সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে শুভস্মিতা কাঞ্জী (পর্ব – ২)

কলিকাতা বিশ্বাবিদ্যালয় থেকে সম্মানিক ভূগোল নিয়ে পাশ করার পর, ওখান থেকেই ভূগোলে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষ করে এই মুহূর্তে নিজের এন.জিও, নাচ এবং লেখালিখি নিয়ে আছেন। 

বন্ধু 

দ্বিতীয় পর্ব

দুদিন হয়ে গেল মালিনী কলেজে এল না..নবারুন একটু চিন্তিত হলেও অতটা গা করল না…ভাবল শরীর টরীর খারাপ হয়তো! বাড়িও যেতে পারছে না, মালিনীর বাবা ওকে ঠিক পছন্দ করেন না যে!..

দুদিনের জায়গায় ধীরে ধীরে দু সপ্তাহ থেকে দু মাস হল, মালিনী এল না আর কলেজে…নবারুন ওর এই না আসাটায় বড়ই কেমন হয়ে থাকে, ওর এই অ্যাবসেন্সটা নবারুনকে যেন কুরে কুরে খেতে থাকে…ক্লাসের কেউই কিছু বলতে পারল না…সবটাই যেন হঠাৎ করে কেমন পানসে লাগতে থাকে, সাথে একটা ভয়, না না দুটো ভয়, এক মালিনীর কী হল আর দুই পরীক্ষায় কী হবে! টেনশনে আজকাল ভুল করে দু চারটে ক্লাসে গিয়েও বসছে নবারুন, পার্টির কাজে মন লাগে না.. ভিতরটা কেমন খালি লাগে যেন..সেই দামাল দাপুটে ছেলেটা আজকাল কেমন হয়ে গেছে যেন হুট করে!  বিরক্তি ঘিরে থাকে সবসময়, মালিনীর সাথে সাথে থাকা, খেয়াল রাখাটা সবটা যেন সবসময় মিস করতে থাকে সে..

