রুমার কথায় কান দেওয়ার মানে হয় না। নিজের বাবার সম্পত্তি যে ছেড়ে দিচ্ছে, সে শ্বশুরের টাকার দিকে হাত বাড়াবে? ছিঃ!
কিছু জিনিস অনুদ্দ্ঘাটিত থাকাই মঙ্গল। যেমন মায়ের অবুঝপনার ভান। আর সেজন্য মা অন্য ভাই-বোনেদের যতই বেশি কিছু দিকনা কেন, অন্তুকে জন্ম দিয়ে যে এত বড়টা করেছে এটাই কি যথেষ্ট নয়? মা যে অন্যদের চাইতে অন্তুর কাছে থাকলে নানা রকম খাবার আবদার করে, যাকে যা প্রাণ চায় কিনে দেওয়ার জন্য টাকা নেয়, যা ইচ্ছা তাই বলে, নিজের মতো করে থাকে, এটাই তো তার স্নেহ-ভালোবাসার পরিচয়। অন্তু মাকে জানতেও দেয় না সে রুমার ফিক্স ডিপোজিটের টাকা ভেঙে মায়ের শখ পূরণ করছে। অথচ রুমা ঠিক ঠারে ঠোরে মাকে জানাতে চেষ্টা করবেই। মা কী সুন্দর বাচ্চা মেয়ের মতো অবুঝপনা করে প্রিয় ছেলের কাছে আবদার করে, ছেলেও মায়ের ইচ্ছাটা নিজের ইচ্ছা বলে চালিয়ে নিজেকে উজাড় করে দেয়। কিন্তু রুমা মা-ছেলের পারস্পরিক এই ভূমিকা যে ছলনা, তা প্রমাণ করেই ছাড়বে যেন। সে মাকে কী দিচ্ছে, আর কী পাচ্ছে, সেটা তাদের মা-ছেলের ব্যাপার। অন্য ভাইবোনেরা কোন কর্তব্য করে কী পেল – এই তুলনাটাই অতীনের ভীষণ অশ্লীল লাগে।
মেয়েটা হবার পর থেকে রুমা চোখে আঙুল দিয়ে অন্য নাতি-নাতনিদের চাইতে বুবলুর সাথে কী কী বৈষম্য করা হচ্ছে তা দেখানোর সুযোগ পেয়ে গেছে। ছোড়দার পাকা চাকরি নেই, তার কথা তো ভাবতেই হবে। তাই মামনির জন্য মায়ের আলাদা বাড়তি ব্যবস্থা। বান্টি হল বাড়ির বড় নাতি, তার তো খাতির হবেই। দিদির ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রটা তো কুটুমবাড়িতে সম্মানের প্রশ্ন। তাদেরকেও যথাসাধ্য দেওয়া কর্তব্য। ওদের সবাইকে দিয়ে থুয়ে আর নিজের চিকিৎসার খরচ চালিয়ে মায়ের হাতে বাড়িভাড়া আর পেনশন বাবদ কতটুকু পড়ে থাকে? এরপরও যখন ছোটো নাতনিকে কিছু দিতে প্রাণ চায়, তখন সেই টাকাটা ছোটোছেলেরই তো গোপনে দিয়ে দেওয়া কর্তব্য। পরের বাড়ির মেয়ে এসব বুঝবে কেন? রুমার যুক্তিটা খণ্ডন করা না গেলেও মন প্রাণ থেকে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। মাকে যখন তখন টাকা সরবরাহ করাটা তো বাচ্চা হওয়ার অজুহাতে বন্ধই হয়ে গেল। দিদি-সমীরদা বাড়িতে এসটাবলিশ্মেন্ট বাবদ মাসে মাসে টাকা পাঠায় না বলে কত খোঁটা দেয়। সমীরদা তো খোলাখুলি “বৌয়ের ভেড়ুয়া” বলে। অভিযোগটা অস্বীকার করার ক্ষমতা অন্তুর নেই। করতে চায়ও না। রুমা বঝুক সে কত স্বার্থপর। সব কিছু কি নিক্তি মেপে হয়? পৃথিবীতে সবাই পেতে আসে না, কাওকে কাওকে দেওয়ার দায়িত্বটাও নিতে হয়। এসব ঝামেলায় জড়াতে চায় না বলেই নিজের বিয়েতে বিশেষ উৎসাহ ছিল না। দিদি সমীরদা এমন জোর করল বলেই অপ্রয়োজনীয় সম্পর্কের অনুপ্রবেশে অতীনের জীবনটা দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। মা তো আইবুড়োভাতের দিন চোখের জলও ফেলেছিল।
