সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে চার অক্ষর (পর্ব – ৪)

রাজপুত্রের গল্প

আগে যা হয়েছে –
দুর্ভাগ্য রাজপুত্রের চিরসঙ্গী। ব্ল্যাক হোলের খপ্পর থেকে রক্ষা পেলেও মিমাসে পৌঁছে রাজপুত্র বন্দী হয় বাকুদের হাতে। বাকু সভায় রাজপুত্রের ভ্রমণ কাহিনী শুনে বাকু মোড়লের ধারণা হয় রাজপুত্র ঈশ্বরপ্রেরিত এবং খুব বেশি টাল বাহানা করবার আগেই বাকু মোড়লের আদেশে রাজপুত্র কে অচৈতন্য করে ফেলা হয় ……
জ্ঞান ফিরতেই রাজপুত্রের ঘিলুর ভেতরকার স্নায়ু সঙ্কেতগুলো ধীরে ধীরে হাঁটা চলা শুরু করলো। ঘুম কেটে যাবার পর যেরকম একটা ঘোর থাকে ঠিক সেরকম নয়, ব্যপারটা আলো ফোটার মতন ক্রমশ। রাজপুত্র খেয়াল করলো, পরিষ্কার ঘর। ধাতব বিছানা। জানলা দরজা্র বালাই নেই তবে আলো রয়েছে। ঠাণ্ডা গরম কোনটাই লাগছে না। বডি একটু ঝিম মেরে আছে কি? কয়েকটা অস্পষ্ট শব্দ আসছে কানে। রাজপুত্র তাকালো এদিক ওদিক। কথা আসছে ঘরের কোনায় থাকা আলমারিটার থেকে। হ্যাঁ সেই আলমারিটাই। আতঙ্কে রাজপুত্র তড়াক করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। আলমারিটা যদিও নড়ল না। মিনিট তিনেক একটু ধাতস্থ হবার পর রাজপুত্র আলমারিটার থেকে বেরনো শব্দ গুলোর দিকে মন দিলো।
“পক্ষান্তরে এ পর্যন্ত পেয়েছি অনেক অপর্যাপ্ত শোক, অগত্যা এত সাবলীল কথা বলে চলি যেন কোন উৎসব রাতে…… এটা জানবেন দুঃখের কোন আন্তর্জাগতিক মাপকাঠি নেই, আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক আর আধিভৌতিক ত্রিতাপ ছাড়াও ব্রহ্মাণ্ডের প্রত্যেক শিশু, প্রতিটি বয়সী লোক নিজের ধরনে দুঃখ জেনেছে ভ্রমণ কিংবা ঝানু সংসারী লোক ……”
রাজপুত্র থাকতে না পেরে একটু ভয়ে ভয়েই আলমারির দিকে তাকিয়ে বলল
“হ্যালো!” প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আলমারিটার থেকে শব্দ বন্ধ হল, পৌনে দু সেকেন্ডের মাথায় আলমারি আবার শব্দ বার করা শুরু করলো,
“মিমাসে স্বাগত উটকো লোক। ধমনীতে আপনার রক্তপ্রবাহ চঞ্চল। তা মন্দ নয়। অভিকর্ষ এখানে নিয়ন্ত্রিত। খিদে আপাতত আপনার পাবে না। ভয় পাবেন না। এই মহাজাগতিক চরাচরে, প্রাণের জয়গান শুধু। এখানে হিংসা নেই, দ্বেষ নেই। মহান বিজান্টারের দর্শিত আলোক পথে এখানে জীবন প্রবাহিত হয়”
রাজপুত্রের মুখের হাঁ এতটাই বড় হয়ে পড়েছিল যে চোয়াল প্রতিবাদ শুরু করে। কোনরকমে ঢোক গিলে আলমারি টার দিকে তাকিয়ে রাজপুত্র বলেই ফেললো, “ এত কাব্য করে কথা না বললেই কি নয়? আমি আদ্ধেক বুঝতে পারছি , আদ্ধেক পারছি না। একটু নরমাল কথা বার্তা বললে ভালো হয়। আর এই বিজান্টার মালটা কে? আমাকে এখানে আটকে রেখে বাকুদের কোন ঘোড়ার ডিমটা হবে?”
আলমারি আবার তিন চার সেকেন্ড চুপ থেকে, শুরু হল ;