ভালো লাগছে না ওর কিছুই যেন! পরীক্ষা আর এক সপ্তাহ বাদে, আর মেয়ে কলেজে আসছে না এখনও! ধুর!!
পরীক্ষাটা কোনক্রমে দিল..ওই নমো নমো করে নিজে যা পেরেছে পড়ে দিয়েছে, উতরে যাবে জানে তবে সে রেজাল্ট পাতে দেওয়ার মতন হবে না এও জানে!
পরীক্ষা শেষ হতেই মনের সব দ্বিধা কাটিয়ে দৌড় দিল মালিনীর বাড়ি, না ও পরীক্ষা দেয়নি..আর তাতেই আরও চিন্তা বেড়েছে, আর পারেনি থাকতে নবারুন..কারণ মালিনী যা মেয়ে ও পরীক্ষা দেবে না এটা হয় না..সিরিয়াস কিছু হয়েছে নিশ্চয়!
বাড়ি গিয়ে দেখে তালা..খোঁজ নিয়ে জানতে পারে মালিনীর মা ওনার বাপের বাড়িতে, মালিনীর বাবাও ওখানে আছেন আপাতত,  মাঝে মধ্যে এ বাড়ি আসেন! আর মালিনীর বিয়ে হয়ে গেছে, ওর বাবার দেখা পাত্রের সাথেই…মামাবাড়ি থেকেই তড়িঘড়ি বিয়ে হয়েছে..
শেষ কথাটায় যেন নবারুনের পায়ের নীচে মাটি কেঁপে উঠল…মালিনী বিয়ে করল অথচ জানালো না! কী এমন হল?? এত রাগ মেয়ের! এত অভিমান!
নবারুনের বুকে এক অদ্ভুত কষ্ট হতে থাকে..দুমড়ে মুচড়ে যেতে থাকে ভিতরটা…এই অদ্ভুত কষ্টের কারণ বোঝে না ও প্রথমে…দিন যায়, মালিনীর না থাকা, ওর বিয়ের খবর যেন ওকে গ্রাস করতে থাকে ক্রমশ…দিনে সিগারেট খাওয়ার সংখ্যা বাড়তে থাকে হুহু করে, পার্টি অফিস যায় না আর..ফেস্টুন স্লোগান, চোখের সেই তীক্ষ্ণ ভাব সব হারাতে থাকে ..
মনের এই অদ্ভুত অবস্থাটা কী বা কেন বুঝতে পারে না নবারুন… বা হয়তো পারছে ভিতর ভিতর! ও জানে না, তবে এটা জানে ও ওর প্রিয় বন্ধু, ওর মালিনী কে মিস করছে, ভীষণ ভীষণ মিস করছে..সাথে একটা অভিমানও জমে আছে মনে..দেখা হলে শোধ নেবেই ও এর…
দুটো বছর কেটে যায়, নবারুন এখন বাবার দোকানে বসে, ওই নীলরতন হাসপাতালের পাশেই | পার্টি, নতুন দিনের স্বপ্ন আজ বাক্স বন্দী, মালিনীর সাথে সাথে সবটা গেছে | গ্র্যাজুয়েশন পর আর পড়াশোনাটা হয়নি, রেজাল্টটা হয়েছিল, কোনক্রমে সেকেন্ড ক্লাসে উতরে গেছিল | বহুদিন গৃহবন্দী করে রেখেছিল নিজেকে, সিগারেট আর বইয়ে ডুবে থাকত, তারপর বাবার বকা আর বোঝানোয় অবশেষে দোকানে বসতে রাজী হয়, এখন এতেই অভ্যস্থ | জীবন পাল্টেছে|
সেদিন সবে খেয়ে এসে দোকানে বসে কর্মচারী দুজনকে তাগাদা দিচ্ছে কাজের জন্য, এমন সময় একটি লোক আসে | লোকটিকে দেখে চিনতে পারে, মালিনীর বাবা, ভীষণ ঘৃণা মেশানো রাগ হল! হ্যাঁ এতবছর পরেও, একবার ভাবল বলে দিই “কোনো ওষুধ হবে না এখন আসতে পারেন”, তারপর কী ভেবে এগিয়ে গেল, ভদ্রলোকের হয়তো আর ওকে মনে নেই, বা চিন্তিত থাকার কারণ খেয়াল করলেন না, ও ওষুধগুলো দিতে গিয়ে নাম দেখে চমকায়, মালিনী! ওর কিছু হয়েছে তার মানে! ওষুধগুলো দেখে বোঝে প্রেগনেন্সির ওষুধ, সাথে এইচ.আই.ভির ওষুধ |
ভদ্রলোক ওষুধ নিয়ে বিল মিটিয়ে চলে যান, ও ছেলেগুলোকে দোকান দেখতে বলে ওঁর পিছু নেয়, হাসপাতালের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলে আটকায়, ওর কাছে কার্ড নেই কী করবে! কিছু না ভেবেই গার্ডের হাতে কটা টাকা গুঁজে বলে খুব আর্জেন্ট! সেও নাছোড়বান্দা, ছাড়বে না, তর্কাতর্কি বাঁধে | মালিনীর বাবা নেমে আসেন, এবার বোধহয় চিনতে পারলেন ওকে,
-এ কী তুমি!
-হ্যাঁ না মানে কাকু আপনি আমার দোকান থেকেই ওষুধ গুলো নিলেন তাই মালিনীর কিছু হয়েছে বুঝেছি তাই ওকে মানে….একটু দেখা যদি…
লোকটির ভ্রু কুঁচকে গেল, মুহূর্ত কী ভেবে বললেন,
-এসো |
পকেট থেকে আরেকটা কার্ড বের করে গার্ডের হাতে দিলেন, গার্ডও নবারুন কে ছেড়ে দিল | ও সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে বলে,
-ধন্যবাদ
ওঁর পিছন পিছন ওয়ার্ডে ঢোকে, ভদ্রলোক এক বেডের সামনে দাঁড়ালেন | এ কী এ কে শুয়ে! এ কী চেহারা হয়েছে মালিনীর!!!
-মালু, দেখ কে এসেছে!
-অ্যাঁ!
-কে এসেছে দেখ!
-কে?
-আমি মালিনী! নবারুন
-ত…তুই! কোথ থেকে?
-কাকু আমাদের দোকান থেকেই ওষুধ কিনলেন তখন |
-তোরা কথা বল আমি আসছি |
ভদ্রলোক চলে যান, নবারুন পাশের টুলটায় বসল, মালিনী হেলান দিয়ে শোয়া,
-এ কী করেছিস নিজের! এটা কী চেহারা তোর!
-হাহ! এ আর নতুন কী! প্রাণটা এখনও আছে এই অনেক!
