মেহেফিল -এ- কিসসা সফি ইসলাম

|| চারুমাসির ঝুমকা ||

(১)

কৌতূহল নিয়ে কাগজের মোড়কটা খুলতেই বেরিয়ে এলো পিতপিতে খুব সাধারণ এক জোড়া নূপুর। কচি পায়ের মাপের সাধারণ রুপোর চেন। তাতে তিনটি করে ছোট ছোট রুপোর বল। দুহাতে তুলতেই হাল্কা মিষ্টি ছুম ছুম আওয়াজটা কানে বাজলো।
 নতুন বাসাতে জিনিসপত্র গোছাতে গোছাতে স্টোরওয়েলের কোণা থেকে কাগজের ছোট মোড়কটি হাতে উঠে এসেছে।
.
 তখন দু’হাজার সালের আগস্ট কি সেপ্টেম্বর। রাতদিন টানা বৃষ্টি। এরকম এক বৃষ্টির বিকেলে এক মহিলা আমার বাড়িতে এসে উঠল। মধ্যবয়সি ছোটখাটো কালো মজবুত গড়ন। খাওয়া পরা জোটেনা তবু দেখলাম সব কিছুতেই সে পরিপাটি। জানলাম আমার শ্বশুর বাড়ির সঙ্গে এই মহিলার নাকি দীর্ঘদিনের সম্পর্ক।
 দুর্যোগের সময় আমার এই ছোট্ট বাড়িতে অতিথি। সত্যি বলতে কি খুশি হতে পারিনি। তবু বউয়ের সম্মানের কথা ভেবে চুপ করে রইলাম।
 মা পিসিদের মাথায় তেল আমলা লাগানো, হাত পায়ের নখ কেটে দেওয়া, গা হাত পা টিপে দেওয়া আর সারা শরীরে খুব দক্ষ ও আরামের হাতে তেল মালিশ করে দেওয়াই নাকি এই মহিলার কাজ ছিল একসময়। বিনিময়ে বছরের শেষে কিছু ধান, অন্য আনাজ আর নগদ কিছু টাকা, নানা উৎসবে শাড়ি গামছা- এসব পেত সে। অবস্থাসম্পন্ন হিন্দু মুসলিম সব বাড়িতেই এরকম কাজ করে বেড়াত সে। কী তার ধর্ম, কোথায় তার আদি নিবাস তা নিয়ে মাথা ব্যথা ছিল না কারো কোনদিন।
 চারুবালা, চারুয়াম্মা, চারুমাসি কেউ কেউ চারুখালা- এরকম নানাভাবে নানা মহিলারা তাকে ডাকত। তার একমাত্র জোয়ান ছেলে তাকে ফেলে কোথায় চলে গেছেলি একদিন, আর ফেরেনি।
.
 পরদিন বিকেলে ঘরে ফিরতেই দেখলাম চারুমাসি আমার বৌয়ের মাথায় তেল লাগিয়ে দিচ্ছে। শুনলাম দুপুরে স্নানের আগে জোর করে সারা গায়ে তেল মালিশও করে দিয়েছে।
 রাত্রে বউ শোনালো, ‘মনে হচ্ছে এক দুদিন থাকবে। তবে তেমন খায়না। আলু সেদ্দ ডাল আর একটু ভাত। তুমি বিরক্ত হয়োনা। আমাদের বাড়ির পুরানো কাজের লোক…’
.
ছেলেবেলায় দেখেছি গেরস্ত পরিবারে সারা বছরের বিভিন্ন কাজের জন্য একজন করে নির্দিষ্ট লোক থাকত। যেমন একজন কর্মকার -লাঙলের ফলা, হেঁসে, কাস্তে, কুড়ুল প্রভৃতি বানানোর জন্য। একজন চর্মকার -পায়ের চটকি, চাষের সরঞ্জাম রাখার থলে ইত্যাদি বানানোর জন্য। একজন কিষাণ বা রাখাল -জমি চাষ ও গরু মোষ ইত্যাদি চরানোর জন্য। একজন ছুতোর -লাঙ্গল, গরুর গাড়ির চাকা ইত্যাদি বানানো বা মেরামতের জন্য। দু’তিন জন কাজের ঝি, প্রভৃতি এবং একজন নাপিতও।
 বছরসারা তাদের দেড় দু’মন ধান সঙ্গে সামান্য কিছু নগদ টাকা, এভাবেই মজুরি দেওয়া হতো তাদের।
.
 আমাদের মতো সাধারণ বাড়ির ছোট বড়রা থান ইট বা পিড়িতে বসে সেসময় নাপিতের কাছে চুল, দাড়ি, নখ কাটাতাম। আর বাবু বা মিয়াঁ বাড়ির ছোট বড়রা শৌখিন টুলে, মোড়ায় বা চেয়ারে বসে চুল দাড়ি নখ কাটাতো।
আমাদের মা, মাসি, পিসি, ঠাকমারা শীতকালে আমাদের গায়ে মাথায় ঘানির সরিষার তেল রগড়ে রগড়ে মাখিয়ে দিতো। আর বাবু বা মিয়াঁদের সারা দেহে তেল মালিশ করে দিত একজন পালোয়ান লোক।
