প্রবন্ধে ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়

জলছবি (ছুঁচ ও স্টেশনের গান)

(১)

ছুঁচ

আমি শ্যামলী। হাসপাতালের বারান্দায় বেঞ্চির ওপর শুয়ে আছি আমি এখন। আমাকে রক্ত দেওয়া হবে। কুড়ি দিন অন্তর রক্ত লাগে আমার। সবসময় হয় না। মা পেরে ওঠে না। কুড়ি দিনের জায়গায় একমাস হয়ে যায়। তখন আমি আর বিছানা ছেড়ে উঠতে পারি না। খুব কষ্ট হয়। আমার থ্যালাসেমিয়া আছে।
ওই সিরিঞ্জটা দেখলেই আমার ভয়ে বুক শুকিয়ে যায়। প্রথম প্রথম খুব কাঁদতাম। কেঁদে কোনও লাভ হয় না। তাই এখন চোখ বন্ধ করে শক্ত হয়ে শুয়ে থাকি। আমার হাতে শিরাই খুঁজে পায় না কাকুরা। আমি নাকি বড্ড বেশি রোগা। সরু সরু হাতে শিরা খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়। শিরা খুঁজতে বারবার ছুঁচ ফোটাতে হয়। আজকেই তো সাত-আটবার ফুটিয়েছে। এখনও পায় নি। আবার খুঁজবে। ব্যাথায় হাত নাড়তে পারি না কতদিন! ব্যাথা ভাল হতে না হতেই আর একবার রক্ত নেওয়ার সময় হয়ে যায়।
মা পাশেই বসে আছে আমার হাতটা ধরে। আমি জানি, মায়ের খুব কষ্ট। আমার একটা দাদা ছিল। তারও এমন হত। খুব কষ্ট পেত দাদা। বোধহয় আমার থেকেও বেশি। তারপর একদিন দাদা মরে গেল। আমিও মরে যাব। আমরা দু ভাই বোন এমন বলে বাবা মা কে দোষ দিত, গাল দিত, মারত, তারপর একদিন চলেই গেল রাগ করে। আর ফিরল না। আমাদের যে এমন রোগ, তা কি মায়ের দোষ? মায়ের তো এই রোগটা নেই! বাবারও নেই। তাহলে দোষ মায়ের হবে কেন? আমরা তো বাবারও ছেলেমেয়ে।
গরমকালে রক্ত পাওয়া যায় না। মা এদিক ওদিক ছুটোছুটি করে রক্ত জোগাড় করে। কখনো ব্লাড ব্যাঙ্ক আমাদের জন্য বিনে পয়সায় রক্ত দেয়। কখনো কোনও ক্লাব রক্তের কুপন দেয়। মা সেসব জোগাড় করার চেষ্টা করে। আমি কতদিন ইস্কুল যেতে পারি না, বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে যেতে পারি না। আমার মাথা ঝিমঝিম করে, চোখে ঝাপ্সা দেখি, নিঃশ্বাসের কষ্ট হয়। আমার চামড়া কেমন খসখসে আর কালো হয়ে গেছে। আমার বন্ধুরা সবাই লম্বা হয়ে গেছে আমার থেকে।
আমি ইস্কুল না গেলে বাড়িতে আমাকে একাই থাকতে হয়। মা কে তো কাজে বেরোতে হয়। একটা ইটভাটায় কাজ করে মা। একা একা দাওয়ায় শুয়ে শুয়ে আমি রাস্তাঘাট, লোকজন দেখি। ডাক্তারবাবু যেসব ওষুধ – ইনজেকশন লিখে দেয়, সেগুলো পেলে আমি একটু ভাল থাকি। কষ্ট কম হয়। কিন্তু অনেক সময় মা কিনতে পারে না সময়মত। অনেক দাম ওষুধের। ডাক্তারবাবু একটা অপারেশনের কথাও বলেছে। এখানকার হাসপাতালে হবে না। আর বাইরে অনেক খরচ। তাই করানো যাবে না। মা দেওয়ালে মাথা ঠুকে ঠুকে কাঁদে। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। আমার খুব কষ্ট হয় তখন। সেটা অন্য রকম কষ্ট।
আমি ছবি আঁকতে ভালবাসি। গান গাইতে ভালবাসি। ইস্কুল গেলে গান শেখা যায়। বই পড়তেও আমার খুব ভাল লাগে। বড় হয়ে আমার ইস্কুলের দিদিমনি হতে ইচ্ছে করে। কিন্তু বড় তো আমি হব না। দাদার মত বড় হবার আগেই আমি …!
ওই আবার আসছে কাকু সিরিঞ্জ নিয়ে। হে ঠাকুর, এবারে যেন একবারেই শিরাটা খুঁজে পাওয়া যায়! আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে মা। চোখে আঁচল চাপা দেয়। আমিও চোখ বন্ধ করে ওই ছুঁচটার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি।

(২)

