মেহেফিল -এ- কিসসা, নুসরাত রীপা

সানজু’র বিয়ের প্রাসঙ্গিকতা ও অপ্রাসঙ্গিকতা

এক)
আজ সন্ধ্যায় সানজু’র বিয়ে।
এখন দুপুর একটা।
এটা যে একটা বিয়ে বাড়ি কে বলবে।
মীরা, বাধন পপাই সবাই যার যার মতো স্কুল, কলেজে গেছে।চাচা কাজে গেছে। চাচীমা প্রতিদিনের মতো রান্না ঘরে কাজের বুয়ার সাথে জোরে জোরে গল্প করছে। সানজু জানে মা ও এখন রান্না ঘরে আছে। তবে মিতভাষী মা হয়তো নিরবে আনাজ কুটছে।
আনাজ কুটছে? সানজু একটু ভ্রু কুঁচকায়
। যে বাড়িতে সন্ধ্যায় বিয়ে সে বাড়িতে কি দুপুরে আনাজ পাতি রান্না হয়? কী জানি। হয়তো হয়। কিন্তু এটা ঠিক নয়।  এখন পোলাও, গোশত রান্না হওয়া উচিত।  সঙ্গে কুড়মুড়ে বেগুন ভাজা, ফিশ ফ্রাই! এটুকু ভেবে আপন মনেই হেসে ফেললো সনজু।
জানলার পাশে একটা চেয়ার টেনে মুখ গুঁজে বসেছিল ও।পর্দা দুই পাশে টান করে সরানো। গলিপথটায় খটখটে হলুদ রোদ অনড়ের মতো লেপ্টে আছে। ভাদ্রের ভ্যাপসা গরম গলির দুপাশের নতুন পুরাতন বিল্ডিংগুলোর দেয়ালে দেয়ালে সেঁটে আছে। মাঝে মাঝে দুএক টুকরো হাওয়া রোদের গন্ধ মেখে বয়ে যায়।
দুপুরটায় এ গলিটা সুনসানই থাকে। এখানে সকালটা সরব থাকে হরেক ফেরিওয়ালার হাঁকাহাঁকি,চেঁচামেচিতে। ফেরিওয়ালারা কী যে বিক্রি করে না ভেবে অবাক হতে হয়। আর বিকেলটা সরব হয় ছেলে ছোকরাদের খেলার হুল্লোড়ে। ঐ এক ক্রিকেট।  ব্যাট,বল, উইকেটের ঠিক নেই। দল টল বলেও কিছু থাকে না। সবাই বোলার,সবাই ব্যাটসম্যান! সানজুর এই খেলাটা ভীষণ বিরক্ত লাগে।  এসময় বাসার বাইরে যেতেই ভয় লাগে কখন একটা বল মাথায় বা গা এ এসে পড়ে!
সানজু ঘাড় বাঁকিয়ে গলির দুইপাশে যতদূর দেখা যায় দৃষ্টি বোলায়।একটা হুডতোলা রিকশা হেলতে দুলতে গলি পথ দিয়ে চলে যাচ্ছে। দূরে একটা বাড়ির সামনে লাল রঙের একটা মোটর বাইক দাঁড়ানো। মোটর বাইক দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো সানজু। ওর খুব সখ ছিলো জীবনে একটা প্রেম করবে। ওর প্রেমিকের একটা লাল রঙের মোটর বাইক থাকবে। সেই বাইকের পেছনে চেপে সারা শহর ঘুরে বেড়াবে!
কিন্তু ভাবা সহজ। বাস্তবতা কঠিন।
সানজুর আর প্রেম করা হবে না। প্রেমিকের পেছনে বসে মোটর সাইকেলে ঘুরে বেড়ানোর তো প্রশ্নই আসে না।
সানজু চেয়ার ছেড়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালো। ও ফরসা নয়। বেশ ময়লা গায়ের রঙ। আদর করে একে শ্যামলা বললেও এটি আসলে কালো। তবে কালো হলেও নাকে চোখে মুখে কচি বয়সের আভা ঝকমক করে।
আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই হাসলো সানজু। আজ ওর বিয়ে। চাচার এক কাস্টোমারের সাথে। লোকটার অনেকগুলো বিজনেস। অনেক টাকা। প্রথম স্ত্রী আছে।  বয়স হয়েছে।  খিটমিটে হয়েছে মেজাজ। লোকটা চায় একটা মিষ্টি শান্ত লক্ষ্মী বউ! চাচা যদিও বলেছে লোকটার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। কিন্তু সানজুর ধারনা লোকটার বয়স পঞ্চাশ। সানজু লোকটাকে দেখেছে। ওর স্কুলের হেড স্যারের মতো দেখায়। হেড স্যার একদিক কথায় কথায় বলেছিলেন তার বয়স পঞ্চাশ।
এতো বয়স্ক একটা লোকের সাথে মেয়েকে বিয়ে দিতে রাজি হয় নি মা। বাবা তো শুনতেই পায়না কিছু। আকার ইঙ্গিত এ কী বুঝেছে কে জানে! হাত নেড়ে কী বলেছে তাও কেউ বোঝেনি। চাচা মাকে বুঝিয়েছে ভদ্র লোকের সাথে সানজুর বিয়ে হলে তিনি সানজুর বাবা মাকে কিছু জমিজমা কিনে দেবেন যাতে তারা খেয়ে পরে বাঁচতে পারে। তার পক্ষে তো বাড়তি তিনজন মানুষকে পালা সম্ভব নয়। আর সানজু তো পড়তেও পারছে না  ঘরে বসে আইবুড়ো হলে শেষে ঘাটের মরা ও জুটবে না ।  কথা সত্যি। আবশেষে অগত্যা রাজি হলো মা। তবে সানজুদের পরিবারের কথা নয় নিজের কিছু স্বার্থের কারণেই চাচা যে বিয়েটা দিতে আগ্রহী সেটা মুখে না বললেও আন্দাজ করা যায়!
