বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্র কি এক বেদান্তিক বিশ্বের আখ্যান ? আলোচনায় অশ্রুজিৎ বসু

বরফ শীতল মধ্যরাত্রি;
রাতের আটলান্টা শহরের এই পাবগুলো সারারাত খোলা থাকে।
শরীরী পসরায়ে খদ্দেরদের জন্য সাজানো, সাথে মদের ফোয়ারা ছুটছে।
রাস্তার ধারে নীল নিয়ন সাইনবোর্ডটা চোখে পড়তেই উদভ্রান্তের মতো ছুটতে থাকা যুবকটি বিশেষ কিছু না ভেবেই দরজা ঠেলে টলতে টলতে ঢুকে পড়লো পাবটাতে।
অদূরে এক অর্ধ-নগ্নিকা পোল ডান্স করছে, কিন্তু ছেলেটির চোখ সেদিকে গেলই না।
একটা টেবিল ফাঁকা দেখে সেখানেই বসে পড়লো, মাথার দুইপাশটা দপ দপ করছে, দুটো বুড়ো আঙুল দিয়ে চেপে ধরে ছেলেটা ঝিমোতে লাগলো, একটু তন্দ্রা মতো এসেছিলো কিন্তু ঠিক তখনই;
– ওয়্যাট ক্যান আই সার্ভ ইউ স্যার??
স্যার? স্যার?
-উমমম; ওহঃ অইম, এনি মকটেল প্লিজ?
-মকটেল?
-ইয়েস প্লিজ!!
কোনো মধ্যরাত্রির আগন্তুকে মকটেল অর্ডার করতে সম্ভবত এই প্রথমবার দেখলো এই পাবের ওয়েট্রেসটি।
কিন্তু সেই যুবকটির মনের মধ্যে যে উথালপাথাল সেই সময় চলছে তার খোঁজ কি ভাবে পাবে অন্য কেউ!
যুবকটির চারদিকে পাপ তার অন্ধকারকে বদলে ফেলেছে অত্যাধুনিক স্পটলাইটে, যে আলোকদ্যুতি ছিটকে পড়ছে নৃত্যরত নারী দেহের বিশেষ বিশেষ অঙ্গ প্রতঙ্গে আর সেসব কে ছাপিয়ে ছেলেটির চোখে বারবার ভেসে উঠছে খানিকক্ষণ আগে দেখা সেই অনভিপ্রেত মুহূর্তের ছবি; এক বিবাহিত মধ্যবয়সী পুরুষের সাথে অন্য এক মধ্যবয়েশী নারীর সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় আলিঙ্গনরত হয়ে শুয়ে থাকার দৃশ্য।
এ তাঁর চোখে কি পড়লো?
ঠাকুর এই পাপাচার কেন দেখালে আমাকে?
বিবাহিত এক পুরুষ তার স্ত্রী ব্যতীত অন্য এক নারীর সাথে? কি ভাবে ঠাকুর?
ছিঃ!
আত্মঘৃণায় যুবকটির মন ভারাক্রান্ত।
এই যুবকটিই এই কাহিনীর প্রথম পুরুষ, সহজ কথায়, একে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে বিনায়ক বন্দোপাধ্যায়ের “মন্ত্র” উপন্যাসটি।
ছোটবেলা থেকে ব্রহ্মচারী ঠাকুরের আশ্রমে বড় হয়ে ওঠা উত্তরণ কর্মসূত্রে আমেরিকা যায়, সাথে করে নিয়ে যায় অতি সযত্নে লালিত পালিত এক সনাতন ভারতীয় মূল্যবোধকে।
কিন্তু অতি সত্বর তার সেই আশ্রমিক ভাবধারার সাথে সংঘাত শুরু হয় চার্বাক দর্শনের আমেরিকা নামক এক বিজাতীয় রাক্ষসের।
যে শুধু তৃষ্ণা মেটাতে জানে!!
পাপ আর পুণ্যের দোলাচলের মধ্যে দুলতে দুলতে, এক সময় হাঁফিয়ে ওঠে উত্তরণ, বিয়ে করে তাঁর দীর্ঘদিনের প্রণয়পার্থিনী অনুসুয়াকে।
কিন্তু মানবী অনুসুয়ার প্রত্যাশা কি মেটাতে সক্ষম কোনো দেবতা?
উত্তর খুঁজে চলেছে লেখক স্বয়ং!
যদিও এর উত্তর এতো সহজ নয়, যে অনুসুয়ার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান ছিলো উত্তরণকে নিজের করে পাওয়া সে কেনই বা একটা সময়ের পরে তার সেই পরমকাক্ষিত পুরুষের থেকে নিষ্ঠুরের মতো মুখ ফিরিয়ে নিলো?
গল্পটা যদি অনুসুয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে পুনকথিত হয়ে কখনো তাহলে হয়তো পাঠক সিদ্ধান্তজনিত উপসংহারে পৌঁছতে পারবে, কিন্তু এই গল্পের পুরোটাই বলা হয়েছে উত্তরণের দৃষ্টিকোণ থেকে।
কিন্তু সত্যিই কি তাই?
কখনো কখনো মনে হয় উত্তরণের পরম আরাধ্য করুণাময় ব্রহ্মচারী ঠাকুর স্বয়ং এই গল্পের কথক।।
এখানে সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতির গুরু-শিষ্যের পরম্পরা এসে মিশেছে দ্বন্ধমুলক বস্তুবাদে।
তাই তো পৃথিবীর প্রথমসারির একজন দার্শনিক হওয়ার সম্ভবনাকে শেষ করে দিয়ে উত্তরণ শুধুমাত্র খুঁজে পেতে চেয়েছিলো নিজেকে।
এই কাহিনী এই পৃথিবীরও যেখানে কোনো জাতপাত নেই, কোনো তৃতীয় প্রকারেন দ্বন্দ্ব নেই।
আছে শুধু দ্বৈত আর অদ্বৈত বেদান্তের ভেদাভেদ।
শাশ্বত ঈশ্বর আছেন এবং শাশ্বত প্রকৃতি আছে, আর আছে অসংখ্য শাশ্বত আত্মা, এটি ধর্মের প্রথম সোপান এটাকেই বলে দ্বৈতবাদ।
তারপরে আমরা বুঝতে শিখি যে অসীম এক, বহু নয়;একই অসীম আত্মা ভিন্ন ভিন্ন দর্পণে নিজেকে প্রীতিবিম্বিত করে বহু বলে প্রতিভাত হচ্ছেন।
আর এটাই সেই অদ্বৈতবাদ।
ভক্তিতে নিমজ্জিত উত্তরণ তাই তাঁর ব্রহ্মচারী ঠাকুরের বলা নীতিমালা থেকে সরে এসে নারীর শরীরে আশ্রয় খুঁজলেও তাঁকে পুনরায় ফিরে যেতে দেখি তাঁর ভিন্ন এক ধার্মিক সত্তার কাছে;
“আমি কারুর নই, কারুর ছিলাম না কখনো; ঘাসের উপরে এসে বসলেই ঘাসটা পতঙ্গ হয়ে যায় না”।