স্টেশনের গান

আমি অনু। রেল স্টেশনে চট দিয়ে ঘেরা আস্তানায় দাদুর সঙ্গে থাকি। দাদু-আমি দুজনেই গান গাই। লোকে যাতায়াতের পথে পয়সা দিয়ে যায়।
আমাদের একটা বাড়ি ছিল গ্রামে। জেলা মুর্শিদাবাদ। বাড়িতে বাবা-মা, ছোট ভাই ছিল। আমি ইস্কুলে যেতাম। অনেক বন্ধু ছিল আমার। রোজ খেলতাম বন্ধুদের সাথে। আর গান গাইতাম। গান গাইতে আমার খুব ভাল লাগে। যে কোনও সুর আমি একবার শুনেই তুলে ফেলতে পারি।
বাবা বোম্বেতে সোনারূপোর কাজ করত। কয়েকমাস পর পর বাড়ি আসত। আমাদের জন্য বম্বে থেকে নতুন জামাকাপড় আনত। বাবা এলে ভালমন্দ খাওয়াদাওয়া হত বাড়িতে। একবার ফিরল কি একটা অসুখ নিয়ে। শরীর দুর্বল, মুখে ঘা, কিছু খেতে পারে না। ঘন ঘন জ্বর হত। বাবা আর ফিরে গেল না কাজে। অনেক রকম পরীক্ষা হল শহরে গিয়ে। জানা গেল খুব খারাপ অসুখ হয়েছে বাবার। রক্তের অসুখ। এইডস। সারবে না। বাবা আর কাজ করতে পারবে না। বাধ্য হয়ে মা গেল কাজ করতে দর্জির দোকানে। সেলাইকল চালাতে পারত মা। কিছুদিন পর বাবা মারা গেল। শেষকালটায় বাবাকে আর চেনা যেত না। হাড়ের ওপর চামড়া জড়ানো।
মাকেও কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিল একদিন। বাবার খারাপ রোগ নাকি মায়েরও হয়েছে। মায়েরও রাতের দিকে জ্বর আসতে শুরু করল। আমাদের সঙ্গে গ্রামের আর কেউ মেলামেশা করত না। কুটুমবাড়ি থেকেও লোকজন আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। একদিন দিদিমা এসে ভাইকে নিয়ে চলে গেল। ভাই নাকি ওখানেই থাকবে। মা আমাকেও নিয়ে যেতে বলছিল। আমি জেদ করে কিছুতেই গেলাম না মাকে ছেড়ে। আমি চলে গেলে মাকে কে দেখবে? মায়ের কষ্ট হলে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতাম, জ্বর এলে মাথায় জলপটি দিতাম। হাসপাতালেও গিয়েছিল মা। কোনও চিকিৎসা হয়নি। নার্স দিদিরা ছুঁয়েও দেখেনি মাকে। ডাক্তারজেঠুর কাছে ওষুধ চাইতে গেলে গালাগাল দিয়ে দুর করে দিয়েছিল।
তারপর একদিন বড়দিমনি আমাকে ইস্কুলে আসতে আসতে বারণ করে দিল। আমি এলে নাকি অন্য ছেলেমেয়েদের পাঠাবে না বাবা-মায়েরা। আমার নাকি খারাপ অসুখ আছে। কিন্তু সত্যি আমার কোনও অসুখ নেই। আমার রক্ত পরীক্ষা হয়েছে। রক্তের কোনও দোষ পাওয়া যায় নি। ডাক্তারজেঠু তো দেখেছে আমার রক্তপরীক্ষার কাগজ। তবু ডাক্তারজেঠু তার চেম্বারে যেতে বারণ করেছে আমাকে। আমার নাকি খারাপ অসুখ আছে বলে জানে সবাই। আমি গেলে আর কোনও রুগি আসবে না। আমাকে কেউ আর খেলায় নিত না। বাড়ি থেকে বারণ করে দিয়েছিল আমার সঙ্গে খেলতে।
মায়ের কোনও চিকিৎসাও হল না। বাবার অসুখের সময় অনেক খরচ হয়ে গিয়েছিল। মাকে আর শহরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো গেল না। কেই বা নিয়ে যাবে? দাদু বুড়ো হয়ে গেছে। শহরের কিছু চেনে না। আর আমি তো অনেক ছোট। আত্মীয়রা, গ্রামের লোকেরা আমাদের সঙ্গে মেশে না, কথা বলে না। কষ্ট পেয়ে পেয়ে মাও একদিন মরে গেল।
বাড়িতে একদানা খাবার নেই। কেউ সাহায্য করবার নেই। দাদু আর আমি একদিন বাড়ি ছেড়ে, গ্রাম ছেড়ে ট্রেনে চেপে চলে এলাম দূরে, অচেনা একটা বড় স্টেশনে। কত মানুষ! কত ট্রেন যায় সারাদিন ধরে! এখানে কেউ আমাদের চেনে না। আমরা দুজনে এখন স্টেশনে বসে গান গাই, ভিক্ষে করি। খাওয়া জুটে যায়। এখানে আমাদের মত আরও কয়েকজন আছে, তারাই এখন আমাদের আপনজন। কেউ জানেনা, আমার বাবা-মা খারাপ অসুখে মরে গেছে। জানলে হয়ত তারাও ঘেন্না করত আমাদের!
আমার শুধু ইস্কুলটার কথা মনে পড়ে খুব। বন্ধুদের কথা মনে হয়। মনে মনে হিসেব করি, ক্লাস সেভেন হত আমার এতদিনে। আমার কথা ভাবে কি ওরা কেউ? খুব জানতে ইচ্ছে করে!
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।