সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ৫)

গ্যাস চেম্বার

পর্ব – ৫

১৯ শে মার্চ
আমাকে যে দেখতে সুন্দর সেটা প্রথম জানতে পারি টুটুলদির থেকে । টুটুলদি আমার জ্যাঠতুতাে দিদি, প্রায় বছরখানেক আমাদের বাড়ি ছিল একটা সময় । ব্যাক পেয়েছিল বলে ওকে আমাদের কৃষ্ণনগরের আদি বাড়ি থেকে এখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল । বাবার কাছে পড়বে বলে এসেছিল টুটুলদি কিন্তু পড়া বাদ দিয়ে অন্য সমস্ত বিষযে ওর ইন্টারেস্ট ছিল। সবথেকে বেশি ইন্টারেস্ট ছিল আমাকে কীভাবে সাজলে সুন্দর লাগবে, না লাগবে তাই নিযে। টুটুলদির সঙ্গেই আমার প্রথম বিউটি পার্লারে যাওযা । আমাদের ওই ছােট্ট শহরে কোনাে বিউটি পার্লার ছিল না সে সময়টা। টুটুলদি আমাকে বাসে করে বেশ খানিকটা দূরে নিয়ে গিয়েছিল। আমার ভয় লাগছিল, বাবা বকবে জানতে পারলে। টুটুলদি পাত্তা দেয়নি । ওর কথাতেই আমার স্টেপস কাটা হল প্রথম । টুটুলদি বলল যে ওপর দিকে সামান্য লেয়ার কাটা হলে আমাকে আরাে ভালাে লাগবে । আমি তখন এসব কিছুই বুঝি না। কী বাউন্সি, কাকে স্টেপস বলে, লেয়ার খায় না। মাথায় দেয়, কিচ্ছু জানা নেই | টুটুলদি সবকিছুর দায়িত্ব নিয়েছিল। তারপর চোথে কীভাবে মাস্কারা লাগালে একটা স্মােকি, ড্রিমি এফেক্ট আসবে সেটা নিয়ে অনেকক্ষণ কথা বলল পার্লারের মহিলার সঙ্গে।
পার্লারের মালকিন বললেন, যাকে নিয়ে এসেছ, সে তাে একদম স্পটলেস বিউটি, তােমার ওকে নিয়ে ভাবতে হবে না। বরং তােমার মুখের স্পটগুলাে কীভাবে দূর করা যায় সেটা চিন্তা করাে ।
শুনে টুটুলদি গুম হয়ে গেল, পরে পার্লারের মালিক অনেক মিষ্টি মিষ্টি কথা বললেও, ওর সেই মেজাজটা আর ফিরে এল না । বাড়ি ফেরার সময় সারাক্ষণ বলে গেল, তাের মতাে স্কিনও নেই, তাের মতাে চুলও নেই, তাের মতাে মুখও না । আমাদের এসব জায়গায় এসেই বা কী লাভ ।
আমি বুঝতেই পারছিলাম না, টুটুলদি কার সঙ্গে কম্পিটিশন করছে, কেন করছে। কিন্তু ওর বারবার করে বলা কথাটা মনে গেঁথে গিয়েছিল । কী এমন আমার আছে যা সবার নেই? রাতে শুয়ে আমার তার জন্য খারাপ লাগতে শুরু করল । এমন একটা জিনিস আমার আছে যা বেশিরভাগ লােকেরই নেই কিন্তু সেই জিনিসটা আমি চাইলেও শেয়ার করতে পারব না আর পাঁচজনের সঙ্গে। আর শুধু খারাপ লাগা নয়, এই অন্যের নেই অথচ আমার আছে ব্যাপারটার জন্য আমি সমস্যায় পড়তে শুরু করলাম এই সময় থেকেই।
পড়তাম শ্রাবণী আন্টির কোচিঙে, সায়েন্সের সমস্ত সাবজেক্টই খুব ভালাে পড়াতেন উনি। একদিন দুপুরে আন্টি বাড়ি নেই, আমরা তিন চারটে মেয়ে গিয়ে বসে আছি, আন্টির বর ভেতরের ঘর থেকে আমাকেই ডাকলেন । যেতেই বললেন, মাথাটা খুব ধরেছে, একটু টিপে দাও তাে। আমি কিছু বললাম না, দাঁড়িয়ে রইলাম । কিন্তু উনি আমার দিকে ব্যাকুল হয়ে তাকিয়ে আছেন দেখে মাথা টিপেও দিলাম মিনিট পাঁচেক । তারপর এসে আবার আমাদের পড়ার জায়গায় বসলাম। ব্যাস এটুকুই ঘটনা। কিন্তু তাই নিয়ে কী যে গুজগুজ ফুসফুস শুরু হল । পরদিন শ্রাবণী আন্টি ক্লাস শেষ হওয়ার পর আমায় একটু থেকে যেতে বললেন।
সবাই চলে যেতে শ্রাবনী আন্টি কেমনভাবে যেন জিজ্ঞাসা করলেন, আমি যখন ছিলাম না তুমি আঙ্কেলের ঘরে গিয়েছিলে? নিজে থেকেই গেলে না আঙ্কেল তােমায় ডাকল?
আমি বললাম, আঙ্কেল ডাকল, তাই গিয়েছিলাম ।
তােমার এখন ব্যস হচ্ছে, কোনাে পুরুষ যদি তােমায় ডাকেও, তােমার চট
– কিন্তু তােমার ব্যাচমেটরা বলছিল, তুমিই নাকি নিজেই গিয়েছিলে। দ্যাখাে করে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ানাে উচিত নয় ।
– কিন্তু পুরুষ কোথায় আমায় ডেকেছিল আন্টি? কাকু ডেকেছিল তাে ।
কাকুও একজন পুরুষ । তােমার বাবাও একজন পুরুষ । এগুলাে তােমার বাড়ির লােক তােমায় শেখায়নি?