“ মহান বিজান্টারের কথা জানাবার আগে ছোটো পটভূমিকার প্রয়োজন। আপনার অস্থিরতার কোনো কারণ নেই বিশেষ। বহু বহু সময় আগে টানুকা নামক এক উন্নত সভ্যতা ছিল। শোনা যায় অগণিত ব্রহ্মাণ্ডে তারা প্রাণের সৃষ্টি করেছিল। তারা একের পর এক উন্নতির সুউচ্চ শিখরে পৌঁছে একসময় সিদ্ধান্ত নেয়, সৃষ্টির কোন মুল্য নেই এবং তাদের অমরত্ব বৃথা কালক্ষেপ। তারা সম্ভবত নিজেরাই নিজেদের অবলুপ্ত করে ফেলে। তাদের অসংখ্য আবিষ্কারের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাকু জাতি। হে উটকো মানুষ, আপনার বাথরুম আগামী দু দিন পাবে না কিন্তু আপনি শুনলে এর থেকেও অবাক হবেন, বাকুরা যে শুধু যুদ্ধে পারদর্শী এমনটা নয়, তাদের বিশেষত্ব হচ্ছে, তারা সবচেয়ে প্রতিকূল গ্রহ উপগ্রহ কে খুব কম সময়ের মধ্যে বসবাসের উপযোগী করে তুলতে পারে। বাকুরা বুদ্ধিমত্তায় অনেক সভ্য জাতির থেকে এখনো এগিয়ে। আপনাদের থেকেও। তবে টানুকারা তাদের এই সৃষ্টিকে অসম্পূর্ণ করে রাখে বাকুদের ব্যক্তি চেতনা না দিয়ে। বাকুরা অনেকটা আপনার গ্রহের মৌমাছির মতন। যা কিছু করে, যা কিছু ভাবে পুরোটাই সম্মিলিত চেতনা স্বরূপ। বাকুদের নিজেদের প্রতি প্রেম অপ্রেম কোনটাই নেই, যে কারণে বাকুদের নিয়ন্ত্রন করা সহজ ছিল আর যুগ যুগান্ত ধরে নিজস্ব স্বার্থ সিদ্ধির জন্য তারা ব্যবহৃত হয়েছে এক জাতি থেকে অন্য জাতির হাতে। বলা বাহুল্য তাদের সেনা বাহিনীর কাজেই লাগানো হয়েছে এতদিন। সেরকম এক যুদ্ধযাত্রায় বাকুদের গোটা মহাকাশযান যান্ত্রিক গোলযোগে হারিয়ে যায় এবং আপনার মতই কৃষ্ণগহ্বরের ভেতর বাকুরা ভুলক্রমে ঢুকে পড়ে। এই কৃষ্ণগহ্বর ই হল মহান বিজান্টার।“
এতক্ষণে রাজপুত্রের কাছে গোটা ব্যপারটা একটু পরিষ্কার হোল। রাজপুত্রের বেশ মনে আছে ব্ল্যাক হোলটা রাজপুত্রকে নিস্তার দেবার আগে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিল বোর না হবার। বিটকেল ব্যপার। তার মানে ব্ল্যাক হোলটা জেনে বুঝে রাজপুত্রকে ওই জল থেকে এই আগুনে ফেলে দিলো? এই অভূতপূর্ব হারামিপনার কি কারণ থাকতে পারে? মহাজাগতিক ঢ্যামনামো?
“ তা, মহান বিজানটার কোন অসীম কৃপা বাকুদের দেখালো? আর এখানে আমি-ই বা কোন উপকারে লাগবো সেটা বলে দিলে ভালো হয়“ আলমারির দিকে না তাকিয়েই রাজপুত্র প্রশ্নটা করলো।
“মহান বিজান্টারের কাছ থেকে বাকুদের ব্যক্তি চেতনা প্রাপ্তি ঘটে। তারা যদিও এখনও সম্মিলিত ভাবে চিন্তা এবং কাজ দুটোই করে কিন্তু তাদের নিজেদের পৃথক চিন্তা আছে, এখনও পর্যন্ত বাকুরা যা যা করেছে , করতে পেরেছে, তার সমস্ত কিছুতে প্রতিটি বাকুর একক অধিকার। এই অধিকারবোধ, এই আত্মপলব্ধি মহান বিজানটারের দেওয়া। বাকুরা নিজেদের নাম দিয়েছে সংখ্যায়। এখানে একহাজার সাতচল্লিশ জন বাকু আছে। মহান বিজান্টার সবাইকে আলাদা চেতনা দিয়েছেন। টানুকারা বাকুদের ঈশ্বর ধারণা দেয় নি। আধ্যাত্মিক বোধ দেয় নি। মহান বিজান্টার বাকুদের সেটা দিয়েছেন”
রাজপুত্র এতক্ষণে একটু হলেও সামলে উঠেছে। আলমারি যে কামড়ে দেবে না সেই লেভেলের আত্মবিশ্বাস রাজপুত্র জোগাড় করে নিজের পুরোনো ফর্মে ফেরবার চেষ্টা করল।
“মহান বিজান্টার আমার পেছনে গোটা বাঁশ বাগান ঢুকিয়ে দিয়েছেন। সেই বাঁশ বাগানে একহাজার সাত চল্লিশ টা বাঁশ আলাদা আলাদা ভাবে প্ল্যান করেছে আগে আলমারি আমাকে বিভিন্নভাবে করে দেখবে। তারপর বাকুরা একক ঈশ্বর চিন্তা নিয়ে আমাকে তাদের কেন্দ্রীয় হারেম বানাবে তাই তো? “

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।