যে ছেলের কাছে মায়ের সব দাবি-দাওয়া, তার বৌয়ের ওপর একটু খবরদারি করতে পারবে না? দাদারা তো বৌদিদের, বিশেষ করে বড়বৌদিকে মা কিছু বললে, তো বড়দা মাকে মা বলে রেয়াত করে না। মায়ের ভাষায় ‘গুয়ে বসিয়ে দেয়’। মা চিরকাল শাসন করে এসেছে। এখন বৌদিদের তো একটুও কটুকাটব্য করা যাবে না, তাহলে বেচারি জ্বালা জুড়োবে কোথায়? অনুগত বশংবদ অন্তুর বৌকেও যদি একটু হম্বি-তম্বি করতে না পারে, তা হলে চলে? নিজের মনে করে বলেই না বকাঝকা করে। এটাকে কি অপমান করা বলে? নাকি বাপ-মা তুলে, বাপের বাড়ির শিক্ষা তুলে খারাপ কথা বলে। না হয় বলল। বুড়োমানুষ কদিনই বা থাকবে ভেবে কি গায়ে না মেখে থাকা যায় না? আর মা হল সবচেয়ে সম্মানীয়। রুমার মা-বাবার চেয়েও বয়সে অনেক বড়। যা মুখে আসে বলতেই পারে, তাই বলে রুমাকেও অতীনের মাথা খেতে হবে? সব চেয়ে বড় কথা, মা কোনো অন্যায় করতে পারে, সেটা অন্তু অন্তত বিশ্বাস করতে পারে না। মা যদি কিছু বলেই থাকে বা করে থাকে, তাহলে তার যথোপযুক্ত কারণ নিশ্চই থেকে থাকবে। মার কপালটাই খারাপ, সবার জন্য করে মরে অথচ সবাই তার মুখের কথায় ভুল বোঝে। অবশ্য রুমা অতীনের মাথা খাওয়ার বদলে বৌদিদের মতো মাকে সরাসরি কিছু বললে অতীন ওর আসল জায়গাটা বুঝিয়ে দেবে, অশান্তির ভয় করবে না।
আর এই এক নতুন এক জ্বালা হয়েছে। ফ্ল্যাট-ফ্ল্যাট করে রুমা পাগোল করে দিচ্ছে কয়েক বছর হল। অতীন নিজের ব্যাঙের আধুলি যা আছে তা দিয়ে অধুনা বিহার সরকারের কাছে বন্ধক দেওয়া জামশেদপুরের বাড়িটা ছাড়াবে বলে ঠিক করে রেখেছিল। দাদারা খানিকটার দায়িত্ব নিলে বাকিটা অতীন যেমন করে হোক যোগাড় করবে। কিন্তু বাড়িতে কারও চোঁঘোঁ নেই। উপরন্তু অতীনেরই যে বাড়িতে কোনও জায়গা নেই, সেটাও স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রুমার সামনে অতীনদের পরিবারের সম্মিলিত চালাকিটা ধরা পড়ে যচ্ছে, কোনও আড়াল থাকছে না। দিদিটা এমন বোকা, রুমার কাছে মর্টগেজের কথাটা ফাঁস করে দিয়েছে। ওদিকে মা দাদারা এসেও অতীনের ছোট ভাড়া বাড়ি নিয়ে ফুট কাটতে ছাড়ে না। অন্তু নিজের একটা ব্যবস্থা করে নিক, সে ইঙ্গিত সকলেই দিচ্ছে। সেই সঙ্গে ব্রতীনের মাথার ওপর ছাদ সুরক্ষিত রাখার জন্য অতীন টাকা ঢালুক এমন প্রত্যাশাও রাখা হচ্ছে। রুমা ব্যাপারটা জানার পর মরিয়া হয়ে উঠেছে। নিজস্ব বাসার অভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। প্রায়ই বলে “বাচ্চা নিয়ে কি শেষে পথে দাঁড়াব?”