সানজু বুঝতেই পারছেনা আজ ওরই
বিয়ে। বিয়ে বাড়ির কোনো লক্ষণ কোথাও নেই। রান্না ঘর থেকে ডাল পোড়া গন্ধ ভেসে আসছে।

দুই)
একটা ঘরেই ওরা বাবা,মা,মেয়ে তিনজনে থাকে। ওদের যা কিছু সম্পত্তি,যা কিছু আসবাব সব এঘরেই ঠাসাঠাসি করে রাখা। এছাড়া আর কীই বা করার।  চাচার বাড়িওতো প্রাসাদ নয়। এই একটা ঘর দিয়ে তাদের ওতো কম কষ্ট হচ্ছে না। সানজু এসব বোঝে।
বাবা, মা কে নিয়ে সানজুদের ছোট্ট পরিবারটা খারাপ ছিলো না। কিন্তু হঠাৎ  কী একটা অসুখে বাবার শ্রবণ শক্তি নষ্ট হয়ে গেলো। কিছু শুনতে পান না।একই সাথে মুখের ভাষা থেমে গেলো। কলেজের দপ্তরীর চাকরিটা চলে গেলো। যে লোক কানে শোনে না সে কাজ  করবে কিভাবে! চিকিৎসার জন্য জমিজমা যা ছিলো বন্ধক দিয়েছিলো। সেসব আর ছাড়ানো হয়নি। সানজু তখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী।  অভাবের তাড়নায় স্কুল ছাড়তে বাধ্য হলো। একথা ঠিক,স্কুলে বেতন লাগে না,বই ও সরকার দেয়।  তাতে কী। কাপড় জামা লাগে,তেল সাবান লাগে। অন্তত দুবেলা খাবার তো চাই।
ভাত জোটে না পেটে তার আবার লেখাপড়া!
প্রায় পথে বসার অবস্থা।  সে সময় চাচা নিজেই ডেকে সেধে ঘরে আনলেন। তিনি ছোটো খাটো সাপ্লাই এর বিজনেস করেন।  আয় ভালোই। বললেন,আমার ভাই রাস্তায় ঘুরবে,লোকজনে নানা কথা বলবে সেসব শুনতে চাই না। আপাতত থাকো। সেই থেকেই থাকা। তবে থাকাটা ক্রমশঃ দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
বাবা টিভি দেখতে ভালোবাসেন। শুনতে পাননা। তবু টিভি ছেড়ে বসেন। সানজু দেখেছে বেশ কয়দিন চাচীমা বাবার হাত থেকে রিমোট নিয়ে টিভি বন্ধ করে দিয়েছেন। বাবার আড়ষ্ট কথায় কর্ণপাত করেনি। সানজুর কান্না পায়।এবাসায় থাকতে ওর ভালো লাগে না।
তিন)
সানজু আয়নার সামনে থেকে সরে আসে।
বিছানার একধারে একটা জাম কালারের বেনারসি রাখা। সানজুর হবু বর পাঠিয়েছেন। শুধু তাই নয়।  একটা বক্সে কিছু গয়না ও আছে। সানজু শাড়িটা হাত দিয়ে স্পর্শ করে। বড় সখ ছিলো লাল বেনারসি পড়বে নিজের  বিয়েতে।  মনে মনে আবার হাসলো সানজু। বিধাতা কিছু মানুষের আশা পূরণ করবেন না এমন পণ করে ই বুঝি তাদের পৃথিবীতে পাঠান।
বিয়ে হবে সন্ধ্যায়। মাগরেব এর নামাজের পর। বর পক্ষই কাজি নিয়ে আসবেন। চাচার কাস্টোমার মানে সানজুর হবু বর বেশি হুল্লোড় করতে নিষেধ করেছেন। বিয়েটা তাই চুপচাপ হবে। চাচী বলেছেন পাশের বাসার শিউলি ই সানজুকে সাজিয়ে দেবে।শিউলি কলেজে পড়ে  ।  সানজুর সাথে দুদিন কথা হয়েছিলো। কী যে মিষ্টি করে কথা বলে!
