শিল্পনগরী দুর্গাপুরে বাস।চাষ মানবজমিন।ছবি আঁকা,কবিতা,গল্প,প্রবন্ধ,রম্যরচনা ছাড়াও আঞ্চলিক ইতিহাস ভালোবাসা বিষয়। লিখেছেন বেশ কয়েকটি গ্রন্থ।
দূষণ মুক্ত পৃথিবী এবং হাটুরেদের গপ্পো
গ্রামের হাটে যারা তরিতরকারি বিক্রিবাটা করেন তাদের অধিকাংশই সেনমার্কেট থেকে সস্তার তরিতরকারি, আনাজ এবং আবর্জনা কিনে এনে প্ল্যাস্টিক বিছিয়ে বসে পড়ে।তাদের মাথায় প্ল্যাস্টিকের ছাউনি। বউনি হয় না অনেকের । এক মাস্টোর যিনি সব বিষয়ে সমস্ত কিছু জানেন, তাঁর চোখের ইশারায় আমাজন বা কঙ্গোর জঙ্গলে দাবানল হতে পারে , সেই মাস্টোর একদিন জনে জনে ডেকে বলে গেলেন এইসব প্ল্যাস্টিক ফ্ল্যাস্টিক চলবে না।সকলেই শুনল।সদ্য সেই মাস্টোর আরও ক্ষমতাবান হয়েছেন এতদিন তাপবিদ্যুতের তার মেরামতি করতেন এখন তাপবন্টনের পুরোধা হয়েছেন।ক্ষমতার কাছে সকলেই প্রজা।সক্কলেই!সক্কলেই প্রাচীন কালের ইতালিও দেওয়াল ঘড়ির ঝুলন্ত দণ্ডের মত দুলতে দুলতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় একদুইতিনচারপাঁচছয়সাতআটনয়দশ এগারো বলার পর আঙুল চুষতে চুষতে বারো । কি গেড়োরে বাবা! একে বউনি হয়নি উনি এসে পরিবেশের সাতকাহন শোনাচ্ছেন। ইতালীয় ঘড়ির ঘন্টা। ইতালি মানে সেই মুসোলিনী তা ধিন ধিনি দেশের এবং সভ্যতার বারটা বাজানো ঘন্টা, ঘন্টি।
নন্দী ভিরিঙ্গী, ডিভিসি মোড়ের ঝুলন্ত হাওয়া ঝুল নিরাপদেই আছে, ঝুলন্ত ঝুলবারান্দা।মূল রাস্তাটা মাখন ,পাশের সার্ভিসরোড কাদা রোড। পথচলতি মানুষের মাথা লক্ষ্য করে বসে আছে। সঠিক মাথা পেলে থেঁতলে দেবে।খবরেরকাগজের পাতায় এমন মহান কাজের মহতী প্রশংসা।ছবি। ফেসবুক সাম্রাজ্যে সকলেই কবি।প্ল্যাস্টিকের ছবি সহ কবিতা অথবা গাঙশালিকের মরা ঠোঁট দিয়ে কথা বলানোর প্রকাশক।
প্ল্যাস্টিক উচ্ছেদের বিপ্লব শুরু হয়েছিল যে দোকান থেকে সে পাক্কা ব্যবসায়ী। কবিটবি বোঝেনা সে আত্মপ্রচারের জন্য হাসিমুখে প্ল্যাস্টিক উচ্ছেদর প্রতীক হতে চেয়েছিল। হয়েছে। দোকানের সামনে একটা টব বসিয়ে হাসিমুখে দাঁতক্যালানি ফটোতুলে পোষ্ট করেছে।দুআনা চার আনা দিনআনিদিনখাই হাটুরেদের মানুষ ঠকানোর অত বিদ্যা নেই। সবুজ থাকল আর নাই থাকল তাতে কিচ্ছুটি যায় আসে না ওদের। কলেজের অনুষ্ঠানে যে শিক্ষিকা মাইক হাতে ঘোষনা করছেন হিন্দি আমাদের রাষ্ট্রভাষা তিনি কি করে জানবেন হাটুরেদের কি অবস্হা! বাংলা বাজারে দুচারটে হাটুরে থাকলে সেখানে সাড়ে চুয়াত্তরটি চল্লু বিক্রেতা। শম্পা হোটেলে সাড়ে চার টাকায় ডালভাতসবজিডিমমাছমাংসআমড়ারচাটনি কব্জি ডুবিয়ে খাওয়া আর দশ টাকার পাউচে এলাহি জলের কল। জল পড়ে যাচ্ছে, খোলা কল বন্ধ করবার কেউ নেই।কার সাধ্য জল সংরক্ষণের কথা বলে।গাঁজাখোর জলবিক্রেতা জলে ঢুবে মরেছে বলে গোটা বাজারটাই আগামীকাল বন্ধ ডেকেছে পয়ঃপ্রণালি দখল করে পাকা দোকান বানানো দোকানীরা। একটু বৃষ্টিতেই রাস্তাময় জল।বলার কেউ নেই।