আমার খারাপ লাগতে শুরু করল । আমি উত্তর না দিয়ে দাঁতে নখ কাটতে শুরু করলাম ।
– যদি না শিখিয়ে থাকেন তাহলে বলব প্রপার শিক্ষা দিতে পারেননি তােমাকে। আচ্ছা, ঘরে গিয়ে কী করলে?
– মাথা ধরেছিল কাকুর, আমি টিপে দিলাম ।
– আর কাকু কী করল?
– শুযে ছিল চোখ বন্ধ করে । আর কী করবে?
– কী করতে পারে সেটা বােঝার বয়স তােমার হয়েছে । কিন্তু এখানে সেসব কিছু হয়নি। হওয়ার কথা না। আর শােনাে তােমাকে পরের ক্লাসে আসতে হবে না। তুমি নেক্সট কবে আসবে আমি ফোন করে জানিয়ে দেব ।
বাড়ি গিয়ে দেখলাম মাযের মুখ গম্ভীর । শ্রাবণী আন্টি নাকি ফোন করে বলেছেন যে আমার বিহেভিযার ভালাে নয়। আমাকে আর ক্লাস করতে পাঠানাের দরকার নেই। আমার সংস্পর্শে থাকলে বাকি মেয়েদেরও স্বভাব খারাপ হয়ে যেতে পারে। আমাদের বাড়িতে গায়ে হাত দেওয়ার চল ছিল না। মা রাতে বাবার সামনে কথাগুলাে বলল আর আমাকে জিজ্ঞেস করল ঠিক কী ঘটেছিল। আমি সবটা বললাম। আমার বাবা- মা আমাকে বিশ্বাস করত। তাও জলের ওপর যেরকম মেঘের ছায়া পড়ে সেরকম একটা ছায়া মায়ের মুখে লেগে থাকল । বাবা কিন্তু হাসিতে উড়িয়ে দিল ব্যাপারটা । বলল, থাক ওখানে আর যেতে হবে না ওকে। অন্য কোথাও আমি ব্যবস্থা করছি ।
এই ঘটনার পরপরই আমি পড়তে যেতে শুরু করলাম সমীরণকাকুর কাছে । যাওয়ার আগের দিন মনে হচ্ছিল সমীরণকাকুও একজন পুরুষ । তার কাছে আমি একা পড়তে যাচ্ছি! শ্রাবণী আন্টি তাে বলেছিলেন যে একা পুরুষের সামনে যাওয়া নাকি ঠিক না আমার আর। আচ্ছা কী করবে পুরুষ? অরণ্য আমায় যেরকম করেছিল সেরকম? কথাগুলাে মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল। কিন্তু সমীরণকাকুর বাড়িতে যেতেই সব ভয় ফুৎকারে উড়ে গেল । সমীরণকাকু বিয়ে থা করেনি। মা আর বােনের সঙ্গে একটা পুরনাে বাড়িতে থাকত যার দরজা প্রায় সবসময় খােলা । কাকু আমায় অঙ্ক, আর ফিজিক্সের সঙ্গে ইংরেজি গ্রামারও শেখাতে শুরু করল । আর সেই প্রথম আমি টের পেলাম পড়ানােটা কেবলমাত্র শাসন নয়, পড়ানােটা একটা আনন্দেরও ব্যাপার। তবে সমীরণকাকুর ধ্যানজ্ঞান ছিল পার্টি। পার্টির জন্য কীভাবে প্রাণ দিতে হয়, পার্টিকে কীভাবে চোখের মণির মতাে রক্ষা করতে হয় তা বােঝাতে অনেক ছেলের ক্লাস নিত লােকটা সেই ক্লাসের কিছুই বুঝতে পারতাম না । কিন্তু এক একটা শব্দ কানে লেগে থাকত কারণ অনেকসময় আমাকে টাস্ক দিয়েও সমীরণকাকু ওদের নিয়ে বসে যেত। আব্রাহাম লিঙ্কন কবে বলেছিলেন, একটা দেশের মধ্যে অর্ধেক মানুষ বন্দী আর অর্ধেক মানুষ স্বাধীন থাকতে পারে না কিংবা লেনিন কবে বলেছিলেন, দয়ালু হবার জন্য নাকি নিষ্ঠুর হতেই হবে … কথাগুলাে উড়ে উড়ে আসত আর আমি সমীরণকাকুর নিজস্ব জগতের একটা আঁচ পাওয়ার চেষ্টা করতাম ।
ভােটের আগে একদম অন্য চেহারা হয়ে যেত কাকুর। সেই সময় মাসখানেক কিছুই প্রায় পড়া হত না। মা মাঝেমধ্যে বলত অন্য কারাে কাছে পাঠিয়ে দিই | বাবা বলত অন্য কেউ তাে পড়াবে পড়ানােটাকে প্রফেশন ভেবে । সমীরণ পড়াবে পড়াটাকে রক্তে চারিয়ে দেওয়ার জন্য । ওই সময় কাকুর মাথায় আর কিছু থাকত না । কোন বুথে কত ভােট পাবে পার্টি, কত ভােট আগের থেকে নিশ্চিত করা যায় তাই নিয়ে নাওয়া খাওয়া ভুলে দিন রাত মেতে থাকত লােকটা | কাকুর সঙ্গে বসে থাকত, ঘুরে বেড়াত আরাে অনেকে আর ওরা দিনরাত্রি শুধু হিসেব করে যেত, কোথায় দশটা ভােট কমবে, কোথায় দশটা বাড়বে। শান্তিতেই ভােট হত আমাদের অঞ্চলে। কোনাে দিন গন্ডগােল দেখিনি। বাবা যখন ভােট দিতে যেত, বাবার সঙ্গে আমিও যেতাম । কিন্তু সেবার ভােটের আগেই হাওয়া গরম হয়ে উঠল। টের পাচ্ছিলাম অন্য রকম পরিস্থিতি আমাদের ছােট্ট শহরে এসে বাসা বেঁধেছে । আসলে পৌরসভার ভােট তাে । যে জিতবে সেই নাকি পুরাে এলাকার মালিক হয়ে যাবে কিছুদিনের জন্য। আর কলকাতার এত কাছে বলে এখানে হুডহুড় করে বাড়ছে জমির দাম । প্রােমােটাররা জমি দখল করবে বলে, ঝিল বুজিয়ে মাল্টিস্টোরিড তুলবে বলে, শোল শকুনের মত ঘুরঘুর করছে। এই সব কথা রাস্তার মিটিঙে সমীরণকাকু বলত। কাকুর পার্টি যদি জেতে তাহলে আমাদের শহরটা আগের মতােই থাকবে। নইলে নাকি নানারকম বদল ঘটে যাবে । শুনতে শুনতে ভয় লাগত আমার ।। এই সময়ে কাকুর আর একটা নেশা প্রকাশ্যে আসত । একা একা দাবা খেলার নেশা। সামনে সমস্ত গুটি মেলে দিয়ে সমীরণ কাকু একটা চাল দিত । তারপর নিজের চাল নিজেই কাউন্টার করত। ভাবতাম একা একা খেলছে কেন সমীরণ কাকু? আমার প্রশ্নের উত্তর দিতেই যেন সমীরণ কাকু একদিন ওর পার্টির ছেলে বাদলকে নিযে দাবা খেলতে বসল । আমি গ্রামার করতে করতে দেখছিলাম কাকুর নৌকোটা চলে গেল, তারপর ঘােড়াটা। একটা গজও খেয়ে নিল বাদল । তখনই সমীরণকাকু কী একটা চাল দিল, বাদল আঙুল দিয়ে কপালের রগ টিপে ধরল । ‘চেকমেট’, সমীরণ কাকু চেঁচিয়ে উঠল। তারপর অন্য গলায় বলতে লাগল, বাদল বড় হ।