|| লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর বিদেশে রহস্যজনক মৃত্যু || আলোচনায় দেবযানী হালদার – 8

“জয় জওয়ান। জয় কিষান।” বিখ্যাত এই কথাগুলো বললেই মনে পড়ে যায় এক অন্য ঘরানার কংগ্রেসী, সততার প্রতীক, ভারতবর্ষের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর কথা। ইনি মারা যান 11 জানুয়ারী, 1966 সালে পূর্বতন সোভিয়েত রাশিয়ার উজবেকিস্তান এর রাজধানী তাসখন্দে।
1965 সালের ভারত পাকিস্তানের যুদ্ধ তাসখন্দ চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়। এই চুক্তি স্বাক্ষর করার জন্য তিনি তাসখন্দ যান। চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় 10 জানুয়ারী, 1966 । সেই দিন মধ্য রাত্রে শাস্ত্রীজি মারা যান। তাঁর মৃত্যকে সোভিয়েত রাশিয়া হার্ট অ্যাটাকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে উল্লেখ করলেও এই মৃত্যু ঘিরে সন্দেহ থেকেই যায়। রহস্যের উন্মোচন হয়নি।
কি কি কারণে তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক নয়।
1. তাঁর থাকার কথা ছিল সেখানের হোটেলে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন করে ভিলা করা হয়।
2. বিদেশের মাটিতে হঠাৎ মারা যাওয়া একদম সুস্থ থাকাকালীন অবস্থায়, অথচ কোনো পোস্ট মর্টেম হয়নি। না তাসখন্দে না দিল্লীতে।
3. তাঁর পার্থিব শরীর যখন দিল্লী ফিরত আসে, তখন তাঁর মুখে, নাকে, বুকে রক্তের দাগ স্পষ্ট ছিল। পরিবারের তরফ থেকে প্রশ্ন করা হলেও ভারত সরকার সোভিয়েত রাশিয়া সরকারের কাছে এর ব্যাখ্যা চায়নি। ধামাচাপা পড়ে যায় বিষয়টি।
5. তাঁর ব্যক্তিগত পরিচারক রাম নাথ সেদিন শাস্ত্রী জির জন্য খাবার বানায়নি। খাবার এসেছিল ভারতীয় রাষ্ট্রদূত টি এন কলের বাড়ি থেকে। রান্না করেছিল কলের পরিচারক জান মহম্মদ।
6. তাঁর ব্যক্তিগত ডাক্তার টি এন চুগ বলেছিলেন তাঁর কোনো অসুখ ছিল না। হার্ট খুব ভাল ছিল।
কুলদীপ নায়ারের একটি আর্টিকেল বের হয় Outlook ম্যাগাজিনে। সেই রাত্রের ঘটনা সংক্ষেপে সেখান থেকে বর্ণনা করছি। লিঙ্ক নীচে আছে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর একটি Farewell পার্টি দেওয়া হয়। রাত 10 টায় তিনি রুমে ফিরে আসেন। পরের দিন কাবুল যাবার কথা ছিল। রুমে ফিরে জান মহম্মদের রান্না করা খাবার খুব অল্প পরিমাণে খান। আলু পালকের সবজি শুধু খেয়েছিলেন। বারো মাস তিনি দুধ খেয়ে শুতে যেতেন। রাত 11:30 তে থার্মো ফ্লাস্কে দুধ এনে দেয় রাম নাথ, তাঁর পরিচারক। শাস্ত্রী জি ফ্লাস্কের ঢাকা খুলতে পারেননি সেটা কুলদীপ নায়ার টেবিলে রাখা ফ্লাস্কের অবস্থা দেখে বলেন। শাস্ত্রী জি একা একটি রুমে ও অন্য রুমে তাঁর পরিচারক রাম নাথ, ব্যক্তিগত সচিব জগন্নাথ ও দুজন স্টেনোগ্রাফার ছিলেন। মাঝ রাতে হঠাৎ শাস্ত্রী জি জগন্নাথ এর রুমে ধাক্কা দেন ও জল চান। ওরা অবাক হয়ে যায় যে প্রধানমন্ত্রীর ঘরে কোনো ঘণ্টা পর্যন্ত নেই। সবাই মিলে ধরাধরি করে শাস্ত্রী জিকে রুমে এনে শুইয়ে দেয়। রামনাথ জল খাওয়ায়। রাত 1:20 তে শাস্ত্রী জি আবার আসেন ও তখন তিনি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। এসেই তাঁর ব্যক্তিগত ডাক্তার এস এন চুগের খোঁজ করেন। সেই সময় তাঁর স্টাফ লাগেজ প্যাক করছিল কারণ পরের দিন তাঁর কাবুল যাবার কথা। জগন্নাথ চেয়ারে বসিয়ে দিতে তিনি একবার ভয়ঙ্কর কেশে ওঠেন, রক্ত জড়ানো লালা বেরোয়। সবাই জল খেতে দেয়। সেকেন্ড এর মধ্যে শাস্ত্রী জি বুকে হাত দেন ও অজ্ঞান হয়ে যান। শেষ হয়ে যায় সব।
