সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে চার অক্ষর (পর্ব – ১)

রাজপুত্রের গল্প

যোজন যোজন আলোকবর্ষ দূরে অন্য এক পৃথিবীর, এক ছিল রাজপুত্র। তার বাবার নীহারিকা বিস্তৃত রাজ্যপাট ছিল। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ঘুগনির ব্যবসা ছিল। প্রাসাদ ভর্তি রোবট প্রতিম সেবা দাসদাসী ছিল। তার হাতিশালে ডিপ্লোডোকাস, ঘোড়াশালে টেরাডাকটিল আর গ্যারেজ গ্যারেজ স্পেসশিপ ছিল । কিন্তু এত অ্যাইয়াশি সেই ব্রহ্মাণ্ডে বেশিদিন টিকলো না রাজপুত্রের । রাজপুত্র একদিন প্রেমে ধপাস করে পড়লো শত্রুপক্ষের গ্রহের রাজকন্যার। সাধারণত প্রেমের গল্পে যা রোমিও জুলিয়েট পরিস্থিতি হয় এখানে তা হল না। রাজপুত্র মুখ ফুটে প্রেমের কথা বলতেই রাজা রানী রাজি এমনকি হবু শশুর বাড়িও কূটনৈতিক কারণ বশত রাজি। বেঁকে খণ্ডক ৎ হয়ে বসলো খালি রাজকন্যা। তার নাকি রাজকুমার কে হাবাকেষ্টা লেগেছে উপরন্তু সে সটান জানিয়ে দিলো তার পুরুষ মানুষ পছন্দ নয়। রাজপুত্র কিন্তু দুম করে আশা হারায় নি। সে রাজকন্যা কে দ্বিধা থরো থরো সাতাশ পাতার অমরাবতী মেইল পাঠালো। সে চিঠি অবহেলায় পরে থাকলো। রাজকন্যা ছুঁয়েও দেখলো না। রাজপুত্র হয়ে পড়লো অসহায় , একা এবং নির্লিপ্ত । এই মানসিক অবস্থায় রাজপুত্র বিষাদ তাড়িত ক্ষণজীবী হতে হতে বিবর্তিত খ্যাঁচা পাবলিকে পরিণত হল । সে কাঁদতো কিন্তু বাথরুমে জলের কল খুলে , কবিতা লিখতো কিন্তু ভীষণ ভীতু হয়ে পাছে লোকে ক্লিশে বলে।
এরকম চলতে চলতে বিরক্ত রাজপুত্র পারিবারিক ঘুগনি ব্যবসা ছেড়ে তার নিজস্ব গোলাপি স্পেস শিপ নিয়ে একদিন পাড়ি দিলো মিমাসের উদ্দেশ্যে। মিমাস আদতে বদখৎ দেখতে পাথুরে উপগ্রহ বকলমে এই ব্রহ্মাণ্ডের যে শনি গ্রহ, তার অনেকগুলো চাঁদের মধ্যে এক পিস চাঁদ। উদ্দেশ্য, বিষাদ ও ব্যর্থতার থেকে ভৌগলিক দূরত্বে যতটা পারা যায় একা বোকা থাকা।
কিন্তু রাজপুত্রের ব্যাড লাক টা চিরকাল খারাপ, তার মিমাস যাত্রা , তার যৌবনে সন্ন্যাস নেবার অভিপ্রায় শুরু তেই হোঁচট খেলো। শর্টকাট মারবার তালে বেগুনী নেবুলার ডান পাশের আকাশ গঙ্গার তীরে জ্যোতিপ্রিয় ফুটোকে নিছক ওয়ার্ম হোল ভেবে রাজপুত্রের গোলাপি স্পেস শিপ ঢুকে পড়লো এক জাঁদরেল ব্ল্যাকহোলের ভেতর। ব্যাস! রাজপুত্র পটাং করে জ্ঞান হারায় আর স্পেস শিপের এমারজেন্সি আলো ছাড়া সব আলো বন্ধ । জ্ঞান ফিরতে বেশ কিছু সময় স্পেসশিপের ইঞ্জিন চালানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে রাজপুত্র যখন মদের বোতল বার করে এক ঢোক মারতে যাবে ঠিক তখনই রাজপুত্রের মাথার ভেতর কে যেন বলে উঠলো ঃ

“কি হে নবাব পুত্তুর ? ঐ পুট পাট সুইচ টিপে এখান থেকে পালানোর মতলব কোচ্ছো নাকি হে ? লাভ নেই … লাভ নেই …”

রাজপুত্র : কে বলছেন ? এটা কোন স্পেস স্টেশন ? দেখুন আমি এখন ইয়ার্কি মারবার মুডে নেই … তাড়াতাড়ি আমাকে এখান থেকে বেরোনোর রাস্তা টা বলুন !

