প্রবন্ধে জয়শ্রী কুন্ডু পাল

সবলা হয়ে ওঠো

ছোট বেলায় গ্রামের বাড়িতে যখন থাকতাম আমাদের পুকুরে প্রচুর হাস চরে বেড়াতো। গ্রামের অনেকের বাড়িতেই হাঁস ছিল। সেই হাঁসেরা রোজ সকালে পুকুরের জলে ভেসে বেড়াতো আর সন্ধ্যে নামার আগে ঠিক পথ চিনি তারা নিজের নিজের বাড়িতে চলে যেত। শীতের সকালে কিংবা গ্রীষ্মের  সন্ধ্যায় হাঁসেরা যখন নির্ভাবনায় হেলতে দুলতে পুকুরে যেত কিংবা বাড়ি ফিরত তখন আড়ালে কোথাও ওৎ পেতে থাকা শেয়াল হাঁসের দলের মধ্যে থেকে একটার ঘাড় ধরে নিয়ে দৌড় দিত আর সবাই ‘গেল গেল! আজ‌ও একটা গেল’! বলে রব তুলতো। হাঁসেরা যেমন নিরাপদে পথ চলতে পারত না আমাদের দেশের মেয়েদের সেই হাঁসেদের অবস্থা।
কার জন্য কোথায় কখন বিপদ কিভাবে দাঁড়িয়ে আছে কেউ জানতে পারে না। হাঁস- শিয়ালের খাদ্য-খাদক সম্পর্কের মতোই কি জানি আমার মনে  এখন নারী- পুরুষের এই একটা সম্পর্কের কথাই  মনে আসে। দুর্বলেরা সব কালে সব দেশে সবলের দ্বারা নিগৃহীত পীড়িত হয়। দৈহিক গঠনে পুরুষের চেয়ে নারী জাতি দুর্বল সেই ধারণাটা পুরুষের মজ্জাগত। আমরা আগে কি ছোট কি বড় কেউই ‘ধর্ষণ’, ‘ধর্ষিতা’ এই শব্দগুলো খুব সহজে উচ্চারণ করতে পারতাম না উচ্চারণ করাটাও যেন অত্যন্ত গর্হিত ছিল অথচ সেই গর্হিত কর্মটি দিবালোকে চন্দ্রালোকে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে আকছার ঘটে চলেছে। তার কিছু খবর টিভিতে,খবরের কাগজে সামনে আসে কিছু আসে না, অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। 2012-র সাংঘাতিক নির্ভয়া কাণ্ডের পর রাষ্ট্র-সমাজ নড়েচড়ে বসল। নির্ভয়ার মতো ভয়াবহ পরিণতি আর কোন মেয়ের যাতে না হয়  সেইজন্য ‘ফাস্ট ট্র্যাকে ধর্ষণ কেস’ সমাধান করার ধারা তৈরি হলো যা কাগজে-কলমে থাকল বাস্তবায়িত হলো না! এই ঘটনার পর তৈরি হলো নির্ভয়া তহবিল। ইমার্জেন্সি রেসপন্স সাপোর্ট সিস্টেম, সেন্ট্রাল ভিকটিম কম্পেন্সেশন ফান্ড, মহিলা ও শিশুদের ওপর সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ, ওয়ান স্টপ স্কিম, মহিলা হেলপ্লাইন প্রকল্প ইত্যাদি ।কিন্তু মেয়েদের সমস্যা যে তিমিরে সেই তিমিরেই ।মেয়েদের অবস্থান কি সেদিনের থেকে এক তিল‌ও পাল্টেছে? তা না হলে নির্ভয়া কাণ্ডের পর উন্নাও কান্ড  ঘটে কি করে?এত বছর পরে একজন চিকিৎসকের ওপর এইরকম হিংস্র জঘন্য অপরাধ হয় কেন? আমাদের পথ-ঘাট, দোকান-বাজার, গণ-পরিবহন কোনটা আজ আমাদের কাছে নিরাপদ? আমাদের মেয়েদের বয়স বিচার নেই, শিশু-বৃদ্ধ কেউই বাদ যায় না এই শিকারীর হাত থেকে ।শেয়াল যেমন বিচার করে না তার শিকারটা শিশু না পরিণত।
আসলে সমস্যার মূল কোথায় খুঁজতে হবে। যে শিশুগুলি অবোধ ,নিষ্পাপ বড় হয়ে তারা কেন কলুষযুক্ত হয়ে পড়ছে?
