সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে শাশ্বতী নন্দী (পর্ব – ১)

নিশিভোর

পর্ব – ১

আজ আকাশ নীল আর সাদাতে মাখামাখি। জানলার বাইরে সুন্দর ক্যানভাস। নিজের চেম্বারে কাচের জানলাটা হাট করে খুলে দিল গৌরী। এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস হুড়মুড় করে ঢুকে আসে ভেতরে। বাতাসে শিউলি গন্ধ। আহ্‌! শরত আসছে, বড় প্রিয় ঋতু ওর।
মোবাইল বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। ট্রু কলারে এক্স এক্স এক্স। কে এটা? ধরতে গিয়েও থমকে যায় গৌরী। অপারেশন ‘ব্লু হেভেন’ শুরু হতে যাচ্ছে। এখন সে  সতর্ক। কলটা ধরা কি ঠিক হবে?
দোলাচলের মধ্যে ফোন কেটে যায়। কয়েক সেকেন্ডের বিরতি। আবার বেজে উঠল। ও রিসিভার তুলতেই কানে একটা ফ্যাসফ্যাসে পুরুষ কন্ঠ, ‘ম্যাম, আপনার অ্যাকশন প্ল্যানটা যে বাতাসে ভাসছে’।
-মানে ? কে, আপনি?
ফোন কেটে গেল।
শুরু হল অস্বস্তি। কার ফোন ছিল? অ্যাকশন প্ল্যানের কথা কেন তুলল? একটু অন্যমনস্ক দেখায় গৌরীকে।
এ রাজ্যে সেই প্রথম মহিলা আইপিএস, যাকে এত বড় দায়িত্ব দেওয়া হল হেড কোয়াটার্স থেকে। শিবশম্ভুর  মতো এক প্রতাপশালী সাধু বাবা, তাকে যেভাবেই হোক ধরা চাই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। স্বঘোষিত এক ধর্মগুরু এই শিবশম্ভু। ভক্তের সংখ্যা লাখ। মানুষকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করে সে নাকি শিষ্যত্ব গ্রহণ করাত। তা ভালোই গুছিয়ে নিয়েছিল তার কারবার, হঠাতই জড়িয়ে পড়ল তারই আশ্রমের দুই সন্ন্যাসিনীর ধর্ষণ ও খুন কান্ডে। এরপরই সে পলাতক। গৌরী সিনহা, অ্যাসিসটেন্ট কমিশনার অফ পুলিশ, ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট, এখন তাই বাবাজী পাকড়াও অভিযানে নামছে। অপারেশন ব্লু হেভেন সে কারণে গঠিত।
উড়ো ফোনটা তার মনকে এলোমেলো করে দিল। তড়িঘড়ি একটা হলুদ ফাইল টেনে নামায় সে আলমারি থেকে। নিজেই। তন্ন তন্ন করে খোঁজে অ্যাকশন প্ল্যান। নেই তো। ভ্রুতে উঁচু নীচু গ্রাফ। কোথায় গেল এত গুরুত্বপূর্ণ একটা ডকুমেন্ট!
সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারকম তোলে। সাব ইন্সপেক্টর রোহিতকে খুঁজল, কিন্তু সে সিটে নেই। অগত্যা ল্যাপটপে নিজেই একটা ভিডিয়ো অন করে। মাস খানেক আগের তোলা একটা ভিডিয়োগ্রাফি। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জোগাড় করতে হয়েছে। স্বয়ং ডি জি সাহেব হাতে তুলে দিয়েছেন। মানুষটা তাকে বড় ভরসা করেন।
ভিডিয়োতে আশ্রম রেইড করার একটা গোটা ক্লিপিংস ধরা আছে। দার্জিলিং থেকে কয়েক কিলো মিটার দূরে ঝিলমিলপুরে বাবাজীর সেই আশ্রম। যদিও পুলিশ অভিযানের খবর পেয়ে সেদিনও বাবাজী খাঁচা খুলে পালিয়েছে।
গৌরী স্ক্রিনের দিকে তাকায়। ফুটে উঠছে ছবি। বিশাল প্রাসাদ, চতুর্দিক আয়নায় মোড়া। একটা শ্বেত পাথরের ফলকে লেখা ‘শান্তিবন’।
শান্তিবনের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে ক্যামেরা। দামি আসবাব, সোফা, জানলায় আধুনিক ডিজাইনের পর্দায় সাজানো বিলাসবহুল ঘর। মেহগনি কাঠের কয়েকটা আলমারি। প্রত্যেকটার পাল্লা খুলতেই বেরিয়ে আসছে থরে থরে সাজানো বাবাজীর রঙ বেরঙের জমকালো পোশাক, কয়েক শো জুতো আর নানা রঙের টুপি। একটা লকারে বাক্স বাক্স লেবেল বিহীন ওষুধ। এরপর আর এক দফা চমক। এক ব্যাগ ভর্তি কন্ডোম, গর্ভনিরোধক বড়ি।
মাই গড! বিড়বিড় করে গৌরী। সঙ্গে সঙ্গে ক্লিপিংসটা ‘পজ’ টিপে থামিয়ে দেয়। ঘরের মধ্যেই পায়চারী করে অস্থির ভাবে, দু হাত পেছনে।
অ্যাকশন প্ল্যানের অরিজিনালটা এভাবে উধাও, ব্যাপারটা কি খুব স্বাভাবিক? এর কোনও কপি আছে কি রোহিতের কাছে? ওহ্‌, ছেলেটা কোথায় যে যায়? টিফিনে, এতক্ষণ! মোবাইলে ধরবে? না, থাক।
কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পেপারটা গায়েবই বা হল কীভাবে? এই ফাইল তো আলমারি বন্দীই থাকে, তাও নিজের চেম্বারে।
আবছা কিছু যেন মনে পড়ল হঠাৎ। গত শুক্রবার ফাইলটা সঙ্গে নিয়ে সে বাড়ি ফিরেছিল না! শনি রবি, ভেবেছিল খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো স্টাডি করবে। কিন্তু দু দিনই হেড কোয়ার্টাসের ডাক, স্বয়ং মন্ত্রী এসেছেন। সোমবার ফাইলটি আবার যথারীতি গাড়ি চেপে ব্যাক টু অফিস। তাহলে কি বাড়ি থেকেই …! কিন্তু বাড়িতে তো তার ফাইলে হাত দেবার কেউ নেই।
বেখাপ্পা একটা চিন্তা জবরদস্তি চেপে বসল মাথায়। অনুভবের নজরে পড়েছিল কি ফাইলটা? যদিও স্ত্রীর ব্যাপারে সে ইদানিং নিষ্পৃহ, কিন্তু গৌরী জানে, সেই নিষ্পৃহতা একটা ভান মাত্র।
অনুভব নিজেও তো একজন দুঁদে আই পি এস, এবং যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ জায়গা সামলাচ্ছে, কিন্তু স্ত্রীর উন্নতির ব্যাপারে … না, না, তা বলে একেবারে অ্যাকশন প্ল্যানটাকে লোপাট করে দেবে? ভুল হচ্ছে না তো কোথাও?
আসলে পরিস্থিতিই তাকে বাধ্য করছে এসব চিন্তা করতে। যেদিন ব্লু হেভেন মিশনের দায়িত্ব পেল গৌরী সিনহা, রাতারাতি যেন ঘরে বাইরে বোঝাই শত্রু তৈরি হল। সকলের মুখে এক কথা। বাঘা বাঘা সিনিয়র আই পি এস টপকে শেষে কিনা শীর্ষে এক মহিলা অফিসার!