 তেমনি সে সব দিনে বাড়িতে বাড়িতে চারুমাসিদেরও বেশ গুরুত্ব ছিল। হাল আমলের থ্রিস্টার ফাইভ স্টার এসি সেলুন, হেয়ার ডিজাইনার, বিউটি পার্লার, স্পা এসবের সাবেক পদ্ধতি তাদের হাতেই ছিল। এ ধরনের নানা কাজ পারিবারিক এবং বংশ পরম্পরায় করে আসত ওরা।
আমি বউকে ঠাট্টা করে বললাম, ‘সকালে আমারও মালিশ করে দিতে বোলো।’
.
আমার বউ তো আগে হতেই চারুমাসির ভক্ত বুঝেছি। দুদিনেই আমার দেড়-দু’বছরের মেয়েও তার ন্যাওটা হয়ে উঠল। ‘চায়ু মাসি চায়ু মাসি’ করে পেছন পেছন ঘুর ঘুর করতে শুরু করল। তার তেল মাখানো, স্নান করানো এমনকি মেয়ের খাবারের থালাও চারু মাসি হাতে তুলে নিল।
.
টানা সাত আটদিন বৃষ্টি চলেছে, আমাদের মেয়ে বিন্তি ঘরবন্দি থেকে হাঁপিয়ে উঠেছে। চারুমাসির কাছে যখন তখন বেড়াতে যাবার বায়না জুড়ছে। কিন্তু বৃষ্টির জন্য চারুমাসি পারেনি।
সেদিন বিকেলে বৃষ্টি কিছুটা ধরে এসেছে। আমি বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছি। হঠাৎ দেখি চারুমাসি- একহাতে দুধের কেটলি, কোলে বিন্তিকে নিয়ে আমার বাড়ির একটু দূরে সার্কাস মাঠে। প্রায় হাঁটু জলের ভিতর দিয়ে হেঁটে আসছে। ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে দুজনের মাথায় একটি মাত্র গামছা। বিন্তি খুশির উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ছে।
 আমার প্রচণ্ড রাগ হল। বুড়িটার কী কোনও হুঁশ নেই! বৃষ্টিতে ভিজে বিন্তি যে জ্বর বাধাবে! বাড়িতে পৌঁছাতেই চারুমাসির কোল থেকে বিন্তিকে ছিনিয়ে নিলাম। নিজেকে সংযত করতে না পেরে বলে দিলাম, ‘এতো বয়েস হয়েছে, তোমার কি এটুকু হুঁশও নেই? দুধের মেয়েটাকে ভিজিয়ে আনলে!’
তাতেও আমার রাগ মিটল না। বিন্তির দাবনার উপর কষে একটা চড় দিলাম। চারুমাসি আঁতকে উঠে সরে গেল। এই চড়টা যে আমি চারুমাসিকেই মারতে চেয়েছিলাম, তা চারুমাসি অক্ষরজ্ঞানহীন মহিলা হলেও হয়তো বুঝে ফেলেছিল।
 বিন্তি অনেকক্ষণ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল। বিন্তির মা মুখ গোমড়া, চোখ ছলছল করে মেয়ের দাবনার পাঁচ আঙুলের ছাপ মিটানোর জন্য সরিষার তেলের বাটি নিয়ে বসলো।
 আমার তখন নিজের উপরই প্রচণ্ড ঘৃণা হচ্ছে। দুধের শিশুকে মেরে আমি যার হুঁস আনতে চাইলাম তার কি কিছু হুঁস হলো?
বিন্তির রক্ত জমে যাওয়া দাবনাতে তেল মালিশ করলাম অনেকক্ষণ। চারুমাসি একমুখ কষ্ট নিয়ে দরজার কাছে বার কয়েক উঁকি দিয়ে সরে গেছে। বিন্তি ঘুমের মধ্যেও মাঝে মাঝে ফুঁপিয়ে উঠেছে।
.
পরের দিন স্কুল থেকে ফিরে জানলাম চারুমাসি চলে গেছে। বুকের ভিতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। বউ নাকি কিছু টাকা জোর করে হাতে গুঁজে দিতে গিয়েও পারেনি। বিন্তি ঘুম থেকে জেগে চারুমাসিকে দেখতে না পেয়ে, বিকেল অব্দি ‘চায়ুমসি যাবো, চায়ুমসি যাবো’ ঘ্যানঘ্যান করে আবার ঘুমিয়েছে। বিন্তির চোখমুখ লাল! সন্ধ্যা নাগাদ ধুম জ্বর এলো মেয়ের।

