ছিলাম । ওকে ভিতরে চাইছিলাম কিন্তু আমার দরজা খুলছিল না । শৌনক যত চেষ্টা করছিল তত ব্যাথা পাচ্ছিলাম । ছিটকে সরে যাচ্ছিলাম আর শৌনক বিরক্ত হচ্ছিল। একসময় শৌনক জোর করে সমস্ত বাধা সরিযে আমার ভেতরে নিজেকে নিয়ে এল । অসহ্য যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলাম আমি । সেই যন্ত্রণার মধ্যেও শৌনক আমায় ছাড়ল না কিছুতেই । কিন্তু দু’জনের খেলা একজন খেললে আর কত আনন্দ পাওয়া যায় তাই একসময় ও সরে দাঁড়াল আর আমি দেখলাম কোনাে জল নেই, হ্রদ থেকে শুধু রক্ত ছলকে উঠছে। ভিজে গেছে আমার দুটো পা । শৌনক চিৎকার করে উঠল, সাে ইউ আর ভার্জিন । আমি শিউরে উঠলাম, শৌনক কি আমার রক্ত দেখে আনন্দ পাচ্ছে? এই রক্ত দেখে আনন্দ পাওয়ার জন্য ও আমায কেরালা নিয়ে এসেছে? আমি যে ভার্জিন সে তাে শৌনক জানতই। কিন্তু রক্ত দেখে আনন্দ পাওয়ার মধ্যে কোন প্রেম লুকিয়ে? তাহলে প্রেম কি একটা পজেশন? আর একটা মানুষ কেবলমাত্র আমার, এতেই আনন্দ পাওয়া? কই পাখিগুলাে যখন নগ্ন আমাকে স্নান করতে দেখে তখন তাে একজন আরেকজনকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চায় না? মানুষের প্রেমের ভেতরে এত মালিকানা বােধ কেন? আমি গুটিয়ে গেলাম। আর ওই গুটিয়ে যাওয়াটা একটা গুমােটের মত জেগে রইল আমাদের মধ্যে । পরদিন ব্রেকফাস্ট টেবিলে শৌনক বলল, এত কষ্ট করে এখানে এলাম, পার ডে বারােহাজার-তেরােহাজার টাকা খরচ করছি, কিন্তু দিনগুলাে নষ্ট হচ্ছে । আমি ওমলেটে কাঁটাচামচ বসিয়েও সেটা আর মুখে তুলতে পারলাম না । আমার মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করল । এত টাকা খরচ করছে শৌনক অথচ আমি ওকে কোনাে রিটার্ন দিতে পারছি না! সেই কবে একটা বইতে পড়েছিলাম অ্যামেরিকার অনেক জায়গায় ভেড়াদের খাইয়ে খাইয়ে মােটা করা হয় তারপর তাদের মাংস কেটে খাওয়া হবে বলে । শৌনক কি সেভাবেই ইউটিলাইজ করতে এসেছিল দিনগুলাে?
সেদিন আবার একবার চেষ্টা করল শৌনক কিন্তু সে চেষ্টা ফলপ্রসু হল না। সেই রাগে ও হাত থেকে একটা গ্লাস ফেলে ভেঙে দিল । চিৎকার করে উঠল, কেন হচ্ছে না? তুমি চাইছ না বােধহয়? আমি কিছু বলতে পারলাম না। কিন্তু বলতে চাইছিলাম, ভীষণ ভাবে চাইছি। আমাকে একটু সময় দাও শৌনক । শৌনক আমার ঘাড়ে, গলায় চুমু খেতে লাগল । আমি নার্ভাস হয়ে যেতে থাকলাম আরাে । মনে হতে লাগল, পারব না । শৌনকের সমস্ত উদ্যোগ, প্রতিদিনের