অস্বীকার করে লাভ নেই, দিন কয়েক সেও নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে। কেসটা যে যথেষ্ট জটিল, বুঝতে এতটুকু অসুবিধা হয় নি।
গৌরী পায়চারী থামিয়ে চেয়ারে এসে বসে। আবার চালু করে ভিডিয়ো। ক্যামেরার ফোকাসে এবার একটা গুদাম ঘর। ওখানে ডাই করা রাখা ধারালো অস্ত্র সস্ত্র, ২টি এ একে ৪৭, একটি পিস্তল, পেট্রল বোমা।
মনিটরে চোখ গেঁথে থাকে গৌরীর। উত্তেজনায় শরীর কাঁপছে। একটা ধর্মস্থানে এত অস্ত্র! ক্যামেরা ছুটছে এবার অন্ধকার এক কোণের দিকে। ধাপে ধাপে নেমে গেছে সিড়ি। সিঁড়ির শেষে একটা সুরঙ্গ পথ।  ঠিক তখনই ঝিরঝির শব্দ করে স্ক্রিনটা ঝাপসা হয়ে যায়। ইস্‌, এ জায়গাতেই ছবিটা কেটে গেল!
না, মিনিট খানেকের মধ্যে ফিরে এসেছে ছবি। ক্যামেরা ছুটছে আশ্রম ক্যাম্পাসের বাইরে। চমকের পর চমক। এ তো নিছক আশ্রম নয়। রীতিমত শহর একখানা। হোটেল, সিনেমা হল, স্কুল, রেস্তোরা, মাল্টি স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল, স্টুডিও, বায়ো গ্যাস কারখানা, পেট্রোল পাম্প, কী নেই ভেতরে?
আবার ঝিরঝির করতে করতে স্ক্রিন কালো হয়ে আসছে। গৌরী বিরক্তিতে ল্যাপটপ বন্ধ করে। মাঝে মাঝে কয়েকটা বিশেষ জায়গায় ছবিটা এমন ঝাপসা হয়ে উঠছে কেন? মনটা খচখচ করছে। ইচ্ছাকৃত ভাবেই কি কয়েকটা দৃশ্যকে ব্লার্ড করে দেওয়া হয়েছে? কে করবে এমন কাজ?
খটকা লাগছে। যে অফিসারের তত্ত্বাবধানে এই রেইডটা হয়েছিল, তাকে খোঁজ করতে চেয়েছিল গৌরী। কিন্তু ডি জি সাহেব জানালেন, তাকে নতুন চার্যে অন্য জায়গায় বদলি করা হয়েছে। কেন? এ প্রশ্ন অবশ্য সে বড় সাহেবকে করতে সাহস পায় নি।
একটা কথা বার বার মনে হতে থাকে তার।  বাবাজীর এত ধন সম্পত্তি শুধুমাত্র ভক্তদের কৃপায়! উঁহু, অসম্ভব। কোনও লম্বা হাতের সাহায্য অবশ্যই আছে।
খবর নিয়ে জানা গেছে, এই বাবাজী নেহাতই এক প্রত্যন্ত গ্রামের দিন আনি দিন খাই পরিবারের ছেলে ছিল। রুজির সন্ধানে কলকাতায় আসা, ঘোরাঘুরি, নানা অসামাজিক ক্রিয়াকলাপে যুক্ত হওয়া, পুলিশের হাতে ধরা পড়া, হাজতবাস, তারপর রেহাই। অনেককাল লোকচক্ষুর আড়লেও ছিল। হঠাতই একদিন ফিরে এল, বাবাজী রূপে। ব্যস, তারপরই ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেল। বাবাজীর প্রবচন শুনতে জমায়েত হত শয়ে শয়ে লোক। ভক্তের ঢল বেড়েই চলে।
ইন্টারকম বেজে উঠল। চমক ভাঙে গৌরীর। রিসিভার তুলতেই ওপাশে রোহিত, ‘ম্যাডাম, খোঁজ করেছিলেন আমাকে? আসব ?’
