শীতকাল এলেই আমার তেমন মনে পড়ে না বর্ষার উচ্ছ্বাসের কথা।হরদম প্লাবিত আমার ভেতর ছুটোছুটি থাকে না বলেই সারা রাত জেগেথাকি শিমুল তুলোর ভেতর।শিমুল তুলো মানেই তো জানেন তো আমাদের উষ্ণতা।কাছেই কোথাও টুপ করে পড়ে এক আধটু; একটু ওড়ে– কেউ পাশ কাটায় সহজ নিশ্বাসে।
শীতকাল এলেই আমার ত্বকে বেড়ালের মসৃনতা থাকে না।এক আধটু করে টান টান হয়েপড়ে সবটায়; ফাটল ধরে উপত্যকা আর নদীর মাঝে জেগে উঠা চরে। কেউ একজন বাস করতেথাকেগুহার ভেতর।আগুনে হাত বাড়াই না– ঢের অনুভবে খুঁজতে থাকি শিশির ভেজাকাঠ।
২
কেউ বোঝে; কেউ বোঝে না– এমন কিছু হয়ে ওঠে বাতাসের ঘূর্ণিতে।আমি চুপ চাপ একটা আড়ালের মধ্যে ঢুকে পড়ি, যেমনটা গুটিসুটি হয়ে থাকা আমারভেতরকার বেড়াল।
প্রিয় আপনি তো জানেন– বহুবার বলেছি বোথ হয় আপনাকে;
– মাঝে মাঝে উড়তে উড়তেচলে যাই অন্যত্র যেমনটা এখানেই এসে পড়ে অনেক অতিথি পাখি। আমি যদিও একটাহুলো বেড়াল; তবুও শীত এলেই অতিথি পাখির পরিযায়ী ভাব আমার মধ্যে কেমন করে জানি চলেআসে। জানি না কেন– হয়তো কোন এক জীনগত বিবর্তন হয়ে গেছে কালের সীমানায়। – একটাবিড়াল আর পরিযায়ী পাখি– বাহ! নিজেকেই নিজেই বলি।
আপনি হয়তো ভাবছেন একটা বেড়াল আবার ওড়ে নাকি? উড়তেই পারে যেমনটা–
আপনার গ্রীবার ভাজে ভাজে বয়ে যায় নদী, রেখে যায় ছাপ।চুম্বনের অহেতুক বন্দনায় ভুলে যাই আমরা সবাই, দ্বীপের মতো হয়ে আছে যেখানে কালো এক মায়াবী তিল। অতঃপর–
এই যেমন আজ আপনাকেই তো দেখলাম দাঁড়িয়ে আছেন অনেকগুলো রিক্সার ভীড়ে।একটাকবিতা হয়ে আছেন কিংবা অনেকগুলো প্রিয় কবিতার বই । আশে পাশের সবকটি রিডিংগ্লাস।মেরুন রংয়েরমায়াবী পোষাকে আপনাকেই পড়ছেন।পড়তে পড়তে খুব কাছে এসে পড়া কেউ একজন আপনারসুগন্ধি নিতেই আমার সাথে চোখে চোখ রাখে।
– আমি হাসি।মৃদু হেসে জানান দেই– পুরো গোলাপী কার্ডিগানে আপনি বেশ! – সন্তর্পনে পাশকাটাই; দূরত্বে আপনাদের সবার দৃষ্টিসীমা – আপনি হয়তো ভাবতে থাকেন – পরিযায়ী পাখি না বেড়াল। – এমন কিছুই না–হয়তো তাই।
২
প্রিয় আপনাকে আপনি বলছি বলে অবাক হচ্ছেন– না, অবাকহতে নেই। আপনাকে বলেছি আগেও, তো শীত আসলেই আপনি আর তুমি নন কিংবা তুইও না।
এটা হচ্ছে পাখি–বিড়ালের সহজাত প্রবৃত্তি। গ্রীষ্মে যখন উড়তে থাকি ঘুড়িরসাথে তখন দু একটা পালক খসে পড়ে। সেগুলো জমিয়ে দুষ্টু বালকেরা খেলা করে। আমিদেখি,