বারাে-তেরাে হাজার টাকা খরচ, নষ্ট করে দেব কোথাও। আর তাই দিলাম । পরদিন সকালে উঠেই শৌনক ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে গেল ছবি তুলতে। আমার সঙ্গে একটা কথাও বলল না বেরােবার আগে । আমার কান্না পেতে লাগল । ভাবতে লাগলাম শৌনক যা পেতে চাইছে তা কীভাবে আমি ওকে দিতে পারি। ঘরের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে আমার সঙ্গে নিয়ে আসা রণজয়দার সিডিটা নেড়ে চেড়ে ডিভিডি প্লেয়ারে ভরে দিলাম। তারপরের সেকেন্ড-মিনিট-ঘণ্টাগুলাে কীভাবে পার হয়ে গেল জানি না। শৌনক দুপুরে খাবার আগে ফিরে বলল, ফালতু এখানে এলাম । এটা একটা অপয়া জায়গা। আমি শৌনকের দিকে তাকালাম । আমার সেই দৃষ্টিতে ও কী খুঁজে পেল, এক মুহূর্ত থমকে গেল। তারপর নিচু গলায় বলল, আমি খেয়েই এসেছি, তুমি লাঞ্চ করতে যাবে এখন? আমি কোনাে কথা না বলে শৌনকের দিকে তাকিয়ে থাকলাম । ওই তিন ঘন্টার মধ্যে আমার যে ট্রান্সফরমেশন ঘটে গেছে। আমার নিশ্বাস ঘন হযেছে, চুলগুলাে উড়ছে । রানওয়েতে ঘুরপাক খাওয়া বিমানটার মতাে একটা গতি আমার চোখে খেলে বেড়াচ্ছে। শৌনক আমার দিকে এগিয়ে এল । আমার কাঁধের ওপর একটা হাত রাখল । তারপর ঠোঁট ছোঁয়াল আমার ঠোঁটে । আমি ওকে জাপটে ধরলাম। আমার এক বন্ধু কথায় কথায় বলত, হ্যাড আ ব্লাস্ট । তাে সেদিন দুপুরে, উই হ্যাড আ ব্লাস্ট । প্রত্যেকটা আহ্বানের উত্তরে প্রত্যেকটা সাড়া সময়ে দিলাম আমি আর অজানা স্বাদে ভরে উঠল চারপাশ । বন্ধ সবকিছু একটা ঝটকায় খুলে গেল। কী সব আওয়াজ শুনতে লাগলাম হাওযায় । সেই ছােটবেলায় একবার চার্চে গিয়ে শুনেছিলাম আমেন মানে ইয়েস, সেই প্রথম সর্বার্থে ইয়েস সত্যি হল আমার জীবনে । আমি একটা শরীর থেকে একটা নারীতে পুনর্জন্ম পেলাম । শৌনকের টাকার সদ্ব্যবহার হল ।
সেদিন বিকেল থেকে ভয়ংকর বৃষ্টি । শৌনক সঙ্গে আনা বােতলটা বের করে বলল তুমি খাবে? আমি বললাম, দাও । সেই বৃষ্টি, সেই নেশার মধ্যে দিয়ে আরাে একবার পরস্পরের কাছাকাছি এলাম আমরা। আবারাে সেই দুপরের মতােই শৌনক আমাকে আর আমি শৌনককে আঁচড়ে-কামড়ে, ছিন্নভিন্ন করে পূর্ণ করলাম, যেন দুটো শরীর তুলি হয়ে উঠে পরস্পরের পােট্রেট আঁকল ।। – অপূর্ব সুন্দর তুমি, শৌনক বারবার বলতে থাকল, আমি ওর ঠোঁটে হাত চাপা না দেওয়া অবধি । দিতেই, শৌনক অবাক হয়ে বলল, তুমি চাও না, তােমার রূপের প্রশংসা কেউ করুক?
