মেহেফিল -এ- কিসসা তমা বর্মণ (বইনিয়ে মত)

মানবজীবনের “যে জীবন ঘুণপোকার”

“যে জীবন ঘুণপোকার” পড়তে পড়তে মনে হল মানবজীবনের এক একটি ঘূর্ণিপাককে যেন লেখক শ্রদ্ধেয়া সাফিয়া খন্দকার রেখা ছোট্ট করে এঁকে গেছেন তাঁর কলমে। “যে জীবন ঘুণপোকার” এর সাহানা এক অসাধারণ চরিত্র! লেখক খুব যত্নে তাঁকে ধরেছেন পড়তে পড়তে বোঝাই যায়। আসলে সাহানা আমাদের চারপাশেই লুকিয়ে থাকা অনেক মুখের মধ্যে একটা দুঃখী মুখ। না। তারপরও তাঁকে তথাকথিত অভাগী নারী চরিত্র বলে মনে হয় না। নিপুণ দক্ষতায় লেখক সাহানার কাছে পৌঁছে দেন এক অসাধারণ মনের নারীকে। তিনি শক্তি রাখেন ব্যক্তিত্বে। স্বামী বিচ্ছিন্না হবার পরও। লাবিবের ভালোবাসা যার মধ্যে এক অসহায় সংঘাত তৈরি করে। কিন্তু ভালোবাসায় তাকে ধরা দিতেই হয়। লাবিবকে জানতে জানতে চোখ ভিজে ওঠে। দারুণ এক মানবিক বোধে গড়েছেন লেখক লাবিব চরিত্রকে। দাগ কেটে রইলো আমার। একটি উপন্যাস মনের খুব কাছে পৌঁছাতে পারে যদি তাতে মানুষের কথা বলা হয়। পাঠক খুঁজে নিতে পারেন কোনও না কোনও চরিত্রে নিজেকে। অথবা চেনা ঘটনা প্রবাহের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসা এমন কোনও মানুষের কথা যদি মনে এসে যায় বুঝতে হবে লেখকের রক্তক্ষয় সার্থক। এই উপন্যাসের পরিধি বিশাল না হলেও বিস্তৃত জীবন দেখতে পাই। দারুণ ভালো লাগা তৈরি হয়। একে একে উঠে আসে আরও অনেক চরিত্র। তাদের মনস্তাত্ত্বিক ভাবনার পর্দা সরাতে সরাতে লেখক দেখিয়ে গেছেন, পরিশীলিতভাবে নানারকম জীবনকথা। এমন করেই সিয়াম এবং কাব্যকে জানি। ভালো লাগে। এবং মিরাজকে জেনে বুঝে যাই মুখোশের আড়ালেও কারো কারো মুখ বিভৎস হয়। এটাই জীবন। জীবনের বাস্তবতা।
লেখক হিসেবে সাফিয়া খন্দকার রেখা পুরো জীবন এবং জীবনের যাপন থেকে উঠে আসা সুন্দর অসুন্দর সমস্ত মুহূর্তকে অদ্ভুত এক ছন্দে গেঁথেছেন!
অর্থাৎ পুরো উপন্যাসে আমার কোথাও মনে হয়নি, এই চরিত্রটি বাড়তি। অথবা কোথাও যোগসূত্র হারিয়েছে বা দরকার ছিল না। টান টান উপস্থাপন। কাহিনি বিন্যাস ঝরঝরে সংলাপের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছে। শ্রদ্ধেয়জন এবং আমার অত্যন্ত প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদের অনেক লেখা এভাবেই সংলাপ পড়তে পড়তে কাহিনি ধরে এগিয়ে যাওয়া।
সাফিয়া খন্দকার রেখা মাননীয়ার প্রতি অনুরোধ রইলো তিনি যেন দীর্ঘ উপন্যাস লেখেন।
আর একটু বলবো, এখানে সাহানাকে সন্তানের মা হিসেবে অসম্ভব এক আকুলতায় থাকতে দেখি সারাক্ষণ। যেমন মায়ের মন হয়। সাহানা পুত্রবধূকেও সস্নেহে বলেন, ভালো থেকো মা। শুদ্ধ আত্মায় উচ্চারিত হতে দেখি। কোথাও দ্বন্দ্বমূলক দুই নারীর স্বাভাবিক সংঘাত নেই! যা আজকের অস্থির সময়ের জন্য অনুভব করা দরকার। পারিবারিক ক্ষয় শুধু স্বামী দ্বারা আসে না একটি নারীর জীবনে। তাতে পরিবারের অন্যান্য সদ্যসরাও জুড়ে যান অনেক সময়। গতানুগতিক গল্প ধারার বাইরে খুব সুন্দর একটা গল্প দেখি শাশুড়িমাতা ও পুত্রবধূর ভিতর। সত্যিই তো পুত্রবধূর স্থান সন্তানসমতুল্যই তো। আর সাহানার মতো মানুষরা এমনই হয়। নিজের জীবনের সমস্ত অন্ধকার সয়ে ওরা অপরের দিকে আলোকে টেনে ধরতে জানে। ভালোবাসতে জানে। আপন করে নিতে জানে সবকিছু। হয়তো ঘুণপোকায় কাটা জীবন যাপন করতে করতে অদ্ভুত সহনশীলতায় এক ঐশ্বরিক রূপই ধারণ করে ফেলে সাহানারা! এবং অবশ্যই লাবিবের প্রেম তার অংশ। যাকে হারিয়ে সাহানা তার ভিতরেই বেঁচে থাকে। কারণ সত্যি প্রেম হারায় না। মানুষ বেঁচে থাকে জীবনের পরেও। প্রেমে। কাজে। সুন্দর মানসিকতার ফলস্বরূপ। লাবিব পেরেছে। প্রেমের এক অতুলনীয় রূপ দেখি লাবিব আর সাহানার সম্পর্কে! অসাধারণ!
বাকিটা পাঠক কৌতূহল নিয়ে পড়ে জানুন।
তবে আমি ব্যক্তিগত ভাবে সাহানাকে অনেকদিন মনে রাখব। শুভকামনার সহিত আমার প্রিয় একজন মানুষ এবং লেখক সাফিয়া খন্দকার রেখা-র পরবর্তী উপন্যাসের অপেক্ষায় রইলাম।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।