মেহেফিল -এ- কিসসা গদ্যে এম উমর ফারুক

হায়রে নিয়তি

বানভাসী রোদ-জল তখনো আসেনি নদীর কূলবর্তী জলমগ্নতায়। মেয়ের পাহারায় ছিল চাঁদ।
মফস্বল শহরগুলো আঁকাবাঁকা সরু গলিতে পরিপূর্ণ। দিনের বলা এসব সরু গলিতে সূর্যের আলো খুব একটা পৌঁছায় না। আর রাতে ল্যাম্পপোস্টের নিচে ছাড়া বাকি অংশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঘুমে চোখ ঢুলু ঢুলু করছে। কিন্তু ল্যাম্পপোস্টের নিচে ঘুমানো বেশ কষ্টসাধ্য। তার ওপর মশা বাহিনীর লাগাতার আক্রমণ। সারাদিন কুকুরের মতো আমার শরীরে কামড় বসিয়ে যাচ্ছে।
সাইজে ছোট হলেও নৈশজগতের রাজত্ব এদেরই হাতে। তবে আশার কথা, আমার সহ্য ক্ষমতা প্রবল। এদের চেয়ে বড় প্রাণীর অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করতে পেরেছি, সে হিসেবে এরা তো চুনোপুঁটি।
দুই আঙুলের ফাঁকে একটা সিগারেট। যেমন কেনা হয়েছিল, ঠিক তেমনি আছে। এখন জ্বালানো হয়নি। পকেটে একটা দিয়াশলাইও আছে। কিন্তু জ্বালাতে ইচ্ছা করছে না। ঠিক ইচ্ছে করছে না বললে ভুল হবে, আসলে জ্বালাতে পারছি না। কি যেন একটা অদৃশ্য বাঁধা হাতটাকে চেপে ধরে রেখেছে। সেই বাঁধাকে উপেক্ষা করার শক্তি বা সাহস কোনোটিই আমার নেই।
সময় পাল্টায়, মানুষও পাল্টায়। পাল্টে যায় তাদের আচরণ আর পাল্টায় কিছু সম্পর্ক। একসময়ের কাছে থাকা মানুষগুলো চলে চলে যায় দূরে, বহু দূরে। চোখের সামনে
থেকেও মনে হয় কত অচেনা!
বছর শেষে যখন ফোনের কল লিস্ট ঘেঁটে দেখি তখন সেখানে শুধু গুটি কয়েক বন্ধু ছাড়া আর কারও অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। অথচ একসময় যাদের মুখ থেকে মধুমাখা কথার বুলি ঝরে পরত, ভাই ভাই রবে চারিদিক মাতিয়ে রাখতো যে মানুষগুলো, সেই মানুষগুলো
আজ হারিয়ে গেছে ব্যস্ততার নির্মম বাস্তবতায়। তাদের জগতে এখন নতুন সব মানুষের আনাগোনা,
আর আমি বুড়ো না হয়েও হয়েছি বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা। দুর্ভাগ্য এই যে, এই বৃদ্ধাশ্রমে আমার একাকী বসবাস। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার কাছের মানুষগুলোও সব পাল্টে গেছে। যে বাবার হাত ধরে হাঁটতে শিখেছি, সাইকেল চালানো শিখেছি সেই বাবা আজ আমাকে দেখলে অনিহায় মুখ ফিরিয়ে নেন। একই বাড়িতে থেকেও যেন আমরা দু’জন ভিন গ্রহের বাসিন্দা। বই পড়ার খুব শখ ছিল আমার। একদম নেশার মতো। একদিন বই না পড়লে রাতে ঘুম আসতো না।
আমার এই শখটা বাবা খুব একটা ভালো চোখে দেখতেন না। তার কাছে, সাহিত্যের বই পড়ে মেধার বিকাশ ঘটানো অপেক্ষা পাঠ্যবই পড়ে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার সুযোগ বাড়ানোটাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ- টিপিক্যাল বাঙালি প্যারেন্টস।
কলেজে ওঠার পর থেকে কবিতা লেখার ভূত মাথায় চাপল। রোজ পড়ার ফাঁকে একটা না একটা কবিতা লিখতামিই। রাত গভীর হলেই নন্দিতা ফোন দিত, ওকে কবিতা শোনাতাম। নন্দিতার আদেশ ছিল আমি যেন প্রতিদিন ওর জন্য কবিতা লিখি।
একদিন ভার্সিটি থেকে ফিরে এসে দেখি বাবা আমার কবিতা লেখার খাতা পুড়ে ফেলেছেন। সেদিন আমি অনেক কেঁদেছি। ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলের চোখে কান্না, বড়ই অদ্ভুত!