সেটা খুঁজলে হয়তো দেখব তার পরিবেশ আবহাওয়াই তাকে বিষাক্ত করেছে, তাকে ঐরকম কর্মে লিপ্ত করতে বাধ্য করেছে ।ভালো-মন্দ জ্ঞানের তফাৎ তার বোধের জগতে নেই। সে নিজের পরিবারেই হয়তো দেখেছে মা দিদি বা অন্য কোনো আত্মীয়াকে অত্যাচারিত হতে। মার খাচ্ছে অসংযমী বাবার কাছে মা, বোন মার খাচ্ছে মাতাল ভাইয়ের হাতে। অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবার অসংযমী জীবন-যাপন তাকে ঐ পথে চালিত করছে। ক্ষমা, তিতিক্ষা, ভালবাসার পরিবর্তে তারমধ্যে লোভ-লালসা, রিরংসা প্রবৃত্তি গুলি প্রকট হয়ে উঠছে ।উপযুক্ত শিক্ষা ও পরিবেশ না পাওয়ার ফলে শিশুর দানবীয় প্রবৃত্তিটি বয়সকালে প্রকট হয়ে পড়ছে যার ফল ভয়াবহ আকার নিচ্ছে আমাদের পরিবারে,সমাজে। এর নিরাময় কি? আমরা কি পারিনা এই বিপর্যয় থেকে দেশকে সমাজকে বাঁচাতে?আমরা যে যেখানে আছি নিজের নিজের কর্ম ক্ষেত্রে, পাড়ায়, গ্রামে ,শহরে যদি সবাই একটু চেষ্টা করি একটু গণসচেতনতা গড়ে তুলতে পারি, নিজের নিজের এলাকার মধ্যে শিশুদের নিয়ে একটু সৎ শিক্ষা দিতে পারি, ভালো-মন্দের তফাৎ বোঝাতে পারি চোখের সামনে একটা উজ্জ্বল দিনের ছবি তুলে ধরি তাহলে বোধহয় কিছুটা ছবি পাল্টালে পাল্টাতেও পারে। আইনানুগ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ততটা ফলপ্রসূ হবে না যতটা ফলপ্রসূ হবে সমাজের সব স্তরের থেকে গণসচেতনতা গড়ে তুললে।
আর অশিক্ষা দারিদ্র্য এই দুটি চরম বিষাক্ত ক্ষত সারিয়ে তোলার দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রকে এবং সমাজের সকল শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকেও।
এখন এই ক্রম অবক্ষয়িত সমাজে বসে রোজ রোজ একটা দুশ্চিন্তাই কুরে কুরে খায় আমার ছেলেগুলোর মনে ঘুনপোকা বাসা বাঁধেনি তো? আমার মেয়ে গুলি গোপনে ধর্ষিতা হচ্ছে নাতো যা সে লজ্জায় গোপন করে যাচ্ছে, বলতে পারছে না কারো কাছে। ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে, প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না। সৌভাগ্যক্রমে আমি একটি গার্লস স্কুলের শিক্ষিকা সেই কারণে প্রতিদিন আমি অনেক মেয়ের সংস্পর্শে আসি। তারা বিভিন্ন পরিবেশ বিভিন্ন পরিবার থেকে আসে ।একটু ভালোবাসা সহানুভূতি পেলেই তারা তুলে ধরে তাদের সমস্যার কথা, তাদের বিড়ম্বনার কথা। আমি ক্লাসে গিয়ে প্রথম 5 মিনিট মেয়েদের ওই শিক্ষাই দিই। ওদের বলি আমাদের চারপাশে মুখোশধারী হায়না ঘুরে বেড়াচ্ছে, তোমরা চোখ কান খোলা রেখে পথ হাঁটবে। ওদের কাছে জানতে চাই বাড়িতে বা বাইরে কেউ বিরক্ত করছে না তো? কেউ কোনরূপ ক্ষতি করছে না তো তাদের ?আমি যে কথা সময়ে বলতে পারিনি এত বছর বয়স পেরিয়ে এসে বলছি ওরা সেটা সময়ে যাতে বলতে পারে, প্রতিবাদ করতে পারে সেই সাহস জোগানোটাই আমার উদ্দেশ্য। ওখান থেকে এমন খবর উঠে এসেছে যা শুনলে লজ্জায় গা ঘিন্ ঘিন করে ।অনেক মেয়ে নিজের পরিবারের বাবা কাকা দাদা মামা দ্বারাও ধর্ষিতা হয়েছে, গৃহশিক্ষক, প্রতিবেশী, বাবার বন্ধু কারো হাত থেকে অবলা শিশু মেয়েগুলির রক্ষা নেই ।আমাদের শিক্ষিকারা সাধ্যমত যতটুকু পেরেছে তাদের সুরাহার চেষ্টা করেছে এবং এখনো করে চলেছে। কিন্তু বৃহৎ সমাজে তা আর কতটুকু?
ছোটবেলা থেকে বড় বেলা এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় খুব কম মহিলা আছেন যে তারা পথে-ঘাটে বাসে ট্রেনে রাস্তায় পুরুষ দ্বারা ধর্ষিত হয়নি। এ ব্যাপারে আমি একটি সমীক্ষা চালিয়ে ছিলাম আমার পরিচিত কিছু মহিলাদের মধ্যে। তারা বয়সে ছিল 24 থেকে 60 এর মধ্যে সেখানে উঠে এসেছিল এমন সব অভিজ্ঞতার কথা যা তখন প্রকাশ করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না, কখনো ভয়ে কখনো লজ্জায়। এরা প্রত্যেকেই কেউ আত্মীয় দ্বারা বাড়িতে, কেউ পথচারী, বাস যাত্রী, ট্রেন যাত্রীর হাতে নিগৃহীতা, ধর্ষিতা।তবে আশার কথা আগের যুগ আর নেই,মেয়েরা এখন আত্মসম্মান রক্ষার্থে লজ্জা বিসর্জন দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না, ভয় পায়না দুর্বৃত্ত পুরুষকে। আমার চোখে দেখা একটি ঘটনা এপ্রসঙ্গে না বলে পারছিনা। একটি স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় বসে আছি হঠাৎ একটি আপ ট্রেন ঢুকলো গেটের সামনে কতগুলি লোক ঝুলাঝুলি অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল এমত অবস্থায় দেখে একটি মেয়ে পায়ের চটি খুলে একজনের গালে সজোরে বসিয়ে দিল। শুনলাম সেই লোকটি ওই মেয়েটির সঙ্গে অশালীন আচরণ করেছিল,ভিড় ট্রেনে সুযোগ বুঝে এবং মেয়েটি তৎক্ষণাৎ তৎপর হয়ে তার প্রতিশোধ নিজেই নিয়েছে। কিন্তু সবক্ষেত্রে তো প্রতিবাদ প্রতিশোধ নেওয়ার উপায় থাকে না যেমন পারেনি হায়দ্রাবাদের পশু-চিকিৎসক তরুণীটি।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।