সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে চার অক্ষর (পর্ব – ৯)
রাজপুত্রের গল্প
৯
ঘড়ি ধরে মাপলে মিমাসে রাজপুত্রের এই হাফ বন্দী দশা আর সতের মিনিট বাদে দশ নম্বর দিনে পা ফেলবে। দশ দিনের প্রথম দু দিন বাদে এই গতকাল অব্দি রাজপুত্রের মনে বেশ নিশ্চিন্তি ছিল। নিশ্চিন্তি বলতে আতঙ্কহীনতা। দৈনিক পঞ্চায়েত সভা মোটামুটি চলে যাচ্ছিল। বাকুদের সম্পর্কে রাজপুত্রের ধারণা এই কদিনে পরিষ্কার। যতই রান্নাঘরে হাতা খুন্তি নিয়ে রান্না বান্না বা নিজেদের ল্যাবরেটরিতে স্ক্রু ড্রাইভার নিয়ে খুটুর পুটুর কাজ করুক, ব্ল্যাক হোলকে যতই ভগবান ভেবে পুজো দিক, গাম্বাট গুলো আদতে রোবটই। ধর-তক্তা-মার-পেরেক করে রক্ত মাংসের দৈত্য রোবট বানানো হয়েছে এদের। সবাই জানে চাষ করতে, সবাই জানে রান্না করতে, সবাই এখানে বিশ্বকর্মা। কোনো ব্যাতিক্রম নেই। যুদ্ধের জন্য তো বটেই, এদের তৈরি-ই করা হয়েছে আদেশ পালনের জন্য। “এই নাও তোমাদের ব্যক্তিচেতনা” বলে বেচারাদের একধরণের ঘোড়ার ডিমের ভাইরাস ওই বিষাক্ত ব্ল্যাকহোলটা ওদের গিলিয়ে দিয়েছে। কিছুদিন ধরে তাই এরা একটু নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। তবে নড়বড়েই হোক আর লঝঝড়েই হোক, বাকুরা শুধু নিজেদের নীল রঙের মোড়লের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে আনন্দে থাকে। এরা কোনোদিন বুড়ো হবেনা, কারণ এদের ছোটো, মেজো, সেজো বেলা নেই। ছিলও না কোনোদিন। রাজপুত্র এরমধ্যে একবার আলমারির স্পিকার ধার নিয়ে এদের কে গান শোনানোর চেষ্টা করেছিল। প্রাচীন পৃথিবীর পিয়ানো। উদ্দেশ্য সাধু, “আহারে বেচারা আকাট ভিনগ্রহিগুলো, খুবএকঘেয়ে জীবন যাচ্ছে? নে বাবা একটু পিয়ানো শোন” বাকুরা বাজনা শুনে হাততালি দেবে এতটা আশা রাজপুত্র করেনি কিন্তু এইটুকু ভেবেছিল এরা অবাক হবে। ও বাবা, কোথায় কি? টানা ১২ মিনিটের পিয়ানো চালানোর পরেও এদের মধ্যে কোনো ভাবান্তর আসেনি। বাকুদের জায়গায় গরুরা থাকলেও হঠাৎ পিয়ানো শুনলে ঘাস চিবানো মুলতুবি রেখে একবার মুখ তুলে অন্তত তাকাতো। বাকুরা পিয়ানোকে পাত্তাই দিলো না। যাকগে যাক। আজ সকালে রাজপুত্র আলমারিকে নিয়ে মোড়লের বাড়ি উপস্থিত। ঠিক করেই ফেলেছে নীলরঙার সঙ্গে দেখা করবে। এভাবে আর কদ্দিন? আলমারি যথারীতি রাজপুত্রকে বাকু মোড়লের বাড়ির সামনে রেখে ভেতরে ঢুকেছে প্রায় মিনিট পাঁচেক হতে যায়। অবশেষে আলমারি ভেতর থেকে বেরিয়ে এল।
“ উটকো মানুষের ভেতরে যেতে আজ্ঞা হোক”
মোড়লের ঘর বলে সাজ সরঞ্জামে আলাদা কোন বিশেষত্ব নেই তবে রাজপুত্র থমকালো
দেওয়াল জুড়ে আঁকাটা দেখে। রঙিন নয়, সাদাতে কালোতে বেল্ট আঁটা শনি গ্রহ। গোটা মিমাসে এই প্রথম কোনো হাতে আঁকা ছবি দেখতে পেল রাজপুত্র। সুন্দর, নিখুঁত এবং জ্যান্ত। ছবিটার দিকে থ্যাপ থ্যাপ পায়ের আওয়াজ পেয়ে রাজপুত্র পেছনে ঘুরতেই মোড়লকে দেখতে পেলো। মোড়লের পাশেই চুপ চাপ দাঁড়িয়ে আলমারি।
“ মর্নিং স্যার। ইয়ে এই ছবিটাতো বেশ সুন্দর, আপনি এঁকেছেন স্যার ?” দাঁত বের করে রাজপুত্র মোড়লকে প্রশ্ন করলো।
“কি প্রয়োজনে উটকো মানুষের আসা হয়েছে? উত্তরের বদলে বাকু মোড়লের সটান প্রশ্ন।
রাজপুত্র বুঝলো, ধানাই পানাই না করে পয়েন্টে চলে আসতে হবে। দু তিন সেকেন্ড মাথা চুল্কে গলা দুবার খাঁকড়িয়ে রাজপুত্র বলেই ফেললো
“ আসলে ইয়ে মানে, আপনাদের তো মোটামুটি সব ঝামেলা ঝঞ্ঝাট-ই শুনলাম এতদিন। যতটা সম্ভব হেল্প করেওছি। এবার যদি পারমিশান দেন তাহলে নিজের বাড়ির দিকে রওনা হই”