আজকাল বাবা আমাকে দেখলে চিনতে পারেন না। বাবা কি অসুস্থ হয়ে পড়লেন! কিছুই বুঝতে পারছি না। কেউ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমার একটি মাত্র মেয়ে, ক্লাস এইটে পড়ে। আমার কথা বাবা ভুলে গেছেন। কিন্তু কি দোষ করেছি আমি?
কোনোদিন একটা সিগারেটও মুখে দেইনি। ভদ্র ছেলে বলতে যা বুঝায় তাই ছিলাম। তবুও বাবা আজকাল আমার দিকে এমন ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকান যেন আমি নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের আসামি।
আমার গর্ভধারিণী মাও আজকাল আমার সঙ্গে কথা বলা একরকম বন্ধই করে দিয়েছেন। সেদিন তিনি আমার রুমের দরজায় এসে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার চোখের নিচে কালো দাগ পড়েছে। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ তিনি মুখে আঁচল রেখে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন। আমি ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মা কে আহত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করি, কাঁদছ কেন, মা?
মা কোনো জবাব দিলেন না। অশ্রুভরা নয়নে তাকিয়ে রইলেন দেয়ালে টাঙানো আমার ছোটবেলার ছবিটার দিকে। আমার দিকে একটিবার ফিরেও তাকালেন না।
সবাই কেমন যেন পাল্টে গেছে। এখন আর নন্দিতাও ফোন করে না। আমি প্রতিদিন ওর জন্য কবিতা লিখে বসে থাকি। ওর ফোন আসে না।
আচ্ছা,
ও কি এখন তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়ে? কিন্তু ও তো বলেছিল আমার কবিতা না শুনলে ওর ঘুম আসে না। তাহলে কি হল মেয়েটার? ও কি আমাকে ভুলে গেল। নাকি বাবার মতো সেও আমাকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে। খুব জানতে ইচ্ছে করে। কি এমন দোষ ছিল আমার। কেন আমাকে এত বড় শাস্তি পেতে হচ্ছে।
শুধু একটা একটি ভুল সিদ্ধান্ত আমার পুরো জীবনটাই ওলোট-পালোট করে দিল। ভার্সিটিতে পড়তে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গ দোষে আমি হয়েছি মাদকাসক্ত। স্বপ্ন তো শুধু বাবা-মারই ভাঙেনি, আমারও ভেঙেছে। অথচ কেউই আমার কষ্টটা বুঝল না। সবাই সবার রাগ আমার ওপর ঝারতে শুরু করল। মুখের ওপর তো সেদিন বাবা বলেই দিলেন, তোর মতো ছেলে আমার দরকার নেই। আমাকে আজ কারোরই দরকার নেই। পৃথিবীও আমাকে তার কোলে এতটুকু জায়গা দিল না। সফেদ দেয়ালে ঝুলানো ঘড়িটাতে চোখ পড়ল। প্রায় ২টা বাজে।
নাহ, এখন সিগারেটটা লাগানো দরকার। খুব টেনশন হচ্ছে। শুনেছি টেনশন-নাসক হিসেবে সিগারেট টানার জুড়ি নেই। আমার এক হাতে সিগারেট আর এক হাতে একটা বিষের বোতল। অনেকক্ষণ থেকে বোতলটা হতে রেখে কচলাচ্ছি আর একবার করে বোতলের ছিপি খুলছি আর বন্ধ করছি।
