মেহেফিল -এ- কিসসা নুসরাত রীপা

রুপোর পালংক

১)
সন্ধ্যে নেমে এসেছে।দিনের শেষ আলোটুকুও হারিয়ে গেছে কুঁয়াশা মাখা নরম অন্ধকারে।
আশ্বিন এখন। বাতাসে হাল্কা হিমের ছোঁয়া লাগে  ভোরের দিকে। সন্ধ্যার অন্ধকারে মাখামাখি হয়ে আছে গোবর আর ধূপধূনোর গন্ধ। গেরস্থেরা সন্ধ্যেবেলা মশা তাড়াতে গোয়ালঘরে ধূপের ধোঁয়া দেয়। একদল ঝিঁঝিঁ পোকা মনে হয় সাঁঝ নামার অপেক্ষাতেই ছিলো। দিনের আলো হারিয়ে যেতেই তারস্বরে ডাকতে শুরু করেছে। যেন এক্ষুণি এক্ষুণি জীবন দিয়ে গাইতে না শুরু করলে কী একটা কান্ড ঘটে যাবে।

সরু মেঠো পথটা দিয়ে হেঁটে আসছে সামু। ভীষণ ক্লান্তি বোধ হচ্ছে। যেন অনন্ত কাল ধরে চলছে তার এই পথ চলা। যেন আর ফুরোবার নয়। রাস্তাটাও মসৃন সুন্দর নয়। ভাঙাচোরা,এবড়ো থেবড়ো। মনে হয় গত তিন চার বছরে মেরামতের জন্য এর ওপর হাত দেয়া হয়নি। আসলে গ্রাম এখন উন্নত হয়ে গেছে। লোকজন পায়ে হেঁটে চলাচল করা কমিয়ে দিয়েছে। সাইকেল ভ্যান আর অটোর সহজ প্রাপ্যতা এবং একই সাথে কম ভাড়ায় চলাচলের সুযোগ থাকায় লোকজন নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া দূর যাত্রায় হাঁটে না।

আগে বাজার থেকে, শহর থেকে বাড়ি ফিরতে বাস থেকে নেমে মানুষেরা সময় কম লাগার জন্য এই লাল ইটের সরু পথটায় নেমে পড়তো। সামুর মনে পড়ে বাজারে বাবার দোকান ছিলো। মাঝে মধ্যেই সামুরা তিনভাই রিক্সাভ্যানে করে বাবার দোকানে চলে যেতো। তিন ছেলেকে নিয়ে বাবা আলী হোটেল এন্ড সুইটস এ চলে যেতেন। তিনভাই পেট ভরে পরটা রসগোল্লা আর চা খেতো। এতো এতো খাওয়ার পরও বাবা আবার জিজ্ঞেস করতেন আর কিছু খাবি?

খেয়েদেয়ে তিন ভাই যখন বাড়ি ফিরতো বাবা সহ তখন সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত নেমে আসতো।
রান্না করতে করতে মা একশবার উঠোনে নেমে আসতেন। সামুদের একমাত্র বোন মালাকে বলতেন বার ঘরের জানলা দিয়ে একটু দেখতে রাস্তায় ছেলেদের দেখা যায় কী না।

অবশ্য সেটা অল্প কিছু দিন। পরে মা আর মালা দুজনেই বুঝে গিয়েছিলো দেরি হওয়ার কারণ।তখন দুশ্চিন্তার বদলে মা রান্না শেষে ঘরের বারান্দায় ইলেক্ট্রিক এর বাতি জ্বেলে কাঁথায় ফোঁড় তুলতো। পাশে রাখা রেডিওতে চলতো সৈনিক ভাইদের জন্য অনুষ্ঠান দূর্বার।
আর মালা পড়ার টেবিলে বসে কান পেতে শুনতো বারান্দার রেডিও থেকে ভেসে আসা গান! মা পড়ার তাগাদা দিলে গাল ফুলিয়ে বলতো, তুমি ভাইজানদের বলো না কেন একদিন আমারে নিয়া যাইতে। তারা বাজারে কতো মজা করে,কতো কী খায়!

