অতীন কি বোঝেনা? বোঝে। বুঝেও মানতে গেলে মন ভারি হয়ে যায়। বরং যার সংস্পর্শে বুঝতে বাধ্য হচ্ছে তার ওপর রাগ হয়। বাচ্চার জন্য তার তেমন ব্যাকুলতা ছিল না। ভাইপো-ভাইজি ভাগ্নে-ভাগ্নীরাই তার প্রাণ ছিল। রুমাই অস্থির হয়ে উঠেছিল। যদিও অভিযোগ করে সমীরদার নানা উল্টোপাল্টা প্রশ্ন আর টিটকিরি মারা কথাও তাকে বাচ্চার জন্ম দিয়ে দোষমুক্ত হতে প্ররোচিত করেছিল। কে জানে? অন্যের প্ররোচনায় অত ব্যাকুলতা জন্মায়? রাগ হয় রুমার ওপর, কেন সে সব দুধকা দুধ, পানিকা পানি করে দিল। তাদের বাচ্চা না হলে মায়ের বৈষম্য চোখেই পড়ত না। ভাই বোনেদের সন্তান নিয়ে আদর করা, আবদার মেটানো – এগুলোই জীবনের সার্থকতা বলে জানত। অন্তু এখনও না বুঝে থাকতে পারে আগের মত। কিন্তু বুঝিয়ে দেবার মানুষ যদি সবসময় সজাগ থাকে।
রুমার কথার জবাব না দিয়ে অতীন স্নানঘরে ঢুকে পড়ল। রুমার খেয়াল হল শোবার ঘরে ওর চলভাষ বেজে বেজে নীরব হয়ে গেল। ফোন তুলে দেখল সমীরণ। বেঙ্গল ট্যালেন্ট নামে একটা প্রকাশনা চালায়। রুমা ফিরতি কল করল।
“হ্যাঁ দিদি, কেমন আছেন?”
“চলছে। তোমার কী খবর?”
“হ্যাঁ দিদি। সেই কথা বলতেই তো ফোন করা। আমরা যে কবিতা কম্পিটিশন আয়োজন করেছিলাম, তার রেজাল্ট বেরিয়েছে। অভিনন্দন দিদি, আপনি প্রথম কুড়ি জনের মধ্যে আছেন।”
“কুড়িজনের মধ্যে থাকার জন্য আবার অভিনন্দন? ফার্স্ট সেকেন্ডে থার্ডের মধ্যে তো হইনি।”
“পাঁচশোর ওপর প্রতিযোগী ছিল পশ্চিমবঙ্গের সবকটি জেলা থেকে। তার মধ্যে অষ্টম স্থান অধিকার করাটাও কম নয়। তাছাড়া আমরা প্রথম পঞ্চাশজনের কবিতা নিয়ে একটি সংকলন করছি, খুব রিজনেবল দাম রাখছি সেটার। তার মধ্যে প্রথম তিনজনকে পুরস্কৃত করা ছাড়াও আপনাদের প্রথম কুড়িজন কবিকেই বিশেষ সম্বর্ধনা দেব। কলামন্দিরে অনুষ্ঠান করে আপনাদের পুরস্কার ও সম্বর্ধনা দেওয়া হবে। আপনাকে দিনক্ষণ জানিয়ে দেব। তবে দিদি আপনি শুধু একজন বিজয়ী নন, আপনি তো আমাদের সংস্থার সঙ্গে আছেন। ওইদিন কিন্তু সঞ্চালনা আপনাকেই করতে হবে। প্রোগ্রামের একটা প্ল্যান আর স্ক্রিপ্ট তৈরি করুন। আর সেদিন আমাদের একটি পত্রিকাও প্রকাশ হবে, তার জন্য একটা সম্পাদকীয় লিখে আনতে পারবেন? আপনাকে আমাদের সম্পাদক মণ্ডলীর মধ্যে চাইছি।”
“ঠিক আছে থ্যাংক ইউ। কিসের প্রোগ্রাম কী কী থাকবে সেটা সেটা না জেনে আমি কী পরিকল্পনা করতে পারি?”
“দিদি আপনিই তো সাজেস্ট করবেন কী কী রাখা যায়। সরচিত কবিতা পাঠ ছাড়াও নাচ গান আবৃত্তি সব মিলিয়ে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও রাখা হবে। আপনি নিজের মতো করে লিখুন না। যেই সঞ্চালনা করুক একটা গাইডলাইন তো চাই”
“মহাবীর সেবা সদনের ওপর যে প্রতিবদনটা দিন কুড়ি হয়ে গেল জমা দিলাম, তার খবর কী? তারপরে গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়েও একটা লেখা চাইল সঞ্চিত তোমার কাগজের জন্য, সেটাও তো গত সপ্তাহে সঞ্জিতের অফিসে দিয়ে এসেছি। সেগুলো কবে বেরোবে? নতুন লেখা তো দিতেই পারি, কিন্তু পুরোনোগুলো..”
“দিদি আপনার প্রতিবেদনটার জন্যই ট্যাবলয়েডের ইশ্যুটা আটকে ছিল। ওটা কম্পোজে পাঠিয়ে দিয়েছি। আপনি প্লীজ এই দুটো মানে প্রোগ্রামের স্ক্রিপ্ট আর সম্পাদকীয়টা লিখে দিন।”
“আর গ্লোবাল ওয়ার্মিং?”
“ওটা আমাদের ট্যাবলয়েড নয়, পত্রিকাতেই যাবে। অনুষ্ঠানের দিন প্রকাশ পাবে। সম্পাদকীয়টা ওর জন্যই চাইছি।”
“তাহলে ওই আর্টিকেলটাই সম্পাদকীয় বানিয়ে দাও না। একটু বড় যদিও।”
“না দিদি, আর্টিকেলটা এত ভালো হয়েছে, রেফারেন্স রয়েছে, ওটা আলাদাই বেরোক। আপনি সাম্প্রতিক পরিবেশ সমস্যার ওপর আলাদা একটা সম্পাদকীয় লিখুন।”
“আচ্ছা, দেখছি। দিন পনেরোর মধ্যে দিলে হবে? অনুষ্ঠানের তো দেরি আছে।”
“দিন সাতেকের বেশি দেরি করবেন না। আমাকে কম্পোজ করিয়ে প্রুফও তো দেখাতে হবে। একদিন অফিসে আসুন না।”
“লেখাগুলো তৈরি হলে যাব। রাখছি।”
“কার সাথে এত বক বক করছ?” অতীন বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে।
রুমা বিবরণ শুরু করল। অতীন খিঁচিয়ে উঠল, ‘শুধু নিজের কথা বলে যাও, নিজের ফ্ল্যাট, নিজের লেখা, অনুষ্ঠান। আমি অফিস থেকে ফিরে এসে কী খাব সেটা জিজ্ঞাসা করার দরকার বোধ করো না।”