খুঁটি নিয়ে কামড়াকামডি করিস না । তাের কাছে দশটা খুঁটি আছে না বারােটা তা কেউ দেখতে যাচ্ছে না। বাচ্চারা ওইরকম সংখ্যা দিয়ে জেতে । বড় খেলােয়াড়রা কীভাবে জেতে জানিস ? তারা সবসময় খুঁটিগুলাে খােয়াতে চায় । খুইযে একটা বড় কোনাে ওপেনিং বার করতে চায়, যাতে অনেকগুলাে খুঁটি হারানাের পরও জিতটা শেষে আমারই হয় । মনে রাখিস, আমি কী হারিয়ে জিতলাম সেটা কোথাও লেখা থাকবে না । কিন্তু আমি জিতলাম এটাই লেখা থাকবে। জেতার জন্য হারাতে শেখ বাদল । আঁকড়ে থাকলে জেতা যায় না ।
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে কথাগুলাে মাথার মধ্যে দপ দপ করছিল। আমি বিড়বিড় করছিলাম, যে জেতে তাকে সর্বস্বান্ত হতে হয়, আঁকড়ে থাকলে জেতা। যায় না ।
কাকু সেই ভােটটা জিততে চেয়েছিল । কিন্তু ভােটের দিন সকাল থেকে অশান্তি শুরু হল । সকালবেলা বাবা ভােট দিতে যাওয়ার আগেই শুনলাম ভােলার বাগানের দিকে নাকি বােমা পড়েছে। আমাদের মহল্লায় বােমা! বাবা তাও আমার হাত ধরেই ভােট দিতে গেল। মা বারবার বারণ করছিল কিন্তু বাবা কোনাে বারণ শুনল না। বাবার মত ছিল আমরা ভয় পেলেই যারা ভয় দেখাচ্ছে তারা আরাে বেড়ে উঠবে । ভােট দেবে বলে বাবা লাইনে দাঁড়িয়েছে আমায় সঙ্গে নিযে, কয়েকটা লােক সামনে এসে বলল, “চলে যান ভােট হয়ে গেছে । কী করে ভােট হয়ে যাবে! ভােট যেখানে দেওয়া হয়, বাবা তাে সেখানে ঢােকেইনি। কিন্তু লােকগুলাে চেঁচিয়ে যাচ্ছিল। বাবা তাদের সঙ্গে সমানে তর্ক করে গেল । ওই তর্কের জোরেই ঢুকল বুথের ভেতর। বাবার ভােট দেওয়া হয়ে গেছে শুনে, টেন্ডার ভােট দিয়ে এল । | ফেরার সময় আমি জিজ্ঞেস করলাম, টেন্ডার ভােট কী বাবা? – যখন তােমার নিজের জিনিসটা অন্য কেউ কেড়ে নেয়, তখন তুমি নিজের দাবিটা যেখানে লিখে আসাে তাকেই বলে টেন্ডার ভােট ।। আমরা ফিরে এলাম বাড়িতে । চারদিক থেকে বােমার আওয়াজ, রক্তারক্তির খবর ভেসে আসছিল। হঠাৎ শুনলাম সমীরণকাকুকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বােমায় আহত হয়েছে সমীরণ কাকু । সেদিনটা কাটল । তার পর দিনও থমথমে আবহাওয়া । বাবা দেখতে গেল সমীরণকাকুকে, আর একরকম জেদ করে বাবার সঙ্গে আমিও গেলাম হাসপাতালে। দেখলাম কাকু শুয়ে আছে, সারা গায়ে ব্যান্ডেজ । আমি কিছু বলতে পারলাম না। শুধু কাকুর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। কাকু আমার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠল ওরা দখল করে নিতে চাইছিল, ওরা হারিয়ে দিতে চাইছিল । কিন্তু আমি কী করলাম বল তাে ! আমি একটা খুঁটিকে এগিয়ে দিলাম। সেই খুঁটিটাকে ওরা খেয়ে ফেলল না ফেলল তাতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু খেলাটায় কিস্তিমাত হয়ে গেছে । ওরা হেরে গেছে।
পরদিন ভােটের রেজাল্ট বেরােতে কথাগুলাের মানে বুঝতে পারলাম। কাকুর পার্টি জিতে আবার ফিরে এল কিন্তু সমীরণকাকু আর ফিরতে পারল না। সেদিন রাতেই মারা গেল । সমীরণ কাকুর ডেডবডি পতাকায় মুডে কতবড় মিছিল হল আমাদের অঞ্চলে। সেই প্রথম রাজনৈতিক মৃত্যু কাকে বলে জানলাম । সমীরণকাকুর নামে একটা শহিদবেদি তৈরি হয়েছিল আমাদের পাড়ায়। আমি সেই শহিদবেদির সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম। সেখানে সমীরণকাকুর নামটা বারবার পড়তাম । আর সন্ধে হয়ে এলেই কেমন একটা ভয় করত । মনে হত ওই শহিদবেদির পাথর থেকে বেরিয়ে এসে সমীরণকাকু আমার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। বলছে, নিজের সেরাটা খােয়াতে শেখ, তবেই তাে জিতবি। স্যাক্রিফাইস না করলে কি জেতা যায় ? ….
