মেহফিল -এ- কিসসা কবিতা: ডিসেকশন শাপলা সপর্যিতা

চাবি – শক্তি চট্টোপাধ্যায়
`পদ্য বাউল’ এই প্রোডাকশনটি করতে করতে আমার নিবিঢ় সখ্যতা গড়ে ওঠে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার সাথে, বস্তুত ব্যক্তি শক্তির সাথে – তার অন্তর্জগৎ তার ভাবনা তার ব্যথা তার প্রেম তার বিরহের সাথে। হয়তো এমন বিশদ ব্যাখ্যা – কবির জীবনের এমন দারুণ ব্যবচ্ছেদ না হলে আমার এই ভালোলাগার বোধটা তৈরীই হতোনা। তার যাতনার সাথে আমার যাতনার বোধ এক না হলে হয়তো এমন করে অত আদরে কবিতাটি নির্মাণ করা সম্ভব হতোনা। হয়তো আবৃত্তি করা সম্ভবই হতোনা। আজকাল প্রায়ই কবিদের বলতে শুনি আবৃত্তিকাররা কবির লেখা কবিতা নষ্ট করে ফেলে। কবিতার অন্য রূপায়ণ করে দেয়। আবৃত্তিকারদের আজকালকার কবিরা বলতে গেলে শত্রু স্থানীয় করে রেখেছে অনেক ক্ষেত্রেই। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় ঠিক তারই উল্টো এক রূপ। কবিতার মতো কবিতা হলে প্রাণে প্রাণে যোগ হয়। কবি এবং আবৃত্তিকারের যোগ হয়। জীবিতের আর মৃতের যোগ হয়। কবি এবং সাধারণ শ্রোতা অর্থাৎ আমি বলতে চাই কবি এবং সাধারণ মানুষের যোগ হয়। একাল সেকালের দারুণ বন্ধন তৈরী হয়। আর কে না জানে যোগ মানেই সমৃদ্ধি। যোগ মানেই সমৃদ্ধতর এগিয়ে চলা। যোগ মানেই উচ্চতর মার্গে অধিষ্ঠান। এ সম্পূর্ণ আমার একার উপলব্ধি। কারণ আমি দীর্ঘ একুশ বছর আবৃত্তির সাথে কাজ করেছি। সেই ১৯৯২ সাল থেকে শুরু হয়েছিল। চলেছে ২০১৩ সাল অবধি। সুদীর্ঘ সময়ে আমি স্টেজে পারফর্ম করতে উঠেছি হাতে গোণা কয়েকটি কবিতা নিয়ে। যা ভালো লাগেনি যে বেদনার সাথে আমার বেদনা মেলেনি সে বেদনার কথা আমি স্রোতার সামনে তুলে ধরবার সাহস করতে পারিনি। যে কবিতা ভালোলাগেনি ভালোবাসতে পারিনি যে কবিতা তাতে বিহার আমি কল্পনাও করতে পারিনি। এ দীর্ঘ সময় ধরে আমি যে যে কবির কবিতা আবৃত্তি করেছি তাদের প্রতি আমার দারুণ ভালোবাসা। তাদের জীবনবোধের প্রতি অসীম শ্রদ্ধাই কেবল বেড়েছে। কারণ যে কবিতার ব্যবচ্ছেদ হয়নি সে কবিতা আমি বুঝতে পারিনি। সে কবিতা পড়তেও আমি দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছি। সে সব কবিতা আমি মুখস্তও করতে পারিনি। আর তাই যে কবিতা ভালো লেগেছে সে কবিতাটি আমার কখন যে মুখস্ত হয়ে গেছে জানতেও পারিনি। স্টেজে নিঃশঙ্ক চিত্তে পড়ে গেছি একটানা। সামনে রাখতে হয়নি কোনো কাগজ। ভালোলাগার সে সব কবিতাই কেবল আমি আবৃত্তি করতে পেরেছি। তেমনই একটি কবিতা ‘চাবি’। এই কবিতাটি আমাকে তৈরী করতে সার্বক্ষণিক সাহায্য করেছিলেন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব ইশরাত নিশাত আপা। তিনি চাইছিলেন এই কবিতাটি পড়া কিংবা আবৃত্তি হবে একেবারে হুইসপার টোনে। একা একা নিজের সাথে কথা বলবার মতো করে। নিজের হাস্কি ভয়েজে যেটা আমার কাছে মনে হয়েছিল দুঃসাধ্য। কারণ ভারী পর্দার কণ্ঠে নিচের সপ্তকে কাজ করতে খুব কষ্ট। অথচ নিশাত আপা আমার দ্বারা সম্ভব করে তুলেছিলেন সেটা।
‘চাবি’ – যেখানে কবি তার মনের গভীর অনুভবের বর্ণনা করতে লেগেছেন। হারিয়ে গেছে যে প্রিয়া তার কাছে চিঠি লিখতে বসেছেন। যেখানে প্রিয়ার ফেলে যাওয়া একটি চাবি ফেরত দেবার অনুষঙ্গ নিয়ে চিঠিটির লেখা শুরু। কিন্তু চাবির কথা লিখতে বসে বার বার মনে পড়ে যাচ্ছে প্রিয়ার মুখ, তার তোরঙ্গের রং, থুতনির উপর প্রিয় তিল। যে কথা বলা যায়না আর কাউকে। যে ছবি মুছে ফেলা যায়না মন থেকে। যা অবান্তর এখন । প্রিয়া দূরদেশে। এখানে দূরদেশ অর্থ ব্যপক। দূরমন.. দূরপ্রেম…দূরমানুষ…দূরসঙ্গ….দূরলিপ্সা…। এই যে গোপন ব্যথা – এই যে গোপনে স্মৃতির তোরঙ্গ খুলে অবিস্মরণীয় প্রিয়ার মুখ দেখার গোপনতা – হারিয়ে যাওয়া চাবি ফেরত দেবার অজুহাতে চিঠি লিখতে বসার ছল .. এ কী চিৎকার করে বলবার? এ কী জোরে জোরে জানানোর? এ একার। নিজের। ভেতরের। দৃশ্যমান হবার নয়। এ শ্রবণযোগ্য করে তুলবার নয়। তাই এর টোন হবে একার। নিজের সাথে কথা বলবার মতো। এর আবেদন হবে চিরন্তর ব্যথার। শ্বাশত রোমান্টিক ভাবের অসাধারণ সরঞ্জামের যোগে এ কবিতাটি লেখা এবং পড়া…….