: স্পেস স্টেশন ? হাসালে ভায়া !! জাঙিয়া তে বুক পকেট খুঁজে লাভ আছে ? দু দণ্ড বসো একটু গপ্পো টপ্পো করি … তারপর না হয় …

রাজপুত্র : দেখুন ভালো হচ্ছে না কিন্তু …

: আরে কোন জিনিস টা আজকাল কোথায় ভালো হচ্ছে ? বলো তো ? অ্যাঁ ? আচ্ছা রোসো , তোমার এটটু সুবিধে করে দি আমাকে তুমি কৃষ্ণ দা বলে ডাকতে পারো … জানি তুমি ঘাবড়ে গ্যাছো আর কি করবে কোনোকিছুর ঠাওর পাচ্ছ না … তাই তো ? তোমাকে আমি আমার ব্যাপারে একটু বলি ক্যামন ? মন দিয়ে শোনো , তোমার থেকে আমি বয়েসে অনেকটাই প্রাচীন রকমের বড় আর লোক খুব খারাপ নই …

রাজপুত্র : দেখুন আমার কিন্তু সহ্যের একটা সীমা আছে …

: না নেই … সীমা বলে কিছু হয় না। তোমার মেয়ে হোলে তাকে তুমি সীমা বলে ডাকতে পারো বড় জোর …

রাজপুত্র : এনাফ অফ ইট !… জানিস আমি কে? তখন থেকে ঢ্যামনামো হচ্ছে ?

: কখন থেকে ? তুমি এখানে কতক্ষণ আছো ? যখন থেকে তুমি তোমার এই গোলাপি ভটভটি চেপে বেগুনি নেবুলা ধাওয়া করে এখানে এসে পৌঁছেছো তখন থেকে সময়ের কোনো ধারণা তোমার অস্তিত্ব কে স্পর্শ করছে না ।

রাজপুত্র : মাম ম মানে ?

: মানে, তুমি এখন নেই ।

রাজপুত্র : নেই ?!!

: মানে তুমি এখন ততক্ষণ নেই যতক্ষণ না আমি ,স্বয়ং , তোমার প্রিয় ঢ্যামনা ব্ল্যাকহোল ,
তোমার অস্তিত্ব কে আমার অস্তিত্বের প্রকোপমুক্ত করছি …..

রাজপুত্র : তারমানে আমি এখন বন্দী ?

: না , তুমি এখন আমার অতিথি আর তোমার সাথে আমি একটু সময় কাটাবো

রাজপুত্র : এই যে বল্লেন আমার অস্তিত্ব ফস্তিত্ব নাকি সময়ের ধার ধারবে না ?