আমি বললাম, না; ওরকম প্রশংসা খুব বেশি শুনলে পরে আমার মনে হয় যে আমি ফোঁপরা; যারা দেখতে খারাপ তারা এক অর্থে লাকি জানাে! তাদের যদি কেউ ভালবাসে তবে তাদের ভেতরে কিছু আছে বলেই ভালবাসবে । কিন্তু আমার সব সময় মনে হয় এই রূপ ছাড়া আমার বােধহয় আর কিছুই নেই। – এই রূপের জন্য কতজন এসেছে তােমার কাছে? – অনেকেই আসতে চেযেছে হয়তাে, আমি বুঝতে পারিনি। অনেকে আসেওনি, এই রূপের সঙ্গে তাে আরাে কিছু আছে আমার, যার কথা তােমায় বলেছি। – বাদ দাও, বাদ দাও। শৌনক প্রসঙ্গটা থেকে আমায় সরিয়ে দিতে চাইল ।। কিন্তু আমি বাদ দিতে পারলাম না। অফুরন্ত আনন্দের ভেতরেও সিজোপিন আর অ্যারিপ-এমটি নামের সেই ওষুধ দুটোকে কিছুতেই আমার অস্তিত্ব থেকে বাদ দিতে পারলাম না । ওর সামনে থেকে উঠে গিযে, ওষুধগুলাে খেয়ে ফিরে এসে আবার শৌনককে জড়িয়ে ধরলাম । শৌনক কিছুটা মুহ্যমান হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, এই ওষুধে কনসিভ করতে কোনাে অসুবিধে হবে না তাে? – তুমি তাে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলে আমাকে, তিনি কী বলেছিলেন? – ছাড়াে সেসব । এখন তাে বাচ্চা চাইছি না। যখন চাইব তার আগে একবার দেখে নিতে হবে । শৌনকের ওই বিষন্নতা আমার ভালাে লাগছিল না । আমি ওকে আমার দিকে টানার চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষণ পর শৌনক সাড়া দিল। আর রাতের রাস্তায় আলাে জ্বলে উঠল যেন । “কী সুন্দর তুমি’, শৌনক আবার বলে উঠল । আমি এবার আর ওকে থামালাম না ।
কুমারাকোম থেকে আমরা গেলাম কোচিনে। সেখানে দুটো দিন থাকার ব্যবস্থা হল । এত এত টাকা শৌনক খরচ করছিল, আমার কেমন খারাপ লাগছিল । কোচিনের যেখানে আমরা ছিলাম সেটা একটা ম্যানশান । কখনাে সেটা পর্তুগিজদের ছিল, কখনাে ডাচদের; কখনাে ব্রিটিশদের, আবার কখনাে ইহুদিদের । একটা মিলিত গন্ধ ছাড়ত প্রাসাদটার ভিতর থেকে । পাঁচশাে বছরের ইতিহাস আছে যে ওখানে । আমিও কি ওরকম একটা কলােনিয়াল ম্যানশান নই? আমার ভেতর মফস্বল, কলকাতা, সমীরণকাকু, বাবা, মা, ভাই, শৌনক সবাই যে আলাদা-আলাদা করে নিজেদের অস্তিত্ব জাহির করছে। আবার কখনাে বা মিশে যাচ্ছে একটাই ঘূর্ণিতে। শৌনক আমায় নিয়ে গেল ওই ম্যানশানের ভেতরেই ছােট্ট একটা মিউজিয়ামে। সেখানে দুর্দান্ত সব পেন্টিং। সেগুলাে দেখতে দেখতে বাবার হাতের আঁকার কথা মনে পড়ছিল। মনে পড়ছিল আমার জীবনের মুহূর্তর পর মুহূর্ত দিয়ে তৈরি সেই সমস্ত ছবির কথা, ভালাে করে দেখার আগেই যারা অস্পষ্ট হয়ে গেছে
ওখানে দাঁড়িয়েই টের পেলাম আমি শৌনক আর আমার ছবিটা, আমি স্পষ্টভাবে আঁকতে চাইছি । এমনভাবে চাইছি যেন আর কোনাে কিছুর আকাঙ্ক্ষা না থাকে ।
কোচিন থেকে ফিরে আসার পথে প্লেনটা এয়ার টার্বুলেন্সের মধ্যে পড়ে হাওয়ায় দুলে দুলে নামতে লাগল আবার ওপরে উঠতে লাগল । প্লেনের যাত্রীরা কেউ কেউ চিৎকার করে উঠল । বাচ্চারা কাঁদতেই থাকল । এয়ার হােস্টেসরা শান্ত হতে বলল । শৌনক অসম্ভব ভয় পেয়ে গেল। আমার হাত চেপে ধরে বলল, ক্র্যাশ করবে না তাে? আমি ওর ঠোঁটে হাত চাপা দিতে গিয়েও থেমে থাকলাম। আমার খুব শান্তি লাগছিল ওই প্রচন্ড দুলুনিতেও । মনে হচ্ছিল এই হাওয়ার মধ্যে যদি গুঁড়ােগুঁড়াে হয়ে যায় প্লেনটা তাহলেও পাশাপাশি থাকব আমরা। একটা অনির্বচনীয় শান্তিতে, শরীরে শরীরে, আত্মায় আত্মায় মিশে যাব । আমরা তাে মাটির অনেক ওপরে আছি । আমরা তাে একে অন্যের হয়ে আছি।

ক্রমশ…
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।