(২)

 কয়েক সপ্তাহ পর বউ ভয়ে ভয়ে জানাল, ওর কানের সোনার দুল জোড়া পাওয়া যাচ্ছেনা। আমি মুখের সবকটা পেশি শক্ত করে ওর মুখের দিকে তাকালাম, ‘তোমাদের বাড়ির খুব নির্ভরযোগ্য বিশ্বাসী চারুমাসি!’
.
এরপর আর আমরা চারুমাসিকে মনে রাখতে চাইনি। বিন্তিও দিনে দিনে স্বাভাবিক হয়েছে। মেয়ে মানুষের সোনাপ্রেম প্রখর তাই বোধহয় আমার বউ বুকের ভিতর চারুমাসিকে কাঁটার মতো বিঁধিয়ে রেখেছিল অনেকদিন। কখনও কখনও ভুলে চারুমাসির নাম তার মুখে চলে আসতো। আমি বউকে ভবিষ্যৎ বানী দিয়েছিলাম, ‘তোমার চারুমাসি আর এমুখো হচ্ছেনা জেনে রেখো।’
.
কিন্তু আমাদের সব ভাবনাচিন্তা, সিদ্ধান্ত উলটপালট আর অবাক করে মাস তিন চারেক পর চারুমাসি হঠাৎ আবার একদিন উপস্থিত হল।
বিন্তি খুশিতে ডগমগ করে উঠল আবার। কিন্তু আমাদের দুজনের ব্যাজার মুখটা আড়াল করার নিপুণ মকশো শুরু হল।
 চারুমাসি সেই আগের মতই। কোথাও তার কোনও অপরাধের চিহ্ন নিংড়ে পেলাম না। অভিনয় কি এতো নিখুঁত হতে পারে! আমরা নীরব সাবধানতায় আবার চারুমাসিকে মেনে নিতে বাধ্য, হ্যাঁ বাধ্যই হলাম।
 আমার ছোটখাটো অগোছালো ঘরকন্না তার হাতের পরিচ্ছন্ন ছোঁয়ায় আবার গুছিয়ে উঠল। মেয়ের নাওয়া খাওয়া বেড়ানো, বউয়ের তেল মাখা, চুল বাঁধা, শ্যাম্পু করা সমেত সংসারের সব কাজ চারুমাসির হাতে উঠে এল। বদলে ছেলেবেলার চেনা মানুষটার জন্য কিছুটা করুণা আর ক্ষমাঘেন্না বৌয়ের হাবভাবে ফুটে উঠল।
.
 একদিন চুল বেঁধে দেবার সময় বউ কথাটা তুলল, ‘মাসি আমার কানের সেই ময়ূরী দুল জোড়া কবে থেকে পাচ্ছিনা, জানো?’
 ‘ওঃ মা, সে কী! বিটিয়া তু তুলিস নাই!’ চারুমাসি ছিটকে উঠে গেল। তারপর বাথরুমের কোনও একটা কৌটো থেকে দুল জোড়া তালুতে করে নিয়ে এলো।
‘তু না, সে ছেলেবিলা থিকেই কুনো কথা মন দিয়ে সুনিস না, বিটিয়া। উস রোজ স্যাম্পু করার সুময় তুকে বুলেছিনু… আজ যদি না পেতাম, তা হলে আমি তুকে কী জওয়াব দিতাম বোল দেখিনি; আর জামাই রাজাই বা আমাকে কী সছতো বোল দ্দিখি?’
আমার বউয়ের মুখ খুশিতে ভরে উঠল। তা হারানো সোনার দুল ফিরে পেয়ে কতটা, আর আমার কাছে চারুমাসির হারানো সম্মান পুনরুদ্ধার হওয়াতে কতটা আমি জানিনা। তবে রাত্তিরে নিভৃতে আমরা দুজনেই খুব লজ্জিত হলাম।
আজ আবার আমরা ভরসা আর বিশ্বাসের সঙ্গে চারুমাসিকে আমাদের সংসারের একজন বলে মেনে নিলাম।
.
