বাঁকুড়া জেলার প্রথম কলেজ বাঁকুড়া খ্রিস্টানকলেজ। ১৯০৩খ্রিস্টাব্দেবাঁকুড়ায়ওয়েসলিয়ানমিশনারিকলেজ নামেযাত্রাশুরুকরে ১৯৩৭ এ এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিই বাঁকুড়া খ্রিস্টানকলেজনামেপরিচিতি লাভ করে। স্বাধীনতা পূর্ব সময় থেকে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে এই কলেজটির সারা দেশেই যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ এপ্রিল এই কলেজেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তন। বাঁকুড়া জেলা ও বাঁকুড়া খ্রিস্টান কলেজের ইতিহাসতো বটেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসেও এ এক স্মরণীয় দিন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তখন রাজ্যের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়। আরও চার বছর পর ১৯৬০ এ প্রতিষ্ঠিত হয় বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়। এখনতো বাঁকুড়াতেও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। খ্রিস্টান কলেজে কেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এই বিশেষ সমাবর্তন আয়োজন করেছিল?শতবর্ষ ছুঁই ছুঁই এক সারস্বত সাধক আচার্য যোগেশ চন্দ্র রায় বিদ্যানিধির হাতে সাম্মানিক ‘ডি.লিট’ প্রদান ও সম্বর্ধনা জানাতেসেইপ্রথম খ্রিস্টান কলেজে উঠে এসেছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সর্বোপরি একটিজেলার ইতিহাসে এ এক বিরল ঘটনা। বহু সম্মান ও সম্বর্ধনায় ভূষিত আচার্যদেবের জীবনে এটি ছিল অন্তিম সম্বর্ধনা পাওয়া।এরআগেবিদ্যানিধিমহাশয়কেবহুসম্মানওসম্বর্ধনায়ভূষিতকরাহয়েছে।বঙ্গীয়সাহিত্যপরিষদ কর্তৃক ‘রামপ্রাণ গুপ্ত স্মৃতি পুরস্কার’, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জগত্তারিণী পদক’ ও ‘সরোজিনী পদক’, পুরীর পণ্ডিত সমাজের দ্বারা ‘বিদ্যানিধি’ উপাধি, কাশীর ভারতধর্ম-মহামণ্ডল দ্বারা ‘বিজ্ঞান ভূষণ’ উপাধি,‘এনসিয়েণ্ট ইণ্ডিয়ান লাইফ’ গ্রন্থের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক ‘রবীন্দ্র স্মৃতিপুরস্কার’ প্রভৃতি নানান সম্মানে তাঁকে সম্বর্ধিত করা হয়েছে। তিনিলণ্ডনের দি রয়াল মাইক্রোসকোপিক্যাল সোসাইটি এবং দি রয়াল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হয়েছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি.লিট প্রদান করার আগেই ১৯৫৫ তে ওড়িশার উৎকল বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ‘ডি.লিট’ দিয়ে সম্মানিত করেছেন।
আচার্য যোগেশচন্দ্র রায় মহাশয় বাঁকুড়ার মানুষ ছিলেন না।১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২০ অক্টোবর হুগলী জেলার দিঘড়া গ্রামে যোগেশচন্দ্রের জন্ম। ১৮৬৮ সালে দুর্গাপূজার পর পিতা তারকনাথ রায় কর্মসূত্রে বাঁকুড়ায় বদলি হয়ে আসায় নয় বৎসর বয়সে তিনি প্রথম বাঁকুড়া আসেন।এখানে এসে তৎকালীন বাংলা স্কুল, বর্তমানের বঙ্গ বিদ্যালয়ে তাঁকে ভর্তি করা হয়। দুমাস তিনি এই স্কুলে পড়েছিলেন। পরের বছর জানুয়ারিতে তাঁকে বাঁকুড়া জেলা স্কুলে ভর্তি করা হয়। কিন্তু পিতার আকস্মিক মৃত্যুরকারণে এক বছরের মধ্যেই যোগেশচন্দ্রকে বাঁকুড়া ত্যাগ করতেহয়।