• Uncategorized
  • 0

পড়ে পুণ্যবানে স্বপন বিশ্বাস

বজ্রবীজ বজ্রযান

কবে থেকে শক্তি সাধনার রূপক হিসাবেমাতৃপূজার প্রচলন ভারত তথা বাংলায়, তা নির্ণয় করাও প্রায় অসম্ভব। ‘মার্কন্ডেয় পুরাণ’ (যার সাথে বাংলার মাটির নাম জড়িয়ে আছে ) – এর 81-93 অধ্যায়ের ‘ শ্রী চন্ডী ‘অংশটি হল দেবী আরাধনার প্রাচীনতম রচনা ।
আবার মার্কন্ডেয় পুরাণের সাথে ব্যাসদেবের নাম জড়িয়ে থাকায়  এর রচনাকাল মহাভারত যুগ হতে পারে ।
বেদ না তন্ত্র, কে বেশি পুরাতন সে বিষয়েবিতর্ক আছে।  তবে ঋগ্বেদ  ( 10/71/9)এবং অথর্ববেদ ( 10/7/42) -এ তন্ত্র জাতীয়শব্দ আছে । সংস্কৃত literature এর  শ্রুতি,স্মৃতি, দর্শন ইত্যাদি  6 টি ভাগের একটি হল’আগম’। আগম-এর তিনটি ভাগ । বৈষ্ণব, শৈব ও শাক্ত । এই শাক্ত আগমের অপর নাম তন্ত্র ।
এই বাংলায় শক্তি সাধনার ইতিবৃত্ত জানার আগে আমরা এটা জেনে রাখতে পারি যে বর্তমানে যে কালী মূর্তি প্রচলিত আছে তাররূপকার ও পূজা বিধি চালু করেন পঞ্চদশ শতাব্দীর নবদ্বীপের সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ । তিনি ‘তন্ত্রসার’ নামক গ্রন্থেররচয়িতা ।
দর্শনে  পুরুষ-প্রকৃতি তত্ত্ব আছে ।তন্ত্রে আছে শিব-শক্তি।  এই তত্ত্বটি একটুবুঝে নেব আগে ।
পদার্থ বিজ্ঞান  (Physics) এ দুটো বিষয় থেকে । পদার্থ ও শক্তি  ( যথাক্রমে matter  and  Energy )। তন্ত্রে  এ দুটিই  হল
শিব ও শক্তি ।  বস্তু ও চেতন । শিব, শব অবস্থায়হলেন নিশ্চল প্রাণহীন পদার্থ ।  কালী হলেন শক্তি । তিনি যখন শিবের সাথে যুক্ত হন শিবতখন চেতনা প্রাপ্ত হন।  তিনি তখন গতিশীল হন, কর্ম ক্ষমতা প্রাপ্ত হন । বিজ্ঞানে বলা হয় Energy কোনও পদার্থ কে  আশ্রয় না করে কখনও নিজ সত্তা প্রকাশ করতে পারে না । তেমনই পদার্থও শক্তি ছাড়ানিজের সত্তা প্রয়োগ করতে পারে না । শিবএবং শক্তিও তাই । অঙ্গাঙ্গী সম্পর্কিত ।
বাংলায় বৌদ্ধ তন্ত্রের সাথে হিন্দু কালী শক্তিসাধনার অনেক নিদর্শন বাংলায় ছড়িয়ে আছে। তারাপীঠ এর দ্বিতীয় সত্তা রূপে নিকটবর্তী (১৯ কিমিদূরে) মলুটিতে মা মৌলাক্ষী দেবী মন্দির। সাধক বামাখ্যাপা প্রথমজীবনে এখানেই সাধনা করেছিলেন।কথিত আছে নাটোরের রাজা রাখড়চন্দ্র এবং তার গুরু কাশীর সুমেরু মঠের দন্ডিস্বামী জঙ্গলে এই দেবীমূর্তিটিকে প্রাপ্ত হন এবং সেই দন্ডীস্বামীজীর মতে এই দেবীমূর্তিটি বৌদ্ধতান্ত্রিক দেবী এমনটাই প্রচলিত ধারনা ( বৌদ্ধ দেবীর মতন এর বর্ণ লাল ইত্যাদি লক্ষণ দেখে দন্ডিস্বামী চিহ্নিত করেন )। বৌদ্ধ বজ্রযানের দেবীমূর্তি-ই সেখানে হিন্দু কালী বা তারা মা রূপে পূজিত হচ্ছেন এখন।