একদিন সকালে আমার মেয়ে বিন্তি মিষ্টি একটা ছুম ছুম আওয়াজ করে আমার কাছে ছুটে এলো। আর ঘুরে ঘুরে নেচে দেখাল আওয়াজের উৎস। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এ্যাই, তুই পায়ের নূপুর কোথায় পেলি?’ বিন্তি খুশি হয়ে জানালো, ‘চায়ু মাসি দিয়েছে। কী ভালো, না বলো?’
আমি চারুমাসির কাছে ছুটে গেলাম, ‘মাসি এসব কেন করেছো? খামোখা এতোগুলো টাকা নষ্ট করেছো! তোমার অবস্থা কি আমরা জানিনা!’
চারুমাসি তাড়াতাড়ি মাথার ঘোমটা টেনে বলল, ‘হামি গুড়িয়া রানীকে ভালোবেসে দিয়েছে। তোমে গোসা করবেনা জামাই রাজা!’
বউ শোনাল, ‘আর দেখো বলা নেই, কওয়া নেই সকালে উঠেই হঠাৎ বলছে চলে যাবে!’
আমি খুব অস্বস্তিতে পড়ে গেছি। বললাম, ‘না, না মাসি বিন্তির জন্য নূপুর কেনা তোমার উচিত হয়নি!’
গরীব মানুষ, একগাদা পয়সা খরচ করে… আমি মানতে পারছি না। আমার বৌয়ের কণ্ঠেও অনুযোগের সুর।
‘বিটিয়া, তোর বাপের বাড়িতে কত খেয়েছে, পরেছে, লিয়েছে তা কি সামান্য একজোড়া চান্দির মলে সোদ হয়ে যাবে, বোল? আমার বেটার মিয়ে হলেও তো তাকে দিতাম কেনে? তুরা গোসা করিস্না। জামাইয়ের ঘর আর কতদিন থাকবে বোল? আমি আবার আসবে, গুড়িয়ার জন্যে! তোদের জন্যে!’ চারুমাসির দুচোখের কিনারা উপচে জল গড়িয়ে এল।
 বুঝলাম ও শুনবে না। আমি বউকে ইশারা দিয়ে সরে এলাম। বউ জোর করে চারুমাসির আঁচলে শ’পাঁচেক মতো টাকা বাঁধবে বলে টানতেই আবিষ্কার করলো- তার কানে রুপোর বড় ঝুমকা জোড়া নেই। যা ছিল তার একমাত্র নারীত্বের আহ্লাদ।
 আমার বউ চেঁচিয়ে উঠল, ‘মাসি! এ কী করেছো তুমি!! তোমার কানের ঝুমকো বেচে আমার মেয়ের জন্য নূপুর…’
চারুমাসি সঙ্গে সঙ্গে আমার বউয়ের মুখ চেপে ধরেছে, ‘চোপ বিটিয়া, চোপ! জামাই রাজা সুনে লিলে খুব রাগ করবে!’
তারপর বিন্তির ঘুমের সুযোগে চোখের জল ফেলে বেরিয়ে গেছে চারুমাসি। সেই যে গেছে আর ফেরেনি।

আমার ক্লাস টেনে পড়া মেয়ে বিন্তির হাতে এখন পুঁচকে পুঁচকে দুটি পিতপিতে মামুলি রুপোর নূপুর। সে কখনো নিজের আবার কখনো তার মায়ের কানের কাছে নিয়ে গিয়ে ছুমছুম করে মিষ্টি  আওয়াজ তুলছে! ওর চোখে মুখে আচমকা শৈশব আবিষ্কারের এক অনাবিল বিষ্ময়-আনন্দ-সুখানুভূতির ছটা। এত বছর পর চারুমাসির কানের সেই ঝুমকা জোড়া আজ আবার আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। কিন্তু আজকের এই কিশোরী কি চালচুলোহীন মামুলি কোনও এক চারুমাসির সোহাগের মূল্য দিতে পারবে?

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।