– মজা নেই; তারপর উড়তে উড়তে থাকি। কোন এক মগডাল খুঁজি একাকী একটু বসারজন্য। – কোন এক বিকেলে আমাকে একাকী দেখে আপনি হয়তো আসবেন অন্তরঙ্গ তুমি হয়ে।কখনো ভুলবশে ‘তুই’ করেও বলে বসেন।
৩
আমি নিভৃতচারী। যদিও নিভৃতচারী,একটু একটু সরেগেলে অভয়রাণ্য ছেড়ে যাই। দূরে তেমন যাই না; দুষ্টু বালকেরা গুলতি ছুড়বে বলে ফেরত আসি।আমার তো গুলতিকে বড় ভয়; বড় ভয়।
৪
একবার এক রাখালের সখ জেগেছিলো পাখি হওয়ার।সেওচেষ্টা করেছিলো; চেষ্টার কমতি তো নয় বরং রপর থেকে আমার বাম ডানায় প্রচন্ড ব্যথা।কুঁকড়ে যাইবেশিক্ষণ উড়লে।
এমনি অবেলায় আপনি আসেন তুমি হয়ে।একটু হাত রাখেন; বুলিয়ে দেন আপনার পশমী ডানায়।
– আমি শিউরে উঠি; তেমন তো আমার অভ্যাস নেই। বৈঠকী রবি শুনতে শুনতে একজনঘোরগ্রস্থ মানুষ যেমনটা কাতর হয় বরষায় ঠিক তেমনি আমিও হই। গ্রীষ্মেরকালবোশেখী ঝড়ের বৃষ্টিতে কাপঁতে থাকি আপনার সোনালী ডানায়। পুরো গ্রীষ্মটাকাটিয়ে দেই নাতিষীতোষ্ণ মগডালে। বহু পাখি আসে যায়, আপনি বা গ্রীষ্মের তুমিঅথবা সেই পার্সি বেড়ালের স্পর্শে প্রিয় এক প্রাণ দৃশ্যতঃ বর্তে যায়।
৩
পড়ন্ত হেমন্তে এক আধটুকুয়াশা পড়লেই আমি বেড়াল হতে থাকি। পালক একটা একটা করে খসে পড়ে। যতই রাতবাড়ে আমার ভেতরকাল বেড়াল জাগতে থাকে। বেড়াল জাগলেই শীত আমার ভেতর খেলা করে,যেমনটা প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলবর্তী উষ্ণ স্রোতে ডলফিনের দল।
৪
এমনি এক সময় একদিন দেখি আমি বেড়াল হয়ে গেছি; পুরো পার্সিয়ান বিড়াল। শীতের পশম আমার পুরো দেহে; শীতনিদ্রার কথোপকথন শুরু হয় আমার অস্থিমজ্জায়।
৫
প্রিয় পাখিটার পালকের রং পাল্টে গেলে, আমি নিশ্চুপ হয়ে পরি। পালটে ফেলিত্বক, হয়ে যাই পুরোনো সেই। একটা একটা করে বিমর্ষ রূপে বায়বীয় দূর্যোগ শেষেওকে বলি।চল তো একটু ঘুরে আসি বহুমূলের সেই বটতলে।
হলো না, চা‘ও না। আগে প্রায় বলতাম, তোর গভীর চোখের ভেতর দিয়ে সুদীর্ঘটানেল। যতই ডুবতে থাকি ততই বোধ হয় শীতল হতে থাকে অলিন্দের অলি–গলি।অথচ এক আধটু এড়িয়ে যাওয়া দেখে মনে হতে থাকে আজকাল– জীবনের রিয়্যেলিটিশোগুলো বোধ হয় এমনি– ক্ষণে ক্ষণে পাল্টে যায় সব কিছু আর আমি ভুলতে থাকি –
৬
একজন পাখির বেড়াল হয়ে যাবার কথা ভেবে আপনি কাতর হবেন না নিশ্চিত।জানেন তো, এখন শীত নিদ্রার সময়– এখুনি গুহাবাস হতে পারে যথার্থ সময়।