মার্কন্ডেয় পুরাণের শ্রী চন্ডী অংশের কাহিনী হল রাজ্যচ্যুত দুই রাজা সুরথ ও বৈশ্য এবং মেধষ মুনির মধ্যে কথোপকথনের কাহিনী।  বহিঃশত্রু এবং আমাত্য বিদ্রোহে দুই রাজ্যহারা রাজা পালিয়ে আসেন এক জঙ্গলে এবং হঠাত্ই তাদের সাক্ষাত্‌ হয়ে যায়। তাদের সাথে আবার দেখা হয়ে যায় মেধস মুনির। তারা যখন জিজ্ঞাসা করেন মুনিকে যে সব হারিয়েও তারা কেন রাজ্য,পরিবার ইত্যাদি ভুলতে পারছেন না তখন মেধস মুনি জানান যে জগত্‌ মায়া ও মোহ দ্বারা আবৃত এবং তা মহামায়া দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই মহামায়া কে, এই প্রশ্ন করলে মেধস মুনি যা বলেন তা-ই হল ‘শ্রী চন্ডী’।
স্বামী বেদানন্দ(যার পূর্বনাম শীতলচন্দ্র),যিনি বরিশালে জন্ম গ্রহণ করেন, তিনি ১২৬৬ বঙ্গাব্দে আবিস্কার করেছিলেন চট্টগ্রামের চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাশের জঙ্গল হল সেই স্থান যেখানে কর্নফুলি নদীর তীরে দুই রাজার দেখা হয়েছিল এবং এর পাশেই পুষ্পভদ্রা নদী পার হয়ে তারা মেধস মুনির আশ্রমে আসেন।
সম্ভবত গৌরীতন্ত্রের কামাখ্যাপটলের নিন্মলিখিত অংশটি বেদানন্দের হাতে আসে।
কর্নফুলি মহানদী…মার্কন্ডেয় মুনেঃ স্থানং
মেধসোমুনেরাস্রমঃ।
ত্ত্রচ দক্ষিণাকালী বাণলিঙ্গং শিবং স্বয়ং ‘
চট্টগ্রামে  ৫১ পীঠের এক পীঠস্থান। বেদানন্দের মতে এই সেই স্থান যেখানে মেধস মুনি ‘শ্রী চন্ডী’-তত্ত্ব দুই রাজ্যচ্যুত রাজাকে জানিয়েছিলেন, যার থেকে মার্কন্ডেয় পুরাণে সেই অংশ রচিত হয়। আমরা অনুধাবন করতে পারি যে কি প্রাচীন সময় থেকে এই বাংলার মাটিতে শক্তি সাধনার ধারা প্রচলিত আছে। শোনা যায় বর্তমানের কলকাতার পার্ক ষ্ট্রীট অঞ্চল, যার পুরনো নাম ছিল চৌরঙ্গী, তা চৌরঙ্গীনাথ নামক এক মহা সাধকের নাম থেকে সৃষ্ট। কালীঘাট যখন ঘোর জঙ্গলপূর্ণ ( ইংরেজদের কলকাতা স্থাপনের আগে পর্যন্ত) তখন সেই সাধক এখানে বাস করতেন।  সেই রকম বশিষ্ট, অষ্টাবক্র ইতাদি নানা পৌরানিক মুনির নাম তারাপীঠ, বক্রেশ্বরের মত শক্তিপীঠগুলির সাথে লোককথায় যুক্ত হয়ে আছে।
দেবীর ৫১ পীঠের ১৫/১৬ টির অবস্থান দুই বাংলাতে। বঙ্গভূমিতে শক্তি আরাধণার ইতিহাস অতি প্রাচীন। হিন্দু হোক বা বৌদ্ধ,শক্তি আরাধনাকে এড়িয়ে বাংলার জনমানস থাকতে পারেনি। কয়েকশ বছর আগেও কৌল ব্রাহ্মণদের রমরমা ছিল। এরাও শক্তিসাধক। খুব নিকট অতীতে রামকৃষ্ণ,বামাখ্যাপা, রামপ্রসাদের মতো সাধকদের কথা আমরা জানি।
১৩০০ নাগাদ বাংলায় আমরা দেখতে পাচ্ছি ৫ টি ধর্মমত প্রচলিত –
১।  দেশীয় গ্রাম্যপূজা
২। বৌদ্ধ সহজযান
৩। নাথপন্থী  যোগীমত
৪। ব্রাহ্মণ্যবাদ    এবং
৫। হিন্দু তন্ত্র
শিব-শক্তি সাধনাটি বাহ্যিক নারী-পুরুষ (ভৈরব-ভৈরবী) দেহগত আচরণকেন্দ্রিক হয়ে ওঠায় সমাজে তন্ত্রের ব্যভিচার নিয়ে বিরূপ ধারনার জন্ম নেয়।
মাতৃসাধনা তথা শক্তি সাধনার পীঠস্থান এই বঙ্গভূমি তাই দীপাবলীতে শক্তি আরাধনার দিন, যদিও অন্যান্য প্রদেশে এই দিনে লক্ষ্মীদেবীর আরাধনা হয়ে থাকে। জৈনদের কাছে এই দিন পালিত হয় মহাবীরের বন্ধন-মুক্তির দিবস রূপে। নেপালের বজ্রযানপন্থীরা ( Newar Buddhist) এই দিনে দীপাবলী তথা লক্ষ্মীর আরাধনা করেন।
সংকলন ও অনুলিখন : ভৈরব বিরজানন্দ অবধূত
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।