১৩ই এপ্রিল
মা নীলের ব্রত করত না। আমাদের মহল্লায় সবার মাকে দেখেছি, নির্জলা উপােস করে সন্ধ্যায় মন্দিরে গিয়ে বাতি জ্বেলে, শিবের মাথায় ডাবের জল, দুধ ঢেলে ব্রত ভেঙে বাড়ি ফিরতে। কিন্তু আমার মা এসব করত না। অনেকে মাকে জিজ্ঞেস করলেও মা কিছু বলত না। একদিন আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, সবাই নীলের ব্রত করে, তুমি করাে না কেন? মা আমার চোখে চোখ রেখে বলেছিল, যে পুজো শুধু ছেলে থাকলে করা যায়, মেয়ে থাকলে করা যায় না বা করতে নেই, তেমন পুজোয় আমার বিশ্বাস নেই। আমি আর কিছু বলতে পারিনি। তবু সবাই যখন নিজের ছেলের মঙ্গল কামনায় শিবের মাথায় গিয়ে জল ঢালত, আমার মনে হত মা একটু গেলে পারে ভাইয়ের ভালাের জন্য । ভাইকে অসম্ভব ভালােবাসতাম তাে। আমার থেকে প্রায় পাঁচ বছরের ছােট ছিল ভাই আর অসম্ভব দুরন্ত ছিল । ভাইয়ের একদম পড়াশােনায় মন ছিল না বলে বাবার খুব চিন্তা ছিল । তাও ভাবত একটু বয়স হলে বােধহয় সব ঠিক হয়ে যাবে । কিন্তু বয়স হলেই সবার সব ঠিক হয়।
আমি কলেজে ফার্স্ট ইয়ার, ভাইযের তখন ক্লাস নাইন । একদিন বাড়ি ফেরার সময় দেখি ভাই রাস্তায় দাঁড়িযে পেয়ারা পাতা চেবাচ্ছে। জানতে চাইলাম, কী করছিস? ভাই তাড়াতাড়ি থু থু করে মুখ থেকে পাতাগুলাে ফেলে দিয়ে ছুটে চলে গেল । কিছু বুঝতে পারলাম না । ঘটনাটা কাউকে বলিনি। পরে একদিন কলেজে শুনলাম একটা মেয়ে আরেকটা মেয়েকে বলছে, ‘সিগারেট খেয়ে বাড়ি ফেরার আগে পেয়ারা-পাতা চিবিয়ে নিলে গন্ধ থাকে না ।’ ভাই সিগারেট খাওয়া ধরেছে? ক্লাস নাইনে? খুব শকড হলাম । বাড়ি ফিরে ভাইয়ের পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে পেছন থেকে ভাইযের চুলের মুঠিটা খপাৎ করে ধরলাম । ভাই অন্য কিছু করছিল, পড়ছিল না, সেটা ওর মুখেই ফুটে উঠল। আমি কোনাে ভনিতা না করে জানতে চাইলাম, সিগারেট খাওয়া ধরেছিস করে থেকে? – তােকে কে বলল? – নিজের চোখে দেখেছি। – কোথায় দেখলি? – তর্ক করিস না। বল সিগারেট খাওয়া কবে থেকে ধরেছিস? বাবা মাকে বলব? একটা অদ্ভুত অ্যারােগ্যান্স নিয়ে ভাই বলে উঠল, ইচ্ছে হলে বলতে পারিস । আমার বয়সী অনেকেই খায় । আমিও খাচ্ছি ।
এভাবে তাে আমাদের বাড়িতে কেউ কথা বলে না । ভাই কেন বলছে? ওর কী হল? সেই মুহুর্তে ভাইয়ের কাছে নিচু হতে পারলাম না। কিন্তু রাতে ভাই যখন ঘুমােচ্ছে, ভাইযের ঘরে ঢুকে বারবার ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললাম, ভাই তুই সিগারেট খাস না । তােকে আমি ক্যাডবেরি খাওযাব । তুই যা যা খেতে চাস তাই খাওয়াব। কিন্তু সিগারেট খাস না ।
সিগারেটের পাশাপাশি ভাই আরাে অনেক কিছু খাওয়া ধরেছিল আমরা টের পাইনি। টের পেলাম যখন, অনেক দেরি হয়ে গেছে । আমাদের পাড়াতেই পুরনাে
| ভাই সেখানে যাওয়া শুরু করেছিল । একদিন ওই মদের আড্ডার পেছনের ঘরে একটা বােমা ফাটে । পুলিশ এসে যাদের ধরে নিয়ে যায় তাদের মধ্যে ভাইও ছিল । পুলিশের জিপ যখন আমাদের বাড়ির সামনে এসে থামল, পুলিশের দুটো লােক যখন বাড়িতে এসে খবরটা জানাল, মা পাথর হয়ে গেল পুরাে । বাবা বাড়িতে ছিল না । আমি সাহসে ভর করে জিপের পিছুপিছু থানায় গেলাম । গিয়ে দেখলাম লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে সবাইকে। ভাইযের বয়সী, ভাইযের থেকে বড়, অনেকগুলাে ছেলে । তাদের কাউকে কাউকে না চিনলেও এই বিটু, বুড়াে কিংবা ফুচানকে আমি ভাইয়ের সঙ্গে অনেকবার দেখেছি। থানার অফিসার বাবাকে চিনতেন । তিনি আমাকে আলাদা করে ডেকে বললেন, আমি বুঝতে পেরেছি আপনার ভাই একটা কুসঙ্গে পড়ে গেছে । শুনুন, আপনি এখানে দাঁড়িয়ে শুধু বলবেন, আপনার ভাই এদের কাউকে চেনে না । এরা আপনার ভাইকে জোর করে দলে ভিড়িয়েছে। আপনার কথার ভিত্তিতেই ওকে আমরা ছেড়ে দেব । আপনাদের ভদ্র পরিবার, বুঝতে পারছি আপনারা কী অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন ।