মালার অভিমান ভরা মুখটা মনে পড়তেই হাসি এসে গেলো সামুর।

অন্ধকার পথ। দু’পাশে নানারকম গাছ গাছালি। ওসবের ফাঁক ফোকর দিয়ে কোনো বাড়ির জানালার আলো দেখা যাচ্ছে। কোনো বাড়ির উঠোনে শিশু-কিশোরের দল কোলাহল করছে।লালচে আলোয় কারো মুখ স্পষ্ট নয়। হাঁটতে হাঁটতে আঁধারের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠা ছবিগুলো আঁধারে মিলিয়ে যাচ্ছে।

ধূর, হাঁটা পথে না আইসা রিক্সাভ্যানে উঠলে ভালো হইতো-মনে মনে ভাবলো সামু। আসলে গত রাত থেকে তার যে মানসিক এবং শারীরিক ধকল শুরু হয়েছে সে কারণেই মস্তিষ্ক সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেছে। এখন সে এমন একটা জায়গায় যেখানে থেমে যাওয়া যায় না।

২)
গতকাল অফিস থেকে ফিরে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে বিছানায় শুয়েছিলো । মনটা ভালো ছিলো না মোটে।গত কয়দিন ধরে ইনচার্জ এর সাথে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে  না। ওর পড়াশোনা কম। চাকরীও তাই ছোটো। অথচ বাবা পড়ানোর জন্য কতো চেষ্টাই না করেছিলেন। পড়তে চাইতো না বলে মা পাশে বসে থাকতেন। সামু ভাবতো,পড়ে কী হবে। সেতো কোনোদিন বাবা মা কে ছেড়ে কোথাও যাবে না। বড় ভাই চাকরী নিয়ে চলে গেলো। মেজো ভাইটা প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়ে নিরুদ্দেশ হলো। বোনটার বিয়ে হয়ে গেলো কুয়েত প্রবাসী ছেলের সাথে।

সামু স্থানীয় কলেজ থেকে ডিগ্রী পাস করে গ্রামেই থেকে গেলো। বাপ মায়ের সাথে। খায় দায় বাপের জমি দেখাশোনা করে। মা বাবা বিয়ের চেষ্টা করে। একে সামুর আগ্রহ নাই অন্য দিকে বেকার ছেলের কাছে কেউ মেয়ে দিতে চায় না। সামুর বিয়ে করা হয় না। বিয়ে নিয়ে সামুর মাথা ব্যথাও নেই। সে নদীর পাড়ে গিয়ে বসে থাকে। এদিকটা নির্জন। ছন আর হোগলার ঘন বন। সামনে টলটলে স্রোতোস্বিনী। ঝিরঝির হাওয়া জল কেটে বয়ে যায়। আকাশের নীল মেখে শ্যামল বিকেল ছড়িয়ে থাকে মায়ের আঁচলের মতো। সামুর মনে হয় পৃথিবীতে এর চেয়ে সুখ আর কিছুতে নেই।

সেই সামু আজ তিন বছর বাড়ি যায় না। যাওয়া আসায় মেলা খরচ। সে টাকায় সামুর এক সপ্তাহের খাবার হয়ে যায়। আর বাড়ি যাওয়া আসা মানে তো শুধু যাওয়া আসাই নয়। এতোদিন পর বাড়ি গেলে পাড়াপড়শী আত্মীয় স্বজনের জন্য আর কিছু না হোক দুটো মিষ্টি মন্ডা তো নিতে হয়। বাবা অসুস্থ। বাড়ীর বাজার সদাই পাড়ার কেউ না কেউ করে দেয়। সামু গেলে তো সেই বাজার তাকে করতে হবে। কর্মক্ষম জোয়ান ছেলে বাড়ীর বাজার করতে বাপের কাছে টাকা চাওয়াটা ও ভালো দেখায় না। অথচ ঐ রকম টাকা খরচ করার ক্ষমতা কোথায় সামুর। গত তিন বছর ঈদ পরবেও বাড়ি যায়নি সে। ফোনে মা বার বার ডেকেছে। সামু কাজের দোহাই দিয়ে মাকে নিবৃত্ত করেছে।অথচ ছোটোবেলা থেকেই সামু মা ন্যাওটা।
চার ভাইবোনের মধ্যে সামু মেঝো। সবাই বলে মেঝো সন্তান ডাকাবুঁকো হয়। খানিকটা অবাধ্যও। আর সামু ছোটোবেলা থেকেই মাকে কাছে পেলে আর কিচ্ছু চাইতো না । হয়তো ফুটবল নিয়ে তিন ভাইতে গোল বেঁধেছে, উঠোনে তুমুল চিল্লাফাল্লা।  তখন অস্থির মা, রসুই ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে যদি বলতো,যে বল নিয়ে ঝগড়া করবে না, তাকে আমি কোলে বসাইয়া কুটনা কাটবো।