-হ্যাঁ, প্লিজ। আর শোন, আমাদের ব্লু হেভেন অ্যাকশন প্ল্যানের একটা কপি থাকলে, সঙ্গে এনো।
মিনিট দশ পেরিয়ে গেছে। রোহিতের পাত্তা নেই। কী খুঁজছে এত? কপিটা আছে, না নেই? সে উঠে আবার আলমারি হাতড়ায়, যদি কাগজের ভিড় থেকে বেরিয়ে আসে অরিজিনাল পেপারটা।
অনুভবের কথা বার বার মনে আসছে কেন? নিজেকে শাসন করে গৌরী। কেন এভাবে ওকে কাঠগোড়ায় দাঁড় করাচ্ছে বার বার? হ্যাঁ, স্ত্রীর ব্যাপারে ও জেলাস, হয়তো এটা খুব কমন ফ্যাক্টর পুরুষের মধ্যে, বিশেষত, একই পেশায় যুক্ত থাকলে।
কাগজের স্তূপ ঘাঁটতে ঘাঁটতে বেরিয়ে এল একটা ফোল্ডার, পৃষ্ঠা ওল্টাতেই ‘শুধুই সত্য’ পত্রিকার কয়েকটা কাটিং। গৌরী ঝুঁকে পড়ে তার ওপর। ফোল্ডারের ওপর একটা ফোন নম্বর ছোট্ট করে লেখা। কার এটা? একটু দোনামোনা করে সে নম্বরটা ধরেই ফেলে। একজন মহিলার গলা। সুমনা। নিজের পরিচয় দিল পত্রিকার সম্পাদিকা বলে।
গৌরীও নিজের পদের উল্লেখ করে কথা শুরু করে। সুমনার গলা বেশ ব্যক্তিত্বপূর্ণ। হেসে বলে, ‘হ্যাঁ, আমরাই প্রথম প্রকাশ করি খবরটা। হেডিং করেছিলাম, বাবাজীর আশ্রম বাগানের মাটিতে পোঁতা আছে বহু লাশ’।
-এতে সত্যতা কতখানি? মানে আপনারা প্রমাণ ছাড়াই কি রিপোর্টিং করেছিলেন?
হাসল সুমনা, -সাংবাদিকতায় আছি বহুদিন।  অতটা কাঁচা খেলোয়ার নই। পর পর কয়েকজন ভক্তকে জেরা করেছিলাম। বেশির ভাগই এড়িয়ে যাওয়া পার্টি। শেষে একজনকে ভয় দেখালাম। অনেক ধানাই পানাইয়ের পর স্বীকার করল, খবরটা সত্যি। তারপরেই একটা জম্পেশ গল্প দিল। মৃত্যুর পর অনেকেই নাকি চায় এই আশ্রমের মাটিতে সমাহিত হতে। তাই ওখানে কিছু মৃতদেহ …
-কাদের দেহ ওখানে পোঁতা? – দ্বিতীয় প্রশ্ন করে গৌরী।
-ওখান থেকেই একটা সাংঘাতিক খবর আমরা কালেক্ট করেছি, এবং সেটা অথেনটিক। আশ্রমে বাবাজীকে ঘিরে থাকত মধ্য বয়সী সব শিষ্যারা। পরনে সাধ্বীদের মতো দুধ সাদা রঙের পোশাক, খোলা চুল। একেক দিন একেক জন শিষ্যাকে বাবাজী ‘পবিত্র’ করার মহান দায়িত্ব পালন করত।
-হোয়াট! পবিত্র মানে?’
-সিম্পল, ধর্ষণ করা হত শিষ্যাদের। বাবাজী যখন ধর্ষণ করত, নিজেকে নাকি দেবতা বলে দাবি করত। বলত যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তিনশো ষাট জন গোপিনীর সঙ্গে প্রতিদিন লীলাখেলায় মেতে থাকতেন। তবুও কৃষ্ণ সকলের কাছে ভগবান। সুতরাং তাকেও যেন দেবতার মর্যাদায় দেখা হয় এবং আত্মসমর্পণ করা হয়।
ফোনটা ছেড়ে দিয়েই ফোল্ডারটা বন্ধ করে দেয় গৌরী। সমস্ত শরীরে যেন কেউ গরম লাভা ঢেলে দিয়েছে। অজান্তেই মুঠো শক্ত হয় আসে।
তখনই দরজায় উঁকি দেয় রোহিত, ‘মে আই কাম ইন ম্যাডাম?’