বাবা অফিসের কনফারেন্সে গেছে লক্ষ্ণৌ, মা পাথরের মতাে বসে আছে ঘরে আর আমি থানায় । আমার একটা কথার ওপর নির্ভর করছে ভাইযের মুক্তি পাওয়া না পাওয়া। সেই সময় মাথাটা দুলে উঠল। চোখ বন্ধ করে সামনে সমীরণকাকুকে দেখতে পেলাম । আমার মনে পড়ল আমাকে তাে এখন একটা স্যাক্রিফাইস করতে হবে। আমি যদি ভাইকে আজকে এভাবে ছাড়িয়ে আনি, ভাই আবার সাতদিন পরে ওই চোলাই মদের ঠেকে, ওই বােমা বাঁধা ছেলেগুলাের সঙ্গে গিয়ে ভিড়বে । তার চেযে ভাই একটু শাস্তি পাক, আমার বুকের পাঁজরটা একটু ভাঙুক। তা হলেই তাে আল্টিমেটলি আমরা জিতব। ভাই ওই খারাপ সঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। আমি গিয়ে দাঁড়ালাম ওই ঘরটায় যেখানে ভাই আরাে আট দশটা ছেলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে । ভাই আমার দিকে তাকাল || সেই চোখের চাউনিতে, একটা আকাশে ওড়া পাখিকে খাঁচায় আটকে রাখলে সে যেভাবে তাকায়, তার প্রতিচ্ছবি । আমিও ভাইয়ের চোখে চোখ রাখলাম । আর ওই বিটু, বুড়াে, ফুচান সবার ওপর দিয়ে চোখ বােলাতে বােলাতে বললাম, আমার ভাইয়ের এরা বন্ধু স্যার । আমার ভাই এদের সঙ্গে মিশত, হয়তাে জেনেই মিশত, হয়তাে ও কোনাে দোষ করেনি, তবু ওদের যদি থানায় আটকে রাখেন, তাহলে আমার ভাইকে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না । ভাই ডুকরে চিৎকার করে উঠল, দিদিভাই…
আমি ভাইযের সেই ডুকরােনাে কান্নাটা শুনতে পেলাম না। আমার কানে তখন সমীরণকাকুর হাসিটা বাজছে। জিততে হলে স্যাক্রিফাইস করতে হয় রে ।
তিনদিন লকআপে থেকে ভাই ফিরে আসার পর বাড়িটা আগের মতাে রইল না। যে মা নীলের ব্রত করত না, কারণ সেটা ছেলে আর মেয়ে দুজনের জন্যই একসঙ্গে করা যায় না, সেই মা কোনাে যুক্তি না শুনে ভাইয়ের পক্ষ নিয়ে আমার ওপর প্রচণ্ড রেগে গেল । মায়ের মনে হল আমি নাকি ভাইকে হিংসে করি | তাই থানায় দাঁড়িযে ভাইয়ের বিরুদ্ধে বলে এসেছি। আমার জন্যই ভাই আজ জেল খাটা আসামি হয়ে গেছে । আমি বারবার করে বােঝাতে চাইলাম, আমি ভাইকে ভালােবাসি। কিন্তু বােঝাতে পারলাম না । ভাই যদি সত্যি খারাপ হয়ে যেত, ভাই যদি বদসঙ্গে পড়ে দশ বছর জেলে যাওয়ার মতাে কোনাে কাজ করত? তার থেকে এই যে তিনদিন শাস্তি পেয়ে এল এটা অনেক ভালাে হল না, আখেরে? বলতে গেলাম কিন্তু মা আমায় একটা দাবড়ানি দিয়ে থামিয়ে দিল ।
বাবার নেশা ছিল ছবি আঁকা। রাতে অফিস থেকে ফিরে কিংবা যে-কোনাে ছুটির দিনে, আমাদের দেড় তলার ঘরটায় ঢুকে বাবা কীরকম যেন একটা ঘােরের মধ্যে চলে যেত, ক্যানভাসের ওপর ব্রাশের দাগ দিতে দিতে । সেই সব ছবি আমি কিছু বুঝতে পারতাম, কিছু বুঝতে পারতাম না। একটা ছবির কথা মনে আছে, বুদ্ধদেব বসে আছেন, পায়ের সামনে একটা গাছ । আর গাছটার ডালপালা অসংখ্য শিশুর হাত হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে আছে । ভয় লাগছিল ছবিটাকে দেখে । বাবা আমায় বুঝিয়েছিল, সারা পৃথিবীর অসংখ্য লােক তাে খিদের থেকে মুক্তি পায়নি। তাহলে বুদ্ধদেব একা কেন পাবেন? সুজাতার পায়েসও ভাগ করে নিতে হবে । আবার যদি ভাগ করে নিতে হয়, পাপ ভাগ করে নিতে হবে না? ভাই তাে কিছুটা হলেও দায়ী ছিল যে ঘটনাটা ঘটেছে তার জন্য । শাস্তি পাবে না? বাবাকে কথাগুলাে বলতে বাবা চুপ করে শুনল, মায়ের মতাে চেঁচিয়ে উঠল না কিন্তু সাপাের্টও করল না আমাকে । ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলাম, আমি একটা বন্দরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছি আর একটা জাহাজ এসে সেই বন্দরে ঢুকতে পারছে না । জাহাজের ব্যালকনিতে দাঁড়িযে ভাই হাত-পা নেড়ে কী বলছে আমি বুঝতে পারছি না। আমি ক্রমাগত বলে যাচ্ছি, একটু দাঁড়া, ড্রেজিং না করলে জাহাজটা এখানে ঢুকতে পারবে না । কিন্তু জাহাজটা দাঁড়িয়ে রইল মাঝসমুদ্রে, আমি কিছুতেই বন্দরটা এমন করতে পারলাম না, যেখানে ভাই এসে ভিড়তে পারে ।
