ঘটনাটি আমার ছাত্রবেলার।পুজোর ছুটিতে বাড়ি ফিরছি। গন্তব্য – বোলপুর থেকে এগারো মাইল।ভিড়ে ঠাসাঠাসি যাত্রীবাহী বাস।তিল দর্শনেরও ফাঁক নেই। একমুখী রাস্তা,খানা-খন্দের ভাস্কর্যে বাস ধিকিধিকি করে চলছে। রামনগর বাসস্ট্যান্ডের কয়েক জন যাত্রীর সঙ্গে উঠলেন মধ্য বয়স্কা এক আদিবাসী মহিলা। বাসে উঠতে গিয়ে এক ভদ্রলোকের পায়ে পা দিয়ে ফেলেছেন। ভদ্রলোক প্রতিক্রিয়া প্রকাশে বললেন -‘আড়বুঙা জাত!’….. তারপর বাংলা-ইংরাজি মিশ্রিত কিছু তিরস্কার সূচক বাক্য -বিন্যাস ছুঁড়ে দিলেন মহিলার সম্মুখে । মহিলা তৎক্ষনাৎ রণচণ্ডী মূর্তি ধারণ করে বললেন -” আমরা আড়বুঙা লই! তু-রাই আড়বুঙা জাতটো বুটিস।আমরা তুদের ভাষাটোও জানি।বুলতেও পারি।আর লিজের ভাষাটোকেও দরদ করি।তুরা তো লিজের ভাষাটোও ভালো করে বলতে লারিস!” ভিড়ের মধ্যে বেশ কয়েকটি বাক্য ঘোরাফেরা করতে লাগলো -“ভিড় বাসে একটু গায়ে গা লাগবে না,পা লাগবে না ? ” বেগতিক বুঝে ভদ্রলোক আর বাক্য ব্যয়ের ঝুঁকি নিলেন না। মুখে সামান্য বিরক্তির সঙ্গে একরাশ নীরবতা ঢাকা নিলেন। জানালা সিটে বসে থাকা আমি মহিলার এমন প্রতিক্রিয়ায় রীতিমতো মতো বিস্মিত হয়েছি।কেন মহিলা, ভদ্রলোকে আক্রমণ করার জন্য ভাষাকেই অস্ত্র করলেন? আমি জানালার বাইরে দৃষ্টি ফেলে খুঁজেছি কার্য-কারণের ভেতর জমে থাকা তাৎপর্য। বাংলা ভাষা কোনোদিনও অট্টালিকার ভাষা ছিল না।বাংলা ভাষার জন্ম তো কুঁড়েঘরেই। ছাত্র-কালে নিবিড়ভাবে ভাষাতত্ত্ব পড়তে পড়তে খুবই বিচলিত হতাম। যেভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ভাষাগুলোর মৃত্যু লক্ষ করেছি। ভয় হতো কোনোদিন যদি………! না,তেমন কোনো লক্ষণ নেই।কুঁড়েঘরে জন্ম হলেও বাংলা একটি প্রগতিশীল ভাষা, যে সব সময় নিজেকে সময়োপযোগী করে তুলেছে। একসময়ে ভারত তথা বাংলায় সংস্কৃত ভাষার ব্যাপক চর্চা ছিল। ফলত বাংলা তার শব্দ ভাণ্ডারে সংস্কৃত শব্দকে নিজের করে নিয়েছে। এভাবেই আরবি, ফারসি এবং ইংরেজি শব্দ বাংলা শব্দ-ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে । বাংলা ভাষায় সাহিত্যিকরাও অবলীলায় বিদেশি শব্দের মিশ্রণ ঘটিয়ে বাংলা সাহিত্যকে ঐশ্বর্যশালী করে তুলেছেন। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে নজরুল এমনকি বিদ্যাসাগরও তাঁর চলতি ভাষায় লেখা রচনায় আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার করেছেন। পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আরবি-ফারসি শব্দের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করাকে মূর্খামি বলে মনে করতেন। আসলে সামজ-জীবনের ভাষাই তো সাহিত্যের ভাষা হয়ে ওঠে। আমরা যাঁরা শব্দ শ্রমিক।তাঁরা ভালো করেই তা অনুভব করতে পারি।ভাষা তো ভাব বিনিময়ের মাধ্যম।মানুষ তার প্রয়োজনেই মাতৃভাষা ছাড়াও অন্য ভাষাকে আয়ত্ত করেছে। সেটা জীবিকার কারণেই হোক বা জ্ঞান পিপাসার কারণেই হোক। কিন্তু মাতৃভাষার প্রতি আমরা কতটা যত্নশীল? কতটা দরদ করি মাতৃভাষাকে? অবাঙালি দেখলে আমরাই তো আওড়ে ফেলি হিন্দি। ব্যাঙ্ক থেকে রেল,পানের দোকান থেকে সবজি বিক্রেতা, ট্যাক্সি ডাইভার থেকে আমলা-গামলা। স্বাধীনতার এতোগুলো বছর পরও এই বাংলায় ডান-বাম, ঊর্ধ-অধ্ব কেউই তো ২১-এর মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলতে পারেননি – ‘বাংলা ভাষা’ই হোক এই বাংলার সরকারি ভাষা ( মাতৃভাষার প্রতি আবেগের তাড়নায় ,যুক্তি-তর্ক পরের কথা) । ভাষা একটি বহতা নদীর মতো সে নিজেকে ভাঙতে ভাঙতে গড়তে গড়তে এগিয়ে যাবে। চাপিয়ে দেওয়া ভাষা অপেক্ষা.. চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতি মারাত্মক। একটা জাতির সংস্কৃতি ভাঙতে পারলেই তো সব শেষ। নয়ের দশক যা শুরু হয়েছে, যা এখন ভয়ানক রূপধারণ করেছে। আমরা কী পারছি সোচ্চার হতে? নাকি নীরবেই মেনে নিচ্ছি এই আগ্রাসন?