দেখা যেতো মায়ের কথা শেষ হয়নি সামু সব ফেলে এক দৌড়ে মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে! না, কোলে উঠবার জন্য নয়, মা অতো কোলে নিতে পারতেনও না। মালা হওয়ার পর তার কী সব অসুখ হয়েছিলো।  সামু চাইতো কেবল মায়ের পাশে বসে থাকতে।

বহুদিন পর্যন্ত, অনেক বড় হয়েও মা হয়তো কাজে ব্যস্ত,মায়ের শাড়ীর আঁচল টা আস্তে করে মুঠোয় নিয়ে শুঁকে নিতো সামু। নরম তুলতুলে আঁচলটায় কী যে এক মিঠে বাস, সামুর ইচ্ছে করতো সে আঁচল জড়িয়ে বসে থাকতে। এমনটা সে করেওছে অনেক সময়, যখন মা নানার বাড়িতে বেড়াতে যেতো ওদের তিন ভাইকে বাড়িতে রেখে। সামু তখন মায়ের শাড়ি জড়িয়ে শুয়ে থাকতো।

৩)
সময় বদলায় কথাটা প্রমাণ করতেই বছর পাঁচেক আগে বাবা প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার অর্থ জোগাতে জমি বিক্রি চললো অবলীলায়। বাবা সুস্থ হয়ে উঠলেন। কিন্তু তখন ঘিরে ধরলো অভাব। বাবার অসুস্থতার সময়ই দোকানটা  লসে চলে যাচ্ছিল।  শেষাবধি ওটা বিক্রিই করে দিতে হলো। সামান্য একটু জমি, কয়েকটা গরু-সংসারের চাকা চলতে চায় না। ভাইজান কিছু পাঠায়। কিন্তু বাবার ওষুধ পথ্য হয় না। সকাল সন্ধ্যা জায়নামাজে বসে মা চোখের জল ফেলে। জীবনে প্রথম মাকে বিষন্ন,হতাশ আর দুঃখী দেখে বুক ভেঙে আসতে চায় সামুর। অবশেষে চেষ্টা চরিত করে, পরিচিত একজন কে ধরে এই চাকরীটা জোগাড় করে নেয়। একটা কনস্ট্রাকশন ফার্মে সহকারী একাউন্টস অফিসার। মাস শেষে কুড়ি হাজার টাকা বেতন। মেসভাড়া, খাওয়া খরচ  আর কিছু হাত খরচা রেখে বাদ-বাকি সবটাকা বাড়ি পাঠিয়ে দেয় সামু।

চাকরী টা ছোটো।  তাই বসদের ঝাড়ির পরিমাণ বেশি। টাকা পয়সার ব্যাপার।  সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। এরই মধ্যে গতকাল বিকালে বাড়ির ফোন। সামু সবেমাত্র পটল দিয়ে রান্না করা চাষের পাঙ্গাশ আর ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে উঠেছে। এঁটো হাতেই মোবাইল তুললে, ওপাশ থেকে ফ্যাসফ্যাসে কন্ঠে ভাইজান বললো, মা খুব অসুস্থ।। তাড়াতাড়ি বাড়ি চইলা আয়।  ব্যস এটুকুই। তারপর অনেকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ হয় না আর। সামু ভেবে পায় না ভাইজান কি মা’র অসুখের কথা শুনে বাড়িতে এসেছে নাকি তার আগে থেকেই আছে!