ভাইকে হােস্টেলে ভর্তি করে দিল বাবা । হােস্টেলে কয়েক মাস থেকে ভাই যখন বাড়িতে এল, তথন ও আপাত শান্ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে চরম উদ্ধত ।। আমার সঙ্গে ঝগড়া করত না, খারাপ ব্যবহারও না, কিন্তু আমি বুঝতে পারতাম ও আমাকে ঘেন্না করে । কোথাও পড়েছিলাম, সম্পর্ক মরে । কিন্তু সে মৃত্যু কীরকম? আমি তাে মৃত্যু বলতে সমীরণকাকুকে কাঠের চিতায় দেখেছি। চিতা জ্বলে উঠতেই, আকাশটা অসম্ভব নীল, আর তার নিচে একদম লাল আগুন । সেই আগুনটা অনেকক্ষণ দেখেছিলাম । ভাইয়ের সামনে দাঁডিযে, বাড়ির পাল্টে যাওয়া পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িযে, আমার মনে হল ওই আগুনটা সম্পর্কের গায়েও লাগে । খুব ইচ্ছে করত আগেকার অবস্থায় ফিরে যেতে । যখন অনেক লােডশেডিং হত আমাদের মহল্লায় আর একটা হ্যারিকেন জ্বালিয়ে, গােল হয়ে আমরা বসতাম। যেখানে ডিনারে গরম ভাতের সঙ্গে, মুসুরির ডাল আর ডিমের ঝােল, অমৃতের চেযেও সুস্বাদু ছিল।
ভাই হােস্টেলে ফিরে যাওয়ার কয়েকদিন পর থেকেই মায়ের শরীর খারাপ শুরু হল । একটা জ্বর আসতে শুরু করল, সঙ্গে কাশি, বুকে ব্যাথা।বাবা দুতিনজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল । কিছু ধরা পড়ল না । শেষমেষ একটা ছুটির দিনে বাবা আর মা কলকাতা গিযে রাতটা থেকে গেল । আমি বাড়িতে একদম একা সেই রাতটা । সারারাত পায়চারি করে বেড়ালাম। সেই রাতটাতে প্রথম আমার মনে হল, ঘরের ভেতরে যেমন একটা চোরাকুঠুরি থাকে, মনের মধ্যেও বােধহয় থাকে। সেই চোরাকুঠুরির ভেতর থেকে কে যেন বেরিয়ে এসে আমার সামনে হাসতে লাগল, আমাকে জাপটে ধরতে থাকল, ভয় দেখাতে লাগল । পরদিন দুপুরে বাবা আর মা ফিরে এল । দুজনেরই মুখ অসম্ভব থমথমে । আমি একাই দুপুরে খেলাম। ওরা কেউ খেল না, বলল যে খেয়ে এসেছে। সন্ধ্যের দিকে বাবার একজন বন্ধু বাড়িতে এল। তার সঙ্গে ফিসফিস করে কীসব আলােচনা হল । আমাকে কিছু বলা হলেও, কয়েকদিনের মাথায়, আমার কাছে লুকনাে রইল না, মায়ের যা হয়েছে সেটা সম্ভবত ক্যানসার। – আমি মরে গেলে তুমি একা বাঁচতে পারবে? মা একদিন জিজ্ঞেস করল আমাকে । – তুমি মরে যাবে কেন? – আমার কী হয়েছে তুমি জানাে? – হয়েছে কিনা সেটা তাে এখনাে ফাইনাল ন্য। – প্রায় ফাইনালই । এখনাে পর্যন্ত যা রিপাের্ট তাতে আমার অবস্থা ভালাে না । এবার আমি যদি না বাঁচি, তুমি নিজেকে ঠিক রেখে তােমার বাবাকে দেখতে পারবে না? ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কটা আবার স্বাভাবিক করে নিতে পারবে না? মা থেমে থেমে কথা বলছিল। আমি মাকে জড়িয়ে ধরতে গেলাম, কিন্তু আমার ভেতরের ওই চোরাকুঠুরির মেয়েটা বেরিয়ে এল । সেই মেয়েটা আমাকে আটকে রেখে বলল, দুরত্বটা থাকা ভালাে । এর কয়েকদিন পরে মায়ের সঙ্গে আমিই গেলাম হাসপাতালে । বাযাপসির জন্য মাকে ব্লাউজ খুলতে হল। তারপর ব্রা । মাকে টেবিলের ওপর শুইয়ে দিয়ে একটা গর্তের মধ্যে মায়ের বুকটা প্লেস করে দিল ওরা । একজন ডাক্তার সেই টেবিলটার সামনে দাঁড়িয়ে একটা সূঁচ মাযের বুকে ফুটিযে দিচ্ছিল দু’বার-তিনবার। ওটা নাকি পেন কিলার । আমি দেখতে থাকলাম সমস্ত কিছু । দেখতে দেখতে একবার কেঁদে উঠলাম ।