চার)
সন্ধ্যা বেলা চাচী যখন সানজুকে সাজানোর জন্য শিউলিকে ডেকে আনলেন তখন গোলমাল বেঁধে গেলো। সানজুর বিয়ে শুনে শিউলি বিস্ময়ে ফেটে পড়লো। সেকি আন্টি! সানজুর তো বিয়ের বয়স হয় নি। আপনি জানেন না, আঠারো বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে দেয়া আইনগত দন্ডনীয় অপরাধ?
চাচী রেগে বললেন, রাখো তোমার অপরাধ। ওদের থাকা খাওয়ার জায়গা নাই। আইন মেনে কী পেট ভরবে?
সানজুর মা চোখের জল মুছে শিউলিকে বললেন,দাও মা মেয়েটাকে সাজিয়ে দাও।
শুভ কাজ —
কিন্তু শিউলি তা শোনেনা। ও বলে, আমি সমাজ কল্যাণ সমিতির সদস্য। কোনে অন্যায় প্রশ্রয় আমি দিতে পারি না। একটা শিশু কন্যাকে আপনারা বিয়ে দিতে পারেন না।
শিউলির কথা অবশ্য চাচী শোনেন না তিনি শিউলিকে বাসা থেকে বের করে দেন।তারপর নিজেই লেগে যান সানজুকে সাজাতে।  বরপক্ষ এসে গেছে দেরি করার সময় নাই।
বরপক্ষ অনেক মিষ্টি এনেছে। পপাই আর বাঁধন বাক্স খুলে খুলে সে সব মিষ্টি ঘুরে ঘুরে খাচ্ছে ।চাচা বসার ঘরে বসে হবু জামাই এর সাথে কিছু ইলেক্ট্রিক মাল সাপ্লাই এর ব্যপারে আলোচনা করছে। সানজুর বাবা বাসায় নেই। এই মুক ও বধির লোকটার তার মেয়ের বিয়ে নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। মা বসে বসে সানজুকে সাজানো দেখছে।
মাগরেব পেরিয়ে এশার ওয়াক্ত এসে গেলো।  কাজি এসে পৌঁছায় নি। দূরের মসজিদ থেকে আজান ভেসে আসছে, রাস্তার কিছু কোলাহল সাথে নিয়ে।
ঠা ঠা গরমে ভারী শাড়ির ভেতর সানজুর শরীর টা মনটার মতই ক্রমশঃ গলে যায় যেন!
পাঁচ)
হঠাৎ হৈ চৈ শোরগোল।
সবাই সচকিত।
ঘটনা কী!
শিউলিকে চাচী বাসা থেকে বের করে দিয়েছিলো।  শিউলি তাই রেগে বাল্য বিবাহ ঠেকাতে পুলিশ নিয়ে এসেছে।
শুধু পুলিশ নয়। ম্যাজিস্ট্রেট ও এসেছেন।এসেছেন সেই সময়ে ম্যাজিস্ট্রেট এর দপ্তরে উপস্থিত থাকা দুটো জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিকও।
অতঃপর নাবালক বিয়ে করতে আসায় হবু বর এরেস্ট  হলো। চাচার হাতেও হাতকড়া পড়লো।
সরকারের নিষেধ সত্ত্বেও সানজুর বাল্য বিবাহ হতে যাচ্ছিলো, শিউলির সাহসিকায় তা রদ করা গেছে- আগামিকাল পত্রিকায় আসার জন্য সাংবাদিক দের কাছে এমন একটা খবর রেডি এখন।
সানজু হা করে  সব দেখছিলো।
ম্যাজিস্ট্রেট সানজুর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ভয় নেই মা। তোমার বয়স শ্বশুর বাড়ি যাবার নয়।পড়াশুনো,খেলাধুলো করার, নিয়মিত স্কুলে যাবে, পড়াশুনো করো মন দিয়ে—
হতভম্ব কিছু সময় কেটে গেলো।
পুলিশ আসামিদের নিয়ে বেরোতে যাবে! চাচা সানজুর মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বললেন, ভাবি থানায় যাচ্ছি।  হয়তো রাতেই ফিরবো। আমি এসে যেনো তোমাদের আর এই বাসায় না দেখি!
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।