কুলদীপ নায়ার বলেছেন যে ঠিক ওই সময়েই তাঁর ঘুম ভেঙে যায় এক মারাত্মক স্বপ্ন দেখে। তিনি দেখেন প্রধানমন্ত্রী মারা যাচ্ছেন। দৌড়াতে দৌড়াতে আসেন যেখানে শাস্ত্রী জি ছিলেন। এসে দেখেন তিনি আর নেই। অর্থাৎ কুলদীপ নায়ারও সন্দেহ করেছিলেন শাস্ত্রী জির মৃত্যু আসন্ন।
এখানে আর এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করবো, অনুজ ধর, নেতাজীকে নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর একটি সাক্ষাৎকার বেরোয় Times Of India তে। তাঁর মতে শাস্ত্রী জির মৃত্যু প্রত্যক্ষ ভাবে নেতাজী অন্তর্ধান রহস্যের সাথে যুক্ত। ওই সময়েই নেতাজী ও গুমনামী বাবার সামঞ্জস্য খুব স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে যায়। সবাই সন্দেহ করতে থাকে গুমনামী বাবাই নেতাজী। শাস্ত্রী জি তাই আবার এক নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করবেন বলেছিলেন। তাসখন্দ থেকে ফিরে এই নিয়ে নির্দেশ দেবার কথা বলে গেছিলেন। আর সোভিয়েত রাশিয়ায় বন্দী হয়ে থাকার যে গুজব ছিল, সেটা নিয়ে কথা বলবেন বলেছিলেন সোভিয়েত সরকারের সঙ্গে।
এই কথার প্রামাণিকতা পাওয়া যায় শাস্ত্রী জির নাতির কথায়। সঞ্জয় নাথ সিং, যিনি নয় বছরের ছেলে ছিলেন ঘটনার সময়। তাঁর কথা অনুযায়ী শাস্ত্রী জি রাত্রে বাড়িতে ফোন করেন। সঞ্জয় জি জানতে চান তাসখন্দ চুক্তির প্রতিক্রিয়া কেমন অনুভব করছেন শাস্ত্রী জি। তিনি উত্তর দেন যে এমন কিছু কথা তিনি সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন যা চুক্তির কথা ভুলিয়ে দেবে। বহু বিতর্কিত বিষয়ে এবার ভারতবাসী জানতে পারবে। আর সবাই এই জন্যই তাঁকে মনে রাখবে। এর 45 মিনিট পর অসুস্থতার ফোন ও তার 10 মিনিট পর মৃত্যু সংবাদ।
অনুজ ধর 2009 এ একটি RTI ফাইল করেন PMO তে, শাস্ত্রী জির মৃত্যু সম্বন্ধে তথ্য জানানোর জন্য। UPA সরকারের প্রধানমন্ত্রী অফিস নাকচ করে দেয় তাঁর আবেদন। বলা হয় প্রধানমন্ত্রী অফিসে ফাইল আছে কিন্তু তা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বৈদেশিক সম্পর্কে অবনতি হবে। শুধু আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নয় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যও সেটা সম্ভব নয়।
আমাদের দেশে বিচার হয় না। কে যে ওই কালো পট্টি চোখে বেঁধে দিয়েছিল কি উদ্দেশ্যে জানি না। তবে বিচার ব্যবস্থা কিন্তু অন্ধই থেকে গেছে। কবে চোখ খুলে বিচারের দৃষ্টি স্বাভাবিক হবে জানি না। রহস্যাবৃত থেকে গেলো প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু। আর আমরা বছরের পর বছর কোর্টের দরজায় হানা দিতে থাকি বিচারের আশায়।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।