সামুর ক’দিন ধরে পিঠে ব্যথা হচ্ছে। ডাক্তার এর কাছে যাওয়া দরকার। বেতনের টাকা যেভাবে বাজেট করা তা থেকে ডাক্তার এর অতিরিক্ত খরচ  অসম্ভব। তাই খরচ বাঁচাতে নিজের ফোনে রিচার্জ বন্ধ রেখেছিলো সামু। ফোন তো তার বলতে গেলে আসেইনা। বাবা মা মোবাইল ব্যবহারে তেমন অভ্যস্ত নয়। সামুই মাঝে মধ্যে ম্যানেজারের রুমে ঢুকে টুপ করে প্রয়োজনীয় ফোন করে নেয়। গত কিছুদিন কাজের চাপে ফোন করা হয়ে ওঠেনি।

গত তিন বছরে একবারও ছুটিতে যায়নি সামু। ভেবেছিলো ও চাইলেই ছুটি পাবে। কিন্তু সে ছুটি পেতে ও হাঙ্গামা করতে হয়েছে।

বাড়িতে যাওয়ার জরুরী ডাক, মা অসুস্থ। ভেতর প্রচন্ড অস্থিরতা। অতঃপর রাত আটটায় ব্যাকপ্যাকে দুটো জামা ভরে মেস থেকে বেরিয়ে পড়েছে সামু।

ঢাকা থেকে বাড়ি তো আর কম দূর নয়। চৌদ্দ ঘন্টার জার্ণি। বাস, ট্রেন,ফেরি সব বাহনই লাগে দেশের  পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ওদের এই ছোট্ট গ্রাম চানপহরে আসতে।

৪)
সারাটা পথ প্রচন্ড অস্থিরতায় মধ্যে কেটেছে। ছোটো বেলার, বড়বেলার নানা স্মৃতি হুটহাট করে চলে আসছে। সামুর চোখে ঘুম।  কিন্তু ঘুমোতে চাইলেই কী একটা ঘোরের মধ্যে চলে যায়! ট্রেনের একটানা ঝিকঝিক শব্দকে উপেক্ষা করে সাদা সাদা একটা আলোময় বিকেল-ভাইবোনদের উল্লাস জেগে ওঠে। উঠোনে বিশাল একটা মাছ। বাবা কিনে এনেছে। মা সেটা কাটার বন্দোবস্ত করছে। আকাশ থেকে তরল নরম রোদে মায়ের নাকের নীচের ঘাম হীরক কুচির মতো চিকচিক করছে! বিশাল বটি দা দিয়ে মা মাছ কুটবার আগেই আবার দৃশ্যপট বদলে যায়। হকারের পানি,পান, কলা ইত্যাদির বিক্রির জন্য বিচিত্র ভঙ্গীতে ডাকাডাকি-সামু সম্বিৎ পায়- ও এখন ট্রেনে বাড়ি যাচ্ছে। মা অসুস্থ।  পেটের ভেতর কোথায় যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। ঘুম ছুটে যায়। সামু পানি ওয়ালাকে ডেকে এক বোতল পানি কিনে।ঢক ঢক করে একনিমিষেই পুরো বোতল শেষ করে ফেলে। তৃষ্ণা !  তৃষ্ণা!  গত সন্ধ্যা থেকে বুকের ভেতর এতো তৃষ্ণা, বোতল বোতল পানি খেয়েও মিটছে না! সামু ঘোর ভাঙা চোখে তাকিয়ে দেখে একজন বোরকা পরিহিতা বাচ্চা কোলে ভীড় ঠেলে পাশের কামড়ার দিকে যাচ্ছে। কিছু লোক সামনের স্টেশনে নামবে বলে আগে থেকেই বাক্স-পেঁটরা গোছাচ্ছে। জানালার পাশে বসা লোকটাকে প্রায় অগ্রাহ্য করে জানলা দিয়ে বাইরে তাকায় সামু। লাল ঘোলা আলো চোখের সামনে ক্রমশঃ স্পষ্টতর হয়।-
ট্রেন থেকে নেমে বাস। লোকাল বাস। লোকে ঠাসা। ভীড়,চাপাচাপি, ঠেলাঠেলি। অজস্র শরীরের গন্ধ মিলেমিশে কেমন একটা ভ্যাপসা হাওয়া বাসের ভেতর। বাইরে হা হা কড়া রোদ। সকাল গড়িয়ে গেছে অনেকক্ষণ। বাস একটু পর পর থামে। লোক নামায়, তোলে। তারপর তুমুল স্পীডে ডানে,বাঁয়ে কাত হয়ে ধূলো উড়িয়ে,তীব্র স্বরে কোঁকাতে কোঁকাতে ছুটতে থাকে,আবার পেছন থেকে কেউ আওয়াজ দিলে হুট করে থেমে যায়। সময় গড়ায়।বুকের ভেতর অস্থিরতা বাড়ে। মা রে!  —– সামু চোখ বন্ধ করে স্রষ্টার কাছে হাত জোড় করে প্রার্থনা করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে!