-এস। পেয়েছ কপিটা? – হাত বাড়ায় গৌরী। – লট অফ থ্যাক্সস। – বোস, কথা আছে।
চেয়ার টেনে বসল রোহিত। -অরিজিনালটা কি … বলতে বলতে থেমে যায় সে। বাকি কথা তার দৃষ্টিতে আটকে। -না, মানে ওটা হারিয়ে গেলে কেলেঙ্কারি, ম্যাডাম’।
সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল রোহিতের দিকে। বছর বত্রিশ তেত্রিশের ঝকঝকে যুবক, সাব ইন্সপেক্টর অফ পুলিশ হয়ে ঢুকেছে। বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, তবে বাইরেটা শান্ত।
কপিটা হাতে নিয়ে খুব মন দিয়ে দেখতে থাকে গৌরী। খুব ঠাণ্ডা মাথায় তৈরি করা অ্যাকশন প্ল্যান। ছক অনুযায়ী এগোলে, বাবাজীকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়। তবে খুব ট্রেইন্ড পুলিশ ফোর্স নিয়ে নামতে হবে। এ কাজে ঝুঁকি প্রচুর। একবার কি অনুভবকে দেখিয়ে নেবে? মানুষটার ক্ষুরধার বুদ্ধি, আর এ সব অপারেশনে বেশ অভিজ্ঞও।
না, থাক। মনে পড়ে গেল সেদিনের কথা। ব্লু হেভেন মিশনের অর্ডারটা সবে বেড়িয়েছে হেড কোয়ার্টার্স থেকে, স্ত্রীকে ফোন করল অনুভব। বিষাক্ত সব শব্দ বাণ।
-কী ব্যাপার, ডি জি সাহেবকে পটালে কীভাবে? হঠাৎ তোমার কেপাবিলিটির ওপর ওঁর এতখানি আস্থা? একজন লেডি অফিসার এর আগে এত বড় কাজের দায়িত্ব পায় নি’।
গৌরী চুপ, মনে মনে শুধু হেসেছিল। একেই বলে মেইল ইগো!
-ম্যাডাম, অরিজিনাল কপিটা কি মিসিং? –রোহিতের প্রশ্নে চমকে ওঠে গৌরী, মুখে কিছু বলে না। হাতের কাগজে আবার মন দেয়।
-ওটা যদি একবার কারো হাতে পড়ে, গুরুত্বটা জাস্ট জিরোতে নেমে যাবে।
গৌরীর চোখাচুখি হয় রোহিতের সঙ্গে। এ কথা কেন মনে হল তার?
-আর একবার নতুন একটা প্ল্যান বানিয়ে নিলে হত না ম্যাডাম? ডি জি পি সাহেবের সই সাবুদ তো কিছুই হয় নি। – রোহিত কয়েক মুহুর্ত কথা থামিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। – আমি কি ভুল বলছি ? প্ল্যানটায় বড়সড় কিছু পরিবর্তন দরকার নেই। শুধু রুট ম্যাপটাকে না হয় একটু ঘুরিয়ে দিতেন। কোন রাস্তা ধরে কীভাবে আমাদের ফোর্স শত্রুর ডেরার দিকে এগিয়ে যাবে, দিন তারিখের শিডিউলটাও এদিক ওদিক বদলে ফেলতেন। আমি কি বোঝাতে পারছি ম্যাডাম?