একটা নার্স আমার হাতটা ধরে বলে উঠল, এখানে না ।
সেদিন মায়ের বুকে একটা বরফের প্যাক দিয়ে মাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হল। তারপর আরও একদিন মায়ের সঙ্গে আমাকে যেতে হল । আর দেখতে ডাক্তার মায়ের বুকে হাত দিয়ে, আঙুল দিয়ে টিপে বুঝতে চাইছে, কোথাও কোনাে গ্রোথ আছে কি না। দেখার সময় ডাক্তারবাবু মাকে বারবার জিজ্ঞাসা করছিল ‘ব্যথা লাগছে?’ আচ্ছা অত জোরে যদি কেউ টেপে ব্যাথা লাগবে না? বারবার ভাবছিলাম, মা বলবে যে ব্যাথা লাগছে । কিন্তু মা বলল না কিছু । সেদিনই পাকাপাকি জানা গেল মায়ের ব্রেস্ট ক্যানসার। পজিটিভ এসেছে রিপাের্ট। পজিটিভ’ শব্দটার সাথে এত খারাপ কিছু জড়ানাে থাকে, আগে জানতাম না। মা পজিটিভ মাযের ব্রেস্ট ক্যানসার। থার্ড স্টেজ। ক্রিটিকাল কন্ডিশন।
সেই চোরাকুঠুরির মেয়েটা এবার প্রতি রাত্রে আমার সামনে বেরােতে লাগল । তার যেন দশটা হাত | কুড়িটা মুখ । সে আমার ভেতরে থেকে আমারই রক্ত খাবে বলে এগিয়ে আসতে লাগল । আমি তাকে কিছুতেই ফেরাতে পারলাম না । মা অসুস্থ থেকে আরাে অসুস্থ হতে লাগল । আর আমার ক্রমাগত মনে হতে থাকল নীল আকাশের নীচে লাল আগুনটা আবার একবার জ্বলে উঠবে । আমার ছেলেবেলাটা আমার চোখের সামনে শেষ হয়ে যাচ্ছিল। ভাই এল, মাকে দেখতে, একদিন ছুটি নিয়ে। ভাইকে নিয়ে মা বেড়াতে বেরলাে, আমাকে নিয়ে গেল না সঙ্গে। আমি একাই থাকলাম বাড়িতে । না একা নয়, সেই চোরাকুঠুরির মেয়েটা তাে কাছেই ছিল । ওর সঙ্গে কথা বলতে থাকলাম। ওর থেকে বুঝতে চাইলাম কেন আমার পৃথিবীটা পাল্টে যাচ্ছে। বুঝতে পারলাম।
মায়ের কেমাে শুরু হল । কেমাে নিযে যখন ঘরে আসত মায়ের কোনাে সেন্স থাকত না । আমি মায়ের কাছে গিয়ে কত গল্প বলে যেতাম, মা একটা আধাে ঘুমে শুনত । আমাদের বাড়িতে একজন সবসময়ের কাজের লােক রাখা হল । বাড়ির সমস্ত কাজ সে করত । আর আমি কলেজ যাওয়ার পথে, ফেরার পথে, বুঝতে চাইতাম মায়ের যন্ত্রণাটা ঠিক কোথায় ।
ওই সময়টা মাঝেমাঝেই রাতে পিসির বাড়িতে থেকে যেতাম । হাসপাতাল থেকে নানান রকম রিপাের্ট তােলার থাকত, দেখাতেও হত । একদিন হাসপাতালে যাওয়ার পথে অটোতে আমার পাশে বসা একটা লােক জোরে আমার বুকটা মুচড়ে দিল । মুচড়ে দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল যেন বীরের কাজ করেছে । আমার লােকটাকে চড় মারা উচিত ছিল, গলা টিপে ধরা উচিত ছিল। কিন্তু ভেতরের মেয়েটা বেরিয়ে এসে বলল ‘ও তাে তােমাকে শুধু জানাতে চাইছে
তােমার মায়ের বুকে যখন সূঁচ ফোটায় কেমন লাগে ।’ কুঁকড়ে গেলাম, মাথা নিচু করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলাম । লােকটা সেটাকে প্রশ্রয় ভেবে নিয়ে আমি অটো থেকে নামার আগে আরাে একবার জোরে টিপে দিল আমার বুক । অসম্ভব ব্যথা করতে লাগল । সেই ব্যথা নিয়েই কলেজে গেলাম। মনে হতে থাকল পৃথিবীর কোনাে সুখ যেমন একার হতে পারে না, কষ্ট কিংবা ব্যথাও নয়। মায়ের ব্যথা তাই আমার মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছে। রাতে যখন বাড়ি ফিরেছি। তথনাে ব্যথাটা যায়নি আমার শরীর থেকে। তার পরদিনই মায়ের বাড়াবাড়ি শুরু হল । মাকে হসপিটালাইজড করতে হল। জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন করতে হবে বলে জানানাে হল, হাসপাতাল থেকে। বাবা একদিনের মধ্যে টাকা জোগাড় করল কিন্তু অপারেশন টেবিলেই কোলাপস করে গেল মা ।।