পয়ঃপ্রণালি দখল করে পাকা দোকান বানানো দোকানিরা সঙ্ঘবদ্ধ।তাদের অনেক জোর।ওখানে বলবার খেমতা নেই পাতি মাস্টোরের। ছুঁলে দেবে। আছোলায় কি যন্ত্রণা যারা ভুক্তভোগী তারা ভালোই জানেন।দুচারটে হাটুরের সে খেমতা নেই।চুপ করে থাকে।শোনে। প্রকাশ্য দিবালোকে সেই মাস্টোরের নাচনকোচন দেখে খবরের কাগজওয়ালারা তাকে এই সমাজের প্রতিনিধি করে প্রচার শুরু করেছে। সবুজ মুখ। তার অনুপ্রেরণায় নবগঠিত পৃথিবী রক্ষা কমিটি গঠিত হয়ে বাজারে নেমে পড়েছে।বাজার দখলের জন্য রাজায় রাজায় যুদ্ধ।যুদ্ধ মানেই চাঙ্গা অর্থনীতি।পাড়া দখলের লড়াইয়ে এক গুন্ডা অন্য গুন্ডা কে শুইয়ে দিয়েছে।এখন ভজন কীর্তন।একদা এক সময়ে পাড়াকাঁপানো ভজনকে চূড়ান্ত অপমান করতে ঠান্ডা ঘরে আমলাগাছ। সবুজ আমলা শুকিয়ে যারা পেটের রোগের মহাঔষিধী নির্মাণ করেন তারা প্রশান্ত চিত্তের প্রেমানন্দ ।
বিদেশীপাড়া হাইস্কুলের শ্রেণীকক্ষে , ফেসবুকে তার মুখ আঁকা শুরু হয়েছে। সবুজবীথি নির্মাণ শুরু হচ্ছে তাঁর নামে। সেখানে বিনা বিদেশী সারে লাউকুমড়ো আলুপটলমুলো কুলো কুলো ফলনের কৌশল শেখানো হবে।প্ল্যাস্টিক উচ্ছেদের প্রতীক সেই তাপবন্টনের মাস্টোরকে, বিপ্লবের প্রতীক কে দেখতে হাটচত্বরে কি ভিড়! কি ভিড়!!সক্কলেই চায় দুষণমুক্ত, প্ল্যাস্টিক মুক্ত পৃথিবী।ঢ্যামনার ক্যালাশ হওয়ার বড় ইচ্ছে !
দুআনি চারআনি নিয়ে যাদের সংসার চলে তারা দামোদরের কারখানার বর্জ্যে জন্মানো মাছ সস্তায় কিনে প্ল্যাস্টিক ঠোঙায় ভরে ঘরকে যেতেই পৃথিবী রক্ষার সেনানীরা ঘিরে ধরছে।পৃথিবী রক্ষার ঠিকাদার । ঠিকাদাররাই শাসন শোষনের মূল শক্তি। তারা ধমকাচ্ছে ।
এসব চলবে না। বলেছ এবারের মতো ছেড়ে দিলাম এরপরে বাজার করতে এলে খবরের কাগজের ব্যাগ বা ঠোঙা নিয়ে আসবেন।
হাঁটুরেরা ভয়ে অস্হির তাদের ছালাও যাবে কম্বল ও যাবে। মাটিতে বিছানোর কিচ্ছুটি থাকবে না। গ্রামে এখন বাঁশ জন্মায় না যে ঝুড়ি বানাবে, বনে শালগাছ নেই যে তাতে কাঠি ফুটাই গোলপারা থালা বানাবে,চারদিকে শুধু শাম্তির প্ল্যাস্টিক। সস্তা । দুধ আগে কাঁচের বোতলে বিক্রি হত এখন ধবধবে সাদা প্ল্যাস্টিকে ঠান্ডা চৌবাচ্চায় ডোবানো।একদা একসময়ে বাংলার নিজস্ব লেবেল সাঁঠা কাঁচের বোতল থাকলেও উন্নয়নের জোয়ার আনতে সব উঠে গেছে । আসানসোলের কাঁচ কারখানা নিয়ে একটা গল্প লিখে উদয়ন ঘোষ জগত বিখ্যাত , দুর্গাপুরের কাঁচ কারখানাটার গায়ে সোভিয়েত রাশিয়ার গন্ধ বন্ধ হতেই ছাল ছাড়িয়ে নুন মাখিয়ে কচি শশার মতো বিক্রি হয়ে গেছে । আগে বাবুদের সকাল বিকালের পাউরুটি মোম লাগানো ঠোঙায় দোকানে দোকানে বিক্রি হত এখন ঝকঝকে প্ল্যাস্টিকে প্লাস্টিকে সাজানো।এক টুকরো দোকানের জন্য খুনোখুনি করে ফেঁসে যাওয়া খানাদানার মালিকের তেলেভাজার প্ল্যাস্টিকের প্যাকেট দোকানে দোকানে ঝুলছে।হাত দিলেই ছুঁলে দেবে ।
অদেরকে কিচ্ছুটি বলবার খেমতা কারও নেই । যত মুরোদ এখানে, হাটেবাজারে ! আনখাই লল্ল্যাট কার ভাল লাগে!!