পরে আরামবাগ, বর্ধমান, হুগলী ও কলকাতায় বিভিন্ন বিদ্যালয় ও কলেজেতিনি শিক্ষা গ্রহন করেন। উদ্ভিদ বিদ্যায় এম.এ পাশ করার পর তিনি কটকের র্যাভেনশ কলেজে অধ্যাপানার দায়িত্ব নিয়ে ওড়িশা চলে যান।১৮৮৩ সালের ১৭ এপ্রিল তিনি কটক আসেন।কটকে তিনি একটানা তিরিশ বছর কাটালেন ও মাঝে কিছুদিন কলকাতায় মাদ্রাসা কলেজ ও প্রেসিডেন্সি কলেজেও কর্মে যুক্ত ছিলেন।যোগেশচন্দ্র রায় ছিলেন এমন একজন বাঙালি যিনি উদ্ভিদ বিদ্যা,পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জ্যোতির্বিদ্যার মতোবিজ্ঞানের বিষয় গুলির পাশাপাশি বাংলা,ওড়িয়াও সংস্কৃত ভাষাচর্চা ও জ্যোতিষচর্চায় শুধু পারদর্শী নয়, ছিলেন একজন অগ্রগণ্য গবেষক।ডঃ সুকুমার সেন জ্ঞানে বিজ্ঞানে পারদর্শী শিক্ষিত বাঙালিদের মধ্যে দুজনকে অগ্রগণ্য বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁরা হলেন যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি এবং রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী। গবেষকরা বাংলা ভাষার তুলনামুলক ব্যাকরণের পথিকৃতের আসনে বসিয়েছেন আচার্য যোগেশ চন্দ্রকে। তিনি বাংলা, হিন্দি, ওড়িয়া, মৈথিলী, অসমিয়া, গুজরাটি, মারাঠি রাজস্থানি, সিন্ধি, কাশ্মীরি প্রভৃতি ভাষাকে নিয়ে বাংলার ব্যাকরণে তুলনামূলক ব্যাকরণ রচনা করেছিলেন। ভাষাতত্ত্ববিদ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় তার ‘Origin and Development of Bengali Language’ গ্রন্থে আচার্য যোগেশ চন্দ্রের নিকট তাঁর ঋণ স্বীকার করেছেন নির্দ্বিধায়।
প্রবাসী সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ছিল তাঁর নিবিড়ঘনিষ্ঠতা।রামানন্দ সম্পাদিত প্রবাসী, মডার্ন রিভিউ শুধু নয় দেশ ও বিদেশের বহু পত্র-পত্রিকায় তিনিবিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখেছেন এবং বিজ্ঞান ও সাহিত্যের ভাণ্ডারকেসমৃদ্ধকরেছেন।রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের আগ্রহেই অবসরের পর ১৯১৯ এর ডিসেম্বরে তিনি বাঁকুড়ায় আসেন এবং এখানেই স্থায়ী ঠিকানা গড়ে তোলেন। বাঁকুড়ায় এসে সারস্বত সাধনার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কাজে তিনি নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। স্বাধীনতার বছরে অর্থাৎ ১৯৪৭এর ৭ ডিসেম্বর বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি স্যার যদুনাথসরকারের নেতৃত্বে চৌত্রিশজন সাহিত্যিক ও সাহিত্যানুরাগী কলকাতা থেকে বাঁকুড়া এসেছিলেন আচার্য যোগেশচন্দ্রকে সম্বর্ধনা জানাতে।স্যার যদুনাথ ছাড়া এই দলে ছিলেন সাহিত্যিক সজনী কান্ত দাস, দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য।
পৃষ্ঠা ২