সামান্য হাসল গৌরী। রোহিত যথেষ্ট উদ্যমী, তবে আর এ ব্যাপারে ওকে এগোতে দেওয়া উচিত নয়। যা করার একাই করতে হবে।
-ওকে, এখন তাহলে এসো রোহিত। বাই দা ওয়ে, আমি প্রতি ডিসট্রিক্টে একটা ফ্যাক্স পাঠিয়েছিলাম, সেটার ব্যাপারে কী হল?
রোহিত চলে যেতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়ায়। মুখে ফিকফিক হাসি, ‘ওই সাধু সন্তদের আখড়ার হদিস তো? আরও কিছু ঝামেলা ইনভাইট করছেন কিন্তু ম্যাডাম। সবচাইতে ঝুঁকি আপনার জীবনে।
 -জীবনের ঝুঁকি? আমার? তোমার এই আশঙ্কার কারণ?
রোহিত গলা ঝাড়ল, ‘না, মানে আপনি টার্গেটেড হয়ে যাবেন ওদের কাছে।
-যেমন?
রোহিত হাত মুঠো করে মুখের সামনে ধরে এবার একটু কেশে নিল, ‘আমার ব্যক্তিগত ধারণা, যতই খানাতল্লাশি চালান, সহজে এর হদিস মিলবে না, ম্যাডাম’।
-কারণটা তো বলবে।
-এই সাধু বাবার দলগুলি নেতা নেত্রীদের ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠে, ওদের গোপন তথ্য সহজে তাই কেউ ফাঁস করবে না।
অনুভবের মুখটা যেন আবার উঁকি দিতে শুরু করল। সেদিন চায়ের টেবিলে, এই প্রসঙ্গেই তুফান তুলেছিল ও। আলটপকা বলে বসে, ‘আজকাল দিনে দুপুরে খোয়াব দেখছ নাকি?’
-মানে? – গৌরী টি ব্যাগ চোবাচ্ছিল তখন চায়ের কাপে।
-শুধু বাবাজী অভিযানে সন্তুষ্ট হওয়া যাচ্ছিল না? তামাম সাধু সন্তদের খুঁটি ধরে নাড়াচাড়া শুরু করে দিলে? জানো না, সমাজের তাবড় তাবড় মানুষের যোগাযোগ এদের সঙ্গে। আরে, কোনও বিষগাছকে সমূলে ওপড়ানো যায় না। অল্প অল্প করে ছাঁটতে ছাঁটতে তাকে নিঃশেষ করতে হয়।
কথাটা বেশ মনে ধরেছিল গৌরীর। চায়ে চুমুক দিতে দিতে হেসে বলেছিল, ‘ওয়েল সেইড। এভাবে মাঝে মাঝে কিছু টিপস শেয়ার কর’।
সত্যিই, ব্লু হেভেন অপারেশনের আগে এই চ্যালেঞ্জটা সে স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছে। মনে হয়েছিল, এক বোঝা জঞ্জাল সাফাইয়ের আগে চারপাশের আগাছাকেও কেটে কুটে সাফ করে নিতে হয়।
তাই রাজ্যের বাকি ভেকধারী সাধুদের মুখোশও সে টেনে খুলতে চাইছিল। রাজ্যে যেখানে যতগুলো সাধু সন্তদের ডেরা, সবগুলোর একটা লিস্ট চেয়ে পাঠিয়েছে জেলাগুলি থেকে। এস পি দের বলা হয়েছে থানাগুলোকে কাজে লাগাতে। কিন্তু দিন সাতেক পরেও টু শব্দটি নেই কোনও জায়গা থেকে। সত্যিই কি, ওদের র‍্যাকেট এত শক্তিশালী? সহজে কেউ ওদের ল্যাজে পা ফেলতে চায় না? নাকি রাজনৈতিক নেতাদের আশীর্বাদি হাত আছে তাদের মাথায়? এ বেলা ধরা পড়লে ও বেলায় রেহাই পেয়ে বেরিয়ে আসবে থানা থেকে।
