সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে রূপক সামন্ত (পর্ব – ২)

হরেক পেশা, অবাক নাম – ২

সূত্রধর–কাঠের কাজ যাঁরা করেন তাঁদের বলে ‘ছুতোর’ মিস্তিরি। আসল কথাটা কিন্তু ছুতোর নয়। এটি মূল ‘সূত্রধর’ শব্দটির অপভ্রংশ, চলতি রূপ। ছুতোর শব্দটিতে মিশে আছে নীচুশ্রেণীর মানুষের প্রতি একধরণের অবজ্ঞার ভাব। সূত্রধররা অবজ্ঞার পাত্র নন। এঁরা মাপজোখ নির্ভর জ্যামিতিতে দক্ষ অনুপম শিল্পী। এঁরা সুতো ধরে নিখুঁত মাপজোখ করে কাজ করেন–সেজন্যই এঁদেরকে বলা হয় সূত্রধর। শুধু কাঠের কাজই নয়, ‘কাষ্ঠ-পাষাণ-মৃত্তিকা-চিত্র–এই চারটি মাধ্যমেই যুগপৎ কাজ করতে তাঁরা অভ্যস্ত ছিলেন’– লিখেছেন প্রখ্যাত লোকসংস্কৃতিবিদ তারাপদ সাঁতরা মহাশয়। একারণেই কাষ্ঠকার, ভাস্কর, মৃত্তিকার এবং চিত্রকর–এই চার পেশাগত সম্প্রদায়ে সূত্রধরদের বিভক্ত করা হয়েছে।
তারাপদ সাঁতরা লিখেছেন–”আঞ্চলিক ভিত্তিতে সূত্রধর সমাজ আবার কয়েকটি প্রচলিত সামাজিক ‘থাক’-এ বিভক্ত ছিল। যথা, বর্ধমানীয়, অষ্টকুলসমুদ্ভব, ব্রহ্মযজ্ঞীয় ও পূর্ববঙ্গীয়। মতান্তরে, বর্ধমান, অষ্টকুল, তারাগুনি ও ভাস্কর। মেদিনীপুর ও বাঁকুড়া জেলায় সূত্রধর সম্প্রদায়ের মতে এই ‘থাক’ বিভাগ হল, বর্ধমান্যা, মান্দারণ্যা, খড়িপেত্যা ও ভাস্কর।” এঁদের মধ্যে তারাগুনি’র কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় নি। মান্দারণ্যা থাক মুসলমান শাসনের মান্দারণ সরকার-বিভাগকে কেন্দ্র করে মেদিনীপুর, হাওড়া ও হুগলি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। খড়িপেত্যা নামটি মল্লভূমে ‘খড়িপেড়্যা’ নামে অভিহিত হয়েছে -যাঁদের কাজ ছিল মন্দির বা দেউলের ‘প্ল্যান এস্টিমেশন করা’। তবে একথা ঠিক যে সূত্রধর ছাড়াও কর্মকাররা কাঠের কাজে যথেষ্ট দক্ষতা দেখিয়েছেন।
সূত্রধরদের নানা শিল্পকর্মের মধ্যে পড়ে – বৃষকাষ্ঠ, কাঠের সিংহাসন, বৃষমূর্তি, কাঠের পুতুল, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র, পুতুলনাচের পুতুল, অলঙ্কৃত খাট-পালঙ্ক, কাঠের মুখোশ, পুঁথির মলাট বা পাটা, পাল্কী-চতুর্দোলা-সুখাসন, কাঠের আলমারি-ড্রেসিং টেবিল-চেয়ার-টেবিল-বইএর তাক, ডিঙি-নৌকা-বজরা-জাহাজ প্রভৃতি জলযান, কাঠের অলঙ্কৃত চন্ডীমন্ডপ ও আটচালা মন্ডপ, অলঙ্কৃত কাঠের রথ, কাঠের প্রাসাদ, দেববিগ্রহ ও নানা মূর্তি, কাঠের অলঙ্কৃত দরজা-জানালা, নানা ধরণের আসবাবপত্র ও তৈজসপত্র, মিষ্টির ছাঁচ, কৃষিযন্ত্রাদি, ঢেঁকি প্রভৃতি এবং আরও নানাবিধ দ্রব্যাদি।
তথ্যসূত্রঃ
১. তারাপদ সাঁতরা; বাংলার দারু-ভাস্কর্য
২. পার্থ চট্টোপাধ্যায়; হুগলি জেলার নৌ শিল্প

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।