‘চিঠি তোমায় হঠাৎ লিখতে হলো।’
এই বাক্যটি সাদা চোখে একটি ইনফরমেশন। কিন্তু ভেতরে কী যে এক আর্তি রয়ে গেছে তা কেবল ব্যবচ্ছেদেই বোঝা সম্ভব। যখন একটি কবিতা নিয়ে দিনের পর দিন আবৃত্তিকার ভাবতে থাকেন, জপতে থাকেন, যখন মাথার ভেতর প্যাথিড্রিনের মতো সম্মোহন তৈরী করে একটি কবিতা। তখন আবৃত্তিকার যে কতকিছু অনুধাবন করতে পারেন! কবি এখানে বিক্ষুব্ধ। তার মন অন্য আর কাউকে চাইছেনা। অন্য কারো সঙ্গ তাকে সুখী করে না। তখন প্রিয়ার সাথে কথা বলাটা তার জন্য বাধ্যকর হয়ে ওঠে। কিন্তু নেই সে। কোথাও নেই। না সামনে। না কোন যোগাযোগে। তাই চিঠি এক্ষণেই লিখতেই হলো। না হলে বুঝি প্রাণ ওষ্ঠাগত। কবিতাটির দুটো যায়গায় এ লাইনটি লেখা আছে
লিখিও, উহা ফেরত চাহো কিনা?
দুটো জায়গায় এই যে দুটো বিষয়ের বোধের প্রকাশের আর গ্রহণের আকাশ আর পাতাল পার্থক্য তা কে ফুটিয়ে তুলবে। একমাত্র আবৃত্তিকার। এক জায়গায় লিখেছেন তোরঙ্গ খুলবার যে চাবিটি প্রিয়া ভুল করে ফেলে গেছেন তা কি তিনি ফেরত চান? এটি একটি সাধারণ প্রশ্ন। আর একটি জায়গায় লেখা আছে স্মৃতির ভেতর প্রিয়ার নিজের ফেলে যাওয়া মুখ রয়ে গেছে কবির কাছে। যেটি অবান্তর। অর্থাৎ যার কোনো প্রত্যাশা নেই, নেই কোনো প্রাপ্তি। এটিই শেষ সম্পদ সবিশেষ সম্বল কবির, সেটি কি প্রিয়া ফেরত চান!! এই যে দুটো লাইনে প্রাণের আকাঙ্ক্ষার ব্যাপক ফারাক দুস্তর ব্যবধান দূরন্ত কামনার প্রতীক্ষা আর অভিমানের রূপক এর প্রকাশ কেবল আবৃত্তিতেই সম্ভব। আর এই কবিতার ডিসেকশন করতে করতেই তৈরী হয়েছিল এক অসাধারণ শ্রবণযোগ্য দারুণ ব্যথাতুর একটি কবিতার অসাধারণ উপস্থাপন…….
আমার কাছে এখনো পড়ে আছে
তোমার প্রিয় হারিয়ে যাওয়া চাবি
কেমন করে তোরঙ্গ আজ খোল?
থুৎনি ’পরে তিল তো তোমার আছে
এখন? ও মন, নতুন দেশে যাবি?
চিঠি তোমায় হঠাৎ লিখতে হলো।
চাবি তোমার পরম যত্নে কাছে
রেখেছিলাম, আজই সময় হলো-
লিখিও, উহা ফেরত চাহো কিনা?
অবান্তর স্মৃতির ভেতর আছে
তোমার মুখ অশ্রু ঝলোমলো
লিখিও উহা ফিরৎ চাহো কিনা?
তারপর বহুদিন পড়েছি চাবি কবিতাটি। নানা জায়গায় নানা অনুষ্ঠানে। বরাবর এক কথা শুনেছি – এত ছোট এত অল্প মুগ্ধ হতে হতে কখন যে শেষ হয়ে গেল…কবিতাটি আর একটু বড় হলে কী হতো! এরই নাম সাবলিমিশন। ক্রম উর্দ্ধতর সত্তায় নিয়ে চলা পাঠককে শ্রোতাকে ……….বেধে দেয়া শ্বাশত এক বেদনায়। এরই নাম কবিতার আবৃত্তিযোগ্য নির্মাণ। এরই নাম সম্নোহন। এই তো কবিতা।
ক্রমশ…