মাকে ইলেক্ট্রিক চুল্লিতে দেওয়া হয়েছিল আকাশের নীচে চিতা জ্বলে ওঠার দৃশ্য আর দেখতে হয়নি আমাকে। শুধু ভাই যখন মাযের শরীরের ভস্মাবশেষ গঙ্গায় ভাসিয়ে দিচ্ছিল তখন ভাবছিলাম, আস্ত একটা শরীর এভাবে একমুঠো ছাই হয়ে যায়? বাড়ি ফিরে মায়ের পুরােনাে ব্লাউজগুলাে নাড়াচাড়া করছিলাম, গাযে দিয়ে দেখছিলাম আর মনে পড়ছিল মায়ের কথা, ‘ওগুলাে আর গায়ে হয় না। যে ব্লাউজ বুকে আঁটত না বলে বাতিল হয়ে গেল, সেও থাকল আর এমন অসুখ হল বুকে যে মাকেই মিলিয়ে যেতে হল পৃথিবী থেকে? এত সামান্য হয়ে যেতে হল যে একটা ছােট্ট মাটির মালসায় এঁটে গেল মায়ের পুরােটা? মায়ের মৃত্যু আমাদের সংসারটাকে একদম তিনটে দ্বীপে ভাগ করে দিল যার কারাের সঙ্গে কারাে তেমন যােগাযােগ নেই। যে বাবা আমার অনেকখানি ছিল, সেও একটা দুরের দ্বীপের মতাে আমার দিকে তাকিয়ে থাকত । ভাই আমার প্রতি ঘেন্না নিয়ে আরাে অনেক দূরে। আর আমি একদম একা । সঙ্গী শুধু ভেতরের মেয়েটা ।
মায়ের মৃত্যুর পর কী করতাম আমি জানি না, আমার তাে মনে হত সব স্বাভাবিকই, কিন্তু বাবার মনে হত, আমাদের বাড়িতে যে কাজ করত সেই রান্নামাসির মনে হত, আমার আচরণ নাকি স্বাভাবিক নয় । আমি একা একা কথা বলতাম, একদিন নাকি ঘরের একটা পুতুলের গলা টিপে ধরেছিলাম । আমায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হল । আমাকে নানান প্রশ্ন করল ডাক্তার, তারপর শুনলাম আমার একটা অসুখ হযেছে । রেজিস্ট্যান্ট স্কিজোফ্রেনিয়া । এতে কিছুক্ষণের জন্য আইডেনটিটি লস পর্যন্ত হতে পারে। অসম্ভব ভালােবাসি যাকে, তাকেও নাকি মেরে ফেলতে পারি । ব্যস, আমার জন্য দুটো ওষুধ বরাদ্দ হয়ে গেল । রােজ ওই দুটো ওষুধ আমাকে খেতে হত । কোথাও কেউ আমাকে দেখে বুঝতে পারত না, আমি হাসতাম, গল্প করতাম, গান গাইতাম। কিন্তু আমি জানতাম যে আমি একটা বস্তুতে পরিণত হয়েছি যার রেসিস্ট্যান্ট স্কিজোফ্রেনিয়া আছে । কিসের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্যান্ট ? আমি তাে রেজিস্ট করতে চেয়েছিলাম সমীরণকাকুর খুন হয়ে যাওয়া, মায়ের মৃত্যু, অটোতে আমার বুকে হাত দেওয়া ওই লােকটাকে, মায়ের বুকে ঢুকে যাওযা সূঁচটাকে । কিচ্ছু রেজিস্ট করতে পারিনি । পৃথিবীতে কিচ্ছু রেজিস্ট করা যায় না। যা ঘটার তা ক্রমাগত ঘটেই যায় । আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িযে সহ্য করতে থাকি । সহ্য করতে
করতে রেজিস্ট্যান্স জন্ম নিল? সেই রেজিস্ট্যান্সকে রেজিস্ট করতেই আমায় ওষুধ খেয়ে যেতে হবে? সকালে ভাত খাওয়ার সময়, রাতে রুটি খাওয়ার সময়, রাস্তায় দাঁড়িযে ফুচকা খাওয়ার সময়, আমি মনে রাখতাম ওই ওষুধ দুটোর নাম, যা ভুলে গেলেই আমি নিজে মরে যাই না যাই, কাউকে মেরে ফেলতে পারি।
সময় থেমে থাকে না। বাবা দ্রুত অনেকটা বুড়াে হয়ে গেল। বাবার সঙ্গে আমার সমস্ত কথা একটা জায়গায় গিয়ে থেমে গেল। আমি আমার জীবনটার দিকে এমনভাবে তাকাতে শুরু করলাম যেন ছােটবেলায় দেখা ট্রেজার আইল্যান্ড। সেখানে কত খেলনা, মায়ের কিনে দেওয়া জামা, ভাইয়ের পাশে দাঁড়িযে তােলা ফটো । সেই ট্রেজার আইল্যান্ড’এর জন্য আমার কষ্ট হত, কিন্তু আমি আর কাঁদতে পারতাম না। ওই দুটো ওষুধ আমার ভেতরের স্কিজোফ্রেনিয়ার পাশাপাশি কান্নাকেও দমিয়ে দিয়েছিল । আমি একেবারে একটা স্বাভাবিক মানুষের মতাে বাড়ি ফিরতাম, নিজের কাজ করতাম, রাতে ঘুমােবার আগে বাবার। সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম । বাবা আমার মুখের দিকে চোখ তুলে জিজ্ঞেস করত, ওষুধ খেয়েছ? আমি বাবার দিকে তাকিয়ে ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলতাম।। তারপর জিজ্ঞেস করতে চাইতাম, তুমি নতুন কোনাে ছবিতে হাত দিয়েছ? কোনাে কথা ফুটত না আমার মুখে। কোনাে রং বেরােত না বাবার হাত দিয়ে ।
ক্রমশ…
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।