“পাঠগ্রহণের দিনগুলি” সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে অমিতাভ দাস (পর্ব – ১)

আমার পাঠগ্রহণ 

পর্ব ১

১৯৯৪ সাল থেকে ২০১৯ দেখতে দেখতে ২৫ বছর হয়ে গেল সাহিত্য চর্চার—কবিজীবনের । কত স্মৃতি কত কথা ।সব-ই কী আর গুছিয়ে লিখতে পারি ? লেখা যায় ? আমি কেবল এলোমেলো স্মৃতিচারণ করতে পারি মাত্র , আর কিছু নয় । গল্প শোনাতে পারি আমার পাঠগ্রহণের । তার বেশি কিছু নয় ।
আমাদের সাহিত্যচর্চার প্রথম দিকে বেশ কিছু বই আমার অন্তর্জগতকে প্রসারিত ও সমৃদ্ধ করেছিল । এখানে সেই সব বই নিয়ে দু’একটি কথা বলি । তখন আমাদের বাংলা স্যার বিজয় সিংহের উৎসাহে পড়েছিলাম রণজিৎ দাশের ” নির্বাচিত কবিতা “।ওখানে একটা মারাত্মক কবিতা আছে–ছেলেকে বলা রূপকথা ।কত বার যে পড়েছি ।আর মুগ্ধ হয়ে ভেবেছি এত চমৎকার কবিতা কীভাবে লেখা সম্ভব । স্যার- ই পড়িয়েছিলেন কালীকৃষ্ণ গুহের কবিতা ।১৯৯৯ সালে কিনে ফেললাম কালীকৃষ্ণ গুহ’র ” নির্বাচিত কবিতা” ।কবিতা পাক্ষিকের বই । পড়লাম ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা’ –ভাস্কর চক্রবর্তী ।সেসব কবিতা পড়ে বিকেলের পর বিকেল এক ধরণের নিবিড় বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন থেকেছি ।
প্রায় এক -ই সময়ে শাহাবুদ্দিন স্যারের আগ্রহে পড়েছিলাম শঙ্খ ঘোষের ‘জার্নাল’ । যা নিয়ে পরে কিছু কথা হয়েছিল শঙ্খবাবুর সঙ্গে টেলিফোনে ।পড়েছিলাম দিলীপকুমার রায়ে অসাধারণ একটি গ্রন্থ–“তীর্থঙ্কর ” । বরেণ্য কিছু মানুষের মগ্ন জীবন -যাপন আর তাঁদের কথোপকথনের বিস্তারিত আলোচনা ।এত ভাল বই ক’টা যে লেখা হয়েছে ,তাই ভাবি । স্যারের মধ্যমগ্রামে ঝিলের ধারে সেই ভাড়াবাড়িটার কথা মনে পড়ে । নির্জন । কাঠের আলমারি ঠাসা বই । পুরোনো বই-এর গন্ধ আজো যেন আমার নাকে লেগে আছে । এমনি বিশুদ্ধ স্মৃতি সে’সব ।
তখন আমি কলেজ ছাত্র । বিশিষ্ট আলোচক ও অধ্যাপক শিবাজীপ্রতিম বসুর ছাত্র ।তথাপি সাহিত্য ও পত্রিকা করার সুবাদে তাঁর নিবিড় সান্নিধ্য লাভ করেছিলাম । মার্কসবাদ আর গান্ধীবাদটা চমৎকার বুঝেছিলাম তাঁর ক্লাসে । বাকিটা অন্নদাশংকর রায়ের প্রবন্ধ পাঠ করে । তাঁর “শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ” আজো আমাকে দিশা দেয় ।
শাহাবুদ্দিন স্যার প্রথম বিভূতিভূষণকে চিনতে শেখান ।আমি একে একে পড়ি–পথের পাঁচালি ,আরণ্যক ,ইছামতী ও দেবযান ।স্যার-ই আমাকে তারাদাসবাবুর ‘কাজল’ পড়তে বলেন ।ততদিনে তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ পরিচয় সম্পন্ন হয়েছে ।তখন তিনি হাবড়া বাণীপুর লোক উৎসবে আসতেন প্রতি বছর । কাজলও আমার অন্তর জগৎকে ছঁয়েছিল দারুণ ভাবে । “কাজল” পড়ে আমি এক দীর্ঘ চিঠি দিয়েছিলাম তারাদাসবাবুকে ।
সে সময়ে শাহাবুদ্দিন স্যারের আগ্রহে পাঠ করি শঙ্খবাবুর–এ আমির আবরণ ,ছন্দের বারান্দা ,এই শহরের রাখাল ,শব্দ আর সত্য ,নিঃশব্দের তর্জনী ।একটা ঘোরের মধ্যে দিয়ে পড়েছিলাম এইসব প্রবন্ধগুলি ।আর নিজেকে পুষ্ট করে তুলছিলাম । এ আমির আবরণ এত ভালো লেগেছিল যে একটা গদ্য-ই লিখে ফেললাম । ” আমির সন্ধানে: রবীন্দ্রনাথের গান ” । শঙ্খ ঘোষকে পাঠিয়েছিলাম । তিনি পড়েছিলেন । ফোনে বলেছিলেন , ভালো লিখেছেন । এইটুকুই আমার পরম প্রাপ্তি । এখন মনে হয় অল্প বয়সের কত যে প্রগলভতা থাকে , নির্দোষ আবেগ থাকে । আজকের দিনে হলে সংকোচে পাঠাতেই পারতাম না ।
আমার সমকালে বা আরো একটু আগে যাঁরা কবিতা লিখছেন চমৎকার ,তাঁরাও তো তাঁদের লেখায় আমাদের মুগ্ধ তথা আবিষ্ট করেছেন । যাঁদের অনেকেই আজ আর লেখেন না । সে সময় সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ ও বিস্মিত করেছিল যাঁর কবিতা তিনি আবির সিংহ । নিরক্ষর চাঁদের আলোয় ,রাত্রি কুড়িয়ে কুড়িয়ে ,মার্কস নয় ,চাঁদ–মূলত এই তিনটি বইয়ের আবেদনকে আজো অগ্রাহ্য করতে পারিনি । তীর্থঙ্কর মৈত্রের  রানু এক জ্বর ,সমুদ্রের বিস্তারের মত তুমি আর বৃষ্টির ভালো হোক আজো জড়িয়ে রেখেছে । আবেগে ,মরমে ,ভালোলাগায় ছুঁয়ে ছিল এই হাত । পত্রিকা বিক্রির পয়সায় কিনেছিলাম — “বৃষ্টির ভালো হোক” ,  তীর্থঙ্কর মৈত্রর লেখা একটি সবুজ কবিতার বই । বলেছিলাম ,তোমার এই বইটা পুরস্কার পাবে ।কাকতালীয় হলেও সত্য যে ,আমার মুগ্ধতা ভাষা পেয়েছিল ।তীর্থঙ্কর মৈত্র ওই বইটার জন্যই প্রথম পুরস্কার পান ।
সুব্রত সিনহা হারিয়ে গেলেন । নয়ের দশকের এক উল্লেখযোগ্য কবি । তাঁর অসামান্য একটি বই পড়েছিলাম –“বনতুলসীর বিকেল ” । সে বইয়ের ছোট ছোট কবিতাগুলি মুগ্ধ করেছিল  ,যা আজো ভুলতে পারিনা । ছোট ছোট কবিতা । যেগুলোকে আজ অণু কবিতা বলা হচ্ছে ।অপূর্ব এক জীবন-দর্শন । কোথায় হারিয়ে গেল আমার সেই এই প্রিয় কবি ?

(চলবে)

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।