এই যে মানুষের মনোজগতের দ্বৈতভাব এটাই কি বেদান্তের মূল নীতি নয়!
যা লেখক অতিসুচারুভাবে ফুটিয়েছেন উত্তরণের মতো এক চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে।
শুধু কি তাই? এই গল্পের বাকি চরিত্রেরা যেমন অনুসুয়া, বৈদেহী, সঞ্জয়দা আর কমলিকাদি; এরা সবাই যাঁর যাঁর নিজের নিজের দ্বৈত সত্ত্বার সাথে সংঘাতে লিপ্ত।
কিন্তু কিভাবে স্বয়ং উত্তরণের মতোই এঁদের সকলের উত্তরণ ঘটলো অদ্বৈতবাদে।
সেটাই এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য বলেই আমার ধারণা।
অদ্বৈতবাদীর কাছে পাপ আর পুণ্য এক সমান। যাহা পাপ, তাহাই পুণ্য। মঙ্গল অমঙ্গল দুইটি পৃথক সত্ত্বা নয়, এই পৃথিবীতে এমন কোনো বস্তু নেই যা সম্পূর্ণভাবে মঙ্গলময় কিংবা সম্পূর্ণভাবে অমঙ্গলের প্রতীক। যে স্নায়ুমণ্ডলী দ্বারা জাগতিক দুঃখবোধ প্রবাহিত হয় সেই একই স্নায়ুমণ্ডলী দ্বারাই সুখবোধও প্রবাহিত হয়।
এই চেতনায় উত্তরণের গল্পই “মন্ত্র”।
পরিশেষে; এই উপন্যাস তাই হয়ে ওঠে এক বেদান্তিক বিশ্বের কাহিনীও যার শুরুতে দেখি বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের বিশ্বায়ন আর যাত্রা পথের শেষ একবিংশ শতাব্দীর গোড়ায়।
উপনিষদ যে শুধুমাত্র ভারতবর্ষ কেন্দ্রীক নয়, ছিলো না কখনই, তাই তো আমেরিকার চরম ভোগবাদী দর্শনেও উঠে আসতে দেখি গীতার জ্ঞান।

“তুমিই পুরুষ,তুমিই স্ত্রী,তুমিই যৌবন গর্বে ভ্রমণ শীল যুবা, তুমিই কুমারী,তুমিই বৃদ্ধ-হে প্রভু,তুমিই সব কিছু”(২:১১৯)
জগৎ প্রপঞ্চের এই বাখ্যাতেই কেবলমাত্র মানব যুক্তি, মানব বুদ্ধি পরিতৃপ্ত হয়।
আমরা তাহা হইতেই জন্মগ্রহণ করি, তাহাতেই জীবিত আবার তাহাতেই প্রত্যাবর্তন করি।
ইহাই জগতের বীজ “মন্ত্র”, “মন্ত্রের” জীবনদর্শন ও বটে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।