ভেতরে ভেতরে জেদ চেপে যায়। দেখা যাক, কে কতদিন এই ভন্ড সাধুদের ওপর আঁচল বিছিয়ে আড়াল করে রাখতে পারে। কোনভাবে লিস্টটা হাতে এলেই, ছক অনুযায়ী নেমে পড়তে হবে ময়দানে।
রোহিতের কথায় মূল ভাবনা আবার সে চলে আসে।
-আচ্ছা ম্যাডাম, সাধু বাবাদের ওই লিস্টিতে কি ঝাড় ফুক করা ওঝা টঝারাও আসতে পারে? যদি বলেন হ্যাঁ, আমি কালই কটাকে ধরে এনে দিতে পারি’।
রোহিতের গলার স্বর হঠাতই উঁচু পর্দায় চড়ে গেল। নাকের দু পাশ লাল। তার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল গৌরী, ‘ওমা, তুমি ওঝা টঝাদের স্বচক্ষে দেখেছ নাকি? দারুণ ইন্টারেস্টিং! আমি কখনও দেখি নি, কিন্তু বিরাট কৌতূহল। সেই ছোটবেলা থেকে। বাবা ভূতের গল্প শুরু করলেই চেঁচিয়ে বলতাম, এ গল্পে ওঝা আছে তো বাবা, ওঝা?’।
রোহিতের গম্ভীর মুখটাও এবার আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হচ্ছে, হয়তো ম্যাডামের কথার ধরনে। বলে, ‘ওঝা দেখতে পাওয়া এমন কী ব্যাপার? সব বুজরুকি। প্রথম দিন যখন একটাকে দেখলাম, ভক্তিই হল না। হাড়গিলে আমাশার রোগীর মতো দেখতে। বসে আছে একটা গাছের নীচে’।
-ওখানে তুমি হঠাৎ?
রোহিতের মুখ করুণ করুণ দেখায়, ‘সংসারে থাকতে গেলে কখনও কখনও শান্তি কিনতে হয় ম্যাডাম। – ওর মুঠো আবার মাইক ধরার কায়দায় উঠে এসেছে মুখের সামনে। পিউ এমন এক নাছোড়বান্দা পাবলিক, কী বলব বলুন! ব্লু হেভেন টিমে এবার আমায় অপারেশনে যেতে হবে শুনেই টানতে টানতে নিয়ে গেল এক ওঝার কাছে, সেই সুভাষগ্রাম। বলে, ওরা ঝেড়ে টেরে দিলে নাকি সব বিপদ কেটে যাবে’।
-পিউ কে? তোমার স্ত্রী?
-এখনও হয় নি, তবে হবে। সামনের মাঘে আমাদের বিয়ে। এমনিতে ওর সবই ভাল, কিন্তু ভীষণ টেনশন। নইলে ভাবতে পারেন আমি নিজে একজন পুলিশ হয়ে ওর সঙ্গে সঙ্গে চলেছি ঝাড় ফুকওলাদের কাছে। – রোহিত ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ে। – তাই বলছি ম্যাডাম, কখনও যদি ওদের ধরে আনার দরকার হয় বলবেন, একদম তুলে নিয়ে আসব। একগাদা মাদুলি, তাবিজ সব গছিয়েছে। কিসসু পরি না। শুধু যেদিন পিউর সঙ্গে মিট করি, হাতের বাজুতে জড়িয়ে নিই।
-কখনও ওদের কাছে আমায় একবার নিয়ে যাবে?
-অফকোর্স ম্যাডাম, যেদিন বলবেন, আমি রেডি। একটাকে ধরলে পুরো গ্রুপটাকেই ধরা যাবে। তবে পিউকে লুকিয়ে করতে হবে।
গৌরী হাসে, তারপর নিজের ল্যাপটপ অন করে। রোহিত বুঝল আর তার এখানে কোনও কাজ নেই। ম্যাডামকে স্যালুট দিয়ে সে ঘর ছাড়ে।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।