নবারুন লক্ষ্য করে ওর গলায় হাতে কালশিটের দাগ স্পষ্ট! ও বলে,
-তোকে মারত ওরা?
-থাক না!
-না তুই বল?
-জেনে কী করবি? যুদ্ধ? পৃথিবী বদলাবি?
-তোর শ্বশুর বাড়ির লোকেরা তোর বর আসবে না! নাকি এসেছে? কই তারা?
-তাড়িয়ে দেওয়ার পর কেউ দেখতে আসে বুঝি??
-মানে!
মালিনী খানিক থেমে একে একে গল্প বলে, বিয়ের পর থেকে ওর ওপর হওয়া ওর বরের অত্যাচার,  রান্না করা ,বাসন মাজা, পুজো দেওয়া ,সবার খেয়াল রাখা এতেই কাটে ওর জীবন| বিশাল বড়লোক বাড়িতেই বিয়ে হয়েছিল, ওর বাবা যা ভেবে বিয়ে দিয়েছিলেন তা হয়নি, মুখরা স্বাধীনচেতা কমিউনিজিমে বিশ্বাসী মেয়েটা প্রশ্ন তুলত কথায় কথায়, আর প্রশ্ন তুললে কথা বললেই জুটেছে মার, জীবন বদলাতে থাকে, চলে মানসিক শারীরিক অত্যাচার| বাপের বাড়ি আসতে দিত না, ও আসতে চাইত না বাবা মায়ের উপর রাগ করে| এভাবেই মাস, বছর কাটে | হঠাৎ ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে মালিনী, পরীক্ষা করে জানা যায় শরীরে এইচআইভি বাসা বেঁধেছে | সঙ্গে সঙ্গে দাগিয়ে দেওয়া হল চরিত্রহীন বলে, বাড়ি থেকে না বেরানো মেয়েটা নাকি বাইরে থেকে চরিত্র নোংরা করে এই রোগ এনেছে, এবং তা বরের মধ্যেও ছড়িয়ে দিয়েছে, কারণ বরেরও এইচআইভি ধরা পড়ে | শুরু হয় তুলকালাম, কেউ জানে না আদতে ওর বর, যে অর্ধেক দিন  পতিতালয়ে দিন কাটাতো, রোগটা তারই বয়ে আনা | দোষ হয় মালিনীর, তাড়িয়ে দেওয়া হয় শ্বশুর বাড়ি থেকে, ওর বাবা মা বুঝিয়েও পারেনি, অবশেষে ঠাঁই হয় বাপের বাড়িতেই, এর মাঝে জানা যায় ওর কন্সিভ করেছে | বর অস্বীকার করে এই বাচ্চাকে | অপমানে লাঞ্ছনায় শেষ হতে চেয়েছিল পারেনি, তাই তো হাসপাতালে |
সবটা শুনে চুপ করে বসে থাকে নবারুন |
-কী রে? কথা বলবি না? এখনও রাগ করে থাকবি?
-একবার জানাতে পারলি না? আমি কী বড় পর হয়ে গেছিলাম রে??
– জানাতাম কাকে? আর কিভাবে?
-বিয়ের আগেও বললি না!
– সময় পাই নি, সুযোগ পাইনি বিশ্বাস কর, তুই তো মনের কথা বলিস নি, তবুও তোর না বলা কথাগুলো কে সত্যি বানিয়ে বাবাকে মিথ্যে বলে এ বিয়ে ভেস্তে দিতে চেয়েছিলাম আর সেটাই কাল হল|
-তুই আমায় বন্ধুই ভাবিস না |
-তুই আমার বন্ধু নোস নব, আমার প্রিয় বন্ধু, আমার……
মালিনী চুপ করে গেল, সারা হাসপাতালের কোলাহল যেন হঠাতই চুপ করে গেল, দুজন দুজনের চোখে আটকে, না বলা কত কথা বলে যাচ্ছে দুজোড়া চোখ, এতদিনের জমা সব অভিমান, রাগ মিটিয়ে নিচ্ছে ওরা নিশ্চুপ ভাবে |
মালিনীর চোখের কোল বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে | নবারুন সেটা মুছিয়ে বলে,
-কাঁদতে হবে না আমি আছি তো, আমি এবার সবটা দেখে নেবো, আর তোকে না বলা কথাগুলো এবার…
-থাক নব..না বলা কথাগুলো থাক বরং! তারপর বল কী করছিস আজকাল?
-বাবার দোকানে বসছি!
-আর তোর স্বপ্ন? পার্টি?
-সব গেছে তোর সাথে, তোর যাওয়াটা আমার কাছে ধাক্কা ছিল, অনেক কিছু শিখিয়েছে বুঝিয়েছে, বিশেষ করে তোর গুরুত্ব! তুই যা শুনতে চাইতিস সেটাকে |
মালিনী হেসে মাথা নামিয়ে নেয় |
নবারুন ওর শীর্ণকায় হাতটা ছুঁলো, মালিনীর ওর রুগ্ন শরীরেও যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল | আঙুলে আঙুল খেলে চলে | দুজনে নিশ্চুপ ভাবে দুজনকে দেখে যায় | মালিনীর বাবা ফেরার পথে ওদের ওভাবে দেখে বুঝলেন কী ভুলটা করেছিলেন!
সেদিন নবারুন বাড়ি ফেরে, অনেক ভাবে, প্যাকেটের পর প্যাকেট সিগারেট শেষ হয়ে যায়, সারারাত ঘুমাতে পারে না, অবশেষে ঠিক করে মালিনী কে বলেই দেবে ওকে ভালোবাসে, ওকে বিয়ে করবে, ওর যত্ন নেবে, মালিনী যতদিন থাকবে ওর সাথে থাকবে, ওর সন্তানও নবারুনেরই হবে…সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়, ওর মা বাবা, মালিনীর মা বাবা যা বলে বলুক দেখা যাবে, কিন্তু এবার আর মালিনী কে হারাতে দেবে না |
পরদিন সকালে মালিনীর কাছে যাওয়া হল না একটা ভীষণ জরুরি কাজ আসায়, সেদিন বিকেলে ফিরে দোকান থেকে ঘুরে হাসপাতালে যেতে যাবে এমন সময় দোকানের একটি ছেলে ওকে একটি চিঠি দেয়, মালিনীর চিঠি |

(চলবে)

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।