বনধ খুবই ভালো জিনিস। স্বাধীনতার আগে প্রতিবাদের পদ্ধতি হিসেবে অরন্ধনকে চিহ্নিত করে ছিলেন খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তবে অরন্ধন খুব শক্ত জিনিস। না খেলে কাজ তো দূরের কথা ভালো করে চিন্তা করাই শক্ত। বেশি দিন না খেলে খুব বিপদ। সেটা যতীন দাস ভাল জানতেন। ৬৯ দিন অনশন করে তিনি দেহত্যাগ করেন। গান্ধিজি বিস্তর অনশন করতেন। না, সাধারণ দিনেও গান্ধিজি অতি অল্প আহারে অভ্যস্ত ছিলেন বলে শোনা যায়। তবে গান্ধিজি অনশন শুরু করলে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নড়ে বসতেন। হাই প্রোফাইল মানুষের অনশন বলে কথা। গান্ধি অনশন ভাঙবেন ঘোষণা করলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মাপের অ্যারিস্টক্র্যাট ফলের রস ভরতি গ্লাস এগিয়ে দিতেন। পাতি লোকজন এদেশে দিব্যি একবেলা অনশন করতে বাধ্য হয়। না, পাতি গরিবের অনশন কোনো রাজনৈতিক প্রজ্ঞাজারিত ব্যাপার নয়। তাই সাধারণের অনশনে সরকারের হেলদোল হত না। পরবর্তীকালে অরন্ধনের চাইতে সহজ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। তাহল ধর্মঘট। ধর্মঘটের সঙ্গে ধর্ম কথাটার একটা যোগসূত্র ছিল সেকালে। ধর্মীয় অনুষঙ্গে উপবাস বা অনশন ছিল চেনা সামাজিক রীতি। নজরুল লিখেছেন জাগো জাগো অনশনবন্দী। ধর্মঘটী শ্রমিকদের বাড়িতে ভালমন্দ খাবার যে জোটে না, তা নজরুল জানতেন। তবে, অনশন করে শরীরকে কষ্ট দিলে যে কেষ্ট মেলে না, সে কথা ভাল বুঝতেন গৌতম বুদ্ধ। তিনি যতদিন অনশন করেছিলেন, সাধনার সার্থকতা মেলেনি। যেই তিনি ভক্তিমতী সুজাতার হাত থেকে পায়স গ্রহণ করে ভক্ষণ করলেন, অমনি তাঁর অন্তরে জ্ঞানের সূর্যোদয় ঘটল। অনশনের সেরা উদাহরণ হিমালয়কন্যা পার্বতী উমা। তিনি স্বামী হিসেবে শিবকে পাবার আশায় একে একে খাদ্যবস্তু বর্জন করতে করতে শেষের দিকে একপর্ণা ও অন্তিমে অপর্ণা হয়েছিলেন। অপর্ণা হবার কালে গাছ থেকে ঝরে পড়া শুকনো পাতাটুকুও খেতেন না। চণ্ডীদাস তাঁর পূর্বরাগের পদে যোগব্রতধারিণী রাধিকা সুন্দরীর মধ্যে উমার ছবিটি এঁকে দিয়েছেন। হিমালয়বনিতা মেনকা তাঁর মেয়েকে অতটা কৃচ্ছ্র সাধন করতে নিষেধ করেছিলেন। উমা কথাটা সেই নিষেধের ইঙ্গিত বহন করে। ‘উ মা’ মানে যেয়ো না, এত কষ্ট দিয়ো না নিজেকে।
অনশন করে পতি হিসেবে শিবকে পেলেও শেষরক্ষা হয় নি উমার। বাপের বাড়ি যাবেন বলে বায়না ধরে জেদের বশে অনিমন্ত্রিত হয়ে সেখানে গিয়ে পতিনিন্দা শুনে প্রাণত্যাগ করেন উমা পার্বতী। কষ্টসাধ্য তপস্যা করে রাধিকাসুন্দরী কৃষ্ণ পাবেন ভাবছিলেন। কিন্তু তিনি আয়ান ঘোষ নামে এক বৃষস্কন্ধ নপুংসকের বিবাহিতা স্ত্রী ছিলেন। তাই রাধিকাসুন্দরীর প্রেম পরকীয়া হয়েই রয়ে গেল। বৈষ্ণব সাধকদের চোখে অবশ্য পরকীয়া সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেম হিসেবে চিহ্নিত। তবে রসিকরাজ কৃষ্ণের পাঁচ পাঁচটি বৈধ স্ত্রী সত্যভামা, রুক্মিণী, লক্ষ্মণা, সুশীলা, জাম্ববতী, ইত্যাদি ছিলেন। তার উপর ষোলশত গোপিনী। তাই রাধিকা যেন কান্তদয়িতকে পেয়েও পেলেন না। তাঁকে ফেলে কৃষ্ণ সাংসারিক কর্তব্য বুদ্ধির টানে মথুরাপুরে চলে যান। সেই বিচ্ছেদের পদ মাথুর বৈষ্ণবমতে উচ্চাঙ্গের। তারপর হল ভাব সম্মিলন। মনে মনে সম্পর্ক।
সুতরাং অনশন করে যে শেষ রক্ষা হয় না, তা ভারতীয় রাজনৈতিক দলের নেতারা ভাল জানতেন। তাঁরা অনশনের বোকা বোকা পথ বাদ দিয়ে অবরোধের পথ নিলেন। মানুষের সক্রিয় উৎসাহপূর্ণ শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণ নয়, নেতাদের চোখে অবরোধের সাফল্য নিশ্চিত করতে নঞর্থক ক্রিয়াকলাপের গুরুত্ব সর্বজনবিদিত। দাও বন্ধ করে রেলপথ। ইলেকট্রিক লাইনের উপর কলাপাতা দুলিয়ে দাও। সরকারি বাসের কাচ ভাঙো। সরকারি পুলিশের মাথা ভাঙো। এক পয়সা ট্রামভাড়া বাড়লেও অনেক ট্রাম পোড়াও। ভাঙনের জয়গান গাও। মানুষ ভেড়া মাত্র। তার সক্রিয় সম্মতি গড়ে তোলা নিরর্থক। নেতারা যে পথে চালাবেন, সেটাই একমেবাদ্বিতীয়ম। নান্যঃ পন্থা বিদ্যতে অয়নায়।
কর্মনাশা বনধ করে জনজীবন অচল করে দাও। সেই ট্রাডিশন সমানে চলেছে।