মনোজকুমার বসু, প্রতাপচন্দ্রচন্দ্র প্রমুখ বিশিষ্টজনেরা।সেইসময় এই সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানের জন্য বাঁকুড়া খ্রিস্টান কলেজের প্রবীণ অধ্যাপক রামশরণ ঘোষকে সভাপতিএবং আচার্যদেবের প্রতিবেশী সাহিত্যিক বৈদ্যনাথ ঘোষকে সম্পাদক করে একটি অভ্যর্থনা সমিতি গঠিত হয়েছিল।১৯৫০-৫১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার রবীন্দ্র পুরস্কার চালু করে। যোগেশ চন্দ্র প্রথম এই পুরস্কার প্রাপক। ১৮৮৬ থেকে১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে তিনি পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, জ্যোতিষ, প্রাচীন ভারতীয় জীবনধারা, বাংলা ভাষা ও শব্দকোষ, বাংলা ব্যাকরণের তুলনামূলক আলোচনা, পূজা-পার্বণ, পুরাণ, বেদ, চণ্ডীদাস চরিত, শিক্ষা সংস্কার, শিক্ষা প্রকল্প, দর্শন প্রভৃতি বিভিন্ন এবং বিচিত্র সব বিষয় নিয়ে গবেষণা করে, গ্রন্থ রচনা করে ও গ্রন্থ সম্পাদনা করে তিনি বাংলা সাহিত্যের জ্ঞান বিজ্ঞানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন।
১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে উৎকল বিশ্ববিদ্যালয় আচার্য যোগেশ চন্দ্রকে সাম্মানিক ডি.লিট প্রদানের পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও ডি.লিট দেওয়ার জন্য জোরালো দাবি ওঠে । যদিও এর প্রায় দুবছর আগেই ১৯৫৩ সালে৪অক্টোবর (১৭ আশ্বিন, ১৩৬০ রবিবার) আনন্দবাজার পত্রিকায় সুশীল রায়ের লেখা একটি চিঠি প্রকাশিত হয়। পত্র লেখক লেখেন “আগামী ২০ শে অক্টোবর শ্রী যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি মহাশয়ের ৯৪ বছর পূর্ণ হচ্ছে। … তা সত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় সম্মান প্রদর্শনের কোন ব্যবস্থ করেননি”। অবশেষে ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আচার্যদেবকে ডি.লিট দিতে উদ্যোগী হয়। যোগেশ চন্দ্রের বয়স তখন ৯৬ অতিক্রান্ত। এই বয়সে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া অসম্ভব ছিল। এমতাবস্থায় বাঁকুড়ায় বিশেষ সমাবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৭ এপ্রিল ১৯৫৬ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বাঁকুড়া খ্রিস্টান কলেজ ও বাঁকুড়া জেলার ইতিহাসে সেই স্মরণীয় দিন যেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাজ্যপাল হরেন্দ্রনাথ মুখার্জির হাত থেকে যোগেশ চন্দ্র রায় ডি.লিট উপাধির মানপত্র গ্রহন করলেন। উপাচার্য নির্মল কুমার সিদ্ধান্ত তাঁর লিখিত ভাষণেরঅন্তিমঅনুচ্ছেদে বললেন “আচার্যযোগেশচন্দ্রেরজ্ঞানবিজ্ঞানেরবহুমুখীকার্যকলাপেরবিষয়আলোচনাকরাআমারপক্ষেসম্ভবনয়।…..যোগেশ চন্দ্রকে ডি.লিট উপাধিতে সম্মানিত করে বিশ্ববিদ্যালয় নিজেকেই সম্মানিত করল”।“The University in honouring him is honouringitsef”. ১৩৬৩ বঙ্গাব্দের নববর্ষের শুরুতে এই অনুষ্ঠানে বাঁকুড়াবাসী উৎসবে মেতে উঠেছিল। পরদিন আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিতসংবাদেলেখা হয়েছিল– “ইতিপূর্বে কলিকাতা শহরের বাহিরে এইরূপ সমাবর্তন অনুষ্ঠান হয় নাই। বহু বৎসর পূর্বে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় শান্তিনিকেতনে আসিয়াছিল ‘ডি-লিট’ উপাধি দিয়া রবীন্দ্রনাথকে সম্মানিত করিতে। মঙ্গলবার দিন রবীন্দ্রনাথ অপেক্ষা বয়োজ্যেষ্ঠ চিন্তাশীল গবেষক আচার্য যোগেশ চন্দ্র বিদ্যানিধিকে অনারারী ডক্টরেট অব লিটারেচার উপাধি দিতে তাঁহার বাসস্থান বাঁকুড়া শহরে সমাবর্তন অনুষ্ঠান করিয়া কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করিলেন”।