: তোমার সময় নেই, কিন্তু আমার আছে , আর আমি সেটা তোমার সাথে একটু কাটাবো … তুমি খালি নিমরাজি হয়ে একটু কর্ণপাত করো … শুরুতেই বলে রাখি তুমি নিশ্চয়ই জানো সাধারণত ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বেরর খপ্পরে পড়লে নিস্তার নেই, আলো অব্দি শুষে নেয়, তুমিতো তুচ্ছ বস্তুবাদী ! সুতরাং খামোখা আকাশ পাতাল ভেবে ইঞ্জিন গরম করে লাভ নেই। তবে তুমি আমাকে কৃষ্ণ দা বলে ডাকতে পারো । কি হোলো ? গুম মেরে গেলে কেনো ? আমার ওপর রাগ হয়েছে বুঝি ?
রাজপুত্র : না না , রাগ কেন হবে ? ভারী আনন্দ হচ্ছে , কৃষ্ণ দা , আসলে আপনি এত খাতির যত্ন করছেন যে আমার মুখে কথাই আসছে না
: বাহ ! এই তো চাই ! নাহ, তোমাকে যত টা হেঁজিপেঁজি ভেবেছিলাম তা তুমি নও ….. আসলে কি জানো ভাই , বুড়ো হয়েছি তো …. এই বেবাক ব্রহ্মান্ডে একা বোকা পড়ে থাকি , কথা বলবার লোক পাই না তাই তোমাকে একটু ট্রাবল দিচ্ছি । চিন্তা নেই তুমি যেখানে যাচ্ছ সেখানে অক্ষত পৌঁছবে … তবে একটা শর্ত আছে।
রাজপুত্র : শর্ত ?
: হ্যাঁ একটা মাত্র শর্ত , আমি তোমাকে কিছু প্রশ্ন করবো । যথাযথ উত্তর দিতে পারলে এই বক রাক্ষসের খপ্পর থেকে ধর্মপুত্রের মুক্তি।
রাজপুত্র : এ মাইরি আপনি না হেবি দুগ্যি লোক আছেন । এই বল্লেন , একটা শর্ত আবার বলছেন কিছু প্রশ্ন আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
: শর্ত একটাই , প্রশ্নদের উত্তরে প্রশ্ন করা চলবে না , খালি উত্তর দিয়ে যেতে হবে …. তোমাকে মুখ ফুটে বলতে হবে না তোমার মগজ থেকে আমি পড়ে নেবো।
রাজপুত্র : আপনার একশো আট বার…
: বেশ ! তাই হবে ! কিন্তু মনে রেখো , তোমার আর তোমার স্পেসশিপের গোলাপি অস্তিত্ব আমার তত্ত্বাবধানে …
রাজপুত্র : একটা রিকুয়েস্ট করতে পারি ? একটু বাংলায় বলবেন ?
: হাহাহাহা !!! , ঠিকাছে । আচ্ছা বলতো দেখি, টুইংকেল টুইংকেল লিটল স্টার তাতে অবাক হবার কি আছে ?
রাজপুত্র : মানে ?
: প্রশ্ন নয় উত্তর চাই।
রাজপুত্র : মানুষ অবাক হতে ভালোবাসে তাই অবাক হবার অজুহাত খোঁজে
: হুমম , আচ্ছা মানুষ অবাক হতে কেন ভালোবাসে ?
রাজপুত্র : খুব তাড়াতাড়ি বোর হয়ে যায় তাই
: খুব তাড়াতাড়ি বোর কেন হয় ?
রাজপুত্র : মানুষেরা সবাই এরকম।
: তুমি সব মানুষ কে চেন ?
রাজপুত্র : আমার দরকার নেই চেনার
: তাহলে তুমি কি করে বল্লে ?
রাজপুত্র : আমার মানুষ সম্পর্কে এটাই ধারণা।
: তুমি কি নিজেকে মানুষ বলে মনে করো ?
রাজপুত্র : হ্যাঁ করি
: তাহলে তুমিও অবাক হতে ভালোবাসো ?
রাজপুত্র : ……
: কি হল ?
রাজপুত্র : ……. হ্যাঁ বাসি
: খুব তাড়াতাড়ি বোর হবে জেনেও অবাক হতে ভালোবাসো ?
রাজপুত্র : …. হ্যাঁ
: তাহলে তুমি কি বোর হতেও ভালোবাসো ?
রাজপুত্র : হবে হয়তো ..
: তোমাকে যদি এখন আমি ছেড়ে দি তুমি কি অবাক হবে?
রাজপুত্র : কিছুটা ..
: পুরোটা নয় কেন ?
রাজপুত্র : কারন আমার আর ভাল্লাগছে না । অবাক হবার জন্য শরীর আর মন কে ঠিক ঠাক রাখতে হয় আপনি তখন থেকে আমার পিণ্ডি চটকাচ্ছেন …
: তোমাকে ছেড়ে দিলে । এখনি এই মুহূর্তে ছেড়ে দিলে তোমার সুস্থ হতে কতদিন লাগবে ?
রাজপুত্র : না ছাড়লে বলবো কি করে ?
: উঁহু , প্রশ্নের উত্তর প্রশ্ন হয় না !

রাজপুত্র : তিন চার দিন।

: বেশ , তিন চার দিন বাদে তুমি পুরো অবাক হবে ?
রাজপুত্র : হ্যাঁ হবো।
: আর তার কত দিন বাদে বোর হতে শুরু করবে ?
রাজপুত্র : আর কোনোদিন বোর হবো না ।। আমার ঘাট হয়েছে !
: এখন তুমি স্ক্রিনের দিকে তাকালে কি রঙ দেখতে পাচ্ছো?
রাজপুত্র : বেগুনি ! বেগুনি নেবুলা !
: তা কি ঠিক করলে? এখানে আমার সাথে কথা বলে অবাক হবে ? না , বেগুনি নেবুলার দিকে যেতে যেতে অবাক হবে ?
রাজপুত্র : যেতে যেতে অবাক হবো !!!
: তাহলে দেরি করছো কেনো? কি হল?
রাজপুত্র : … পালাচ্ছি কৃষ্ণ দা ! , এক্ষুনি পালাচ্ছি … !!!

ক্রমশ …

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।