দাদু-নাতির সম্পর্কটি খুব সরেস ও সরস। স্নেহ স্বভাবতই নিম্নগামী। বৃদ্ধ দাদু-ঠাকুমা নাতি-নাতনিদের দিকে যতটা স্নেহ,আদর,ভালোবাসা ঢেলে দেন, বয়সকালে নিজের সন্তানসন্ততিদের ততটা দেননি। এই প্রবণতা খুবই স্বাভাবিক।
কিন্তু স্বাভাবিকের বাইরেও কিছু-কিছু চমকপ্রদ ঘটনা থাকে। তেমনই এক দাদু ও তাঁর দেড় মাসের নাতির আশ্চর্য গল্প শুনুন।
গল্পটা মার্কিন মুলুকের। দেড় মাস বয়সের এক খুদে নাতিসাহেব তার ঠাকুর্দাকে হুইস্কি খাওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করতো। মানে বোতল এগিয়ে দিতো, জল বা বরফের ক্যান এনে দিতো, এইসব আরকি ! এই অসম্ভব শৈশবের কথা ভেবে চোখ কপালে তুলবেন না। ঘটনাটি নিখাদ সত্যি। সেই খুদে ওস্তাদ নাতিটি বড়বেলায় এক জগদ্বিখ্যাত মার্কিন লেখক, যাঁর পোশাকি নাম স্যামুয়েল ল্যাংহর্ন ক্লিমেন্স, মার্ক টোয়েন নামে যিনি বিপুল জনপ্রিয়।
মার্ক টোয়েনের অতি শৈশবের এই অদ্ভুত ঘটনারাজিকে হেসে উড়িয়ে দেবেন না, এর প্রতিটি ঘটনাই সত্যি বলে টোয়েন তাঁর আত্মকথায় স্পষ্ট করে লিখে গেছেন। পৃথিবীর অজস্র লেখক তাঁদের ছেলেবেলার কথা লিখেছেন, কিন্তু শৈশবের মাত্র দেড় মাস বয়সের কথা মার্ক টোয়েনের মতো আর কারও স্মৃতিতে ছিল না।
আত্মকথার এক জায়গায় মার্ক টোয়েন লিখছেন, ” আমার যখন মাত্র ছ-সপ্তাহ বয়স, তখন আমি আমার ঠাকুর্দাকে হুইস্কি খাওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করতাম। ঘটনাটির কথা বহু বছর ধরে আমার পরিষ্কার মনে আছে, কিন্তু এ-নিয়ে এখন মুখ খুলতে সাহস হয় না। অনেক বয়স হয়ে গেছে তো, স্মৃতিশক্তি আর আগের মতো কাজ করে না। তবে একটা সময় আমি সব কিছুই মনে রাখতে পারতাম। যা ঘটেছে এবং যা ঘটেনি — দুটোই মনে থাকতো ভালোভাবে। কিন্তু এখন আমি বোধ হয় শুধু সেইসব ঘটনাই মনে করতে পারবো, যেগুলি কখনওই ঘটেনি।”
বুঝুন কাণ্ড ! শুধু নিজের জীবনের ওই ঘটনাটিই নয়, তাঁর ছোট ভাই হেনরির জীবনেরও একটি রোমহর্ষক গল্প শুনিয়েছেন তিনি। হেনরির বয়স যখন মাত্র এক সপ্তাহ, তখন সে একবার সটান হেঁটে ঘরের বাইরের আগুনের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল।
সাতদিন বয়সের এক শিশু কীভাবে সটান হাঁটতে পারে বা দেড়মাসের শিশু দাদুকে হুইস্কির বোতল, জল এগিয়ে দিতে পারে, এই নিয়ে তর্ক তুলে লাভ নেই। বিশ্বাস-অবিশ্বাস পাঠকদের ব্যাপার।
আসলে মার্ক টোয়েন একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি এমন একটি আত্মকথা লিখতে চান, যার সমান কোনও নজির এই পৃথিবীতে নেই। কোনও গতানুগতিক জীবনলেখ নয়, এই আত্মকথা আসলে নিয়মহীন নিয়মে ( Systemless system) লেখা হবে। সেই লেখায় সবার আগে জায়গা পাবে লেখকের ভালোলাগার ঘটনাগুলি ( ” high degree anecdotic “) । যেসব ‘ ফ্যাক্ট ‘ এখানে থাকবে সেগুলি আবার সবসময় ‘ সত্য ঘটনা ‘ হওয়ার দরকার নেই।
জীবদ্দশায় আত্মকথা প্রকাশ করতে চাননি মার্ক টোয়েন, কী দরকার ওসব গোপন কথা ফাঁস করে নিজেকে অস্বস্তিতে ফেলার ! তাই আত্মকথার ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, ” ধরে নিন এসব কথা আমি আমার কবর থেকে বলছি। কবর থেকে নিজের গোপন কথা জানাতে কোনও লজ্জা নেই।”
কিন্তু লেখকের এই পরিকল্পনাটি সফল হয়নি। ১৯০৬-‘০৭ সালে ‘ নর্থ আমেরিকান রিভিউ ‘তে পঁচিশটি কিস্তিতে তাঁর আত্মকথার কয়েকটি পরিচ্ছেদ প্রকাশিত হয়েছিল। মার্ক টোয়েন মারা যান ১৯১০ সালের ২১ এপ্রিল, প্রায় পঁচাত্তর বছর বয়সে। পরে ১৯২৪ এবং ১৯৪০ সালে তাঁর আত্মকথার দুটি সংস্করণ বের হয়, শেষ সংস্করণটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে, চার্লস নিডারের সম্পাদনায়। সেই সময় পাঠকরা ওই আত্মকথা পড়ে মোটেই খুশি হতে পারেননি। কিন্তু পরবর্তীকালের পাঠককুল ওই আত্মকথা পড়ে রীতিমতো মুগ্ধ হন। তথাকথিত অসঙ্গতি, পরম্পরাহীন কালক্রম এবং সত্যমিথ্যার ভেদহীনতায় আধুনিক পাঠক সম্পূর্ণ অভিনব এক স্বাদ পেয়েছেন।
আপনারাও একবার চেষ্টা করে দেখবেন নাকি,আপনাদের জীবনে যেসব ঘটনা কখনওই ঘটেনি, তাদের কথা মনে করার ?