এক মহিলা তার বাচ্চাকে এই ভীড় বাসের মধ্যেও জোর করে খাওয়াতে চেষ্টা করছে। বাচ্চাটা খাবেই না। মহিলার স্বামীর হাতে খাওয়ার বাক্স। সেদিকে তাকিয়ে সামু ফের আনমনা হয়ে পড়ে। খাওয়া নিয়ে তারা ভাইবোনেরা কখনো ঝামেলা করেনি। তবুও মা কোনো কোনো শীতের সকালে মস্তো গামলায় ভাত তরকারী মেখে উঠোনে মাদুর পেতে বসে  ছেলেমেয়েদের ডাকতেন। সামুরা সব ভাই বোন মাকে ঘিরে বসতো। মা সবার মুখে এক একটা জাম্বুরা সাইজ লোকমা তুলে দিতেন! সামুর মনে আছে মায়ের হাতে হলুদ,রসুনের গন্ধ,  সামু খেতে চাইতো না। মা তখন গল্প শোনাতেন। রাজা রাণীর গল্প। সে গল্পে রাজকন্যা রুপোর পালংকে ঘুমাতো। সেই রুপোর পালংকের ব্যাপারটা ভীষণ পছন্দ করেছিলো ভাইজান। তার কখনো কিছুর দরকার হলে মা কে বলতো, এখন দাও মা। বড় হইয়া আমি তোমারে রুপার পালংক বানাইয়া দিবো। তুমি রাজকন্যার মতো সেই পালংকে ঘুমাইবা!
ভাইজানের এই কথাটায় মা খুব মজা পেতো। আত্মীয় পরিজন এলে সবাইকে সে বলতো, কামু বড় হইয়া আমারে রুপার পালংক বানাইয়া দিবো– মায়ের চোখ তখন চক চক করতো,রুপোর পালংকের জন্য নয়,ছেলের ভালোবাসার মুগ্ধতায়!

মায়ের সেই মুখটা মনে পড়তেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামু। মনে মনে ভাবে এতোদিন বাড়ি না গিয়ে ভীষণ ভুল হয়ে গেছে। বুকের ভেতরটা হাহাকার করে। কেমন একটা জ্বলা জ্বলা অনুভূতি । একবালতি বরফ ঢাললে বুঝি সে বুক শীতল হয়! সামু ভাবে এবার মা সুস্থ হয়ে উঠুক,যতো কষ্টই হোক প্রতিমাসে মা কে দেখতে বাড়ি আসবেই। ভাবতে ভাবতে  বাচ্চা খাওয়াতে থাকা ঐ মহিলার দিকে তাকায়। বাচ্চাকে খাওয়াতে সে তখনো চেষ্টা করেই যাচ্ছে। তার সোনালী পাড় শাড়ীর আঁচল খাবারে মাখামাখি হচ্ছে সেদিকে খেয়ালই নেই। সামু জানালার বাইরে চোখ রাখে। পিছে চলে যেতে থাকা দৃশ্যাবলী রোদের তাতে ঝাপসা হয়ে আসতে থাকে দূরের শহর, গ্রাম, মাঠ আর বৃক্ষলতা!

