ধারাবাহিক রম্যরচনায় ইন্দ্রাণী ঘোষ
ইচ্ছে মুলুক
আজ বাপু দশ পয়সা হাতে নিয়েই সবুজ ঘরে ঢুকেছি। সূর্যি দাদা রাগ দেখাচ্ছেন তেড়েফুঁড়ে। আমি তো এসেই সবুজ ঘরে ‘ধপাস” হয়েছি। হঠাৎ কুমু এসে কানের লতিতে আলতো কামড় দিলে। আমি বললাম ” এনেছি দশ পয়সা” কুমু বললে “ওতে হবে না, আজ চার আনা লাগবে’ , আমি বললাম ‘ভাই রক্তিমাভ আমার তোরঙ্গটা খোল না’। সে বললে ‘আমার আজ বেজায় ঘুম পাচ্ছে’। অমনি কুমু গিয়ে তাঁকে মারলে এক ঠ্যালা।
আমি দেখলাম কুমুকে চটিয়ে লাভ নেই। তাড়াতাড়ি উঠে ডালা খুলে বার করে দিলাম একটা দশ আর একটা পাঁচ পয়সা। রক্তিমাভ এবার গড়গড় করে গড়াতে শুরু করলে। পাড়ার মোড়ে তখন এক বেহালা আলা এসেছে। আর তাঁর বোনা সুরের জাল ছড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের পাশের বাড়ীর বাগান ছুঁয়ে, আমাদের ছাদ ছুঁয়ে, দেয়াল ছুঁয়ে। কুমু তাঁর কুচি কুচি দাঁত দিয়ে সে ফিনফিনে জাল কেটে মোড়ের মাথায় সাঁতরে যেতে লাগল। আমি রতুর(রক্তিমাভ) গায়ে পা তুলে শুয়ে রইলাম।
চোখটা একটু জুড়িয়ে এসেছে কুমু এসে হাজির। মুখে একটা ছাই রঙা মিনিয়েচার মোড়া তাতে নীল , সবুজ মিনেকারি কাজ করা।
কুমু বললে ‘বুড়ো আজ কুলপি আনে নি বেহালা এনেছে’। তা আমি বললাম ‘ বুড়ো কোথায়?’ কুমু বললে ওই রাধাচূড়াতলায় বেহালা বাজাচ্ছে। আমি বললাম ” এই দুপুরে ওখানে কেন? এই ঘরেই এসে একটু জল বাতাসা খেয়ে খানিক জিরিয়ে নিক।’ আমার কথা শুনেই রতু গড়াতে শুরু করলে। পেছন পেছন কুমুও ধাওয়া করলে। সবুজ দেয়াল তখন বাতাসের মত ফিনফিনে হয়ে গেছে। মোড়ার মিনের কাজ দিয়ে তখন হলুদ, কমলা আলো বেরোচ্ছে।
তা বলের পিঠে চেপে তো বুড়ো এসে হাজির। আমি কুঁজো থেকে জল গড়িয়ে আসন পেতে ঘিঞ্জি ঘরে বসতে দিলেম। পাশের কার্নিশে পায়রা দম্পতির বাসা থেকে তখন নীলচে আলো বেরোচ্ছে। আমি বুড়োকে জিজ্ঞেস করলাম “ও কিসের আলো?” বুড়ো বললে ” ওদের বাসায় নীলকান্ত মণি আছে দিদি, সবাই ওঁকে দেখতে পায় না’ আমি উঠে গিয়ে শিকের ফাঁক দিয়ে দেখতে গেলাম। তা সেই আসমানি রঙের আলো এসে আমায় দুই হাতে জড়িয়ে ধরলে। আমিও তাঁর বুকে মাথা এলিয়ে দিলাম। আমার ঠোঁট, চিবুক, কপাল জুড়ে সে আলো খেলা করলে। বুড়ো তখন সুর ধরেছে। আমার সারা ঘর তখন সাত সুরে আর সাত রঙে থৈ থৈ করছে। আমার ঘরের বাইরে সে সাত রঙা ঢেউ উছলে পড়লে তাতে এসে ঠোঁট আর পালক ডোবাল বুলবুলি, টুনটুনি, ছাতারেরা। আমি কুমুকে বললাম ‘ওদের ভিতরে ডাক’, অমনি বাঁ দিকের সবুজ দেয়ালটা গভীর বন হয়ে গেল। আর তাঁর ডালে ডালে দুধসাদা দুধরাজ, লাল টুকটুকে আলতাপরি, ঘন নীল ময়ূর সবাই সূরে সুরে সুর মেলালে। কতক্ষণ সে জলসা চলেছিল জানি না। শুধু মনে আছে বনের মাঝে এক রথ এসে দাঁড়ালে। বুড়ো তখন আমার কাছে এসে বললে ‘ দেখ তো দিদি আমার সারথিটিকে চেন কিনা?’ চোখ কচলে দেখলাম সে এক দিব্য পুরুষ। আমি চেঁচিয়ে বললাম ‘ চিনি গো চিনি বুড়ো তোমাদের দুজনকেই চিনি ,তোমার এই সারথি তোমায় আমার ঘরে এনেছিল কতকাল আগে’।
আর কি বুড়ো থাকে, রথে চড়ে হাওয়া সারথিকে নিয়ে। বনটাও আর নেই। কুমু আর রক্তিমাভ ঘুমিয়ে কাদা। শুধু আমার চিবুকে, ঘাড়ে, গলায় আসমানি রেশমের পরশ জড়িয়ে আছে। সাঝবাতির মত তারারা তখন মাথার উপর নীল উঠোনটাতে একটু একটু করে ফুটতে শুরু করেছে।