অষ্টমবারের মতো বোতলের ছিপিটা খুললাম।
এবার আর হার মানবো না, কাজটা সেরেই ফেলব। মাথার কাছে এসে কিছু কথা খুব ধাক্কা দিচ্ছে। ধাক্কা দিচ্ছে বাবার ঘৃণাত্বক চাহনি, তার অবজ্ঞাসূচক কথাগুলো। ধাক্কা দিচ্ছে মায়ের অশ্রুসিক্ত চোখের ছলছল চাহনি। ধাক্কা দিচ্ছে মায়ার সেই হাতটি, যে হাতটি এখন অন্য কারো হাত ধরে ঘুরে বেড়ায়।
আজ আর এসব নিতে পারছি না। সহ্যের একেবারে শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছি আমি।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠে,
কেন দূরে থাক, শুধু আড়ালে রাখ,
কে তুমি, কে তুমি, আমায় ডাকো…
এত রাতে ফোন দেওয়ার মতো আমার কেউ নেই। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফোনটা পকেট থেকে বের করলাম।
মোবাইলের মনিটরে যে লোকটির চেহারা ভেসে উঠেছে সেই লোকটি প্রায় চার ঘণ্টা আগে অকর্মণ্য, কুলাঙ্গার, ইতরসহ বাংলা ভাষার প্রায় সব গালি খরচ করে আমাকে ধিক্কার দিয়েছেন। শেষে, তোর মতো ছেলে থাকার চেয়ে না থাকা ভালো এবং তুই এই মুহূর্তে বাড়ি থেকে বের হয়ে যা- বলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছেন।
বুঝতেই পারছেন, যিনি ফোন করেছেন তিনি আমার হতভাগ্য বাবা।
কিন্তু আমি জানি, ফোন রিসিভ করলে বাবার কণ্ঠ শুনতে পাব না। ফোনটা করেছেন আমার মা। বরাবরের মতো এবারো হয়তো তিনি বলবেন, ফিরে আয় খোকা, আমরা তোর জন্য না খেয়ে বসে আছি। আর মন খারাপ করিস না, বাবা। ফিরে আয়!
আমার বাবার মধ্যে আবেগ-ভালোবাসা বলে কিছু নেই -ব্যাপারটা ঠিক এমন না। তার মধ্যেও আবেগ আছে, সন্তানের প্রতি ভালোবাসা আছে কিন্তু তার প্রকাশভঙ্গী আমার মতো ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের প্রাণীর বোধগম্যের বাইরে।
ফোনটা রিসিভ করলাম।
তুই কই, বেটা?
এত রাতে বাহিরে কি করিস। তাড়াতাড়ি বাসায় আয়, তোর মা তোর জন্য খিচুড়ি রান্না করেছে। তাড়াতাড়ি আয়, বাপ-বেটায় মিলে খাব।
ফোনে বাবার কণ্ঠ শুনে আমি চমকে উঠলাম। তিনি ফোনে কি বললেন তা বুঝতে একটু সময় লাগল। আমি আমার চোখের পানি আটকাতে পারলাম না। প্রবহমান ঝর্ণাধারার মতো তা ঝরতে শুরু করল। আমি নিশ্চুপ, নির্বিকার।
মা খিচুরি নিয়ে বসে আছে। আমি আসার পর সেই খিচুড়ি খেতে দিল। কিন্তু আমাকে খাওয়ানোর আনন্দ বাবা মায়ের মুখে ছিল না। বিরক্তের সঙ্গে বসে ছিল। ক্ষুধার্ত পেটের দু’চার বার খাওয়ার পর পেটটা মোচড় দিয়ে ওঠে। মুখ থেকে বেড়াতে থাকে সাদা ফেনা। যন্ত্রনায় ছটফট করতে থাকি। এ সময় বাবা বলে তোর মতো সন্তানের কোনো প্রয়োজন নেই। মুখে কাপড়ের আঁচল টেনে কাঁদে মা…
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।