ঈদের দিন। মেহমানে ভরা বাড়ি। মা একটা জলপাই রঙা শাড়ি পরেছে। কমলা আঁচলে গোলাপ ফুল ছাপানো। মা রান্না করছে। মাটির চুলো। অসাবধানে সেই গোলাপ আঁচলে আগুন ধরে গেলো। দাউ দাউ আগুন। সামু দৌড়ে পানি আনতে পুকুরের দিকে ছুটলো। হাতে লোহার বালতি। বালতিটা বড় আর ভারি। সামুর দৌড়াতে কষ্ট হচ্ছে। একটা ইটে পা বেজে সামু পড়ে গেলো। বালতিটা কোথাও ঠোকর খেতেই বিশ্রী শব্দ হলো। সামু চমকে উঠে। বাস প্রচন্ড ব্রেক কষে থেমে গেছে। আবারো ঘোর ভাঙে।

৫)
সামু মোবাইলে সময় দেখে।  পৌনে আটটা বাজে।এই পথ দিয়ে কতো শতবার যাওয়া আসা করেছে অথচ আজ হাঁটতে গিয়ে পা যেন চলছেই না। এই পথটাকে সহস্র মাইল মনে হচ্ছে। হাঁটার কষ্ট আর মনের দুশ্চিন্তা মিলে ক্লান্তিটা কয়েকহাজার গুণ বেড়ে গেছে।

অবশেষে বাড়ির দরজা, কুঞ্জলতায় ছাওয়া, অন্ধকারে গুহামুখের মতো মনে হয়। তিন বছর আগে, শেষবার যখন এসেছিলো ঠিক এমনই দেখে গিয়েছিলো। টিনের সীমানা বেড়ার সামনে দাঁড়িয়ে চতুর্পাশে দৃষ্টি বোলায় সামু। বেড়ার ওপাশে চিরপরিচিত উঠোন। টিনের চালের ওপর ঝুঁকে থাকা সজনের ডাল। সজনের ঝিরিঝিরি পাতা বাতাসে দোলে, আলোছায়ার চিকরিমিকরি কাটে সাদা উঠোনের ওপর যেখানে বসে মা কূলোয় চাল ঝাড়ে!
বাইরে থেকে বাড়িটা সুনসান। নানান প্রশ্ন জাগে মনে।বাড়িতে কেউ নেই না কি? মা কি তবে হসপিটালে?মায়ের খারাপ কিছু হলে তো বাড়িতে লোকজন থাকার কথা। অন্তত: পড়শীরা তো থাকবেই। মা যে সবার বড় প্রিয়জন। শিউলী ফুলের মতো কোমল,মায়াবতী! চোখ থেকে হঠাৎ এক ফোঁটা গড়িয়ে পড়া জল সামু আঙুল দিয়ে মুছে নেয়।
ভেতর থেকে খুব মৃদু একটা গন্ধ ভেসে আসছে। চেনা চেনা গন্ধ। কিন্তু কিসের গন্ধ মনে পড়ছে না। সামু বাড়ির ভেতর ঢুকতে গিয়েও একটু থামে। বুকের ভেতর ঢুপ ঢুপ করে পেন্ডুলাম পেটাচ্ছে হার্টটা!

মনে মনে আল্লাহর দরবারে আবার প্রার্থনা করে, মা যেন সুস্থ থাকে। প্রার্থনা করে বটে কিন্তু মনের মধ্যে স্বস্থি পায় না।
উঠোনে পা রাখতে রাখতে সামু বরাবরের মতো জোরে হাঁক ছাড়ে, ঐ মা, মা—
কিন্তু ও নিজেই বুঝতে পারে গলায় জোর ফুটছে না।
ও আবার জোরে ডাক দেয়, মা—–

আবছা অন্ধকারে গুমোট নিরবতা গম গম করে। বাতাসে টিনের চালে নারকেল ডাল ঘষা খেয়ে শব্দ তোলে অচিন সুরের হাহাকার।সামুর চোখে পড়ে একটা  লাশবাহী খাটিয়া আমলকী গাছের পাশে রাখা। বারান্দার মৃদু আলোয় স্টীলের খাটিয়াটাকে সামুর কাছে রুপোর পালংকের মতো মনে হয়।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।